এই ওয়েবসাইটে আর আপডেট হবে না। আমাদের নতুন সাইট Parstoday Bangla
সোমবার, 28 মার্চ 2016 17:31

সিজদাহ বেদার বা প্রকৃতি দিবস

সিজদাহ বেদার বা প্রকৃতি দিবস

ফার্সি নববর্ষের তেরতম দিবসটির নাম ‘প্রকৃতি দিবস’ ফার্সিতে বলা হয় রুজে তাবিয়াত। এদিনে ইরানের পার্কগুলো হয়ে পড়ে অস্থায়ী নিবাস যেন। বনবাস মানে প্রকৃতির নিবীড় সান্নিধ্যে সময় কাটানোর এক অনবদ্য দিন এটি।

 

প্রাচীনকাল থেকেই ইরানিদের মাঝে এই উৎসবের প্রচলন চলে আসছে। তবে ইসলামি বিপ্লব-পূর্বকালে এই দিবসটিকে বলা হত ‘সিজদাহ বেদার’। একটা বিশেষ আনুষ্ঠানিকতার মধ্য দিয়ে পালন করা হত এই দিবসটিকে। এখনো সেইসব আনুষ্ঠানিকতার কিছুটা রেশ রয়ে গেছে। প্রথম পর্যায়ে পড়বে বিশেষ খাবার দাবার প্রসঙ্গ। সেকানজাবিন লেটুস, চোগলে বাদাম ইত্যাদি খাওয়া হত সিজদাহ বেদারে। সেকানজাবিন হলো সিরকা, মধু, পানি ইত্যাদির মিশ্রণে তৈরি এক ধরনের পানীয়। এই তরল পানীয় শরবতের মতো কিংবা লেটুসে মেখে খাওয়া সিজদাহ বেদারের একটা ঐতিহ্যবাহী প্রথা ছিল। সিরকা সহযোগে আনগাবিন খাওয়া হয় বলে সেকানজাবিন নাম হয়েছে। আনগাবিন শব্দটি মূলে ছিল আরবি আনজাবিন। সে কারণেই সেকানজাবিন হয়েছে। আরেকটি বাদাম জাতীয় খাবারের নাম হলো চোগলে বাদাম ইংরেজিতে বলা হয় ‘গ্রিন অ্যালমন্ড’-এই সবুজ বাদামটি সিজদাহ বেদারের বিকেলে এখনও খাওয়া হয় প্রচুর পরিমাণে।

 

ইরানে বসন্ত ঋতু শুরু হয় বছরের শুরু থেকে। প্রথম তিন মাস বসন্ত ঋতু। বসন্তু মানেই হলো সবুজের সমারোহ, নতুনের বিস্তার। নবীন কিশলয় মাটির বুক চিরে বেরিয়ে এসে ছড়াবে সবুজ মখমলি আমেজ। মাঠের পর মাঠ আর বাগবাগিচাগুলো সবুজের মায়া ছড়িয়ে দোলা দেবে মনে-এটাই স্বাভাবিক। এই বিচিত্র সবুজের মাঝে ফোটে কত যে রঙীন ফুল তা গুণে শেষ করা কঠিন। চারদিকে এরকম একটি পরিবেশ যদি থাকে,আর তার মাঝে থাকে যদি একটি তাঁবু, না না, একটি নয়, তাঁবুর পরে তাঁবু, তাহলে কেমন হবে বলুন তো! এই উপলব্ধিটা বাস্তবে পেতে হলে ফারসি নতুন বছরের তেরতম দিনে চলে আসতে হবে ইরানের যে-কোনো পার্কে। হ্যাঁ! এইদিনের অনন্য সাধারণ সৌন্দর্যে তো বটেই পুরো বসন্ত ঋতুতেই বনবাসী জীবন যাপনের আহ্বান জানিয়ে কবি লিখেছেন:

 

এসেছে নওরোজ চলো এ বসন্ত লগনে

ঘর ছেড়ে বাঁধি ঘর সবুজ জঙ্গলে, বনে

 

