এই ওয়েবসাইটে আর আপডেট হবে না। আমাদের নতুন সাইট Parstoday Bangla
বুধবার, 25 সেপ্টেম্বর 2013 17:16

মুসলিম সভ্যতা ও সংস্কৃতি- (৮৬তম পর্ব)

আমরা ভারত উপমহাদেশে ১৮৫৭ সাল পূর্ববর্তী সময়ে উপনিবেশবাদের বিরুদ্ধে যে বিভিন্ন আন্দোলন গড়ে উঠেছিল সেসব নিয়েই কথা বলার চেষ্টা করেছিলাম। বলেছিলাম যে সংগ্রামী মুসলমানরা সে সময় সাংস্কৃতিক এবং সামরিক বিচিত্র পদক্ষেপের মাধ্যমে চেষ্টা করেছিল ইসলামের হারানো গৌরব ফিরিয়ে আনতে, ইসলামী চেতনাকে পুনরায় জাগিয়ে তুলতে। আজকের আসরে আমরা ভারত উপমহাদেশে ইসলামী জাগরণ বিশেষ করে ১৮৫৭ থেকে ১৯৪৭ এবং ১৯৪৭ থেকে বর্তমানকাল পর্যন্ত দীর্ঘসময়ের মুসলমানদের আন্দোলনগুলো পর্যালোচনা করার চেষ্টা করবো।

 

১৯৫৭ সালের আগে ব্রিটিশ উপনিবেশবাদীদের পদক্ষেপগুলোর ফলে ভারতে বিদেশী আধিপত্য ও হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে সার্বজনীন অভ্যুত্থানের ক্ষেত্র সৃষ্টি হয়েছিল। ইতোমধ্যে ১৮৫৭ সাল থেকে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত  সময়ে ভারত উপমহাদেশের মুসলমানদের আন্দোলনগুলো ইসলামী জাগরণের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। এই আন্দোলনগুলো অবশ্য দুটি ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছিল। একটি ছিল ধর্মীয় আন্দোলন আরেকটি রাজনৈতিক। ১৮৫৭ সালে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে হিন্দু মুসলমানদের রক্তক্ষয়ী উত্থানে অংশ নিয়েছিল ‘আলীগড় আন্দোলন, দেওবন্দ আন্দোলন, নুদওয়াতুল ওলামা আন্দোলন। বৃহৎ এই আন্দোলনগুলোর পাশাপাশি বিচ্ছিন্নভাবে আরো বহু আন্দোলন গড়ে উঠেছিল। সেইসব আন্দোলনও  উপনিবেশবাদের মোকাবেলায় এবং ইসলামী জাগরণের ক্ষেত্রে প্রভাবশালী ভূমিকা রেখেছিল।

 

স্যার সাইয়্যেদ আহমদ খান তাঁর ব্যক্তিগত চিন্তাদর্শের মাধ্যমে আলীগড় আন্দোলন গড়ে তুলতে পেরেছিলেন। তিনি গুরুত্ব দিয়েছিলেন ভারত যেন পিছিয়ে না পড়ে সেদিকে। বিশেষ করে ১৮৫৭ সালের অভ্যুত্থানের ফলে যে রকম চাপের মুখে পড়েছিল ভারতীয় মুসলমানরা তার ফলে তাদের পিঠ দেয়ালে ঠেকে যাবার অবস্থা সৃষ্টি হয়েছিল। এই পিছিয়ে পড়ার ভয় থেকে মুসলমানদের বাঁচানোর জন্যে স্যার সাইয়্যেদ আহমদ খান ইংরেজি ভাষার নতুন নতুন জ্ঞান অর্জনের ওপর গুরুত্ব দিয়েছিলেন। আবার ব্রিটিশদের সাথে দ্বন্দ্ব সংঘাতে জড়ানোর পরিবর্তে তাদের সাথে সহাবস্থান করার কথা বলেছিলেন। স্যার সাইয়্যেদ আহমদ খান ধর্মীয় হোক কিংবা সামাজিক হোক সকল ক্ষেত্রেই নতুনত্বের পক্ষে ছিলেন। পাশ্চাত্য সভ্যতার বিরোধিতা না করে তিনি বরং উপমহাদেশের মুসলমান সমাজের সাথে কীভাবে তাকে সমন্বিত করা যায় সেই চেষ্টায় ছিলেন। তিনি মনে করতেন সেকেলে বা প্রাচীন দৃষ্টিভঙ্গি মুসলমানদের উন্নতি ও অগ্রগতির পথে প্রধান অন্তরায়।

