এই ওয়েবসাইটে আর আপডেট হবে না। আমাদের নতুন সাইট Parstoday Bangla
রবিবার, 20 অক্টোবার 2013 14:57

মুসলিম সভ্যতা ও সংস্কৃতি- (৮৯তম পর্ব)

মরোসহ ব্রুনাই এবং থাইল্যান্ডের মতো দেশগুলোতে ইসলামী জাগরণের ইতিহাস

ইরানের ইসলামী বিপ্লব মরো মুসলমানদেরকে আধ্যাত্মিক প্রেরণা ও শক্তি জুগিয়েছিল। এই সমর্থন ও শক্তির ফলে তারা ব্যাপকভাবে অনুপ্রাণিত ও উজ্জীবিত হয়ে উঠেছিল। ১৯৮৪ সালে মরো ইসলামিক লিবারেশন ফ্রন্ট (Moro Islamic Liberation Front) সংক্ষেপে MILF, মরো ন্যাশনাল লিবারেশন ফ্রন্ট (Moro National Liberation Front) সংক্ষেপে MNLF থেকে পৃথক হয়ে গিয়েছিল। নতুন এই ফ্রন্টটি অনেকটা রক্ষণশীল প্রকৃতির এবং ওহাবি চিন্তাধারার অনুসারী ছিল। খুব স্বাভাবিকভাবেই সৌদি আরব এই দলটিকে সহযোগিতা করতো। ফিডেল রামোস প্রেসিডেন্ট থাকাকালে সরকার এবং মরো ন্যাশনাল লিবারেশন ফ্রন্টের সাথে চার বছর আলোচনা চালিয়ে যাবার পর ১৯৯৬ সালে একটি সন্ধিচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। ঐ সমঝোতা চুক্তি অনুযায়ী মিন্দানাও দ্বীপসহ মুসলিম অধ্যুষিত এলাকাগুলোর উন্নয়নের জন্যে সাময়িক কিছু প্রস্তাব গৃহীত হয়। একইভাবে ২০০১ সালে এখানে নির্বাচনও অনুষ্ঠিত হয়। ঐ নির্বাচনে মরো ন্যাশনাল লিবারেশন ফ্রন্ট কোনো আসন পায় নি এবং এই ফ্রন্ট শেষ পর্যন্ত ডক্টর ফারুক হোসাইনকে তাদের নেতা হিসেবে মনোনীত করে।

 

অপরদিকে, মরো ইসলামিক লিবারেশন ফ্রন্ট সরকারের মোকাবেলায় কঠোর অবস্থান নেয়। তারা এরকম অবস্থান নিয়ে চেষ্টা করেছিল ইসলামী সরকার বা ইসলামী শাসন ব্যবস্থা কায়েম করবে। এ লক্ষ্যে তারা অগ্রসরও হয়েছিল খানিকটা। বেশ কিছু বাস্তব পদক্ষেপও গ্রহণ করেছিল। এসব পদক্ষেপ বা কর্মসূচি বাস্তবায়ন করতে গিয়ে সরকারী বাহিনীর সাথে এই ফ্রন্টের নেতাকর্মীদের দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়েছিল। পরবর্তীকালে অর্থাৎ ২০০১ সালে উভয় পক্ষই আলোচনার টেবিলে বসে এবং  ত্রিপলিতে দু পক্ষের মাঝে সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষিরিত হয়।

 

