এই ওয়েবসাইটে আর আপডেট হবে না। আমাদের নতুন সাইট Parstoday Bangla
সোমবার, 10 নভেম্বর 2014 14:28

'বিশ্ব যদি আরো একবার আরো এক আলীকে(আ.) জন্ম দিত!'

'বিশ্ব যদি আরো একবার আরো এক আলীকে(আ.) জন্ম দিত!'

লেবাননের প্রখ্যাত লেখক, কবি, চিন্তাবিদ, শিক্ষাবিদ ও গবেষক জর্জ জোরদাক গত ৫ই নভেম্বর পাড়ি জমিয়েছেন পরকালে। তার বয়স হয়েছিল ৮৮ বছর। খ্রিস্টান হয়েও জোরদাক ছিলেন আমিরুল মু'মিনিন হযরত আলী (আ.)'র অতুলনীয় ও গৌরবময় নানা নীতি আর চরিত্রের গভীর অনুরাগী। এই মহান ব্যক্তির বিদেহী আত্মার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তার সংক্ষিপ্ত পরিচিতি তুল ধরবো আমাদের আজকের এই বিশেষ আয়োজনে।

 

জোরদাক জীবনের একটা বড় অংশই ব্যয় করেছেন হযরত আলী (আ.)'র চিন্তাধারা ও জীবন নিয়ে গবেষণা আর লেখালেখিতে। 'আলী: মানবীয় ন্যায়বিচারের কণ্ঠস্বর বা আহ্বান' শীর্ষক ৫ খণ্ডের বই তার ওই ব্যাপক গবেষণারই ফল। এই ৫ খণ্ডের শিরোনামগুলো হলো যথাক্রমে 'আলী ও মানবাধিকার', 'আলী ও ফরাসি বিপ্লব', 'আলী ও সক্রেটিস', 'আলী ও তাঁর জীবন যাপনের যুগ' এবং 'আলী ও আরব জাতীয়তাবাদ'। এ বইগুলো ছাড়াও ছোটোগল্প, ইতিহাস ও নাটকসহ নানা বিষয়ে জোরদাকের লেখা ত্রিশটিরও বেশি বই প্রকাশিত হয়েছে। তিনি দু'টি কাব্য বা কবিতার বইও উপহার দিয়ে গেছেন আরবী সাহিত্য জগতকে। 

 

জর্জ জোরদাক শৈশবে স্কুল কামাতেন। অবশ্য স্কুল-কামানো মেধাবী এই ছেলে তার ভাই ফুয়াদের তত্ত্বাবধানে প্রতিদিনই মুখস্থ করতেন আমিরুল মু'মিনিন হযরত আলী (আ.)'র ভাষণ, চিঠিপত্র ও উপদেশ-বাণীর অমর সংকলন 'নাহজুল বালাঘা'র কিছু অংশ। একদিন স্কুলের হেডমাস্টার জর্জের অনুপস্থিতির বিষয়ে নালিশ করলেন ফুয়াদের কাছে। ফুয়াদ জানতো তার ভাইয়ের অনুপস্থিতির আসল কারণ। ফুয়াদ নিজেও স্কুলে নিয়ে এসেছিলেন আরবী সাহিত্যে বাগ্মিতা ও অলংকারিক ভাষার অমর সম্পদ তথা  'নাহজুল বালাঘা'র একটি কপি। হেডমাস্টারকে ওই কপিটি দিয়ে ফুয়াদ বলেন:

 'আপনিও এ বইটি পড়ুন ও তা মুখস্থ করুন এবং এ থেকে দূরে থাকবেন না। জর্জ ঘরে যা শিখছে তা স্কুলের পাঠ্য বিষয়গুলোর চেয়ে অনেক বেশি মূল্যবান।'

 

