এই ওয়েবসাইটে আর আপডেট হবে না। আমাদের নতুন সাইট Parstoday Bangla
সোমবার, 21 মার্চ 2011 12:48

ফার্সি নববর্ষ বা নওরোজ-১৩৯০

ইরানে ফার্সি বছরের প্রথম দিনকে নওরোজ বলা হয়। নওরোজ মানে নতুন দিন। নওরোজের মাধ্যমে নতুন বছরের পাশাপাশি শুরু হয় বসন্ত ঋতু। ফলে প্রকৃতি রাজ্যের মতো মানুষের মনেও নববসন্তের আমেজ দেখা দেয়। এই বসন্ত মহান আল্লাহর অসীম শক্তি ও ক্ষমতারই নিদর্শন। চিরায়ত সুন্দর,ভালোবাসা আর নব-যৌবনের প্রতীক এ বসন্ত । পবিত্র কোরআনের সূরা ফাতিরের ৯ নম্বর আয়াতে এ প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, "তিনিই আল্লাহ! যিনি বায়ু প্রবাহকে মেঘমালায় উন্নীত করেন, মেঘমালাকে মৃত ও শুকনো ভূমিতে পাঠান এবং এর মাধ্যমে মৃত ভূমিকে জীবন্ত সজীব করে তোলেন। পুনরুত্থান দিবসও এ রকমই হবে।"
হ্যাঁ, সবকিছুর উপরই আল্লাহ ক্ষমতাবান এবং তিনি যে মৃতকে জীবন দান করতে পারেন- সে বার্তাই নিয়ে আমাদের সামনে আসে বসন্ত।  

বাংলা কবিতার একটি লাইন এ রকম- 'ফুল ফুটুক আর নাই ফুটুক,আজ বসন্ত।'কিন্তু ইরানে বসন্তের সূচনায় ফুল ফোটেনি এমনটা কখনো দেখা যায়নি। ঋতুরাজ বসন্তকে স্বাগত জানানোর জন্য ইরানের প্রকৃতিরাজ্যে পরিবর্তন শুরু হয় শীতের শুরু থেকেই। ঈদ বা কোনো উৎসবে মানুষ যেমন তার পুরোনো জামা-কাপড় পাল্টে নতুন সাজে সজ্জিত হয়, বসন্তের উৎসবেও প্রকৃতি তেমনি নতুনভাবে সাজবার জন্য শীত ঋতুর জরাজীর্ণ পোশাক পরিবর্তন করতে শুরু করে। প্রকৃতি যেন সবকিছু বিলিয়ে দেয় বসন্তের জন্য। যে গাছ-গাছালি এতোদিন তার সবুজ পত্র-পল্লব মেলে ধরে রসিক মনের নান্দনিক তৃষ্ণা মিটাচ্ছিল, সে এখন তার সকল পত্র-পল্লব ঝেড়ে ফেলতে উদ্যত।
কী অপূর্ব আত্মত্যাগ এই বৃক্ষরাজির! নিজেকে উজাড় করে দিয়ে হরিণের শিং-এর মতো ঠায় দাঁড়িয়ে থেকে প্রহর গুণতে থাকে বসন্তের। এরিমাঝে নিজেকে ধুয়ে-মুছে পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন করে দিতে নেমে আসে বৃষ্টি।

 

একদিকে শীত, অন্যদিকে বৃষ্টি। একটানা বৃষ্টিতে কেবল গাছপালা কেন, ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট, পাহাড়-পর্বতের ধূলিমাখা জির্ণতা নিমিষেই ঝরঝরে হয়ে ওঠে। পরিস্কার হয়ে যাবার পর এবার নেমে আসে বরফ। বরফ তো নয়, যেন পূর্ণিমার চাঁদ গড়ে পড়েছে পৃথিবীর বুকে। সমগ্র ইরানজুড়ে বরফের এই আচ্ছাদন চোখে না দেখলে বিশ্বাসই হবে না নয়নাভিরাম সৌন্দর্য। যেদিকেই তাকানো যায়, যতোদূর যায় দু'চোখ- শূভ্রতার চোখ ধাঁধাঁনো ঔজ্জ্বল্যে ভরে যায় মন। আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতায় নুয়ে পড়ে বিশ্বাসী আত্মা। এক সময় বরফ গলতে শুরু করে। প্রকৃতিতে নেমে আসে মৃদুমন্দ উষ্ণতা। এক অপূর্ব শিহরণ জাগে চারদিকে। মৃত শুষ্ক ডালপালায় সবুজের সমারোহ দেখা দেয়। বিচিত্র সব ফুলের গাছে কলিরা চোখ মেলে। শুরু হয় ঋতুরাজ বসন্ত বা নওরোজের।