ফার্সি বছরের প্রথম মাসের নাম ‘ফারভারদিন’। ১৩ ফারভারদিন হলো নওরোজ উৎসবের শেষ দিন। ইরানের জনগণ এইদিনে তাদের প্রাচীন সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য অনুসরণে ঘর ছেড়ে চলে যায় সুন্দর পরিবেশ ও আবহাওয়াময় একটি এলাকায়। সবুজ কোনো প্রান্তরে, বনে, পার্কে কিংবা কোনো ঝরনার পাশে পরিবারের সবাইকে নিয়ে, আত্মীয় স্বজন বন্ধুবান্ধবদের নিয়ে চলে যায়। সেখানে গিয়ে তাঁবু গেড়ে অস্থায়ী নিবাস তৈরি করে। সারাদিনের প্রয়োজনীয় খাবার দাবারের আয়োজন করে। দিনভর হাসি-আনন্দ-উল্লাসের মধ্য দিয়ে সিজদাহ বেদার বা প্রকৃতি দিবস উদযাপন করে। সকল সমস্যাকে পাশে ঠেলে সকল চিন্তা-ভাবনা, উদ্বেগ-উৎকণ্ঠাকে মন থেকে সরিয়ে দিয়ে প্রকৃতির সবুজ আর নির্মলতা দিয়ে মনকে ভরে তোলে এইদিন। বসন্তের শুরুতে প্রকৃতির নিবীড় সান্নিধ্যে এই উৎসব পালন করা হয় বলে অনেকে সিজদাহ বেদারকে ‘বাসন্তি উৎসব’ বলেও অভিহিত করেছেন।

 

প্রকৃতি দিবসে বিচিত্র খাবার দাবারের আয়োজন করা হয়। বিশেষ করে ‘অশে বালগুর’ মানে চামড়া পরিষ্কার করা যব দিয়ে তৈরি করা এক ধরনের স্যুপ, যার ভেতর প্রচুর পরিমাণে সব্জি থাকে। নুডলসের মতো দেখতে এক ধরনের ফাইবারের সঙ্গে বিচিত্র সব্জি এবং সয়া দিয়ে আরেক ধরনের স্যুপ তৈরি করা হয়। ফার্সিতে বলা হয় ‘অশে রেশতে’। এই দুই ধরনের স্যুপ বেশ খাওয়া হয় এই দিনে। পশ্চিমাঞ্চলীয় ইরানে এই দিনে দুপুরের খাবার হিসেবে কোপ্তা খাওয়ার প্রচলন আছে। মাছ দিয়ে সব্জি পোলাও, কাবাবসহ আরও অনেক রকমের পোলাও খাবার প্রচলন আছে এই দিনে। খাবার দাবার যাই হোক তাঁবুর পর তাঁবু গেড়ে যারা বিভিন্ন প্রান্ত থেকে এক জায়গায় এসেছেন এই দিনটি যাপন করতে তাদের মাঝে পারস্পরিক বন্ধুত্ব ও নৈকট্য সৃষ্টি হয় এই দিনটিকে উপলক্ষ করে। এটাই এই প্রকৃতি দিবসের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।

 

এখানে একটি কথা উল্লেখযোগ্য সেটা হলো আগেকার দিনে ওয়েস্টার্ন ‘আনলাকি থার্টিন’ কনসেপ্টকে অনেকে সিজদাহ বেদারের সঙ্গে মিল দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। ইসলামি বিপ্লবের পর ওই কনসেপ্টকে ভুল এবং অ-ইরানি প্রমাণ করার স্বার্থে দিবসটির নামকরণ করা হয়েছে ‘প্রকৃতি দিবস’। এই দিবসের আনন্দ খুবই উপভোগ্য। বনের ভেতরে সবুজের কোলে সারাদিন কাটানোর আনন্দ একেবারেই অন্যরকম। বিশেষ করে ইরানের পার্কগুলো যেরকম সাজানো গোছানো এবং সার্বিক নিরাপত্তার চাদরে ঢাকা সেটা যিনি উপভোগ করেন নি, উপলব্ধি করতে কষ্ট হবে। গভীর রাত পর্যন্ত সপরিবারে পার্কে কাটিয়ে অবশেষে ঘরে ফেরেন সবাই। এভাবেই কাটানো হয় প্রকৃতি দিবস।#

 

রেডিও তেহরান/নাসির মাহমুদ/২৮

 

 

 

 

মন্তব্য লিখুন


Security code
রিফ্রেস দিন