থাইল্যান্ডও খ্রিষ্টিয় পণেরো শতকে ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় নেয়। ইরানের দুই ভাই থাইল্যান্ডে ইসলাম বিস্তারে ব্যাপক ভূমিকা রেখেছিল। ইসলাম প্রচারে ব্যাপক প্রভাব বিস্তারকারী এই দুই ভাইয়ের নাম হলো ‘শায়খ আহমাদ কোমি’ এবং শায়খ সায়িদ কোমি’। তাদের প্রভাবের একটা নিদর্শন হলো খ্রিষ্টিয় ১৬৫৬ সালে প্রতিষ্ঠিত একটি বিখ্যাত মসজিদ। মসজিদটি নির্মাণ করা হয়েছিল অয়ুদিয়া শহরে। বিংশ শতাব্দির শুরুতে থাইল্যান্ডের মুসলমানরাও ইসলামী সংস্কারকামী আন্দোলনের প্রভাবে বিশেষ করে মুহাম্মদ আবদুহ’র চিন্তাধারার মাধ্যমে প্রভাবিত হয়েছিল। এ সময় আহমাদ ওহাব তাঁর সংস্কারমূলক চিন্তাধারার সমন্বয়ে একটি বই লেখেন। এ বইটির আদর্শ ও চিন্তা চেতনাগুলো ছিল মুহাম্মদ আবদুহ এবং রাশিদ রেযার চিন্তাধারারই বহিপ্রকাশমাত্র। হল্যান্ডি উপনিবেশবাদের বিরুদ্ধে তার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডগুলো ছিল ‘মুহাম্মাদিয়া আন্দোলনে’র ছাঁচে ঢালা। তাঁকে যখন ইন্দোনেশিয়া থেকে থাইল্যান্ডে নির্বাসন দেওয়া হয়েছিল তখন তিনি সক্ষম হয়েছিলেন প্রচুর ভক্ত ও সমর্থক জোটাতে।

 

তিনি ইসলামী সংস্কারমূলক সর্বপ্রথম যে ফ্রন্টটি গড়ে তুলেছিলেন, সেটির নাম ছিল ‘আনসারুস সুন্নাহ’। ১৯৬০ এর দশকে মুসলমানদের ওপর যখন সরকারী চাপ বেড়ে গিয়েছিল, তখন পাত্তানি লিবারেশন ফ্রন্ট গড়ে তোলেন। একইভাবে ১৯৬৮ সালে ‘পাত্তানি সম্মিলিত স্বাধীনতা সংস্থা’ নামে আরো একিটি প্রন্ট তিনি গড়ে তুলেছিলেন। তাদের আন্দোলনের লক্ষ্য ছিল থাইল্যান্ডের দক্ষিণাঞ্চলীয় মুসলমান অধ্যুষিত চারটি প্রদেশের স্বাধীনতা। ১৯৭০ এবং ১৯৮০’র দশকগুলোতে থাইল্যান্ডে ইসলামী জাগরণমূলক আন্দোলনের ব্যাপক বিস্তৃতি ঘটে। গেল দুই দশকেও মধ্যপ্রাচ্যসহ মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে ইসলামী জাগরণমূলক আন্দোলনের সক্রিয় তৎপরতা চালিয়ে গিয়েছিল একটু ভিন্ন আঙ্গিকে। তারা ‘দাওয়া’ আন্দোলনের ছকে এবং আঙ্গিকে মূলত ইসলামী কার্যক্রমই পরিচালনা করে গেছেন। এই আন্দোলন ইসলামী মূল্যবোধগুলোকে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা চালিয়ে গিয়েছিল এবং তারা বিভিন্ন ইসলামী দেশকে সাহায্য সহযোগিতাও করে গিয়েছিল।

 

