এই ওয়েবসাইটে আর আপডেট হবে না। আমাদের নতুন সাইট Parstoday Bangla
শনিবার, 21 সেপ্টেম্বর 2013 14:58

মুসলিম সভ্যতা ও সংস্কৃতি- (৮৫তম পর্ব)

ভারতে উপনিবেশবাদীরা যখন প্রবেশ করে মুসলমানরা তখন ব্যাপকভাবে প্রতিক্রিয়া দেখায় এবং প্রতিবাদ জানায়। বেশিরভাগ মুসলমানই বুঝতে পেরেছিল যে উপনিবেশবাদীদের আধিপত্যের ফলে তাঁদের নিজেদের রাজনৈতিক মর্যাদা হারিয়ে যাবে সেজন্যে তারা ব্রিটিশ উপনিবেশবাদীদের আধিপত্যকে কিছুতেই মেনে নিতে চান নি। বরং তাঁরা ব্রিটিশ উপনিবেশবাদীদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় লড়াই করার পথ বেছে নিয়েছিলেন।

 

ভারতেও কিন্তু ব্রিটিশ, ফরাশি, হল্যান্ড এবং পর্তুগিজ ইত্যাদি সকল উপনিবেশিক শক্তিই প্রবেশ করেছিল। তবে তাদের সবাই এসেছিল বাণিজ্য করার নাম করে। তবে এদের মাঝে ব্রিটিশরা ছিল অন্যদের তুলনায় বেশি শক্তিশালী। সে কারণে ব্রিটিশ উপনিবেশবাদী শক্তি অন্যান্য উপনিবেশবাদীদের চেয়ে অনেক বেশি এগিয়ে গিয়েছিল এবং অন্যদের নেতৃত্ব দেওয়ার পর্যায়ে চলে গিয়েছিল।

 

তারা ছিল ভীষণ ধূর্ত। ব্রিটিশরা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি গঠন করার মধ্য দিয়ে ভারতের রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে তাদের অপরাপর শক্তিকে সরিয়ে দিয়েছিল। ভারতে উপনিবেশবাদীরা যখন প্রবেশ করে মুসলমানরা তখন ব্যাপকভাবে প্রতিক্রিয়া দেখায় এবং প্রতিবাদ জানায়। বেশিরভাগ মুসলমানই বুঝতে পেরেছিল যে উপনিবেশবাদীদের আধিপত্যের ফলে তাঁদের নিজেদের রাজনৈতিক মর্যাদা হারিয়ে যাবে সেজন্যে তারা ব্রিটিশ উপনিবেশবাদীদের আধিপত্যকে কিছুতেই মেনে নিতে চান নি। বরং তাঁরা ব্রিটিশ উপনিবেশবাদীদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় লড়াই করার পথ বেছে নিয়েছিলেন। মুসলমানদের এইসব সংগ্রাম আর পরবর্তীতে হিন্দুদের আন্দোলনের ফলে ব্রিটিশ উপনিবেশবাদী শক্তি ভারত ছেড়ে যেতে বাধ্য হয়েছিল। এই ঘটনাটি ঘটেছিল ১৯৪৭ সালে। এই বছরই ভারত বিভক্ত হয়ে পাকিস্তান এবং ভারত দুই দেশে পরিণত হয়েছিল।

 

