এই ওয়েবসাইটে আর আপডেট হবে না। আমাদের নতুন সাইট Parstoday Bangla
সোমবার, 11 এপ্রিল 2016 11:41

বর্ষবরণে মুখোশ না পরার আহ্বান ডিএমপির, ‘পান্তা-ইলিশ বানোয়াট সংস্কৃতি’

ডিএমপি কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া ডিএমপি কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া

বাংলা নববর্ষের মঙ্গল শোভাযাত্রায় মুখোশ না পরার অনুরোধ জানিয়েছেন ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া। আজ (সোমবার) ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে পহেলা বৈশাখ সামনে রেখে সার্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে ব্রিফিংয়ে তিনি এ অনুরোধ জানান।

 

ডিএমপি কমিশনার জানান, পহেলা বৈশাখকে কেন্দ্র করে নিশ্চ্ছিদ্র নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। মঙ্গল শোভাযাত্রায় কেউ যেন মুখোশ না পরেন আয়োজকদের সে অনুরোধ জানানো হয়েছে। তবে শোভাযাত্রা উপলক্ষে তৈরি মুখোশ হাতে রাখা যাবে।

 

তিনি বলেন, কিছু কিছু কোম্পানি তাদের প্রচারণার জন্য চুক্তি ভিত্তিতে লোক নিয়োগ করেন একই ধরনের টি-শার্ট পরে শোভাযাত্রায় অংশ নিতে। এই সুযোগ নিয়ে দুর্বৃত্তরা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে। এবছর সে বিষয়টি লক্ষ্য রাখা হবে। শোভাযাত্রার ভেতরে, সামনে এবং পেছনে আমাদের বিশেষায়িত দল সোয়াট টিম নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করবে।

 

আছাদুজ্জামান মিয়া বলেন, পহেলা বৈশাখকে কেন্দ্র করে রমনা-শাহবাগ-টিএসসিসহ পুরো এলাকা সিসিটিভি ক্যামেরার আওতায় আনা হবে। রমনা পার্ক, সোহরাওয়ার্দী উদ্যান এবং টিএসসিতে তিনটি কন্ট্রোল রুম করা হবে। সেখানে থেকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা পাবে দায়িত্ব পালনকারী সদস্যরা। টিএসসি, শাহবাগ এবং রমনা পার্কে তিনটি ওয়াচ টাওয়ার নির্মাণ করা হবে। ওয়াচ টাওয়ার থেকে দূরবীক্ষণ যন্ত্রের সাহায্যে সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হবে।

 

গত বছরের বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার জন্য দুঃখ প্রকাশ করে ডিএমপি কমিশনার বলেন, এবছর যেন কোনো ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি সৃষ্টি না হয় সে বিষয়টি গুরুত্বসহকারে দেখা হচ্ছে। ইভটিজিং-পকেটমার প্রতিরোধ করতে সোয়াট টিমের পাশাপাশি পোশাকি পুলিশ এবং ডিবি মাঠে থাকবে। রমনা পার্ক এবং সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে প্রবেশে এবার নারী-পুরুষের আলাদা লাইন থাকবে। প্রবেশ গেটে পর্যাপ্ত পরিমাণ পুলিশ মোতায়েন করা থাকবে যেন কাউকে হয়রানির শিকার না হতে হয়।

 

তিনি বলেন, সন্ধ্যার পরে রাস্তায় হাঁটতে, রেস্তোরাঁয়া বসে গল্প করতে কোনো নিষেধ নেই। শুধুমাত্র উন্মুক্ত স্থানে বড় ধরনের গানের কনসার্ট বা অনুষ্ঠান করা যাবে না। সন্ধ্যার পরে বাড়ির ছাদে এবং রেস্তোরাঁয় আপনার উৎসব উদযাপন করুন, পুলিশ আপনাদের নিরাপত্তা দেবে।

 

এদিকে, জাটকা সংরক্ষণ ও ইলিশের প্রজনন নির্বিঘ্ন করতে এ বছর ইলিশ ছাড়াই বাংলা নববর্ষ উদযাপন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে খুলনা জেলা প্রশাসন।

