এই ওয়েবসাইটে আর আপডেট হবে না। আমাদের নতুন সাইট Parstoday Bangla
বুধবার, 19 মার্চ 2014 17:48

সামাজিক সম্প্রীতি ও ঐক্যের সেতুবন্ধন নওরোজ: মাহবুবুর রহমান

১৯ মার্চ (রেডিও তেহরান): ফার্সি নববর্ষ বা নওরোজ  ব্যক্তি, পারিবারিক এবং সামাজিক জীবনে ব্যাপক প্রভাব ফেলে। নওরোজ ঐক্য ও ভ্রাতৃত্বের প্রতীক। নওরোজ সম্পর্কে  একথা বলেছেন বাংলাদেশের চাঁদপুর জেলার ফরিদগঞ্জ আলিয়া মাদ্রাসার প্রিন্সিপাল এবং আঞ্জুমানে সিরাজুম মুনিরার চেয়ারম্যান ড. মাওলানা এ কে এম মাহবুবুর রহমান।

পুরো সাক্ষাতকারটি এখানে উপস্থাপন করা হলো

 

রেডিও তেহরান : আপনি দীর্ঘদিন ইরানে ছিলেন। ইরানি জনগণের সমাজ-সংস্কৃতির সঙ্গে আপনি ঘনিষ্ঠভাবে পরিচিত। নওরোজ হচ্ছে- ইরানিদের প্রধান সামাজিক উতসব। তো প্রথমেই আপনি বলুন, এ উতসবকে আপনি কেমন দেখেছেন?

 

মাওলানা মাহবুবুর রহমান: আলহামদুল্লিাহ! ইরানে আমি বেশ কিছুদিন ছিলাম। ফলে ইরানের নওরোজকে আমি আমি খুব কাছ থেকে দেখেছি। নওরোজে ইরানের সর্বস্তরের প্রতিটি মানুষের মধ্যে সাড়া পড়ে যায়। ইরানীরা এই উৎসবকে তাদের জন্য মোবারক বা সাড়া জাগানো উৎসব বলে মনে করে।

 

শাহের আমলে যেভাবে নওরোজ পালিত হতো বা নওরোজে যেসব অনুষ্ঠান হতো সেটাকে পরিবর্তন করে ইমাম খোমেনী(র.) নেতৃত্বে ইসলামী বিপ্লবের পর এটিকে ইসলামের আলোকে উদযাপন করা হয়। ইমাম খোমেনীর পর ইরানের ইসলামী নেতৃত্ব  নওরোজের অনুষ্ঠানকে ইসলামের আঙ্গিকে সাজিয়েছেন। যারফলে নওরোজ একটি ইসলামী অনুষ্ঠানে পরিণত হয়েছে।

 

নওরোজ ইরানীদের পারিবারিক জীবনে অত্যন্ত প্রভাব ফেলে। নওরোজে  সমস্ত ইরানী  তাদের পরিবারের সাথে একত্রিত হয়ে অনুষ্ঠান করে। তারা একত্রে বসে দুয়া করা এবং খাওয়া দাওয়া করাসহ পারিবারিক বন্ধনের মধ্যে সময় কাটায়। পরিবারের সকলের খোঁজ খবর নিয়ে থাকে ইরানীরা এই নওরোজের সময়। বাবা মাকে তাদের সন্তানরা ফুল দিয়ে শুভাশিষ জানায়। ফলে ছোট বড়সহ সবার মধ্যে আত্মীয়তার সম্পর্ক সুদৃঢ় করতে ফার্সি নববর্ষ বা নওরোজ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ইরানে নওরোজের সময় যেভাবে গোটা দেশে উৎসবের সাড়া পড়ে যায় এমনটি অন্য কোনো দেশে দেখি না। বাংলাদেশেও নববর্ষের উৎসব হয় কিন্তু সেটি ইরানের মতো এত জাকজমকপূর্ণ নয়।

 

রেডিও তেহরান : ফার্সি নববর্ষের সঙ্গে বাংলা নববর্ষের পার্থক্য এবং সামঞ্জস্য আছে?