ব্রুনাইতেও খ্রিষ্টিয় চৌদ্দ শতকে কিংবা পণেরো শতকের শুরুর দিকে জনগণ ইসলামে দীক্ষা লাভ করেছিল। ১৪০৫ খ্রিষ্টাব্দে রাজতান্ত্রিক ব্রুনাই ইসলামে প্রবেশ করার পর তৎকালীন বাদশা নিজের নাম ‘মুহাম্মাদ’ রেখেছিলেন। এই নাম নিয়েই তিনি তাঁর শাসনকার্য বা হুকুমাত শুরু করেছিলেন। এই দেশে ইসলাম বিস্তারের পর ব্রুনাইয়ের সম্মান এবং মর্যাদা এতো বেড়ে গিয়েছিল যে বলা হয়ে থাকে ইতিহাসের স্বর্ণযুগ শুরু হয়ে গিয়েছিল। ইসলাম আসার পর ব্রুনাইতে জনগণের ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। বোরনিও দ্বীপ, মালয়েশিয়ার পূর্ব দ্বীপ, বর্তমান ফিলিপাইনের মূল ভূখণ্ড এবং সিঙ্গাপুর এই কটি ভূখন্ড নিয়ে একটি সাম্রাজ্য গড়ে উঠেছিল। ঐ সাম্রাজ্য ব্রুনাই সাম্রাজ্য নামে পরিচিতি লাভ করে। কিন্তু ব্রুনাই সাম্রাজ্যের শক্তিও উপনিবেশবাদী হল্যান্ড এবং উপনিবেশবাদী বৃটেনের শক্তির মতোই ধীরে ধীরে হ্রাস পেতে পেতে ক্ষয়ের অতলে হারিয়ে গিয়েছিল।

 

ক্রীড়ণক সরকারগুলো যখন শাসনকার্য চালাচ্ছিল তখন তারা এমন সব আইন কানুন অনুসরণ করছিল যে বিভিন্ন ক্ষেত্রেই সেগুলোর সাথে ইসলামী বিধি বিধানের কোনো সম্পর্ক বা সামঞ্জস্যই খুজে পাওয়া যেত না। ব্রুনাই ইসলামের ইতিহাসে বৃটেনের উপস্থিতির অন্যতম একটি উদাহরণ ও নিদর্শন হলো ধর্মীয় শিক্ষা কার্যক্রমের প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনা। সেইসাথে ধর্ম বিষয়ক কার্যক্রম পরিচালনার জন্যে নির্দিষ্ট প্রশাসনেও পরিবর্তন আনা আরেকটি নিদর্শন। এতো কিছুর পরও ব্রুনাইয়ের ধর্ম বিষয়ক প্রশাসনিক দফতরগুলোতে ঔপনিবেশিক শক্তিগুলোর প্রভাব খুবই কম পড়েছিল কিংবা বলা যায় এই প্রশাসনিক বিভাগগুলো ঔপনিবেশিক শক্তির নির্দেশনা মেনে নিতে রাজি হয় নি। সে কারণে ইসলামের স্বাভাবিক উজ্জীবনী ও প্রাণসঞ্চারী বিধি বিধানগুলো একেবারে পরিপূর্ণ সতেজতা নিয়েই মুসলমানদের মাঝে বিরাজমান ছিল।

 

ব্রুনাইয়ের ওপর জাপানী হামলার পরও দেশটিতে আরেকটি পরিবর্তন আসে। ইতোমধ্যে অসংখ্য সংগ্রামী দল ও গোষ্ঠি গঠিত হয়। সেইসব দল ও গোষ্ঠি অনেক প্রতিবাদ সংগ্রামও করে। এইসব বিক্ষোভ সংগ্রামের লক্ষ্য ছিলো ব্রুনাইয়ের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব অর্জন করা। অবশেষে ১৯৮৪ সালে ব্রুনাই স্বাধীনতা লাভ করে এবং তার ছয় বছর পর হুকুমাতের আনুষ্ঠানিক নাম হয় ‘ইসলামী রাজতান্ত্রিক মালয়েশিয়া’। এই ঘটনার পর ইসলামী আচার অনুষ্ঠানের বিস্তার চোখে পড়ার ব্যাপ্তি লাভ করে। সামগ্রিকভাবে বলা যায়, ব্রুনাইতে সবসময়ই ইসলাম ছিল হুকুমাত এবং জনগণের কাছে আকর্ষণীয় এবং সহজগ্রাহ্য।#

মন্তব্য লিখুন


Security code
রিফ্রেস দিন