 

আজ (সোমবার) খুলনা জেলা প্রশাসক (ডিসি) নাজমুল আহসান ‘ডিসি খুলনা’ নামে তার ফেসবুক পেজে এ তথ্য জানিয়েছেন। পাশাপাশি তিনি অন্যদেরও একই পন্থা অবলম্বনের অনুরোধ জানান।

 

ডিসি নাজমুল আহসান তার ফেসবুকে টাইমলাইনে লিখেছেন, “প্রিয় খুলনাবাসী এবং ফেসবুক বন্ধুরা। শুভ নববর্ষ ১৪২৩। আপনারা নিশ্চই অবগত আছেন যে, চলমান মৌসুমটি হচ্ছে ইলিশ প্রজননের উৎকৃষ্ট সময়। এ সময় পহেলা বৈশাখকে উপলক্ষ্য করে বাজারে ইলিশের চাহিদা বেড়ে যায়। ফলে, নদীতে জাটকা ও মা ইলিশ নিধন শুরু হয় ব্যাপক হারে। তাই জাতীয় বৃহত্তর স্বার্থ বিবেচনা করে জেলা প্রশাসন খুলনা এ বছরের (১৪২৩ বঙ্গাব্দ) পহেলা বৈশাখের আয়োজনে ইলিশ মাছ না রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে, অন্যসব আয়োজন আগের মতোই থাকবে। সবার জন্য শুভ কামনা রইল।”

 

চট্টগ্রামে ইলিশ ছাড়াই বাংলা নববর্ষ উদযাপনের সিদ্ধান্ত

এর আগে রোববার চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক মেজবাহ উদ্দিন এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জাটকা ও মা-ইলিশ রক্ষায় এ বছর ইলিশ ছাড়াই বাংলা নববর্ষ উদযাপন করার কথা জানান।

 

তিনি বলেন, ইলিশ রক্ষায় এবার জেলা প্রশাসনের বৈশাখী আয়োজনে ইলিশ মাছের তৈরি কোনো খাবার রাখা হবে না। তবে অন্য সব আয়োজন থাকবে।

 

জেলা প্রশাসক বলেন, পহেলা বৈশাখে পান্ত-ইলিশ খাওয়া সাম্প্রতিক ধারণা। ঐতিহাসিকভাবে এর পক্ষে কোনো জোরালো উদাহরণ পাওয়া যায় না। সম্প্রতি পহেলা বৈশাখকে কেন্দ্র করে জাটকা নিধন করা হচ্ছে। নিষিদ্ধ জেনেও বেশি দামে বিক্রির জন্য এই অপরাধ করে যাচ্ছেন কতিপয় অসাধু ব্যবসায়ী। তারা এ সময় ইলিশের দামও মাত্রাতিরিক্তভাবে বাড়িয়ে দিয়েছেন।

 

বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে পান্তা-ইলিশ নিষিদ্ধ

বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্ষবরণ উৎসবে পান্তা-ইলিশ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক ড. ইমামুল হক গত বুধবার সাংবাদিকদের সঙ্গে বর্ষবরণ ও বৈশাখী মেলা উদযাপনের বিভিন্ন দিক নিয়ে মতবিনিময়ের সময় পান্তা-ইলিশ নিষিদ্ধ করার যৌক্তিকতা তুলে ধরে বলেন, বাংলা বর্ষবরণের সঙ্গে পান্তা-ইলিশের আদৌ কোনো সম্পর্ক নেই। পহেলা বৈশাখে ইলিশ খাওয়ার এই রীতির বিরুদ্ধে দেশজুড়ে গণসচেতনতা তৈরি করা দরকার।

 

রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ইলিশ নিষিদ্ধ

এছাড়া, রংপুর বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে (বেরোবি) বর্ষবরণ আয়োজনে ইলিশ নিষিদ্ধ করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।

 

গতকাল (রোববার) দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ দপ্তরের কর্মকর্তা মোহাম্মাদ আলী স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।

