এই ওয়েবসাইটে আর আপডেট হবে না। আমাদের নতুন সাইট Parstoday Bangla
সমাজ-সংস্কৃতি

‘সামগ্রিকভাবে বলতে গেলে আল্লাহর নবীদের আবির্ভাবের সূচনা থেকেই   মানবাধিকার বিষয়টি বিশেষ করে দ্বীনে ইসলামে প্রতিষ্ঠিত হয়। ইতিহাস পরিক্রমায় সকল ঐশী ধর্মই মানবাধিকারের মৌলিক নীতিমালার প্রতি ভীষণ গুরুত্ব দিয়েছে। আল্লাহর নবীরাসূলগণ মানুষকে বিচিত্র বন্দীত্ব আর দায়বদ্ধতা থেকে মুক্ত করার জন্যে এবং মানুষের প্রকৃত স্বাধীনতা অর্জনের জন্যে ব্যাপক চেষ্টা প্রচেষ্টা চালিয়েছেন। সেইসাথে সমাজে বিদ্যমান জুলুম নির্যাতন আর তাগুতদের মোকাবেলা করার ক্ষেত্রে ছিলেন সুদৃঢ় এবং একপায়ে দাঁড়ানো।’

 

ইতোমধ্যে আমরা বিংশ শতাব্দি অতিক্রম করেছি এবং নতুন একটি সহস্রাব্দে পা রেখেছি। নতুন এই সহস্রাব্দেও আমেরিকাসহ পাশ্চাত্যের অন্যান্য দেশ ও সরকারগুলো ডেমোক্রেসি ও মানবাধিকারের নামে অপরাপর দেশের ওপর আধিপত্য বিস্তার করেই চলছে। এই সরকারগুলো অন্যান্য দেশকে তাদের সকল ক্ষেত্রে পশ্চিমা মূল্যবোধসহ সকল আদর্শ গ্রহণ করতে বাধ্য করতে তাদের সর্বশক্তি নিয়োগ করছে। কিন্তু পশ্চিমা ধাঁচের মানবাধিকার কি প্রাচ্যের সংস্কৃতির সাথে পুরোপুরি বা সামগ্রিকভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ? মুসলিম সভ্যতা সংস্কৃতির আজকের পর্বে আমরা পাশ্চাত্যে মানবাধিকারের ঐতিহ্য এবং একইভাবে মানুষের মৌলিক অধিকারের ব্যাপারে কথা বলার চেষ্টা করবো।

 

হিউম্যান রাইট্স বা মানবাধিকার আসলে নৈতিক অধিকারেরই একটা বিশেষ শ্রেণী যেখানে জাতি, ধর্ম, বর্ণভেদে সকল মানুষেরই সমান অধিকারের বিষয়টির প্রতি গুরুত্ব দেওয়া হয়। সেইসাথে কে কোন্ সমাজের বা কোন‌্ ধরনের দল ও গোষ্ঠির সদস্য সে বিষয়টির ওপর দৃষ্টি না দিয়েই অধিকারের ব্যাপারটির প্রতি দৃষ্টি দেওয়া হয়। মানবাধিকার একটি সার্বজনীন নৈতিক বিধান এবং সবারই উচিত এই বিধানকে কাজে লাগানো। আধুনিক এই বিশ্বে মানবাধিকার অভিধা বা পরিভাষাটির বয়স খুব বেশি নয়। বড়ো জোর বিংশ শতাব্দি পর্যন্ত তার উদ্ভব ও বিস্তারের পরিসীমা, বিশেষ করে বিশ্ব মানবাধিকার ঘোষণা পর্যন্ত তার শেকড় বিস্তৃত বলা যায়, তবে এই সংজ্ঞাটি কিন্তু বেশ পুরোণো। মানবাধিকারকে বিশেষ কোনো সভ্যতা কিংবা বিশেষ কোনো যুগের সাথে সম্পৃক্ত করা যাবে না। সকল মাযহাব, সকল মতাদর্শ এবং সাহিত্য ও দর্শনের মহান গ্রন্থগুলোতে তার উল্লেখ রয়েছে। বিশ শতকের মাঝে এবং বিশেষ করে বিশ শতকের শেষের দিকে মানবাধিকার বিষয়ক বহু আন্তর্জাতিক সনদ গৃহীত হয়েছে, এগুলো মানবাধিকারের উন্নয়ন ও বিকাশে ব্যাপক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

 

