এই ওয়েবসাইটে আর আপডেট হবে না। আমাদের নতুন সাইট Parstoday Bangla
রবিবার, 20 সেপ্টেম্বর 2015 15:58

মুসলিম বিশ্বের বর্তমান পরিস্থিতি এবং হজের অশেষ শক্তিকে উপেক্ষা

পবিত্র হজ অফুরন্ত কল্যাণ ও শক্তির উৎস। মহান আল্লাহর পথে জীবন, সম্পদ ও আমিত্বকে বিসর্জন দেয়ার এবং সাম্য, ভ্রাতৃত্ব ও ইসলামী ঐক্যের চেতনাকে শানিত করার বার্ষিক মহড়া অনুষ্ঠিত হয় এই পবিত্র হজে। রাজনৈতিক ও সামাজিক কল্যাণের দিক থেকে হজ ইসলামের শীর্ষস্থানীয় এবাদত। পবিত্র কোরআনে সূরা হজের ২৭ ও ২৮ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, মানুষকে হজের দিকে আহ্বান কর যাতে তারা নিজের বিভিন্ন কল্যাণগুলো দেখতে পারে। হজ সব ধরনের খোদাদ্রোহী শক্তিকে অস্বীকার করার পাশাপাশি ইসলামী ভ্রাতৃত্ব, ঐক্য ও সংহতির আলোকোজ্জ্বল প্রকাশ ঘটায়। হজের মহাসম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় ইসলামের পবিত্রতম স্থানে এবং সেখানে একই পোশাকে একই শ্লোগান দিয়ে সমবেত হয় সারা বিশ্বের সব জাতি ও বর্ণের মুসলিম নর-নারী।

 

ইসলামী ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হযরত আয়াতুল্লাহিল উজমা খামেনেয়ী হজকে একটি বিশ্ব-সম্মেলন হিসেবে উল্লেখ করে বলেছেন, ইসলামের অন্যান্য এবাদত ও ধর্মীয় কর্তব্যের চেয়ে হজের অগ্রগণ্য দিকটি হল-এর আন্তর্জাতিকতা বা বৈশ্বিক রূপ। যে খোদাভীতি ও খোদার প্রতি বিনম্রতা প্রত্যেক মুসলমানের মধ্যে থাকা উচিত তা হজ এক আন্তর্জাতিক বা বৈশ্বিক রূপ নেয়। বিভিন্ন জাতি, ভাষা, গোত্র, বর্ণ ও সংস্কৃতির অধিকারী মুসলমানরা মক্কায় সমবেত হন এবং তাদের সবাই খোদার প্রতি বিনম্র ও ভীত-বিহ্বল থাকেন।

 

আজকাল ওয়াহাবি আলেমরা হজকে ব্যক্তিগত এবাদত বলতে চান। অথচ হজসহ ইসলামের বিভিন্ন এবাদতের ব্যক্তিগত ও আধ্যাত্মিক দিক ছাড়াও রয়েছে সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক দিক। হজ মুসলমানদের জনসমুদ্র, শয়তানের প্রতীকের দিকে পাথর নিক্ষেপ, খোদাদ্রোহী শক্তির সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করার ঘোষণা এবং তাদের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব ও ঐক্যের গৌরবোজ্জ্বল প্রকাশ খোদাদ্রোহী শক্তির মনে আতঙ্ক সৃষ্টি করে বলেই তাদের কেউ কেউ এখনও পবিত্র কাবাঘরকে ধ্বংস করার কথা বলে।


