এই ওয়েবসাইটে আর আপডেট হবে না। আমাদের নতুন সাইট Parstoday Bangla
রবিবার, 22 নভেম্বর 2015 18:50

সাদা পাখি (৬)

২২ নভেম্বর (রেডিও তেহরান):পথিমধ্যে আবহাওয়া গুমোট হয়ে এলো। হঠাৎ করেই শুরু হয়ে গেল ঝড়-তুফান। এমন ভীষণ তুফান যে শিরযাদের মনে হলো এ মুহূর্তে ঘোড়ার পিঠ থেকে নেমে যদি কোথায় আশ্রয় না নেয় তাহলে ঝড় তাদেরকে উড়িয়ে নিয়ে যাবে। সে এদিক ওদিক তাকিয়ে কোথায় আশ্রয় নেয়া যায় জায়গা খুঁজলো। চোখে পড়লো তার একটা কেল্লা। খুব বেশি দূরে নয়,কাছেই। ঘোড়াকে সে ওই কেল্লার দিকে ঘুরালো। কিন্তু যখন সে ঘোড়ার পিঠ থেকে নামতে চাইলো তখনই সেই সাদা পাখি এসে হাজির। সাদা পাখি এবার শিরযাদকে তার ধারালো নখ দিয়ে আঘাত করতে শুরু করলো। এমনভাবে নখ দিয়ে খোঁচালো যেন শিরযাদ ঘোড়ার পিঠ থেকে নামতে না পারে। শেষ পর্যন্ত তাই হলো। ঘোড়ার পিঠ থেকে আর নামলো না শিরযাদ। আর সাদা পাখি ঘোড়ার পিছে পিছে উড়ে যেতে লাগলো।

 

শিরযাদ বেচারা এই ঝড়-তুফানের ভেতরেই ঘোড়া নিয়ে ছুটলো। ধীরে ধীরে তুফান থেমে গেল এবং শিরযাদ আর দেওকন্যা কিছুটা স্বস্তি পেল। সাদা পাখিও এবার চলে গেল। কিছুটা পথ সামনে যাবার পর শিরযাদ দেখলো একটা কৃষিভূমিতে সোনার লাগাম আর মালা পরা একটা ঘোড়া আনমনে লেজ নাড়াচ্ছে আর চরে বেড়াচ্ছে। সাদা ডিমের খোসার মতোই দেখতে,একদম সাদা। দেওকন্যা বললো: ‘শিরযাদ! দেখো কী সুন্দর ঘোড়া! যদি এই ঘোড়াটাকে ধরে আনতে পারতাম তাহলে আমি ওই ঘোড়ার পিঠে চড়তাম! তাহলে তোমার আর কষ্ট হতো না। আমারও না!’

 

দেওকন্যার কথা শেষ না হতেই সাদা ঘোড়া হ্রেষা তুলে দৌড়ে এলো তাদের কাছে। শিরযাদ ঘোড়াটির লাগাম হাতে তুলে নিতে গেল ঠিক সেই মুহূর্তে আবারও ওই সাদাপাখি বিজলির মতো এসে হাজির হলো। এসেই সে শিরযাদকে নখ দিয়ে আঘাত করতে লাগলো এবং ঘোড়াটিকে তাড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করলো।

 

সাদাপাখির এই আচরণে শিরযাদ বিরক্ত হলো। কিন্তু কিছুই বললো না। সে তার মতো যেতে লাগলো। যেতে যেতে এক সময় গিয়ে পৌঁছলো সেই দৈত্যের কেল্লার কাছে যে কেল্লার দৈত্য তাকে আঙুরের ঝুড়ি দেওয়ার জন্য শর্ত দিয়েছিল সাদা দৈত্যের কন্যাকে নিয়ে আসতে। সাদা পাখি এবার শিরযাদকে বললো: একটু ধৈর্য ধরো,একটু অপেক্ষা করো শিরযাদ! আমার মনে হচ্ছে তুমি এবং এই দেওকন্যা পরস্পরকে ভালবাসতে শুরু করেছো। তাহলে এই কন্যাকে তো কোনোভাবেই দৈত্যের হাতে তুলে দেওয়া যায় না। এক কাজ করো! আমি এখন ঠিক এই দেওকন্যার মতো রূপ ধারণ করবো। তুমি আমাকে নিয়ে যাবে দৈত্যের কাছে আর এই কন্যাকে এখানে রেখে যাবে।’

 

তাই করলো শিরযাদ। আর ওই দৈত্য এক ঝুড়ি আঙুর দিলো শিরযাদকে। আঙুর নিয়ে বেরিয়ে এসে শিরযাদ দেওকন্যাকে ঘোড়ায় চড়িয়ে ফিরে চললো দৈত্যকেল্লার দিকে।

 

