এই ওয়েবসাইটে আর আপডেট হবে না। আমাদের নতুন সাইট Parstoday Bangla
সোমবার, 19 ডিসেম্বর 2011 10:42

ইউনেস্কোর ঐতিহ্যের তালিকায় ইরানের আরো দু’টি নিদর্শন

সম্প্রতি ইন্দোনেশিয়ার বালি দ্বীপে অনুষ্ঠিত হয়েছে ইউনেস্কোর "ইন্টেঞ্জিবল কালচারাল হেরিটেজ" সংরক্ষণ কমিটির ষষ্ঠ বৈঠক। সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রক্ষা বিষয়ক কমিটির এই বৈঠকে ইরানসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অন্তত আশিটি প্রস্তাব নিয়ে পর্যালোচনা করা হয়েছে। ইরানের পক্ষ থেকে পাঁচটি প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে এই বৈঠকে। এর মধ্য থেকে দু'টি প্রস্তাব বিশ্ব আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যের তালিকাভুক্ত হয়েছে।

ইরান যে পাঁচটি প্রস্তাব দিয়েছিল ইন্দোনেশিয়া বৈঠকে, সেগুলো হলোঃ ইরানের বিভিন্ন কওমের ঐতিহ্যবাহী আধ্যাত্মিক মিউজিক, পারস্য উপসাগরের ট্র্যাডিশনাল লঞ্চ নির্মাণ এবং এগুলোর সাহায্যে নৌযাত্রা বিষয়ক জ্ঞান, নাক্কলি অর্থাৎ গল্প বলার প্রাচীন ইরানী ঐতিহ্য, মখমল ও জরি বোণা এবং হযরত আলি আকবার (আ) এর জন্ম সংক্রান্ত ধর্মীয় রীতিনীতি বিষয়ক প্রস্তাব। এই পাঁচটি প্রস্তাবের মধ্যে যে দু'টি প্রস্তাব বিশ্ব আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যের তালিকাভুক্ত হয়েছে গৃহীত হয়েছে সেগুলো হলো নাক্কলি শিল্প এবং পারস্য উপসাগরের ট্র্যাডিশনাল লঞ্চ নির্মাণ এবং এগুলোর সাহায্যে নৌযাত্রা বিষয়ক জ্ঞান। এর আগেও ইরানের ঐতিহ্যবাহী নওরোয সংস্কৃতি, তাজিয়া সংস্কৃতি, ঐতিহাসিক মল্লক্রীড়া সংস্কৃতি, খোরাসানের উত্তরাঞ্চলীয় মিউজিক এবং কাশানের ঐতিহ্যবাহী গালিচা বুণন শিল্পকে ইউনেস্কোর "ইন্টেঞ্জিবল কালচারাল হেরিটেজ" এর তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।

পারস্য উপসাগরে নৌযাত্রা এবং নাক্কলি শিল্প-এই দু'টি প্রস্তাব সামগ্রিক হবার কারণে ইউনেস্কোর বিশ্ব আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যের তালিকাভুক্ত করার পক্ষে বিচারকগণ রায় দিয়েছেন। এই দু'টি ঐতিহ্যবাহী নিদর্শন বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকাভুক্ত হবার মধ্য দিয়ে "ওয়ার্ল্ড ইন্টেঞ্জিবল হেরিটেজ" এর তালিকায় ইরানের নিদর্শন অন্তর্ভুক্তির সংখ্যা ৯-এ দাঁড়ালো। বিশেষজ্ঞদের অভিমত হচ্ছে ইরানের ঐতিহ্যবাহী নিদর্শনগুলো বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকাভুক্ত হবার মধ্য দিয়ে দেশের সাংস্কৃতিক মূল্যবান সম্পদ সংরক্ষণের ওপর যেমন প্রভাব পড়বে, তেমনি ইসলামী ইরানের সাংস্কৃতিক ও ঐতিহ্যবাহী মূল্যবান সম্পদগুলোর সাথেও বিশ্ববাসী পরিচিত হবার সুযোগ পাবে। পারস্য উপসাগরীয় উপকূল বিশেষ করে সিরাফ, লিয়ান এবং কাহুরের মতো ইরানের ঐতিহাসিক বন্দরগুলো থেকে প্রাপ্ত তথ্যপঞ্জী অনুযায়ী ইরানীরা অন্তত পাঁচ হাজার বছর আগে থেকে অর্থাৎ সেই এইলামিয়ান যুগ থেকে পারস্য উপসাগরীয় জলপথে ব্যাপক কর্মতৎপর ছিল।