ভারত উপমহাদেশের মুসলমানদের আন্দোলনকে অন্তত তিনটি কালপর্বে বিশ্লেষণ করা যেতে পারে। একটি হলো ১৮৫৭ সালের পূর্ববর্তীকালের আন্দোলন। অপরটি হলো ১৮৫৭ সাল পরবর্তীকাল থেকে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত সময়কার আন্দোলন। আর তৃতীয় কালপর্বটি হলো ১৯৪৭ সাল থেকে শুরু করে বর্তমান সময় পর্যন্ত কালপর্বের আন্দোলন। তবে ১৮৫৭ সালের আগে থেকে অর্থাৎ গোর্কানিদের রাজনৈতিক পতনের সময় থেকে এবং ধীরে ধীরে ভারতে ব্রিটিশ উপনিবেশবাদীদের অনুপ্রেবেশের সূচনা থেকে মুসলমানদের মাঝে দুই ধরনের আন্দোলন দেখা দেয়। একদিকে মুসলমানদের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিত্বগণ বা শাসকশ্রেণী যাঁরা চেষ্টা প্রচেষ্টা চালিয়েছিলেন ব্রিটিশ উপনিবেশবাদীদের অনুপ্রবেশ প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে।  অপরদিকে শাহ ওয়ালি উল্লা দেহলভির চিন্তাধারার প্রভাবে প্রভাবিত ধর্মীয় আন্দোলন-যারা চেষ্টা করেছিলেন মুসলমানদের হারানো ঐতিহ্য ও চিন্তাধারাকে ভারতে পুনরুজ্জীবিত করে তুলতে। ভারতের মুসলিম শাসক শ্রেণীর মাঝে সিরাজুদ্দৌলা, হায়দার আলী এবং টিপু সুলতানের মতো নেতা ছিলেন যারা ব্রিটিশ উপনিবেশবাদের বিরুদ্ধে উল্লেখযোগ্য কর্মতৎপরতা চালিয়েছিলেন। 

 

উপনিবেশবাদের বিরুদ্ধে আন্দোলনের কথা বলছিলাম আমরা। বাস্তব দৃষ্টিতে তাঁদের ঐ আন্দোলন বা কর্মতৎপরতা ব্যর্থ বা পরাজিত হলেও প্রমাণিত হয়েছে যে, ভারতের মুসলমানরা উপনিবেশবাদী শক্তির কাছে মাথানত করবে না, তাদের দাসত্ব মেনে নেবে না। ভারতীয় মুসলমানদের বিভিন্ন ধর্মীয় আন্দোলনও ব্রিটিশ উপনিবেশবাদী শক্তির বিরুদ্ধে ধর্মীয় সংস্কারকামী বা জাগরণমূলক আন্দোলন রূপে আবির্ভূত হয়। এইসব আন্দোলনের মূলে ছিলেন শাহ ওয়অলি উল্লা দেহলভি। গোর্কানিয়ান সাম্রাজ্যের পতনের সময়েই তাদের এই জাগরণমূলক আন্দোলনের সূত্রপাত হয়। দেহলভির সন্তান এবং তাঁর অনুসারীরাই এ আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছিলেন। তাঁদের মধ্য থেকে কয়েকজনের নাম উল্লেখ করার মতো। শাহ আব্দুল আযিয, সাইয়্যেদ আহমাদ বেরলভি এবং শাহ ইসমায়িল। এঁদের বাইরেও কয়েকজনের আন্দোলন ইতিহাস খ্যাত। যেমন বাংলার হাজি শরিয়ত উল্লাহর আন্দোলন এবং তিতুমিরের আন্দোলন। এঁরা এমন সব আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন যে ভারতীয় মুসলমানদের সংগ্রামের ইতিহাসে সেইসব আন্দোলন বিশেষ গুরুত্বের দাবি রাখে।

 

এইসব গুরুত্বপূর্ণ এবং ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ববর্গ তাঁদের নিজ নিজ সময়ে শুধুমাত্র যে উপনিবেশবাদী শক্তির বিরুদ্ধে সংগ্রামই করেছেন তা-ই নয় বরং তাঁরা ইসলামের মূলনীতিগুলো বাস্তবায়নের ব্যাপারে ব্যাপক চেষ্টা প্রচেষ্টাও চালিয়েছেন। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় শাহ ওয়অলি উল্লাহর উত্তরসূরি শাহ আব্দুল আযিয (১৭৪৬-১৮২৪) ব্রিটিশদের বিভিন্ন পদক্ষেপের বিরুদ্ধে মারাত্মক প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন। বিশেষ করে ইসলামী শরিয়তের বিধি বিধানগুলোর ব্যাপারে অযাচিত হস্তক্ষেপ করার ব্যাপারে ব্রিটিশরা যেভাবে আনুষ্ঠানিকভাবে পদক্ষেপ নিয়েছিল সেগুলোর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন। ইসলামী ফতোয়ার ব্যাপারে ব্রিটিশরা বাড়াবাড়ি করার কারণে তিনি  ব্রিটিশদের দখলিকৃত ভারতের উত্তরাঞ্চলকে ‘দারুল হার্‌ব’ ঘোষণা করতেও দ্বিধা বোধ করেন নি। দারুল হার্‌ব ঘোষণা করে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে জিহাদ করাকেই মুসলমানদের পক্ষ থেকে তাদের মোকাবেলার একমাত্র উপায় বলে সিদ্ধান্ত দেন। শাহ আব্দুল আযিযের মূল লক্ষ্য ছিলো ব্রিটিশ উপনিবেশবাদীদের ব্যাপারে ইসলামী শরিয়তের বিধান কী সেটা মুসলমানদেরকে জানিয়ে দেওয়া এবং ইসলামী দ্বীনের ভিত্তিমূলে মুসলমানদের জীবন পরিচালনার বিধানকে আরো মজবুত এবং দৃঢ়ভাবে স্থাপন করা।

