এই ওয়েবসাইটে আর আপডেট হবে না। আমাদের নতুন সাইট Parstoday Bangla
বৃহস্পতিবার, 04 জুলাই 2013 00:03

ইরানি টিভিগুলোর ওপর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা জনপ্রিয়তারই প্রমাণ

পশ্চিমা কোনো  কোনো স্যাটেলাইট কোম্পানি ইরানি চ্যানেলগুলোর সম্প্রচার বন্ধ করে দিয়েছে। ইরানি গণমাধ্যম বিরোধী ততপরতার অংশ হিসেবে এই ন্যক্কারজনক পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে।

গত পয়লা জুলাই হটবার্ড ১৩-বি, ইউটেলস্যাট ২৫-সি, ইউটেলস্যাট ২১, ইউটেলস্যাট ৮-ওয়েস্ট-এ, ইন্টেলস্যাট ২০, গ্যালাক্সি ১৯ এবং অপটিউস ডি-২ ইরানের ইংরেজি নিউজ চ্যানেল প্রেস টিভি’র সম্প্রচার বন্ধ করে দেয়।


এ ছাড়া, ইরানের স্প্যানিশ-ভাষার চ্যানেল হিসপান টিভির সম্প্রচার ইউটেলস্যাট ৮-ওয়েস্ট-এ, ইউটেলস্যাট ৭-ওয়েস্ট-এ এবং ইন্টেলস্যাট ২১ থেকে বন্ধ করে দেয়া হয়েছে।
ইরানের বিনোদন চ্যানেল 'আই ফিল্ম' ইংরেজি, ফার্সি ও আরবি ভাষায় চলচ্চিত্র প্রচার করে। নিষেধাজ্ঞার ছোবল থেকে রক্ষা পায়নি নির্মল বিনোদনের এ চ্যানেলটিও। এ ছাড়া, আল-কাওসার নামে ইরানের অন্য একটি চ্যানেলের সম্প্রচারও একইভাবে বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। 


এদিকে, ইরানি চ্যানেলগুলো বন্ধের সিদ্ধান্ত বাতিলের জন্য আমেরিকা এবং ইন্টেলস্যাটের কাছে গতকাল আহ্বান জানিয়েছে ইন্টারন্যাশনাল টেলিকম্যুনিকেশন স্যাটেলাইট সংস্থা (আইটিএসও)।


আইসিএসও’র মহাপরিচালক জোসে ম্যানুয়েল ডো রোসারিও ইরানের গণমাধ্যমের বিষয়ে আলোচনার জন্য ইন্টেলস্যাট ও আমেরিকার প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। 
ইন্টেলস্যাট গত ১৯ জুন তেহরানকে জানিয়ে দেয়, তারা ১ জুলাই থেকে প্রেস টিভিসহ ইরানের কোনো চ্যানেলের অনুষ্ঠান সম্প্রচার করতে পারবে না। আইআরআইবি'র প্রেসিডেন্টের ওপর পশ্চিমা দেশগুলো যে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে তার অজুহাত দেখিয়ে এ সিদ্ধান্ত নেয়ার কথা জানিয়েছে ওই স্যাটেলাইট প্রভাইডার। তবে ইরানের ইংরেজি ভাষার নিউজ চ্যানেল প্রেস টিভি জানতে পেরেছে, মার্কিন অর্থ বিভাগের বিদেশি সম্পদ নিয়ন্ত্রণ বিষয়ক দপ্তর (ওএফএসি) ইরানি চ্যানেল বন্ধ করে দেয়ার জন্য ইন্টেলস্যাটের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছে।


আইআরআইবি ইন্টেলস্যাটের কাছে পাঠানো এক প্রতিবাদ লিপিতে বলেছে, "৩০ জুন থেকে আইআরআইবি'র চ্যানেলগুলো বন্ধ করে দেয়ার যে সিদ্ধান্ত কোম্পানিটি নিয়েছে আমরা তার তীব্র প্রতিবাদ জানাচ্ছি।"


২০১২ সালের প্রথম দিক থেকে বিভিন্ন ইউরোপীয় সরকার ও স্যাটেলাইট কোম্পানির নজিরবিহীন হামলার মুখে পড়েছে প্রেস টিভিসহ অন্যান্য ইরানি চ্যানেল। ২০১২ সালের অক্টোবর মাসে প্রেস ও হিস্পান টিভিসহ ইরানের কয়েকটি স্যাটেলাইট টিভি চ্যানেল বন্ধ করেছিল ইউটেলসেট।  ব্রিটেন, জার্মানি,  ফ্রান্স এবং স্পেনসহ পশ্চিমা অনেক দেশে এরই মধ্যে এ সব চ্যানেল  বন্ধ করে দেয়া হয়েছে।