এ বিষয়ে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য তথ্যগুলো ইসলাম পরবর্তী যুগের সাথে সম্পর্কিত। পুরাতাত্ত্বিক গবেষকদের গবেষণা ও খনন কাজের ফলাফল অনুযায়ী পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে ইরানের সর্ববৃহৎ বন্দর ছিল সিরাফ। ইসলামী যুগে এই বন্দরে চীন, ভারতসহ আরো বহু দেশের নামকরা বণিকেরা তাদের ব্যবসায়িক লেনদেন অর্থাৎ বাণিজ্যিক তৎপরতা চালাতো। বিশ্ব পর্যটকেরা যেসব ভ্রমণ কাহিনী লিখেছেন, সেসব ভ্রমণ কাহিনীতে এই বন্দর এলাকায় যেসব কার্যক্রম চলতো বলে উল্লেখ করেছেন সেসবের মধ্য থেকে দু'টি কার্যক্রমের ঐতিহ্য এখনো বজায় রয়েছে। একটি হলো লঞ্চ তৈরির কাজ এবং অপরটি সমুদ্রযাত্রা। লঞ্চ তৈরি এবং সমুদ্রযাত্রার ঐতিহ্য কেবল সিরাফেই নয় বরং বুশেহর, হরমুযগানের মতো পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের ইরানী শহরগুলোতেও বর্তমানেও প্রচলিত আছে। সেইসাথে চালু রয়েছে ব্যবসায়িক কাজকর্মও।

লঞ্চ তৈরির পেশাকে স্থানীয় পরিভাষায় বলা হয় "গালাফি", আর গালাফি পেশাজীবি অর্থাৎ লঞ্চ তৈরি করেন যাঁরা তাদেঁরকে বলা হয় গালাফান। পারিবারিক উত্তর প্রজন্মক্রমে অর্থাৎ বাবার কাছ থেকে ছেলে লঞ্চ তৈরির কাজ শিখে নিয়ে এই পেশাটিকে আজ পর্যন্ত তারা চালু রেখেছে। লঞ্চ তৈরির পেশাটি বুশেহরের হস্তশিল্পের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহ্য হিসেবে পরিগণিত। বাংলাভাষী শ্রোতাদের প্রায় সবাই মোটামুটি লঞ্চ কী তা নিশ্চয়ই জানেন। তারপরও বলছি, লঞ্চ নৌকার চেয়ে আকারে বড়ো একটি পরিবহণ যা পানির ওপরে চলে। সাধারণত দুধরনের লঞ্চ হয়। একটি যাত্রী বহনের জন্যে অপরটি মালামাল পরিবহনের জন্যে। মালামাল পরিবহণের লঞ্চগুলোর উপরের দিকটা প্রায় অর্ধেকই খোলা,কিন্তু যাত্রীবাহী লঞ্চের কেবল সামনের দিকেই সামান্য একটু খোলা থাকে। লঞ্চ তৈরির মূল উপাদান হচ্ছে কাঠ। কাঠ ব্যবহারের যুক্তি হলো এটা আর্দ্রতা বা ঠাণ্ডা প্রতিরোধী।