 

নওরোজ বিশ্বের প্রাচীনতম উৎসবগুলোর অন্যতম। ইরানে ইসলামের আগমনের পর একমাত্র নওরোজই ইসলামী সংস্কৃতির রং ধারণ করে বছরের পর বছর ধরে টিকে আছে। নওরোজের টেবিল বা দস্তরখানে কোরআন মজীদ রাখা, আল্লাহর কাছে দোয়া করা, পারস্পরিক দেখা-সাক্ষাত ও কল্যাণ কামনা করা এবং আত্মীয়-স্বজনদের কবর জিয়ারত করা - এ যুগের নওরোজ উৎসবকে পুরোপুরি ইসলামসম্মত জাতীয় উৎসবে রূপান্তরিত করেছে। 

 

যাহোক, প্রতি বছরের মতো এবারও বিশ্বের ত্রিশ কোটি মানুষ ব্যাপক উৎসাহ, উদ্দীপনা ও ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের মধ্য দিয়ে নওরোজ পালন করছে। এ উপলক্ষ্যে ইরানের সর্বত্র এখন আনন্দের জোয়ার বইছে। নওরোজ উপলক্ষ্যে পাঁচ দিনের সরকারী ছুটি- এ আনন্দে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। ইরানিরা ব্যাপক হারে দেশের বিভিন্ন স্থানে সফর শুরু করেছেন। অনেকেই শহরের কোলাহল ছেড়ে আত্মীয়-স্বজনের সাথে আনন্দ ভাগ করে নিতে গ্রামে চলে গেছেন। কেউবা গেছেন ঐতিহাসিক ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যে ঘেরা বিখ্যাত স্থানগুলোর শোভা উপভোগ করতে। কেবল এ বছরই নয়, দৈনন্দিন জীবনের একগুয়েমী ও ক্লান্তির অবসান এবং জীবনে নতুনত্ব আনার উদ্দেশ্যে ইরানীরা প্রতি বছরই নওরোজের সময় এ ধরনের সফর করে থাকেন।

 

ফার্সি ১২তম মাস তথা ইসফান্দ মাসের মাঝামাঝি সময় থেকে নওরোজ উৎসবের প্রস্তুতি শুরু হয়। এ সময় নতুন পোশাক, নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কেনা, ঘর-বাড়িতে রং করা এবং নতুন আসবাবপত্র কেনার ধুম পড়ে যায়। ঘর-দোর, রাস্তাঘাট পরিস্কার করার কাজে ইরানীরা একে অপরকে বিশেষ করে প্রতিবেশীদের সাহায্য করে থাকে। এর ফলে পরস্পরের মধ্যে আন্তরিকতা ও সহমর্মীতা গড়ে ওঠে। শুধু তাই নয়, নওরোজের প্রাক্কালে ইরানীরা অপেক্ষাকৃত দরিদ্র ও অভাবী মানুষকে অর্থ ও উপহার দিয়ে উৎসবের আনন্দ সবার মধ্যে ভাগ করে নেয়। আর এজন্যই নওরোজকে ফার্সিতে 'ঈদে নওরোজ' বলা হয়।