 

মাওলানা মাহবুবুর রহমান:  জ্বি ফার্সি নববর্ষের সাথে বাংলা নববর্ষের কিছু কিছু দিকের মিল আছে। যেমন ধরুন পহেলা বৈশাখ বা বাংলা নববর্ষ উপলক্ষে  বাংলাদেশে মেলা হয় আনন্দ উৎসব হয়। এখানেও মেলা হয়। তবে বাংলাদেশের সেই মেলাটির সাথে মুসলিম সংস্কৃতির সাথে কোনো কোনো ব্যাপারে ভিন্নতা রয়েছে। বাংলাদেশের নববর্ষ বা পহেলা বৈশাখে যেসব অনুষ্ঠান করা হয় তাকে মুসলিম সংস্কৃতির সাথে মেলানো যায় না। হিন্দু সংস্কৃতির সাথে পুরোপুরি মিল রয়েছে। তবে বাংলাদেশের জাতীয় একটি উৎসব হিসেবে পহেলা বৈশাখ বা বাংলা নববর্ষ একটি সাড়া জাগানো উৎসব।

 

তবে ইরানী জনগণ শুধুমাত্র নওরোজকে একটি উৎসব হিসেবে দেখে না। নওরোজের সাথে ইরানীদের যেন আত্মার সম্পর্ক। নওরোজকে তারা পালন করে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে এবং ভালোবাসার সাথে। তবে বাংলাদেশের নববর্ষ সেরকম ভালোবাসা ও গুরুত্বের সাথে পালিত হয় না। ইরানের আড়াই হাজার বছরের ঐহিত্যের প্রতীক হচ্ছে ফার্সী নববর্ষ বা নওরোজ। ইরানী নওরোজ গোটো বিশ্বের জন্য একটি মডেল বলে আমি মনে করি।

 

রেডিও তেহরান : আচ্ছা ফার্সি নববর্ষের এমন কোনো দিক কি আছে যেটি বাংলা নববর্ষ বা সংস্কৃতিতে গেলে সেটি সমৃদ্ধ হতে পারে?

 

মাওলানা মাহবুবুর রহমান:  জ্বি ফার্সি নববর্ষ বা নওরোজের এমন অনেক দিক আছে যা বাংলা নববর্ষের মধ্যে  এলে অবশ্যই আমাদের নববর্ষ সমৃদ্ধ হতে পারে। ইরানী নববর্ষের হাফত সীনটা খুবই ভালো একটা বিষয়। ঈদে নওরোজের দিন ইরানীরা হাফত সীনের দস্তরখানের চারপাশে বসে পরিবারের সবাই মিলে কোরআন তেলাওয়াত ও দোয়া করে। আর আরবী হাফ আরবী 'সীন' হরফ দিয়ে শুরু হওয়া সাতটি জিনিস রাখা হয়। ওই সাতটি দ্রব্য হলো, সীব, সেক্যে, সাবজেহ, সামানু, সেনজেদ, সের্খে ও সোমাগ।

 

বাংলাদেশের সমাজে আগে যখন হুজুররা কুরআন শরীফের ছবক দিতেন তখন হাফত সীনের কথা বলা হতো এবং এটার প্রচলন ছিল। পরে আমি যখন ইরানে গেলাম তখন বুঝতে পারলাম যে আসলে এই হাফত সীনের প্রচলনটা আসলে কি। এটি আসলে ইরানের ঈদে নওরোজ উৎসবের একটি বিশেষ রীতি। ইরানি সমাজে যেভাবে নওরোজ উদযাপিত হয় এবং সবার মধ্যে সামাজিক এবং আত্মিক বন্ধন সুদৃঢ় হয় সেটি যদি বাংলাদেশ হয় তাহলে এখানকার জনগণের জন্যে উপকার হতো। তাছাড়া সামাজিক বন্ধন সুদৃঢ় হতো।

 

রেডিও তেহরান : আপনি জানেন যে, ফার্সি নওরোজ শুধু ইরানে নয় প্রতিবেশি আরো কয়েকটি দেশে এটি উদযাপিত হয়। এ সম্পর্কে কিছু বলুন।

 

