এই ওয়েবসাইটে আর আপডেট হবে না। আমাদের নতুন সাইট Parstoday Bangla
মঙ্গলবার, 27 আগস্ট 2013 15:33

মুসলিম সভ্যতা ও সংস্কৃতি- (৮১তম পর্ব)

 ইরানের শিয়া আলেমগণ বিদেশী উপনিবেশবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছিলেন। শিয়া আলেমগণ বিদেশী উপনিবেশবাদীদের বিরুদ্ধে বাস্তব অর্থেই সংগ্রাম শুরু করেন। শিয়া বিপ্লবের নতুন চিন্তাদর্শে নিষ্ক্রিয়তা বা সমর্পনের মতো প্রশান্তির আহ্বানকারী ব্যাখ্যাগুলো পরিহার করা হয় এবং তার পরিবর্তে সংগ্রামী এবং বিপ্লবী চেতনার আদর্শকে স্থান দেওয়া হয়।

 

আমরা গত কয়েকটি আসরে মুসলিম জাগরণ বিশেষ করে আরব বিশ্বে ইসলামী জাগরণের দুই শ’ বছরের ইতিহাস তুলে ধরার চেষ্টা করেছিলাম। বলেছিলাম যে ঐ আন্দোলনে সাইয়্যেদ জামালুদ্দিন আসাদাবাদী, সাইয়্যেদ কুতুব, তাহতাভি, খায়রুদ্দিন তূনেসী, হাসানুল বান্নাসহ আরো অনেকের যেমন অবদান ছিল তেমনি ঐ ইসলামী জাগরণে ইখওয়ানুল মুসলেমিনের মতো আন্দোলনেরও ব্যাপক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল।

 

গেল দুই শতাব্দিতে ইরানের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ কালপর্বে ধর্মীয় ও সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ইত্যাদি বিচিত্র অঙ্গনে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। এজন্যে এই দুই শ’ বছরের ইতিহাস ইরানের জন্যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই দুই শ’ বছরের ঐতিহাসিক পর্ব-যাকে ইরানের সমকালীন ইতিহাস বলে অভিহিত করা হয়-তা শুরু হয়েছিল ১৭৯৪ খ্রিষ্টাব্দ অর্থাৎ ইরানে কাজারি রাজবংশের শাসনামলের সূচনা থেকে। ইরানে কাজারি শাসনামলে বিশেষ করে ফাতহ আলী শাহ কাজারের পর উপনিবেশবাদী দেশগুলো ইরানের ওপর নজর দেয়। এ সময় ইরানের সাথে ইউরোপের দূরত্ব ছিল যথেষ্ট। ইউরোপ ছিল তখন বেশ শক্তিশালী। ইউরোপের বিভিন্ন দেশের মাঝে সে সময় প্রতিযোগিতা চলছিল। তো ইউরোপের এই শক্তিশালী উপনিবেশবাদী দেশগুলো যে ইরানের ওপর দৃষ্টি নিক্ষেপ করেছিলো, তার কারণ ছিল ইরান ছিল তৎকালীন ভারতবর্ষের প্রতিবেশী দেশ। আর ভারত ছিল তখন শক্তি, সম্পদ এবং বিশ্বে ব্রিটিশ রাজনৈতিক নির্ভরযোগ্যতা ও শক্তিমত্তার প্রতিভূ।

 