 

অবশ্য তাঁর এই দৃষ্টিভঙ্গির কারণে বিশেষ করে পশ্চিমা ঘেঁষা চিন্তা ভাবনার কারণে বহু ব্যক্তি এবং ব্যক্তিত্বের সমালোচনার শিকার হয়েছিলেন। এমনকি অনেক ঘটনা দুর্ঘটনাও ঘটে গেছে এইরকম চিন্তাভাবনা পোষণ করার ফলে। তাঁর সমালোচকদের মধ্যে অন্যতম একজন ছিলেন সাইয়্যেদ জামালুদ্দিন আসাদাবাদি। সমালোচনা করা সত্ত্বেও তাঁর অনেক কট্টর বিরোধীও কিন্তু মুসলমানদের জন্যে তিনি যেসব অবদান রেখে গেছেন-বিশেষ করে শিক্ষা দীক্ষার ক্ষেত্রে-সেগুলো অস্বীকার করেন নি। জ্ঞান ও বিজ্ঞান চর্চার ক্ষেত্রে তাঁর শ্রম এবং প্রচেষ্টা সত্যিই অনস্বীকার্য। আধুনিক এই বিজ্ঞানের যুগের ইতিহাসবিদগণও মনে করেন ভারতীয় মুসলমানদের জ্ঞান বিজ্ঞানগত উন্নয়নে স্যার সাইয়্যেদ আহমদ খান কালজয়ী অবদান রেখেছেন।

 

ভারতের ধর্মীয় আন্দোলনগুলোর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ আরেকটি আন্দোলনটি ছিল দেওবন্দ আন্দোলন। ১৮৫৭ সালের ঐতিহাসিক বিপ্লবের সময় ব্রিটিশরা বহু মুসলমান বিশেষ করে আলেম ওলামা এবং ধর্মীয় নেতাকে হত্যা করেছিল। আবার অনেক মুসলিম মনীষীকে গ্রেফতার করে বন্দিশালার অন্ধ কোটরে আটকেও রেখেছিল। এ সময়কার গুরুত্বপূর্ণ দেওবন্দ আন্দোলনটি যিনি গড়ে তুলেছিলেন তিনি ছিলেন মুহাম্মদ কাসেম নানুতুভি। তিনি আরো অনেক মুসলিম মনীষীর সহযোগিতায় দেওবন্দ আন্দোলনের সূচনা করেন। এই আন্দোলনের লক্ষ্য ছিল ইসলামী জাগরণ। দেওবন্দ আন্দোলনের নামটি হয়েছে একটি এলাকার নাম দিয়ে। এই এলাকাটি দিল্লি থেকে নব্বুই মাইল উত্তর পূর্বে সাহরানপুরের পাশে অবস্থিত। ভারতের ধর্মীয় আন্দোলনের নেতা শাহ ইসমায়িলের কাছ থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি দেওবন্দ আন্দোলন গড়ে তোলার পদক্ষেপ নেন। লক্ষ্য উদ্দেশ্য ছিল ইসলামকে পুনরুজ্জীবিত করা।

 