 

সাইয়্যেদ আহমদ শহিদ নামে খ্যাত ‘সাইয়্যেদ আহমাদ বেরলভি’ও(১৭৮৬-১৮৩১) শাহ আব্দুল আযিযের অনুসারী একজন ছাত্র ছিলেন। তিনি ১৮২৭ সালে পেশোয়ারের কাছে শিখ শাসকদের বিরুদ্ধে এক ধরনের ইসলামী শাসন প্রবর্তন করেছিলেন। তিনি চেয়েছিলেন তাঁর শাসনাধীন অঞ্চলে ইসলামী শরিয়তের বিধি-বিধান বাস্তবায়ন করতে। কিন্তু বেশ কিছু কারণে তাঁর সেই প্রচেষ্টা বিফল হয়ে যায়। কারণগুলোর একটি হলো শিখদের সাথে দ্বন্দ্ব-সংঘাত লেগে যাওয়া এবং অপরটি হলো স্থানীয় লোকজনদের মাঝে তাঁকে পুরোপুরি মেনে না নেওয়ার প্রবনতা। সাইয়্যেদ আহমদ বেরলভি অবশ্য চেয়েছিলেন ইসলামী অনুমোদন করে না-এমনসব কাজ এবং আকিদা বিশ্বাস থেকে সমাজকে পূত পবিত্র করে তুলতে। সেইসাথে কুরআন এবং সুন্নাহর ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত সর্বপ্রথম ইসলামী শরিয়াতের দিকে ফিরে যেতে। যদিও কোনো কোনো লেখক মনে করেন তাঁর আসল উদ্দেশ্য ছিল ভারতে ব্রিটিশ উপনিবেশবাদী শক্তির বিরুদ্ধে সংগ্রাম করা।

 

ভারতীয় মুসলমানদের রাজনৈতিক এবং চিন্তাদর্শগত আন্দোলনের নেতৃত্ব যাঁরা দিয়েছিলেন তাঁদের মাঝে উল্লেখযোগ্য আরো একজন ব্যক্তিত্ব ছিলেন শাহ ওয়ালি উল্লাহর উত্তর পুরুষ ‘শাহ ইসমায়িল’। মুসলিম সমাজ সংস্কারের লক্ষ্যে তিনি বেশকিছু মূল্যবান বইপুস্তক লিখেছেন। তাঁর লেখা বইগুলো উর্দু ভাষায় যেমন আছে, তেমনি আরবি ভাষা এবং ফার্সি ভাষায়ও রয়েছে। এসব বইয়ের মধ্যে অন্যতম একটি বই হলো আরবি ভাষায় লেখা ‘তাকভিয়াতুল ইমান’। এ বইটির বিষয়বস্তু হলো তৌহিদ। যাই হোক উপনিবেশবাদ বিরোধী মুসলিম আন্দোলনে আরো দুই বাঙালি মুসলমান ব্যাপক অবদান রেখেছিলেন। তাঁরা হলেন হাজি শরিয়তুল্লাহ এবং সাইয়্যেদ মির নেসার আলি ‘তিতুমির’। তাঁদের অবদানের কথা এই স্বল্প পরিসর আসরে বলে শেষ করা যাবে না। কখনো সময় সুযোগ হলে বিস্তারিত বলার চেষ্টা করবো। আর আপনাদের সুযোগ থাকলে তাঁদের ওপর লেখা বইও সংগ্রহ করে পড়তে পারেন।#

মন্তব্য লিখুন


Security code
রিফ্রেস দিন