এদিকে ইরানের অর্থনীতি এবং রাজনীতির দুর্বলতাগুলো সে সময় ছিল একেবারে স্পষ্ট। এ কারণে উপনিবেশবাদী ইউরোপীয় শক্তিগুলো ইরানের ওপর যেমন খুশি তেমন চুক্তি বা শর্ত চাপিয়ে দিতে পেরেছিল এবং এমনকি ইরানের পূর্ব এবং উত্তরের অনেক ভূমি পর্যন্ত তারা দখল করে নিতে পেরেছিল। এরফলে ইরানের অর্থনীতি অনেকটা পুঁজিবাদী অর্থনীতির রূপ ধারণ করেছিল। এইসব দুর্বলতার কারণেই ইসলামী নীতিমালার ভিত্তিতে ইসলামী জাগরণমূলক আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটে এবং বিদেশী উপনিবেশবাদীদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবার পটভূমি রচিত হয়। কাজারি হুকুমাতের শুরুতেই ধর্মীয় জনশক্তি বিশেষ করে মারজায়ে তাকলিদ অর্থাৎ অবশ্য অনুসরণীয় ধর্মীয় নেতা এবং আলেম উলামাগণ সমাজে ধর্মীয় নেতৃত্ব দেওয়ার মতো ভূমিকায় অবতীর্ণ হন। এর পেছনে গুরুত্বপূর্ণ যে কারণগুলো কাজ করেছিল তা ছিল ধর্মতত্ত্ব চর্চা কেন্দ্রগুলোতে তখন গবেষণার পুনরুজ্জীবন ঘটে এবং বিশেষ করে শিয়া ধর্মীয় কেন্দ্রগুলোতে ব্যাপক পরিবর্তন আসে। ইজতেহাদ বা গবেষণামূলক দর্শন চিন্তার মূল উজ্জীবক হিসেবে যিনি অবদান রেখেছিলেন তিনি হলেন মোল্লা মোহাম্মাদ বাকের বাহবাহনি, তিনি অবশ্য ওয়াহিদ বাহবাহনি নামেই বেশি পরিচিত।

 

মোল্লা মোহাম্মাদ বাকের বাহবাহনির কথা বলছিলাম আমরা। তাঁর কাজের গুরুত্বটা ছিল মূলত এইখানে যে, তিনি ইসলামী জাগরণমূলক আন্দোলনের ক্ষেত্রে প্রভাবশালী এবং মুজতাহিদ বা গবেষক শ্রেণীর বেশ কিছু ছাত্র তৈরি করে যেতে সক্ষম হয়েছিলেন। এই গবেষক শ্রেণীর আলেমদের মধ্যে কয়েকজন হলেন মোল্লা মাহদি এবং মোল্লা আহমাদ নাররকি, শায়খ জাফর কাশেফুল গাত্তা, অগা সাইয়্যেদ আলী তাবাতাবায়ি, হাজ্ব মুহাম্মাদ ইব্রাহিম কালবাসি, সাইয়্যেদ মুহাম্মাদ মাহদি বাহরুল উলূম এবং মির্যা কোমী।

 

শিয়া আলেমগণ বিদেশী উপনিবেশবাদীদের বিরুদ্ধে বাস্তব অর্থেই সংগ্রাম শুরু করেন। শিয়া বিপ্লবের নতুন চিন্তাদর্শে নিষ্ক্রিয়তা বা সমর্পনের মতো প্রশান্তির আহ্বানকারী ব্যাখ্যাগুলো পরিহার করা হয় এবং তার পরিবর্তে সংগ্রামী এবং বিপ্লবী চেতনার আদর্শকে স্থান দেওয়া হয়। বিদেশী উপনিবেশবাদীদের বিরুদ্ধে উলামাদের এই বিপ্লবী ও সংগ্রামী ভূমিকা ছিল যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। কেননা প্রথম এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মধ্যবর্তী সময়টাতে ইরান এবং রাশিয়ার মাঝে যে সংঘর্ষ বেধেছিল তাতে ইরানের আলেম সমাজই রণাঙ্গনে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। রুশরা এ সময় মুসলমানদের ওপর ব্যাপক অত্যাচার চালিয়েছিল। তারা মুসলিম নারীদের ওপরও নির্যাতন চালিয়েছিল। সেইসাথে মুসলমানদের ধন সম্পদ লুট করে নিয়ে যাচ্ছিলো। এরকম এক পরিস্থিতিতে জনগণ সংগ্রামী আলেমদের কাছে দূত পাঠিয়ে রুশদের হঠাতে তাঁদের সাহায্য কামনা করে। আলেম সমাজ সে সময় বাস করতেন নাজাফে। অগা সাইয়্যেদ মুহাম্মাদ ইস্ফাহানীসহ আরো অনেক আলেমের কাছে এরকম দূত পাঠিয়ে অত্যাচারী রুশদের হাত থেকে মুসলমানদের উদ্ধার করার জন্যে আবেদন জানিয়েছিল।

 