হজ একটি আদর্শ মুসলিম সমাজের প্রতীক। সব ধরনের বাহ্যিক ভেদাভেদ ভুলে মুসলিম ও অমুসলিম দেশগুলোর মুসলমানরা এখানে সমবেত হন। এ সময় তারা পরস্পরের সুখ ও দুঃখ, শক্তিমত্তা এবং সম্ভাবনার নানা দিগন্ত সম্পর্কে অবহিত হন। একটি নির্দিষ্ট স্থানে ও নির্দিষ্ট সময়ে মুসলমানদের সবচেয়ে বড় সম্মেলন অনুষ্ঠানের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য এটাই। বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সা:)’র পবিত্র আহলে বাইতের সদস্য ইমাম জাফর সাদিক (আঃ) এ প্রসঙ্গে বলেছেন, মহান আল্লাহ মানুষ সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহর দেয়া প্রতিটি বিধানের মধ্যে রয়েছে ইহকালীন ও পারলৌকিক কল্যাণ। হজের বিধান এ জন্য দেয়া হয়েছে যাতে পূর্ব ও পশ্চিমের জনগণ এখানে সমবেত হন এবং পরস্পরকে চিনতে পারেন। এ ছাড়াও মুসলমানরা যাতে মহানবী (সা)'র নানা নিদর্শন ও বিষয় সম্পর্কে জানতে পারে এবং এসব বিষয় যাতে তারা কখনও ভুলে না যায় তা হজের অন্যতম লক্ষ্য বলে তিনি উল্লেখ করেছেন।  

 

বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সা:) হজকে ইসলাম প্রচার ও প্রসারের কাছে ব্যবহার করেছেন। এ ছাড়াও হযরত ইমাম হুসাইন (আঃ) হজের সমাবেশকে কুখ্যাত ইয়াজিদের শাসনের পরিণতি সম্পর্কে জনগণকে সচেতন করার কাজে ব্যবহার করেছিলেন।

 

সাম্রাজ্যবাদীদের নিয়ন্ত্রিত সংবাদ মাধ্যমের পক্ষপাতদুষ্ট প্রচারণার কারণে মুসলিম বিশ্বের নানা সমস্যা সম্পর্কে মুসলমানদের মধ্যে স্পষ্ট ধারণা নেই। কিন্তু হজের সুবাদে কোনো একটি মুসলিম দেশের সমস্যাগুলোর প্রকৃত চিত্র সরাসরি সংশ্লিষ্ট দেশের হাজী সাহেবদের কাছ থেকে জানা যায়। আজ ইরাক, সিরিয়া, ফিলিস্তিন, আফগানিস্তান ও ইয়েমেনে কি ঘটছে তা এই দেশগুলোর হাজী সাহেবদের কাছ থেকে জেনে নিতে পারেন অন্যান্য দেশের মুসলমানরা। 

 

ইসলামের দৃষ্টিতে অন্য মুসলমানদের সমস্যা সম্পর্কে জানাই যথেষ্ট নয়, সমস্যা সমাধানেও অগ্রণী হতে হবে। প্রকৃত মুসলমান অন্য মুসলমানকে নির্যাতিত হতে দেখেও নীরব থাকতে পারে না। বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সা:) এ প্রসঙ্গে বলেছেন, যারা অন্য মুসলমানের সমস্যা সমাধানের ব্যাপারে চিন্তা-ভাবনা বা প্রচেষ্টা না চালিয়েই রাত অতিক্রম করে তারা মুসলমান নয়। 

 

তাই হজের সমাবেশ মুসলমানদের সংকট ও সমস্যাগুলো দূর করার সবচেয়ে ভালো সুযোগ। মরহুম ইমাম খোমেনী (রঃ) এ প্রসঙ্গে বলে গেছেন, বিশ্বের হাজি সাহেবদের এক জায়গায় সমবেত করুন, ইসলাম ও মুসলমানদের স্বার্থসহ এ সংক্রান্ত সমস্যা সম্পর্কে পরস্পর মত বিনিময় করুন এবং এইসব সমস্যা সমাধান ও ইসলামের পবিত্র লক্ষ্যগুলো অর্জনের জন্য প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করুন।