যেতে যেতে প্রায় পৌঁছে গেল কবুতর পালা দৈত্যদের কেল্লায়। হঠাৎ করে সেই সাদা পাখি আবারও এলো। শিরযাদকে সে একইভাবে বললো: একটু অপেক্ষা করো! আঙুর রেখে তুমি আমাকে নিয়ে যাও দৈত্যের কাছে। বিস্ময়ের পর বিস্ময় নিয়ে শিরযাদ তাই করে। আঙুরের পরিবর্তে আঙুররূপি সাদাপাখি নিয়েই সে যায় দৈত্যের কাছে। দৈত্য শিরযাদকে এক জোড়া কবুতর দেয় এবং সেই কবুতর নিয়ে শিরযাদ রওনা হয় সরাইখানার দিকে যেখানে সে রেখে এসেছে মুসাফিরকে, যে মুসাফির তাকে চেরাগ পাবার জন্য কবুতরের শর্ত দিয়েছিল। এখানেও সে কবুতরের পরিবর্তে সাদা পাখিটাকেই দেয় মুসাফিরকে আর তার কাছ থেকে চেরাগটা নিয়ে যাত্রা করে প্রাসাদের দিকে।

 

শিরযাদের প্রাসাদে ফেরার কথা এক কান দু’কান হতে হতে তার চাচার কানেও পৌঁছে যায়। চাচা তার দরবারের অভিজাতদের নিয়ে শিরযাদকে অভ্যর্থনা জানাতে এগিয়ে যায়। শিরযাদ যা নিয়ে এসেছিলো সেদিকে বাদশাহর নজর পড়তেই শিরযাদকে কাছে টেনে নিয়ে কপালে চুমু খেয়ে বললো: শিরযাদ! বাছা আমার! তুমি সত্যিই বীর, নির্ভীক বীর!

 

বাদশার আদেশে শিরযাদ দেওকন্যাকে বিয়ে করলো। চল্লিশ দিন চল্লিশ রাত এ উপলক্ষে জমজমাট উৎসব হলো। শিরযাদ যখন তার কক্ষে ঢুকলো সাদা পাখিও তার সঙ্গে গেল। পাখিকে দেখে শিরযাদ বিরক্ত হলো খুব। বাদশাহ সাদাপাখিকে তার কাছে ডেকে কারণ দর্শাতে বললো। পাখি বললো: শিরযাদ জিজ্ঞেস করো আমি তার কোনো ক্ষতি করেছি কিনা?

 

জবাবে শিরযাদ বললো: এই পাখিটা আমাকে ঝড়-তুফানের ভেতর একটু আশ্রয় নিতে দেয় নি। এমনকি স্বর্ণের লাগামসহ বিচিত্র সরঞ্জাম পরা চমৎকার একটি সাদা ঘোড়ার মালিক হতেও দেয় নি। গতরাতে আমাদের কক্ষে ঢুকে বিরক্ত করেছে।

 

সাদা পাখি এবার বললো: ঝড়ের মাঝে তোমাকে ঘোড়া থেকে নামতে দেই নি এজন্য যে ওই ঝড় ছিল স্বয়ং মেয়েটির বাবা। তুমি যতক্ষণ ঘোড়ার পিঠে ছিলে ততক্ষণ তার সাধ্য ছিল না তোমার কোনো ক্ষতি করে। তোমাকে মাটিতে নামাতে পারলেই সে তামাকে ধ্বংস করে দিতে পারতো। একথা বলেই সাদা পাখি দেওকন্যার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো: ঠিক বলেছি না? মেয়ে বললো: তুমি ঠিকই বলেছো।

 

পাখি আবারও বলতে লাগলো: ওই স্বর্ণ পরিহিত ঘোড়ার মালিক হতে দেই নি এজন্য যে ওটা আসলে ঘোড়া ছিল না, ও ছিল এই মেয়ের চাচা। ওই ঘোড়ার গায়ে যদি তোমার হাত পড়তো তাহলে তোমাকে সে মাটিতে ফেলে মেরেই ফেলতো। এই বলে পাখি আবারও মেয়ের অনুমোদন নিতে চাইলো। দেওকন্যা বললো পাখি যথার্থই বলেছে।

 

সাদাপাখি আবারও বলতে লাগলো: গতরাতেও আমি তোমার কক্ষে এজন্যই ছিলাম যে, এই মেয়ের ভাই একটা কালো সাপ হয়ে তোমার কক্ষে লুকিয়ে ছিল তোমাকে মারার জন্য। রাতে তুমি যখন ঘুমিয়েছিলে তখন আমি ওই সাপটাকে মেরেছি। এই হলো সেই মরা সাপ। এই বলে সাপটাকে দেখালো পাখি। মেয়েটা এবারও পাখির কথা সত্য বলে রায় দিলো।

 

এরপর ঘটলো আরও অবাক করা ঘটনা। পাখিটা বললো: আমার ভাগ্যে লেখা ছিলো যে আমি একজনকে সারাজীবন সাহায্য করে যাবো। যাকে সাহায্য করবো সে যদি মানুষ হয় তাহলে তার স্ত্রী হবো নতুবা মারা যাবো। আমার এখন সময় ফুরিয়ে এসেছে এবং এখুনি আমি মারা যাবো। বলতে না বলতেই পাখিটার প্রাণ উড়ে গেল কোথায় কে জানে। শুধু তার দেহটা পড়ে থাকলো পাথর হয়ে। দরবারে উপস্থিত সবাই এই ঘটনা দেখে ভীষণ কষ্ট পেল। পাখির মৃত্যুতে সবাই কাঁদতে শুরু করে দিলো।#

মন্তব্য লিখুন


Security code
রিফ্রেস দিন