এই ওয়েবসাইটে আর আপডেট হবে না। আমাদের নতুন সাইট Parstoday Bangla
মঙ্গলবার, 13 মার্চ 2012 12:20

নওরোজ : নব-সৃষ্টির অনন্য উৎসব

ফার্সি "নওরোজ" শব্দটির অর্থ নতুন দিন। নওরোজ বিশ্বের প্রাচীনতম উৎসবগুলোর মধ্যে অন্যতম। জনপ্রিয় এ সংস্কৃতি ও উৎসব আজ শুধু ইরানের জাতীয় উৎসব নয়, আফগানিস্তান, তাজিকিস্তান, আজারবাইজান, তুর্কমেনিস্তান, উজবেকিস্তান, তুরস্ক ও ইরাকেও এ উৎসব জাতীয় পর্যায়ে পালিত হয়। এ উৎসব কম-বেশি পালিত হচ্ছে জর্জিয়া, পাকিস্তান ও ভারতেও। সাধারণত ২০ বা একুশে মার্চ ফার্সি নববর্ষ শুরু হয়। বসন্ত ঋতু শুরু হওয়ার সাথে সাথে শুরু হয় এ নববর্ষ।

ঠিক কবে এবং কে প্রথম নওরোজ উৎসব চালু করেছিলেন তা স্পষ্ট নয়। কবি ফেরদৌসির অমর কাব্য শাহনামা ও ঐতিহাসিক তাবারির বর্ণনা অনুযায়ী ইরানের প্রাচীন কিংবদন্তীতে উল্লেখিত বাদশাহ জামশিদ ছিলেন এ উৎসবের প্রথম আয়োজক। কেউ কেউ বলেন, ইরানের হাখামানেশীয় সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা সম্রাট দ্বিতীয় সাইরাস বা কুরুশ বাবেল বা ব্যাবিলন জয়ের বছর তথা খ্রিস্টপূর্ব ৫৩৮ সালে সর্বপ্রথম নওরোজকে জাতীয় উৎসব হিসেবে ঘোষণা ও পালন করেন। পারস্য সম্রাট প্রথম দারিউশের শাসনামলে এ উৎসব পার্সিপলিস প্রাসাদ কমপ্লেক্স বা তাখতে জামশিদে অনুষ্ঠিত হয়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিরা এ উৎসবে উপস্থিত হয়ে ইরানি সম্রাটকে নানা উপহার সামগ্রী দিতেন।
প্রথম দারিউশ নওরোজ উপলক্ষে খ্রিস্টপূর্ব ৪১৬ সনে স্বর্ণমূদ্রার প্রচলন করেছিলেন। আশকানি ও সাসানিয় সম্রাটদের যুগেও নওরোজ উৎসব পালিত হত। সাসানিয় শাসনামলে নওরোজের প্রথম ৫দিন ছোট নওরোজ হিসেবে অভিহিত হত। এ সময় সাধারণ জনগণ বা প্রজারা সম্রাটের সাথে দেখা করত এবং সম্রাট তাদের কথা শুনতেন। কিন্তু ষষ্ঠ দিনকে বলা হত বড় নওরোজ। এ দিনে কেবল সম্রাটের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিরাই তার সাথে সাক্ষাৎ করত এবং বিশেষ উৎসব পালিত হত। খৃস্টিয় ২৩০ সালে সাসানীয় সম্রাট আর্দেশিরের সঙ্গে যুদ্ধে রোমান সেনারা পরাজিত হয়। আর্দেশির বিজিত অঞ্চলেও নওরোজ পালনের নির্দেশ দিয়েছিলেন। সাসানীয় যুগেই নওরোজ উৎসবের অনুষ্ঠানমালা ও পর্বগুলো তুলনামূলকভাবে বেশি বিস্তৃত হয়েছিল।
ইসলামের আবির্ভাবের পর ইরানে নওরোজ উৎসবের রীতিতে পরিবর্তন দেখা দেয়। ইসলামী আচার-অনুষ্ঠান যুক্ত হয় এ উৎসবের সাথে। মুসলমানরা বসন্ত ঋতুতে গাছপালার পুনরায় সবুজ হওয়াকে পারলৌকিক জীবনের প্রমাণ বলে মনে করেন। বিশেষ দোয়া পাঠের মধ্য দিয়ে ইরানি মুসলমানরা নওরোজ বা নববর্ষ শুরু করেন। এ মুনাজাতে তারা বলেন, "হে অন্তর ও দৃষ্টির পরিবর্তনকারী এবং দিন ও রাতের পরিচালনাকারী এবং অবস্থার পরিবর্তনকারী (মহান আল্লাহ)! আমাদের অবস্থাকে সর্বোত্তম অবস্থায় রূপান্তরিত করুন।" নওরোজের প্রথম সেকেন্ডেই সবাই এ দোয়া পাঠ করেন। এ সময় তাদের সামনে টেবিলে বা দস্তরখানে থাকে পবিত্র কোরআন, তসবিহ এবং "হাফতসিন" নামে খ্যাত সাতটি বিশেষ সামগ্রীসহ আরো কিছু সামগ্রী। "হাফতসিন" অর্থ সাতটি "সিন"। ওই সাতটি জিনিষের নামের প্রথম অক্ষর ফার্সি বা আরবী বর্ণমালার "সিন" অক্ষর দিয়ে শুরু হওয়ায় সেগুলোকে এ নাম দেয়া হয়েছে। এ ৭টি সামগ্রী হল, " সাবজে" বা গম বা ডালের সবুজ চারা, সামানু বা গমের চারা দিয়ে তৈরি করা খাবার, সিব বা আপেল, "সেনজেদ" নামের একটি বিশেষ ফল, "সোমাক্ব" নামক বিশেষ মশলা, সির বা রসুন এবং সের্কে বা সিরকা। এসব সামগ্রী হল নব-জীবন, প্রবৃদ্ধি, ফলবান হওয়া, প্রাচুর্য, সৌন্দর্য, সুস্থতা, ভালবাসা, আনন্দ ও ধৈর্য প্রভৃতির প্রতীক। এ ছাড়াও নওরোজের এ দস্তরখানে ডিম, আয়না, পানি, লাল রংয়ের ছোট মাছ ও ধাতব মুদ্রা রাখা হয়। এসবেরই রয়েছে বিশেষ অর্থ।