অবশ্য মুসলিম বিশ্বের সমস্যাগুলো সমাধানের জন্য স্বাগতিক সরকার হিসেবে সৌদি সরকারের উচিত প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থা করা। কিন্তু এই সরকার এখনও এ ধরনের উদ্যোগ নেয়নি। পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ বলেছেন, মুসলমানদের সঙ্গে শত্রুতার ক্ষেত্রে ইহুদিরাই সবচেয়ে বেশি কঠোর। অথচ কোনো কোনো মুসলিম নামধারী সরকার ইহুদিবাদী ইসরাইলের সঙ্গে সব ধরনের সহযোগিতার সম্পর্ক রাখছেন এবং ইসরাইলকে নিরাপদে রাখার জন্যই সিরিয়া, ইরাক ও ইয়েমেনের ওপর যুদ্ধ চাপিয়ে দিয়েছেন।

 

হজ মুসলমানদের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি ও ভুল ধারণাগুলো দূর করার খুবই উপযুক্ত সুযোগ এনে দেয় । বর্তমানে চরমপন্থা, সংকীর্ণতা ও অসচেতনতার কারণে মুসলমানদের মধ্যে ব্যাপক অনৈক্য ও দলাদলি বিরাজ করছে। আফগানিস্তান, পাকিস্তান, সিরিয়া ও ইরাক এই হানাহানির প্রধান শিকার । এসব হানাহানিতে প্রাণ হারাচ্ছে নিরপরাধ মানুষ। অনেক ধর্মান্ধ ওয়াহাবি বা সালাফি নেতার ফতোয়া এ ধরনের হামলার উৎস। এইসব নেতা নারী ও শিশুদের হত্যা করাকেও বৈধ বলে ফতোয়া দিয়েছেন! ইসলামের শত্রুরা এ ধরনের হামলা ও অনৈক্য সৃষ্টিতে সহায়তা করছে। অথচ পবিত্র হজের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য হল ইসলামী ঐক্য জোরদার করা এবং ইসলামের শত্রুদের প্রতি ঘৃণা প্রকাশ করা।

 

হজ শত্রুদের ষড়যন্ত্রকে বোঝার এবং সেগুলোকে ব্যর্থ ও নিন্দিত করার এক অসাধারণ সুযোগ। মুশরিকদের সাথে সম্পর্কচ্ছেদের ঘোষণা ও ইসলামের শত্রুদের প্রতি ঘৃণা প্রকাশের বিধান প্রচলিত হয়েছিল নবম হিজরিতে। রাসূল (সাঃ)’র নির্দেশে মহান আল্লাহর এ সংক্রান্ত বিধান তথা সূরা তওবার প্রথম কয়েক আয়াত হজের অনুষ্ঠানে পড়ে শোনান হযরত আলী (আঃ)। ইসলামী ইরানও মরহুম ইমাম খোমেনী (রঃ) পরামর্শ অনুযায়ী প্রতি বছর হজের মধ্যে মুশরিকদের সাথে সম্পর্কচ্ছেদের ঘোষণা ও ইসলামের শত্রুদের প্রতি ঘৃণা প্রকাশের অনুষ্ঠান পালন করছে। ইসলামী বিপ্লবের বর্তমান নেতা হযরত আয়াতুল্লাহিল উজমা খামেনেয়ীর মতে মুশরিকদের সাথে সম্পর্কচ্ছেদের ঘোষণা ও ইসলামের শত্রুদের প্রতি ঘৃণা প্রকাশ প্রকৃত হাজী বা মুমিনের অন্যতম প্রধান চেতনা।

 

তিনি বলেছেন, হজের বিভিন্ন অনুষ্ঠান আল্লাহর প্রতি হৃদয় সমর্পণ ও তাঁর পথে চেষ্টা-প্রচেষ্টা বা সংগ্রামে নিয়োজিত হওয়া এবং শয়তান ও তার দোসরদের অপতৎপরতার সাথে সম্পর্কচ্ছেদের ঘোষণার পাশাপাশি তাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের অবস্থান নেয়ার প্রকাশ। 