জোরদাকের জন্ম হয়েছিল ১৯২৬ সালে দক্ষিণ লেবাননের মারজিউন অঞ্চলে। শিল্প-সাহিত্য ও সংস্কৃতি বিষয়ে তার বাবা মায়েরও ছিল ব্যাপক আগ্রহ। তারাও অত্যন্ত শ্রদ্ধা করতেন হযরত আলী (আ.)-কে। সুযোগ পেলেই স্কুল কামাই করে সাহিত্যের বই পড়তেন জর্জ জোরদাক। এ জন্য বেছে নিতেন দর্শনীয় বা মনোহর প্রাকৃতিক কোনো স্থান। একবার ধরা পড়ে যান ভাই ফুয়াদের কাছে। ফুয়াদ অবশ্য তাকে উৎসাহ দেন ও তার জন্য নিয়ে আসেন অলঙ্কার শাস্ত্রের অহংকার 'নাহজুল বালাঘা'। বইটি জর্জকে দিয়ে ফুয়াদ বলেন: 'বইটাকে বিশেষভাবে পড়বে ও যতোটা সম্ভব মুখস্থ করবে। কারণ, যে এই বইটি পড়বে ও এর লাইনগুলো মুখস্থ করবে সে সব কল্যাণই পাবে।' ১৩ বছরে পা দেয়ার আগেই জর্জ জোরদার নাহজুল বালাঘার বেশ কিছু অংশ মুখস্থ করেন। এভাবে আলী (আ.)'র ব্যক্তিত্বের সঙ্গে তার প্রাথমিক পরিচয়ের সূত্রপাত ঘটে। এ ছাড়াও জর্জ তার ভাই ফুয়াদের কণ্ঠে গাওয়া আলী (আ.)'র প্রশংসাসূচক নানা কাসিদা বা গান শুনতেন। এইসব গানে আলী (আ.)'র স্বর্ণোজ্জ্বল জীবনাচার, মেধা, মহত্ত্ব ও উচ্চতর সম্মানের প্রশংসার কথা থাকতো। 

 

জর্জ জোরদাক প্রায় ১৪ বছর বয়সে সাহার বা ভোর রাত নামের একটি গীতি-নাট্য রচনা করেছিলেন। দক্ষিণ লেবাননের কয়েকটি গ্রামে এই নাটক প্রদর্শন করা হয়। এ সময় তার এক আত্মীয় তাকে গণিত ও বিজ্ঞান বিষয়ে পড়াশুনার জন্য ইউরোপে পাঠাতে চাইলেও নিজ জন্মভূমির প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অশেষ টানে এবং সাহিত্য ও কবিতার প্রতি গভীর ঝোঁকের কারণে জর্জ ওই প্রস্তাব নাকচ করে দেন। এ অবস্থায় জর্জ বৈরুতে এসে গির্জার কলেজে ভর্তি হয়ে আরবী সাহিত্য বিষয়ে পড়াশুনা শুরু করেন। হাইস্কুলে পড়ার সময় ১৭ বছর বয়সে জোরদার সঙ্গীত ও দর্শন বিষয়ে দু'টি বই লিখেছিলেন। বই দুটি আরব লেখকদের অভিভূত করে। ডক্টর তাহা ইয়াসিনের মত প্রখ্যাত লেখক এ দু'টি বইকে মিশরে বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করেন। 

 

 খ্রিস্টান কলেজে পড়াশুনা শেষ করার পর জর্জ জোরদাক লেবাননি ও আরব পত্র-পত্রিকায় লেখালেখি শুরু করেন এবং এর পাশাপাশি বৈরুতের কয়েকটি স্কুলে আরবী সাহিত্য ও দর্শনের ক্লাস নিতেন। এইসব স্কুলে আমীরুল মু'মিনিন হযরত আলী (আ.)'র চিন্তাধারা ও তাঁর সাহিত্য-কর্ম সম্পর্কেও পড়ানো হত। এ সময় জর্জ হযরত আলী (আ.) সম্পর্কে আরো গভীরভাবে জানার জন্য নানা বই-পুস্তক পড়তে থাকেন। এইসব বইয়ের বেশিরভাগই ছিল খিলাফতে হযরত আলী (আ.)'র ন্যায্য অধিকার সম্পর্কিত। কিন্তু জর্জ জগত-জীবন ও মানব সমাজ সম্পর্কে হযরত আলী (আ.)'র দৃষ্টিভঙ্গি জানতে চাচ্ছিলেন। ফলে তিনি আবারও ইমামের  বাণীর অমর সংকলন 'নাহজুল বালাঘা'র কাছে ফিরে যান ও গভীর মনোযোগ দিয়ে তা পড়তে থাকেন। এবার তার কাছে স্পষ্ট হয় যে, হযরত আলী (আ.) সম্পর্কে অতীতের ও সমসাময়িক যুগের  লেখকরা যা লিখেছেন তাঁর ব্যক্তিত্ব বাস্তবে আরো অনেক বড় বা উঁচু। এই মহান ইমামের মানবতা বাস্তবতাকে গভীরভাবে উপলব্ধি ও সমস্ত মহৎ বা পবিত্র গুণ থেকেই উৎসারিত হয়েছে বলেও জর্জ মনে করেন। তার মতে আলী (আ.) মানুষকে জীবনে যেসব বিষয় মেনে চলতে বলেছেন তা সময় ও স্থানের গণ্ডী পেরিয়ে বিশ্বজনীন আহ্বানের রূপ নিয়েছে। 