 

এর আগে রোববার সচিবালয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তাদের সঙ্গে এক বৈঠক শেষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল সাংবাদিকদের বলেন, পহেলা বৈশাখে বিকট আওয়াজের বাঁশি বাজানোর ওপরও নিষেধাজ্ঞা থাকবে। ছোট ছোট মুখোশ দিয়ে মুখাবরণ বন্ধ করে দিয়ে তারপর বের হওয়া, এটা আমরা নিয়ন্ত্রণ করব।

 

পহেলা বৈশাখের সাথে ইলিশের সম্পর্ক আছে কি?

বর্ষবরণ আয়োজনে ইলিশ নিষিদ্ধ করার বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক ড. একে এম নূর-উন-নবী বলেন, “পহেলা বৈশাখের সাথে ইলিশের কোন সম্পর্ক নেই। পহেলা বৈশাখে ইলিশ নয় বরং নুন-পান্তা-তেল-মরিচই উপযুক্ত খাবার। সাথে ভর্তা বা ডিম ভাজিই যথেষ্ঠ হতে পারে। তাছাড়া ইলিশ প্রজননের এই সময়ে বাঙালী উৎসবের নামে ইলিশ উৎসব করা হলে সাগরে ইলিশের সংখ্যা কমে যাবে।”

 

বাংলার ঐতিহ্য নিয়ে দীর্ঘদিন গবেষণা করছেন অধ্যাপক ও বাংলা একাডেমীর মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খান। কিন্তু বাংলা নববর্ষের দিনে ইলিশ খাওয়ার আদৌ কোনো সম্পর্ক আছে কিনা জানতে চাইলেইতনি বলেন, বাঙালির নববর্ষ উদযাপনের চিরায়ত সংস্কৃতির সাথে ইলিশের কোনো সম্পর্ক নেই।

 

তিনি জানান, “বৈশাখে যখন খরার মাস যখন কোনো ফসল হতো না তখন কৃষকদের হাতে পয়সাও থাকতো না। সুতরাং তাদের পক্ষে ইলিশ কিনে খাওয়া সম্ভব হতো না। সুতরাং এটা মোটেও সত্যি নয় যে, কৃষকরা নববর্ষ উদযাপনে পান্তা ইলিশ খেয়ে বছর শুরু করতো। গ্রামবাংলায় নববর্ষের উৎসবই ছিল খুব ছোট আকারে। কৃষাণী আগের রাতে একটি নতুন ঘটে কাঁচা আমের ডাল ভিজিয়ে রাখতো, চাল ভিজিয়ে রাখতো। সকালে কৃষক সেই চাল পানি খেত এবং শরীরে কৃষাণী পানিটা ছিটিয়ে দিত। তারপর সে হালচাষ করতে যেত। দুপুরবেলায় পান্তা খেতে পারতো কাঁচা মরিচ, পেঁয়াজ দিয়ে। কখনো কখনো একটু শুটকি, একটু বেগুণ ভর্তা ও একটু আলু ভর্তা দিয়ে খেত”।

 

বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক বৈশাখের পান্তা-ইলিশের জন্য ‘শহরের কিছু শিক্ষিত নাগরিককে’ দায়ী করেছেন।

 

লেখক-চিন্তক যতীন সরকার বলেন, “স্বাধীনতার পর থেকে পান্তা-ইলিশকে পহেলা বৈশাখের অনুষঙ্গ করে তোলা হয়। প্রকৃত অর্থে এটি বানোয়াট সংস্কৃতিচর্চা। এর সঙ্গে বাঙালির কোনও সম্পর্ক নেই। পান্তা হচ্ছে গরীবের খাবার আর উৎসবের সময় মানুষ যেখানে ভালো ভালো খাবার খায়, সেখানে পান্তাকে খাওয়ানো হচ্ছে ব্যবসার খাতিরে।” (আশরাফুর রহমান)#

 

 

 

 

মন্তব্য লিখুন


Security code
রিফ্রেস দিন