আলেম সমাজ জনগণের এই আবেদনে সাড়া দিয়ে রাশিয়ার সাথে ইরানের যুদ্ধে রুশ বিরোধী জিহাদের ডাক দিয়েছিল। শিয়া আলেমগণ এই যে দ্রুততার সাথে জনতার ডাকে সাড়া দিলো তা-ই প্রমাণ করে ইসলামী জাগরণ তথা রাজনৈতিক ক্ষেত্রে আলেম সমাজের হস্তক্ষেপ কতোটা প্রয়োজনীয় এবং গুরুত্বপূর্ণ ছিল। সেইসাথে ভেতরে ভেতরে যে ইসলামী বিপ্লবী আন্দোলন দানা বেঁধে উঠেছিল তারও প্রমাণ মেলে আলেম সমাজের এই দ্রুত প্রতিক্রিয়া থেকে। এভাবে আলেম সমাজ সেনাদল এবং জনগণের পাশাপাশি রুশ বিরোধী যুদ্ধে অংশ নিয়েছিল। যেসব মুজাহিদ উলামা সরাসরি রুশ বিরোধী যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন তাদের মধ্যে কয়েকজন হলেনঃ আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ মুহাম্মাদ মুজাহিদ, মোল্লা মুহাম্মাদ জাফর, সাইয়্যেদ নাসরুল্লাহ আস্তারাবাদী, সাইয়্যেদ মুহাম্মাদ তাকি কাজভিনি, মোল্লা আহমাদ নাররকি কাশানী এবং আরো অনেকে। এরপরে অবশ্য দ্বীনী আন্দোলনের ক্ষেত্রে সংস্কারের চেষ্টা চালানো হলে বৃটেন সেই সুযোগকে কাজে লাগায়। তারা ধর্ম বিরোধী বিচিত্র চিন্তাদর্শের আগমন ঘটিয়ে ইসলামী জাগরণকে দমন করার চেষ্টা চালায়। যেসব চিন্তাদর্শের আবির্ভাব ঘটিয়েছিল বৃটেন তার মধ্যে অন্যতম ছিল সেক্যুলারিজম।

 

উপনিবেশবাদীরা এ সময় বিভিন্ন ফের্কার জন্ম দিয়ে ইসলামী চিন্তাদর্শের অগ্রযাত্রা দমিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চালিয়েছিল। ‘বাব’ তেমনি একটি ফেৎনা। এর মাধ্যমে উপনিবেশবাদীরা সর্বশেষ ত্রাণকর্তা মাহদি (আ) এর আবির্ভাবসহ আশাবাদী চিন্তাধারায় আঘাত হেনেছিল। আলী মুহাম্মাদ বাবের মাধ্যমে এই ফের্কাটির জন্ম দিয়েছিল তারা। সময়ের বিবর্তনে এই বাব চিন্তাদর্শেও ফাটল সৃষ্টি হয়েছিল। একটি শাখা আযালিয়া এবং আরেকটি বাহায়ি শাখায় বিভক্ত হয়ে পড়েছিল এই বাব চিন্তাদর্শ। রুশ উপনিবেশবাদীরা ছিল আযালিয়াদের পৃষ্ঠপোষক আর ব্রিটিশ উপনিবেশবাদীরা ছিল বাহায়িদের পৃষ্ঠপোষক। তারাই এই দুই ফের্কাকে শক্তিশালী করে তুলেছিল এবং সেগুলোর বিস্তার ঘটিয়েছিল। পরবর্তীকালে ইসলামের পুনরুজ্জীবনকামী আন্দোলনের পথিকৃৎ সাইয়্যেদ জামালুদ্দিন আসাদাবাদীর মাধ্যমে ইসলামী রেনেসাঁর সূত্রপাত ঘটে। ইরানসহ ইসলামী সমাজকে জাগিয়ে তোলার ক্ষেত্রে এবং আলেম সমাজের মাঝে আশাবাদ জাগানোর ক্ষেত্রে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। ঐক্য এবং জাগরণই ছিল তাঁর আন্দোলনের মূল লক্ষ্য। শ্রোতাবন্ধুরা! এই ঐক্য এবং জাগরণের প্রয়োজনীয়তা কি আজো অনুভূত হচ্ছে না? #

 

 

 

 

মন্তব্য লিখুন


Security code
রিফ্রেস দিন