এই ওয়েবসাইটে আর আপডেট হবে না। আমাদের নতুন সাইট Parstoday Bangla
রবিবার, 30 ডিসেম্বর 2012 18:50

সহিংসতার প্রচার ও প্রসারে মার্কিন গণমাধ্যম

“গবেষকগণ একটি বিষয়ে অভিমত ব্যক্ত করেছেন যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নির্ভরযোগ্য গণমাধ্যমগুলো প্রকৃত সত্যকে আড়াল করে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করে থাকে। এ ক্ষেত্রে নেতৃবৃন্দ বিশেষ করে ইহুদিবাদীরা চেষ্টা চালায় ব্যক্তির সহিংস আচরণের ওপর যে গণমাধ্যমগুলা প্রভাব ফেলে তা অস্বীকার করতে এবং তাকে গুরুত্বহীন বলে তুলে ধরতে।” গবেষকদের এই অভিমতের সত্যতা বিশ্লেষণ করাহয়েছে এই নিবন্ধে।  

 

একটি তিক্ত, দুঃখজনক এবং বিপর্যয়কর খবর সবার কানেই পৌঁছেছে যে, আমেরিকার ২০ বছরের এক যুবক দু’টি অস্ত্র হাতে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কানেকটিকাট অঙ্গরাজ্যের নিউটাউন শহরের একটি স্কুলে ঢুকে ছাত্র ছাত্রীদের ওপর এলোপাথাড়ি হামলা চালায়। ভয়াবহ এই ট্যাজিক ঘটনায় অন্তত ২০টি শিশু, ছয়জন বয়স্ক লোকসহ হামলাকারী নিজেও মারা যায়। বিভিন্ন বার্তা সংস্থার রিপোর্ট অনুযায়ী ১৪ ডিসেম্বর শুক্রবার সকালে এক যুবক কুমতলবে নিউটাউনের স্যান্ডিহুকের একটি স্কুলে ঢুকে পড়ে এবং পাঁচ থেকে দশ বছরের শিশুদের ওপর গুলিবর্ষণ করে। কেবল শিশুদের ওপরই নয় বয়স্কদের এমনকি স্কুলের শিক্ষকদের লক্ষ্য করেও গুলি ছোঁড়ে ঐ যুবক

 

গুলির শব্দ বন্ধ হয়ে যাবার পর যারা এই ভয়াবহ পরিস্থিতি থেকে প্রাণে বেঁচে গিয়েছিল, তারা স্বাভাবিকভাবেই পাশবিক এক দৃশ্যের মুখোমুখি হয়। ক্লাসরুমে, বারান্দায় এখানে সেখানে ছাত্রদের রক্তাক্ত লাশ পড়ে আছে, রক্তে ভেসে যাচ্ছে ফ্লোর- কী ভয়ংকর দৃশ্য। নিয়ম অনুযায়ী ঘটনার পরপরই এর মোটিভ জানার জন্যে এবং হত্যাকারীর পরিচয় খুঁজে বের করার জন্যে তদন্ত কাজ শুরু হয়ে যায়। তদন্তে জানা গেছে গুলিবর্ষণকারী যুবকটির নাম হচ্ছে অ্যাডাম লেঞ্জা এবং সে নিউজার্সি অঙ্গরাজ্যের বাসিন্দা। সে কখনোই আইনের মুখোমুখি হয়নি এমনকি তার সঙ্গীসাথী ক্লাসমেটরা পর্যন্ত বলেছে সে ছিল একেবারে চুপচাপ শান্তশিষ্ট প্রকৃতির। তারা কখনোই অ্যাডামের মাঝে উগ্রতা কিংবা সহিংস আচরণের লেশমাত্র দেখেনি।

 