 

ইরানের আলআলম টেলিভিশনের সম্প্রচার ও এখন ইন্টেলস্যাটের নিষেধাজ্ঞার আওতাভুক্ত হয়েছে।

 

ইসলামী ইরানের সম্প্রচার সংস্থার প্রধান ডক্টর ইজ্জাতুল্লাহ জারগামি পশ্চিমা স্যাটেলাইটগুলোর মাধ্যমে ইরানি  চ্যানেলগুলোর সম্প্রচার বন্ধ করার ঘটনা সম্পর্কে এক প্রতিক্রিয়ায় বলেছেন, পশ্চিমা শক্তিগুলোর বৈষম্যমূলক ও বাক-স্বাধীনতা বিরোধী এইসব পদক্ষেপ থেকে বোঝা যায়, ইসলামী ইরানের চ্যানেলগুলো বিশ্বের জনগণের মধ্যে গভীর প্রভাব রাখছে। তিনি আরো বলেছেন,

 

 "এ নিয়ে পশ্চিমা স্যাটেলাইটগুলো ১৯ বার ইরানি চ্যানেলগুলোর সম্প্রচার বন্ধ করল। ইরানের এই চ্যানেলগুলোর গভীর প্রভাবই এতে ফুটে উঠেছে। ওরা কেবল চলচ্চিত্র ও নাটক প্রচারকারী ইরানি টিভি চ্যানেল আই-ফিল্মের সম্প্রচারকেও সহ্য করতে পারছে না।"

ইরানি চ্যানেলগুলো স্বাধীনভাবে সত্য ও বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ প্রচারের পাশাপাশি মুক্তিকামী জনগণের পক্ষ নিয়ে পশ্চিমা সরকারগুলোর মানবাধিকার বিরোধী নানা চরিত্র ও ঘটনা ফাঁস করছে বলেই এই সরকারগুলোর আক্রোশের শিকার হয়েছে বলে পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন। তবে আমেরিকা ও পাশ্চাত্যে সক্রিয় ইহুদিবাদী লবিগুলোই ইরানি চ্যানেলগুলোর বিরুদ্ধে অবৈধ ও বিদ্বেষী পদক্ষেপ নেয়ার পেছনে মূল হোতা হিসেবে কাজ করছে।

 

ইউটেলসেটের প্রধান একইসঙ্গে ইসরাইল ও ফ্রান্সের নাগরিক। তিনি কিছুদিন আগে কয়েকটি স্যাটেলাইট কোম্পানির কাছে চিঠি পাঠিয়ে তাদেরকে ইরানি চ্যানেলগুলোর সঙ্গে সহযোগিতা বন্ধ করার আহ্বান জানান।

 

এদিকে বিশ্বের বহু দেশের গণমাধ্যম-ব্যক্তিত্ব ও চিন্তাবিদ ইরানি চ্যানেলগুলোর সম্প্রচার বন্ধ করার পদক্ষেপকে বাক-স্বাধীনতার ওপর হামলা বলে প্রতিবাদ জানিয়েছেন।

 

দুঃখজনকভাবে ইরানের বিরুদ্ধে এইসব ন্যক্কারজনক পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে এমন সব সরকারের নির্দেশে যারা নিজেদের বাক-স্বাধীনতা, মুক্তচিন্তা, তথ্যের অবাধ-প্রবাহ ও  গণতন্ত্রের ধ্বজাধারী বলে দাবি করে থাকে। কিন্তু ইরানি চ্যানেলগুলোর ওপর তাদের নিষেধাজ্ঞা থেকে বোঝা যায়, পাশ্চাত্যের এইসব দাবি কতটা কপটতাপূর্ণ ও দ্বিমুখী আচরণের প্রমাণ। এইসব পদক্ষেপ জনগণকে তাদের পছন্দের সংবাদমাধ্যম বা গণমাধ্যম থেকে দূরে রাখার বলদর্পী ব্যবস্থার শামিল এবং তা মানবাধিকারের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন বলেও অনেক চিন্তাবিদ উল্লেখ করছেন।

 

ইরানি    চ্যানেলগুলোর ওপর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা জাতিসংঘের মানবাধিকার ঘোষণার ১৯ নম্বর ধারার স্পষ্ট লঙ্ঘন। এই ধারায় বলা হয়েছে:

"সব মানুষই চিন্তা ও বিশ্বাসের এবং সেগুলো প্রকাশ বা বর্ণনার স্বাধীনতা রাখে। নিজ নিজ চিন্তাধারা বা বিশ্বাস প্রকাশের ক্ষেত্রে কোনো দুশ্চিন্তা বা ভয় না করাও মানুষের অন্যতম অধিকার। এ ছাড়াও জনগণ তথ্য ও চিন্তাধারা সংগ্রহের ক্ষেত্রে এবং সেগুলো প্রচারের ক্ষেত্রে সব ধরনের মাধ্যম ব্যবহারের অধিকার রাখে। আর এইসব বিষয়ে তারা মুক্ত এবং কোনো সীমা রেখার গণ্ডীতে আবদ্ধ নন। "