 

হজ ইসলামী ঐক্য প্রতিষ্ঠার ও ইসলামের শত্রুদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের যে মহা-সুযোগ এনে দেয় তা কাজে লাগানো সম্ভব হলে ফিলিস্তিন, ইরাক, সিরিয়া, ইয়েমেন, আফগানিস্তান, পাকিস্তান ও কাশ্মীরের মত স্থানে মুসলমানদের রক্তপাত বন্ধ করা সম্ভব হত। দুঃখজনকভাবে অনেক মুসলিম সরকার যুক্তরাষ্ট্র ও ইহুদিবাদী ইসরাইলের মত বড় শত্রুকে উপেক্ষা করছে কিংবা তাদের সহযোগিতা করছে! গাজায় ইসরাইলী হামলার সময় কোনো কোনো মুসলিম ও আরব দেশের ভূমিকাই এর দৃষ্টান্ত। পবিত্র হজের মাসে সৌদি সরকার ইয়েমেনে হামলা চালিয়ে সেখানকার মুসলমানদের রক্ত ঝরাচ্ছে! অথচ ইসলাম এই মাসে যুদ্ধ-বিগ্রহ ও হত্যাকাণ্ড নিষিদ্ধ করেছে। 

 

পবিত্র হজ জালিমের বিরুদ্ধে মজলুমের ফরিয়াদ তুলে ধরার উপযুক্ত স্থান। এখানে ইয়াজিদের ও উমাইয়া শাসকদের জুলুম নিপীড়ন তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন হযরত ইমাম হুসাইন (আ)। প্রকৃত ইসলামী শাসন না থাকলে যে হজকে যে পরিপূর্ণভাবে আদায় করা যায় না এবং সেক্ষেত্রে ইসলামী শাসন প্রতিষ্ঠার চেষ্টাই যে বেশি জরুরি তা তুলে ধরেছিলেন তিনি হজের মাত্র কয়েক দিন আগে মক্কা ত্যাগ করে। মহানবী (সা.)ও কুফরি শক্তিকে পরাজিত করার পর সাহাবিদের নিয়ে হজ করতে গিয়েছিলেন। 


হজ মুসলমানদের জন্য শান্তি প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানায়। অথচ পবিত্র মক্কা ও মদিনার সেবক হবার দাবিদার রাজতান্ত্রিক এক শাসকগোষ্ঠী পবিত্র হজের মৌসুমে যুদ্ধ ও রক্তপাত নিষিদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও আজও ইয়েমেনের নিরীহ মুসলমানদের ওপর নির্বিচার বোমা হামলা চালিয়ে যাচ্ছে ও ধ্বংস করছে দেশটির সব ধরনের অবকাঠামো। প্রায় ৬ মাস ধরে সৌদি সরকারের নির্বিচার হামলায় নিহত হয়েছে প্রায় ৬ হাজার ইয়েমেনি মুসলমান যাদের মধ্যে রয়েছে অন্তত এক হাজার শিশু ও নারী। এমনকি ইয়েমেনের মুসলমানদেরকে এ বছর হজও করতে দেয়া হচ্ছে না। অথচ পবিত্র কুরআনের আয়াত অনুযায়ী মহান আল্লাহর ঘর জিয়ারতে মুসলমানদেরকে বাধা দেয়ার অধিকার কারোই নেই।

 

হজ মুসলমানদের জন্য শক্তি ও কল্যাণের অনন্য উৎস। তাই মুসলমানদের উচিত হজের বিভিন্ন কল্যাণকে অতীতের চেয়েও বেশী কাজে লাগানো। কারণ, আজ অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে মুসলিম উম্মাহর ভবিষ্যৎ অনেক বেশী উজ্জ্বল। # 

 

রেডিও তেহরান/এএইচ

 

 

 

 

 

 

মন্তব্য লিখুন


Security code
রিফ্রেস দিন