যাই হোক এরপর শুরু হয়ে গেল এ নিয়ে গবেষণা। বিশেষ করে গণমাধ্যমে প্রচারিত সহিংসতা এবং সামাজিক আচরণের ক্ষেত্রে সহিংসতার ওপর তার প্রভাব ইত্যাদি ছিল বিশেষজ্ঞদের মাঝে একেবারে রগরগে আলোচনার বিষয়। বিশেষ করে যারা শিক্ষক বা বিভিন্ন ক্ষেত্রে শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের সাথে জড়িত তাঁদেরকে এ বিষয়টি বেশ ভাবিয়ে তোলে। অনেকেই যে মতটি দিয়েছেন এ ব্যাপারে তাহলো, গণমাধ্যমে বিদ্যমান সহিংসতার সাথে বাস্তবিক সহিংসতার যোগসূত্র রয়েছে। তাই গণশিক্ষার জন্যে এবং শিশু ও কিশোর দর্শক শ্রোতাদেরকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্যে কিছু কর্মসূচি প্রণয়ন করা জরুরি। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়- টেলিভিশনের একটি সহিংস অনুষ্ঠান অন্তত এক কোটি দর্শক দেখে। যদিও এদের মধ্য থেকে মাত্র এক শতাংশ দর্শক হয়তো উত্তেজিত হয়ে পড়ে কিন্তু এই সংখ্যা এক লাখ। অর্থাৎ এই এক লাখ দর্শকের ভেতর সহিংসতা জেগে ওঠে।

 

তার চেয়েও জঘন্য দিকটি হলো এই যে, গবেষকগণ এ বিষয়ে অভিমত ব্যক্ত করেছেন যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নির্ভরযোগ্য গণমাধ্যমগুলো প্রকৃত সত্যকে আড়াল করে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করে থাকে। এ ক্ষেত্রে নেতৃবৃন্দ বিশেষ করে ইহুদিবাদীরা চেষ্টা চালায় ব্যক্তির সহিংস আচরণের ওপর যে গণমাধ্যমগুলা প্রভাব ফেলে তা অস্বীকার করতে এবং তাকে গুরুত্বহীন বলে তুলে ধরতে।

 

ড্রামার গল্পে যে সহিংসতা তা প্রাচীন গ্রিক ড্রামা থেকে আজ পর্যন্তও অব্যাহত রয়েছে। সেই এলিজাবেথ থিয়েটার থেকে শুরু করে বর্তমান যুগের ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ার ড্রামাতেও সহিংসতা একইভাবে অব্যাহত রয়েছে। উদাহরণত বলা যায়, উইলয়ম শেক্সপিয়রের বিখ্যাত নাটক ম্যাকবেথের শেষ দৃশ্যে ম্যাকবেথের কর্তিত মস্তক মঞ্চে অর্থাৎ দৃশ্যপটে নিয়ে আসা হয়। ১৯০৩ সালে ‘রেল ডাকাতি’ নামে একটি ফিল্ম তৈরি করা হয়েছিল। এটি ছিল গল্প বা কাহিনী নির্ভর প্রথম চলচ্চিত্র। এই ফিল্মটির একটি দৃশ্যে এমনভাবে সাতটি গুলি ছোঁড়া হয়েছিল ক্যামেরার দিকে যে সিনেমা হলে এই ফিল্মের প্রথম দর্শকরা নাকি ঐ দৃশ্য দেখে চীৎকার করে ভয়ে হল ছেড়ে পালিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু পর্দাবিহীন গণমাধ্যমে বিশেষ করে মার্কিন গণমাধ্যমগুলোতে এ ধরনের সহিংসতার কারণে মানুষ কিন্তু ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে থেমে থাকে নি বরং দিনের পর দিন তাদের মাঝে সহিংসতা বেড়েই চলেছে।

 

 