  পৃথিবী যখন সূর্যের চারপাশে একবার প্রদক্ষিণ শেষ করে ঠিক সে মুহূর্তে ইরানে নওরোজের অনুষ্ঠানাদি শুরু হয়। এ সময় একটি দস্তরখানের ওপর ফলমূল, বাদাম, বিস্কিট, আয়না এবং একটি কোরআন শরীফ রাখা হয়। এছাড়া, আরবী 'সীন' হরফ দিয়ে শুরু হওয়া সাতটি জিনিস রাখা হয়। ওই সাতটি দ্রব্য হলো, সীব, সেক্যে, সাবজেহ, সামানু, সেনজেদ, সের্খে ও সোমাগ। সীব মানে হলো আপেল, সেক্যে হলো মুদ্রা, সের্খে হলো সির্কা, সোমাগ হলো টক জাতীয় এক প্রকার ফল আর সামানু হলো- গম দিয়ে তৈরি একপ্রকার মিষ্টি জাতীয় খাবার। এছাড়াও হাফত সীনের দস্তরখানে বিভিন্ন রং দিয়ে রঙিন করা মুরগীর ডিম, মোমবাতি, কাঁচের পাত্রে রঙিন মাছ, বিভিন্ন ফল ও বাদাম এবং ফুলদানিতে নানা রঙের ফুল রাখা হয়। ইরানীরা হাফত সীনের দস্তরখানের চারপাশে বসে পরিবারের সবাই মিলে কোরআন তেলাওয়াত ও দোয়া করে। এ সময় একটি বিশেষ দোয়া পড়া হয়। দোয়াটি হচ্ছে,

হে আল্লাহ!
আমাদের অন্তর, আমাদের দৃষ্টি, সবকিছুর পরিবর্তনকারী তুমি
রাত ও দিনের আবর্তনকারী তুমি
তুমিই আমাদের ভাগ্য নিয়ন্তা
তুমিই আমাদের অবস্থা পরিবর্তনকারী
তুমি আমাদের অন্তর, আমাদের দৃষ্টি, আমাদের ভাগ্য
ও আমাদের অবস্থাকে সর্বোত্তম অবস্থায় রূপান্তরিত করে দাও।

এই দোয়ার মাধ্যমে বিশ্বজগতের প্রতিপালক মহান আল্লাহর কাছে জীবনকে সুন্দরভাবে পরিচালনা করার জন্য আবেদন জানানো হয়েছে। মোনাজাত শেষে সবাইকে মিষ্টিমুখ করানো হয়। এরপর পরিবারের মুরুব্বীরা ছোটদের 'ঈদী বা সালামী' দেয়। নতুন বছর শুরু করার এমন পদ্ধতি সত্যিই বিরল!



নওরোজের সময় ইরানের মসজিদ, ইমামবাড়া ও মাজারগুলোতে বিশেষ প্রার্থনা অনুষ্ঠিত হয়। শিরাজ প্রদেশের জনগণ মহানবী (সা.) এর বংশধর হযরত শাহ চেরাগ (র.) এর মাজারে,কোমের লোকজন নবীজীর আরেক বংশধর হযরত মাসুমা (সা.আ.) এর মাজারে এবং মাশহাদের জনগণ ইমাম রেজা (আ.) এর মাজারে প্রার্থনায় মিলিত হন। এ সময় জনগণ সমস্বরে বিশ্বনবী (সা.) এবং তাঁর পবিত্র বংশধরদের প্রতি দরুদ ও সালাম জানিয়ে পরস্পরকে শুভেচ্ছা জানান।


নওরোজের প্রধান অনুষ্ঠানাদি শেষ হয়ে গেলে খাবার ছাড়া হাফত সীনের অন্য জিনিসগুলো সরিয়ে নেয়া হয় এবং পচনশীল দ্রব্যগুলো ফেলে দেয়া হয়। নতুন বছরের ১৩তম দিন ইরানীরা বাড়ির বাইরে বিশেষকরে পার্কে সারাদিন সময় কাটান। এভাবেই শেষ হয়ে যায় নওরোজ উৎসবের আনুষ্ঠানিকতা।  #

মন্তব্য লিখুন


Security code
রিফ্রেস দিন