ত্রিশ বছর পর্যন্ত দেওবন্দ আন্দোলনের তৎপরতার পর এই আন্দোলনের নেতৃবৃন্দ সক্ষম হয়েছেন সমগ্র ভারত জুড়ে অন্তত চল্লিশটি মাদ্রাসা বা ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে। এইসব মাদ্রাসায় শিক্ষকগণ কুরআন, হাদিস, ফিকা, দর্শনের পাশাপাশি আরবি –ফার্সি ভাষাগুলো শেখানোর সুযোগ পেয়েছিলেন। এইসব মাদ্রাসায় হানাফি ফিকাহর ভিত্তিতেই মাজহাবি শিক্ষা দেওয়া হতো। তবে নতুনত্বকে ইসলাম সম্মত নয় বলে বরণ করার পথ বন্ধ করে দিয়ে এটাকে বলা হতো বিদআত। দেওবন্দ আন্দোলনকারী বা তাদের অনুসারীগণ বিশ্বাস করতেন উপনিবেশবাদীদের কবল থেকে মুক্তি লাভ করার জন্যে প্রাথমিক যুগের ইসলামের দিকে ফিরে যেতে হবে। বিংশ শতকের শুরু থেকে ভারতে রাজনৈতিক তৎপরতার সূচনাকাল পর্যন্ত এই দেওবন্দ আদর্শের অনুসারীরাও রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রবেশ করেছিল এবং সমকালীন রাজনীতিতে ব্যাপক গুরুত্বপূর্ণ অবদানও রেখেছিল।

 

নাদওয়াতুল ওলামা হচ্ছে এই শ্রেণীর নামকরা একটি মাদ্রাসা। ভারতীয় মুসলমানদের পুনরুজ্জীবিত করে তোলার ক্ষেত্রে এই নাদওয়াতুল ওলামা’র যথেষ্ট অবদান ছিল।  ১৮৯৪ সালে একদল মধ্যপন্থী আলেম লখনৌ শহরে এই মাদ্রাসাটি প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। ভারতের বিখ্যাত ইতিহাসবিদ এবং চিন্তাবিদ ‘শিবলি নুমানী’ এই মাদ্রাসাটি প্রতিষ্ঠাকারীদের একজন ছিলেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী এই নাদওয়াতুল ওলামা মাদ্রাসাটি প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য ছিল সমকালীন রাজনৈতিক পরিস্থিতি থেকে ইসলামের ধ্বংস রোধ করা, ইসলাম নিয়ে পড়ালেখা বা চর্চার বিস্তার ঘটানো, সামাজিক সংস্কার এবং ইসলামী আকিদা-বিশ্বাস আরো ছড়িয়ে দেওয়া। শিবলি নুমানী দ্বীনকে রাজনীতি থেকে আলাদা করে ভাবার যে প্রবণতা তার তীব্র বিরোধী ছিলেন।

 

তিনি নাদওয়াতুল ওলামা’র মাধ্যমে আধ্যাত্মিক ব্যক্তিবর্গ এবং আলেম ওলামাকে কুরআনের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণধর্মী তাফসির করার জন্যে উৎসাহিত করেছেন এবং চেষ্টা করেছেন। সেইসাথে চেষ্টা করেছেন নিজেকে উনবিংশ শতকের সমাপ্তি লগ্নের বিশ্বের জ্ঞান ও বিজ্ঞানের সাথে খাপ খাইয়ে নিতে। নাদওয়াতুল ওলামার আলেমগণ চেষ্টা করেছেন মুসলমানদের মধ্যকার বিভিন্ন ফেরকা যেমন হানাফি ফেরকা, আহলে হাদিস এবং শিয়া ফেরকার আলেমদের মাঝে সমন্বয় করতে। কিন্তু সেই চেষ্টা সফল হয় নি।

 

এই তিনটি প্রধান যেগুলো ১৮৫৭ সালের বিপ্লব পরবর্তী যুগে মুসলমানদের অস্তিত্বের স্বাক্ষর রাখার স্বার্থে গড়ে উঠেছিল সেইসব আন্দোলনের বাইরেও আরো কিছু মাদ্রাসা কেন্দ্রিক বিচ্ছিন্ন আন্দোলন গড়ে উঠেছিল। যেমন ফারাঙ্গি মহল ধর্মীয় শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্র। মোল্লা নিজামুদ্দিন এখানে প্রশিক্ষণ দিতেন। মুসলিম লীগের কথাও এ প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য। #

মন্তব্য লিখুন


Security code
রিফ্রেস দিন