মাওলানা মাহবুবুর রহমান: ইরানের ঈদে নওরোজ শুধু ইরানে নয় প্রতিবেশি আরো বেশ কয়েকটি দেশে এই নওরোজ উৎসব পালিত হয়। তাছাড়া আফগানিস্তান, তাজিকিস্তান, আজারবাইজান, তুর্কমেনিস্তান, উজবেকিস্তান, তুরস্ক ও ইরাকেও এ উৎসব জাতীয় পর্যায়ে পালিত হয়। এটা অত্যন্ত ভালো দিক যে অন্যান্য দেশেও এ দিনটি  উদযাপন করা হয়। অবশ্যই নওরোজ দেশে দেশে জাতিতে ঐক্যের একটা বন্ধন। নওরোজ মানুষের মধ্যে সামাজিক চেতনা জাগায় ফলে তা যদি বিশ্বের আরো দেশে দেশে ছড়িয়ে দেয়া যেত তাহলে আরো ভালো হত।

 

রেডিও তেহরান : আপনি জানেন যে, নওরোজকে ইরানের জনগণ ব্যাপক উতসাহ-উদ্দিপনার সঙ্গে পালন করে। বাস্তবতা হচ্ছে-ইরানে এটিই সবচেয়ে বড় উতসব। তো এর সামাজিক ও ঐতিহাসিক গুরুত্বটা কোথায়?

 

মাওলানা মাহবুবুর রহমান: ঐতিহাসিক ও সামাজিকভাবে নওরোজের গুরুত্ব অপরিসীম। ইরানের ইতিহাসের সাথে নওরোজের সম্পর্ক সুগভীর। সমাজ জীবনের প্রতিটি স্তরে নওরোজ সাড়া জাগায়। সামাজিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে যে সম্প্রীতি এবং ঐক্যের  প্রয়োজন নওরোজ সেই সম্প্রীতি ও ঐক্যের সেতুবন্ধন।

 

ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে আমি বলব ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানসহ বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে সাম্য,ঐক্য ও ভ্রাতৃত্ব সৃষ্টির  জন্য ইরানী নওরোজের ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ইরানের জনগণের প্রতি আমাদের আহবান থাকবে নওরোজকে আরো এমনভাবে সাজাবেন যাতে কুরআনিক সংস্কৃতির সাথে আরো বেশি সামঞ্জস্য থাকে।

 

রেডিও তেহরান : সবশেষে এবারের ফার্সি নববর্ষ উপলক্ষে ইরানি জনগণের পাশাপাশি রেডিও তেহরানের শ্রোতাদের উদ্দেশ্যে কিছু বলুন।

 

মাওলানা মাহবুবুর রহমান: ফার্সি নববর্ষ নওরোজ উপলক্ষে রেডিও তেহরানের শ্রোতাদের আহবান জানাবো- আপনারা যারা ইরানের শিক্ষা, সংস্কৃতি, বিপ্লব এবং ঐতিহ্যকে ভালোবাসেন তারা ইরানের জনগণ যেভাবে জাতি সত্ত্বা নিয়ে, সামাজিক বন্ধনকে সুদৃঢ় করার জন্য নওরোজকে পালন করে সেভাবে যদি আপনারাও গ্রহণ করেন তাহলে সেটি ভালো হয়। রেডিও তেহরানের শ্রোতারা বিশ্বের যে যেখানে আছেন তারা নওরোজের মতো অনুষ্ঠান করে মুসলিম ভ্রাতৃত্ব, ঐক্য এবং সামাজিক বন্ধন তৈরীতে ভূমিকা রাখতে পারেন। নওরোজের মতো অনুষ্ঠান প্রচারের জন্য  রেডিও তেহরানকে আমি বিশেষভাবে ধন্যবাদ জানাই।

 

আর নওরোজ উপলক্ষে ইরানের জনগণকে শুভেচ্ছা জানাই। বিশেষ করে যে লাখো শহীদের রক্তের বিনিময়ে ইরানের ইসলামী বিপ্লব সফল হয়েছে তাদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানাই। তাছাড়া ইরানের যারা বহু ত্যাগের বিনিময়ে ইসলামকে দুনিয়ায় তুলে ধরার কাজে রত আছেন তাদেরকেও জানাই মোবারকবাদ।

 

ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের সম্মানিত বর্তমান রাহাবার, রাষ্ট্রপতি, স্পিকার এবং সম্মানিত আয়াতুল্লাহগণসহ ইরানের সব জনগণকে আবারও নওরোজের শুভেচ্ছা জানাচ্ছি।#

 

রেডিও তেহরান/জিএআর/১৯

মাধ্যম

মন্তব্য লিখুন


Security code
রিফ্রেস দিন