মার্কিন গণমাধ্যমগুলোতে প্রচারিত আট হাজার ঘণ্টার স্যাটেলাইট টিভি প্রোগ্রাম পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, শতকরা ৬০ ভাগ টিভি প্রোগ্রামই সহিংস এবং উত্তেজনা সৃষ্টিকারী। আমেরিকায় প্রাইমারি স্কুলের একটি শিশু স্কুল সার্টিফিকেট নেবার আগেই অন্তত আট হাজার হত্যাকাণ্ড এবং লক্ষাধিক সহিংস ঘটনা, যৌন নির্যাতনের ঘটনাসহ হতাহতের বিভিন্ন ঘটনার সাথে পরিচয় লাভ করে। টিভি পর্দাতেই বেশিরভাগ তারা এসব দেখে থাকে। এই শিশুটি যদি স্যাটেলাইট কিংবা ভিডিও প্লেয়ারের সংস্পর্শে এসে থাকে তাহলে এর পরিমাণ আরো অনেক বেড়ে যাবে। সিনেমার বড়ো পর্দায় সহিংসতার এই চিত্র আরো বেশি ভয়াবহ। পি জি চলচ্চিত্র নির্মাণের হার কমে গেলেও জি বা জেনারেল পর্যায়ের চলচ্চিত্র নির্মাণের হার অনেক বেড়ে গেছে। পি জি শ্রেণীর চলচ্চিত্র শিশুদের উপযোগীই নয় আর জেনারেল পর্যায়ের চলচ্চিত্রে আগের তুলনায় সহিংসতার মাত্রা অনেক বেশি। বাচ্চাদের কম্পিউটার গেইমেও এই সহিংসতা ব্যাপকভাবে লক্ষ্য করা যায়। গবেষকদের গবেষণায় দেখা গেছে শতকরা পঁচাশি ভাগ কম্পিউটার গেইমই সহিংস। এমনকি পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুরা পর্যন্ত এ ধরনের সহিংস চিত্রের সম্মুখিন হয়ে থাকে।

 

 

গবেষকরা সেই ষাটের দশকের শুরু থেকেই গবেষণা করে আসছেন যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের গণমাধ্যমে যে সহিংসতা প্রচারিত হয় সেটা সামাজিক সহিংসতার ক্ষেত্রে কতোটা প্রভাব ফেলে? এ বিষয়ে গবেষণা করতে গিয়ে তাঁরা দেখেছেন ষাটের দশক থেকেই বিশেষ করে ১৯৬৫ সাল থেকে আমেরিকায় সহিংসতা বিস্ময়করভাবে বেড়ে গেছে। এ সময়টা হলো টিভি প্রোগ্রাম উপভোগকারী প্রথম প্রজন্মের সময়কাল যারা সহিংস অপরাধে জড়িত হয়ে পড়ার বয়সে উপনীত হয়েছে। ফলে টেলিভিশন যে সমাজে সহিংসতা বিস্তারে কতোটা প্রভাব ফেলে তা সহজেই অনুমান করা যায়। তার পরও টিভি অনুষ্ঠান বা সিনেমা নির্মাণ কোম্পানিগুলোর অধিকাংশই এই সত্যটি স্বীকার করেত চায় না। তারা বরং বলেঃ আজ যদি সকল টেলিভিশনের তার কেটে ফেলা হয় দু’বছর পর কি রাস্তাঘাটে সহিংসতা দেখা যাবে না? মার্কিন চলচ্চিত্র সংস্থার প্রধান জ্যাক ভলেন্টি এ কথা বললেও একটি প্রশ্নের জবাব দিতে তিনি নারাজ।

সেটা হলোঃ বাদাম বুট আর স্যুপ বিক্রির বিজ্ঞাপন দেখে যদি মানুষ প্রভাবিত হতে পারে তাহলে সহিংস দৃশ্য দেখে কেন প্রভাবিত হবে না? যাই হোক মনোবিজ্ঞানীগণও কিন্তু টিভিতে প্রচারিত সহিংসতার কুপ্রভাবের কথা স্বীকার করেছেন। ফলে আপনার সন্তানদের টিভি অনুষ্ঠান দেখার ব্যাপারে কিংবা কম্পিউটার গেইম খেলার ব্যাপারে সতর্ক হবেন এটা সময়ের দাবি। নৈলে তারা যে তাদের অজান্তেই নিজেদের ভবিষ্যত নষ্ট করে বসবে-সেই দুঃখজনক সত্য কি অস্বীকার করার সুযোগ আছে?  # 

 

রেডিও তেহরান/এনএম/এআর/৩০

মন্তব্য লিখুন


Security code
রিফ্রেস দিন