পারস্য উপসাগরীয় এলাকায় নির্মিত লঞ্চগুলোর আয়ু প্রায় একশ' বছরের মতো। বুশেহরে এখনো কাঠের তৈরি এমন বহু লঞ্চ দেখতে পাওয়া যাবে যেগুলো নব্বুই বছর আগে থেকে এখন পর্যন্ত যাত্রী পরিবহন কিংবা মালামাল পরিবহণ করে যাচ্ছে, তবু কোনোরকম ক্ষতি হয় নি। অথচ ফাইবার গ্লাস দিয়ে তৈরি লঞ্চগুলো সবোর্চ্চ বছর বিশেক চালানো যেতে পারে এর বেশি নয়। লঞ্চের সারেং কিংবা মালিকদের ভাষ্য অনুযায়ী ফাইবার গ্লাস দিয়ে তৈরি লঞ্চগুলোর সাহায্যে ভিনদেশে খাদ্যপণ্য পরিবহণ করা হলে সেসব খাদ্যপণ্যের বড়ো একটা অংশই পচেঁ নষ্ট হয়ে যায়। কিন্তু কাঠের তৈরি লঞ্চের সাহায্যে খাদ্যপণ্য পরিবহণ করা হলে কোনোরকম সমস্যা হয় না।

'নেইমেহ খনি' নামের এক ধরনের মিউজিক আছে যা ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় উপকূলীয় প্রদেশগুলোতে প্রচলিত আছে। হরমুযগানের লোকজন সমুদ্রে কাজেকর্মে গেলে, মাছ ধরার সময়, লঞ্চ তৈরির কাজ করার সময় এই নেইমেহ সঙ্গীত গায়। নেইমেহ সঙ্গীতের কথা এবং বিষয় হলো স্থানীয় কোনো প্রসঙ্গ, আবহাওয়া কিংবা নিষ্পাপ ইমামদের গুণবৈশিষ্ট্য বর্ণনা। নেইমেহ গাওয়ার লক্ষ্য হলো মাছ শিকারী বা জেলেদের মনোবলকে চাঙ্গা রাখা কেননা তারা সংসারের ভরণ পোষণ মেটাবার জন্যে উত্তাল সমুদ্রে প্রাণবাজি রেখে পাড়ি জমায়। যেভাবে তারা বিশাল ঢেউয়ের সাথে পাঞ্জা লড়ে, কেজানে প্রকৃতির করালগ্রাস থেকে আর ফিরে আসবে কি আসবে না। লঞ্চের নাবিক দলের সদস্য এবং ক্রুরা কিংবা মাছ শিকারীরা যখন তাদের নৌকা বা লঞ্চগুলো নিয়ে পানিতে যাত্রা করে এবং দাঁড় টানতে শুরু করে তখন ঐ নেইমেহ'র আওয়াজ বেড়ে যায়। নাবিকের দল উচ্চস্বরে এবং একযোগে নেইমেহ গাওয়ার কারণে সমুদ্রের অনেক দূর থেকে এবং উপকূলের বিশাল এলাকা জুড়ে তার ধ্বনি শোনা যায়।

ফায়েয এবং মাফতুনসহ ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় অন্যান্য কবিগণ এই নেইমেহ রচনা ও গাওয়ার মধ্য দিয়ে নবীরাসুলসহ আহলে বাইতের বর্ণনা দেন।সমুদ্রের জলে যারা বিচিত্র পেশায় জড়িত তাঁরা এই নেইমেহ গাওয়ার মধ্য দিয়ে বুযুর্গানে দ্বীনে ইসলামের পবিত্র আত্মার প্রতি তাওয়াসসুল করার মাধ্যমে নিজেদের শক্তি ও মনোবল কয়েক গুণ বাড়িয়ে নেয়।
যাই হোক ইরানের ঐতিহ্যবাহী নাক্কলিও বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকাভুক্ত হয়েছে। নাক্কলি হলো গল্প বলা। যেমন শাহনামা কিংবা বিসমিল্লা অথবা হামযা'র গল্প বলার মতো। এই গল্প বলা বিশ্ব থিয়েটারের ইতিহাসবিদদের দৃষ্টিতে নাটকের তিনটি মূল উপাদানের একটি। #  {jcomments on}

মন্তব্য লিখুন


Security code
রিফ্রেস দিন