 

 এরই প্রেক্ষাপটে লেবাননের এই খ্রিস্টান পণ্ডিত ২৮ বছর বয়সে আলী (আ.) সম্পর্কে লিখেছেন 'ইমাম আলী, মানবীয় ন্যায়বিচারের কণ্ঠস্বর বা আহ্বান' শীর্ষক অসাধারণ বইটি। বইটি প্রকাশ করা হয় ১৯৫৮ সালে। ৫ খণ্ডের এই বিশাল বই একটি বড় ধরনের ঘটনা হিসেবে মুসলিম বিশ্বের শিয়া ও সুন্নি নেতৃবৃন্দের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। অধ্যাপক তৌফিক ইব্রাহিমের মতে, 'এ বই লেবাননসহ আরব বিশ্বের জন্য সবচেয়ে বড় শৈল্পিক উপহার ও বৃহত্তম সেবা'। এ বইটি লেখার উদ্দেশ্য সম্পর্কে জর্জ জোরদাককে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন: 

 

'শৈশবে স্কুল থেকে বের হয়ে গাছের নীচে বসে কুরআনের সুরাগুলো ও ইমাম আলী (আ.)'র নানা ভাষণ আর উপদেশ মুখস্থ করতাম। তাই আমি নাহজুল বালাঘা সম্পর্কে কিছু লিখবো না- এটা কেমন করে হতে পারে? অথচ এ মহাগ্রন্থের প্রাণ-সত্তা জুড়ে রয়েছে দর্শন ও আরবী সাহিত্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ  যা শেখা  উচ্চতর ক্লাসের সব ছাত্রের জন্যই জরুরি। সেই স্কুল-জীবনের শুরু থেকেই এ ছিল এক পরিচিত ও প্রিয় বিষয় এবং আমি বুঝতে পেরেছি যে বড় বড় লেখকরা ইমাম আলী (আ.) সম্পর্কে অনেক লেখা সত্ত্বেও তাঁর জীবন সম্পর্কে বড় ধরনের গবেষণা চালাননি। লেখকরা কেবল ইমামত ও খেলাফতে তাঁর ন্যায্য অধিকারের দলিল প্রমাণ নিয়েই লিখেছেন। তাই নাহজুল বালাঘা নিয়ে চিন্তা-ভাবনার ইচ্ছা জাগে আমার মধ্যে এবং অন্যরা যে বিষয়ে উদাসীন থেকেছেন সে বিষয়গুলো তুলে ধরার সিদ্ধান্ত নেই।' জর্জ জোরদাক 'ইমাম আলী, মানবীয় ন্যায়বিচারের কণ্ঠস্বর বা আহ্বান' শীর্ষক অসাধারণ বইটি প্রকাশের পর তার একটি কপি উপহার দিয়েছিলেন তৎকালীন শিয়া মুসলমানদের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় নেতা গ্র্যান্ড আয়াতুল্লাহ বোরুজেরদি (র.)'র কাছে। ওই উপহারের সঙ্গে পাঠানো এক চিঠিতে জর্জ লিখেছিলেন:

 