ইরানি চ্যানেলগুলোর ওপর বার বার পশ্চিমাদের নিষেধাজ্ঞা আরোপ এটা প্রমাণ করল যে তারা বিরোধীদের কণ্ঠ ও বিকল্প কণ্ঠকে সহ্য করে না। ইউটেলসেট কিছুদিন আগে ল্যাটিন আমেরিকা অঞ্চলে প্রেসটিভি ও স্প্যানিশ ভাষার ইরানি টিভি চ্যানেল  হিস্পান টিভিসহ অন্যান্য ইরানি    চ্যানেলগুলোর সম্প্রচার বন্ধ করতে হিস্পাস্যাটকে নির্দেশ দিয়েছিল।

 

সাম্প্রতিক মাস গুলোতে ইউটেলস্যাট ও ইরানি চ্যানেলগুলো বন্ধ করতে ইউরোপ ও এশিয়ার স্যাটেলাইট চ্যানেল প্রোভাইডারগুলোর ওপর চাপ জোরদার করে। অথচ অত্যাধুনিক যোগাযোগ প্রযুক্তির ব্যাপক বিস্তারের এই যুগে এবং স্যাটেলাইট কোম্পানিসহ এসংক্রান্ত নেটওয়ার্ক প্রযুক্তির ছড়াছড়ির এই সময়ে ইরানি চ্যানেলগুলোর সম্প্রচার বন্ধ রাখা সম্ভব নয়।

 

তেহরান এরই মধ্যে তার চ্যানেলগুলোর অনুষ্ঠান সম্প্রচারের জন্য কয়েকটি নতুন স্যাটেলাইট কোম্পানি ও ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডারকে ব্যবহার করতে সক্ষম হয়েছে।

 

 

আসলে পশ্চিমা সরকারগুলো এটা দেখছে যে বিশ্বব্যাপী ইরানের সংবাদ ও বিনোদন চ্যানেলগুলোর জনপ্রিয়তা দিনকে দিন বাড়ছে। ফলে সাম্রাজ্যবাদী নানা চক্রান্ত ও নীতি-অবস্থান সম্পর্কে বিশ্বের জনগণ সচেতন হয়ে উঠছে। বিশেষ করে ইরানের ইংরেজি-ভাষী টিভি চ্যানেল প্রেসটিভি ও আরবী ভাষী টিভি চ্যানেল আল-আলমের অনুষ্ঠানমালা বিশ্বব্যাপী ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে।ইরানের এই চ্যানেলগুলো তথ্য ও সংবাদের ক্ষেত্রে পাশ্চাত্যের একক আধিপত্যকে ভেঙ্গে দিতে সক্ষম হয়েছে। এছাড়াও ইরানের এইসব মাধ্যম দেশটির ইসলামী নীতিমালা এবং জুলুম-শোষণ বা আগ্রাসন ও অবিচার-বিরোধী অবস্থানগুলো তুলে ধরার মাধ্যমে পশ্চিমা শক্তিগুলোর কর্তৃত্বকে চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন করেছে।আর এ জন্যই পশ্চিমা সরকারগুলো ইরানি চ্যানেলগুলোর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের মাধ্যমে সত্যের টুঁটি চেপে ধরার চেষ্টা করছে।

 

কিন্তু পশ্চিমা শক্তিগুলোর এটা জেনে রাখা উচিত যে, বর্তমানে তথ্যের বিস্ফোরণের যুগে সত্যের সম্প্রচারকে ধামাচাপা দেয়া সম্ভব নয়। যেমনটি পবিত্র কুরআন বলেছে: সত্যের বিজয় সমাগত বা অবশ্যম্ভাবী এবং মিথ্যা নির্মূল হওয়া বা মিথ্যার পরাজয় অনিবার্য। কারণ, মিথ্যাতো নির্মূল হওয়ার জন্যই রচিত হয়।

 

ইরান পশ্চিমা সরকারগুলোর এইসব অবৈধ পদক্ষেপের বিরুদ্ধে আইনি লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে এবং আন্তর্জাতিক মহলেও বিশ্ব-জনমতের কাছে পশ্চিমাদের এইসব দায়িত্বজ্ঞানহীন পদক্ষেপের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জোরদার করছে। #

 

রেডিও তেহরান/এএইচ/৩

 

 

 

মন্তব্য লিখুন


Security code
রিফ্রেস দিন