ইরানিরা নওরোজের দিন বাবা-মাসহ নিকট-আত্মীয় ও ঘনিষ্ঠজনদের সাথে সাক্ষাৎ করেন। এ সময় বেশ কয়েকদিন ছুটি থাকে এবং ইরানিরা দেশের বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান সফর করেন এবং কেউ কেউ বিদেশেও যান। অনেক ইরানি নওরোজের প্রথম প্রহর বা প্রথম দিনটি পবিত্র কোনো স্থানে কাটাতে পছন্দ করেন। যেমন, অনেকেই পবিত্র মাশহাদ শহরে বিশ্বনবী হযরত মুমহাম্মাদ (সা.)'র পবিত্র আহলে বাইতের সদস্য হযরত ইমাম রেজা (আ.)'র মাজার জিয়ারত করেন। অনেকে এ উপলক্ষে পবিত্র কোম শহরে হযরত ইমাম রেজা (আ.)'র বোন হযরত মাসুমা (সা.)'র মাজারে যান, কেউবা ইরাকে হযরত ইমাম হোসাইন (আ.)'র মাজারে বা আহলে বাইতের অন্য কোনো সদস্যের মাজারে নববর্ষ শুরু করেন। ইমামদের পরিবারের অন্য সদস্যদের মাজারেও এ সময় ভীড় দেখা যায়।
নওরোজের দিন অনেকেই একে-অপরকে উপহার বা বখশিশ দিয়ে থাকেন। ছোট শিশুরা বড়দের কাছ থেকে বখশিশ পেয়ে খুব খুশি হয়। নওরোজ ইরানি, কুর্দি, তাজিক ও আজেরি জাতিসহ আরো কয়েকটি জাতির বৃহত্তম জাতীয় উৎসব। জাতিসংঘের সংস্কৃতি বিষয়ক সংস্থা ইউনেস্কো নওরোজ উৎসবকে বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছে।
নওরোজের আগেই ইরানিরা ঘরদোর পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন করেন। পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজে তারা পাড়া-পড়শী ও আপনজনদের সহায়তা করেন। ঈদ বা নওরোজের অনেকে আগেই পুরোনো আসবাবপত্র বা জরাজীর্ণ জিনিষ ফেলে দিয়ে তারা নতুন জিনিষ কেনেন। নতুন জামা-কাপড়, জুতা প্রভৃতি কেনার হিড়িক পড়ে যায়। নওরোজের মেহমানদারির জন্য তারা ব্যাপক পরিমান ফল, মিষ্টি ও অন্যান্য খাদ্য-সামগ্রী কিনে থাকেন। এ সময় স্থায়ী বাজার ছাড়াও অনেক অস্থায়ী বাজার বা মেলার আসর জমজমাট হয়ে ওঠে।
ফার্সি প্রথম মাস বা ফারভারদিন মাসের এক তারিখ থেকে শুরু হয় নওরোজ উৎসব এবং শেষ হয় ১৩ তারিখে। ১৩ তারিখে ইরানির কেউই ঘরে থাকে না। তারা সেদিন ঘরের বাইরে বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান ও মনোরম প্রাকৃতিক স্পটে সময় কাটান। বিশেষ করে উদ্যান, ঝর্ণা, পাহাড়, পার্ক- এসব স্থানে তারা চাদর বিছিয়ে বা তাবু খাটিয়ে খোশ-গল্প করে এবং মজাদার খাবার খেয়ে সময় কাটান।

যে কোনো ঈদ বা উৎসব মানবীয় আনন্দের অপার উৎস। মানুষ আনন্দ-উৎসব ছাড়া বেঁচে থাকতে পারে না। তবে আল্লাহর স্মরণই মানুষকে জোগায় সবচেয়ে বড় প্রশান্তি এবং অপার মানসিক সুখ। আমিরুল মুমিনিন হযরত আলী (আ.) বলেছেন, যে দিনটিতে মানুষ কোনো পাপ করে না, সে দিনটিই তার জন্য ঈদ বা উৎসবের দিন। নওরোজ উপলক্ষে মহান আল্লাহর সন্তুষ্টির আশায় ঈদের আনন্দকে ভাগ করে নেয়ার জন্য অনেক ইরানি বিশেষ ত্রাণ-তহবিলে অর্থ বা নানা জিনিষ-পত্র দান করে থাকেন। এসব অর্থ বা জিনিষ গরীব, এতিম ও অভাবগ্রস্তদের দান করা হয়।
পুরনো দিনের সব মলিনতা, জড়তা, গ্লানি ও হতাশা আমাদের জীবন থেকে ধুয়ে মুছে সাফ হয়ে যাক এবং সৃষ্টিশীলতা ও নতুনত্বের প্রাণ-প্রবাহে গড়ে উঠুক উন্নত, সফল ও সার্থক মানব-জীবন এ প্রত্যাশা নিয়ে শেষ করছি এ বিশেষ আলোচনা। #

 

তেহরান রেডিও/এএইচ/এআর/১৩.৪{jcomments on}

মন্তব্য লিখুন


Security code
রিফ্রেস দিন