"আমি ইমাম আলীর জীবনের নানা অবস্থা, তাঁর পথ বা আদর্শ ও ইতিহাস নিয়ে গবেষণা করেছি। এসবের মধ্যে আমি পেয়েছি এমন সব নীতি, আদর্শ ও উচ্চতর মূল্যবোধ, মানব সমাজ বর্তমান যুগে, বিশেষ করে পাশ্চাত্য কেবল এখন এইসব বিষয়ে উপনীত হওয়ার দাবি করছে। এইসব নীতি ও আদর্শ মৌলিক ও বিশ্বজনীন। এইসব নীতির সবই ইমামের বক্তব্য ও আচরণে সর্বোচ্চ মাত্রায় বিরাজ করেছে। পশ্চিমা প্রাচ্যবিদরা ও ইসলাম বিশেষজ্ঞরা ইমামের জীবনে এইসব নীতি ও আদর্শের উপস্থিতি কমবেশি উপলব্ধি করলেও এ গৌরব যে প্রাচ্যের তা স্বীকার করতে চাননি। পশ্চিমাদের অনেক আগেই শত শত বছর পূর্বে এমন একজন ব্যক্তি ছিলেন যিনি সব মূলনীতি ও বাস্তবতা উপলব্ধি করেছিলেন ও সেগুলোর ব্যাখ্যাও দিয়েছিলেন। অথচ প্রাচ্যবিদরা এই বাস্তবতাকে গোপন রেখেছেন। আবার প্রাচ্যেও বিদ্বান ও আলেমরা হযরত আলীর জীবন ও তাঁর নানা অবস্থা থেকে যেভাবে এইসব নীতি-আদর্শকে গ্রহণ বা ব্যবহার করা উচিত ছিল তা করেননি।  প্রাচ্যে এমন একজন মহামানব থাকা সত্ত্বেও তাঁর মূল্যকে গুরুত্ব দেয়া হবে না- তা আমার কাছে মর্মান্তিক বলে মনে হয়েছে। যাই হোক আমি এ বইটি লিখেছি। আমি একজন খ্রিস্টান হওয়ায় কেউ আমাকে এই ইমামের উচ্চতর সম্মান বা মর্যাদার দিকগুলো বর্ণনার কারণে গোঁড়া বলে অপবাদ দিতে পারবে না। আর আমার ভাষা আরবী হওয়ায় ও আমি গবেষক বা পড়াশুনায় অভ্যস্ত হওয়ায় কেউ আমাকে বেখবর বলেও অভিযুক্ত করতে পারবেন না।"  

 

জর্জ জোরদাকের মতে, ইমাম আলী (আ.) ইউরোপীয় চিন্তাবিদদের চেয়ে ১৪০০ বছর এগিয়ে আছেন। অন্যদের বিষয়ে না লেখার কারণ তুলে ধরে তিনি বলেছেন: "আমি আলী (আ.)'র পর তাঁকে ছাড়া এমন যোগ্য আর কাউকে খুঁজে পাইনি যাকে নিয়ে লেখালেখি করা যেতে পারে। আলীর বিপ্লব মানবীয়, সামাজিক, চিন্তাগত ও সামাজিক বিপ্লব। এই বিপ্লব চলাকাল (প্রতিদ্বন্দ্বী) দুই ফ্রন্টের মধ্যে একদিকে ছিল ধর্ম, দয়া, ন্যায়বিচার, মানবতা ও স্বাধীনতা এবং অন্যদিকে ছিলে অসভ্যতা বা দুর্নীতি। আর এই দুই ফ্রন্টের মধ্যে ছিল অনেক ব্যবধান। আলীর ফ্রন্ট সবচেয়ে সৎ ও ন্যায়ের ফ্রন্ট হওয়ায় এ নিয়েই গবেষণা করাকে দায়িত্ব বলে মনে করেছি। এই ফ্রন্ট আমার জন্য পথের আলো হয়ে দেখা দেয়।" 

 

হযরত আলী (আ.) সম্পর্কে আক্ষেপ করে জর্জ জোয়ারদাক বলেছেন:  হে যুগ বা সময়! তুমি যদি তোমার সমস্ত শক্তি ব্যয় করতে এবং হে প্রকৃতি! তুমিও যদি তোমার সমস্ত ক্ষমতা ব্যয় করতে একজন মহামানব, মহাবীর ও মহাপ্রতিভাধর ব্যক্তি সৃষ্টির কাজে! আর এভাবে আরো একবার আমাদের বিশ্বকে আরো এক আলী যদি উপহার দিতে!"  #

 

রেডিও তেহরান

 

 

 

মন্তব্য লিখুন


Security code
রিফ্রেস দিন