মানবাধিকারের কাঠামোগুলো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে গঠিত হয়েছে। বিশ্ব সমাজ হিটলারের নির্মমতা আর অপরাধযজ্ঞের শিকার হয়ে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। তখন মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা করার জন্যে একটা কাঠামো বা সংস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্যে যুদ্ধে জড়িত দেশ এবং সরকারগুলো চিন্তাভাবনা শুরু করে। তারই পরিপ্রেক্ষিতে যুদ্ধরত দেশগুলোর কর্মকর্তাগণ সিদ্ধান্ত নেন মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা করার জন্যে একটা মেথড বা পদ্ধতি আবিষ্কার করবেন। অবশেষে ১৯৪৫ সালের ২৬ জুন জাতিসংঘের ঘোষণা তৈরি হয় এবং সদস্যদের স্বাক্ষর গৃহীত হয়। জাতিসংঘ এবং আন্তর্জাতিক সমাজ ১৯৪৮ সালের ১০ ডিসেম্বরে ‘বিশ্ব মানবাধিকার সনদ’ নামক গুরুত্বপূর্ণ এই ঘোষণাটি পাশ করতে সক্ষম হয়। এই মানবাধিকার ঘোষণাটির একটি ভূমিকা এবং ত্রিশটি অনুচ্ছেদ রয়েছে। জনগণের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা এবং অধিকারের মতো মৌলিক বিষয়গুলোর এই ঘোষণায় গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

 

আমরা যে মানবাধিকার সনদটির কথা বললাম এটি মানবাধিকার বিষয়ক অন্যান্য সনদের ফাউণ্ডেশান বা ভিত্তি প্রস্তরের মতোই গুরুত্ববহ। এগুলোকে এমনভাবে সংকলন করা হয়েছে যে, বেশিরভাগ চিন্তাবিদই এগুলোর যথাযথ বাস্তবায়নকে খুবই জরুরি বলে মনে করেন। এই ঘোষণার অন্তর্নিহিত অর্থ কাজে লাগানোর জন্যে সংশ্লিষ্ট দেশগুলো যাতে মানবাধিকার রক্ষা করে চলে সেজন্যে প্রয়োজনীয় চুক্তি বা স্মারকগুলোও পরবর্তী দুই দশকের মধ্যে গৃহীত হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ এই সনদগুলোর মধ্যে রয়েছে গণহত্যা নিষিদ্ধ করণ বিষয়ক কনভেনশন, বর্ণ-বৈষম্য নিষিদ্ধ সংক্রান্ত কনভেনশন, বর্ণবাদ বা বর্ণপূজা নিষিদ্ধ সংক্রান্ত কনভেনশন, নির্যাতন-নিপীড়ন বিরোধী কনভেনশন, নারীর বিরুদ্ধে বৈষম্য রোধ সংক্রান্ত কনভেনশন এবং শিশু অধিকার বিষয়ক কনভেনশন ইত্যাদি।

 

আগেই বলেছি যে আধুনিক বিশ্বে মানবাধিকার বিষয়ক সংস্থা গড়ে উঠেছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর। অথচ সামগ্রিকভাবে মানবাধিকার সেই আল্লাহর নবী-রাসূলদের আবির্ভাবের সূচনা থেকেই উপস্থাপিত হয়েছে, বিশেষ করে দ্বীনে ইসলামে মানবাধিকার একেবারে বিধিবদ্ধ হয়েছে। ইতিহাস পরিক্রমায় দেখা গেছে ঐশী দ্বীন বা ধর্মগুলো মানবাধিকারের মূলনীতিগুলোর প্রতি খুবই গুরুত্ব দিয়েছে। হযরত নূহ (আ), ইব্রাহিম (আ), মূসা (আ), ঈসা (আ) এবং ইসলামের নবী হযরত মুহাম্মাদ (সা) মানুষকে বিচিত্র বন্দীত্ব আর দায়বদ্ধতা থেকে মুক্ত করার জন্যে এবং মানুষের প্রকৃত স্বাধীনতা অর্জনের জন্যে ব্যাপক চেষ্টা প্রচেষ্টা চালিয়েছেন। সেইসাথে সমাজে বিদ্যমান জুলুম নির্যাতন আর তাগুতি শক্তির মোকাবেলা করার ক্ষেত্রে ছিলেন সুদৃঢ় এবং একপায়ে দাঁড়ানো। কুরআনে কারিম আর নবীজীর সুন্নাত নিয়ে গবেষণা করে দেখা গেছে, মানবাধিকারের  মূলনীতিগুলোর প্রতি ইসলামে পরিপূর্ণ ও সামগ্রিকভাবে এবং একেবারে বাস্তবতার আলোকেই যথার্থ দৃষ্টি দেওয়া হয়েছে।

 

অবশ্য বিশ্ব মানবাধিকার ঘোষণা পশ্চিমা বিশ্বদৃষ্টির আলোকে একেবারেই হাল আমলের ঘটনা। এই ঘোষণায় নৈতিকতা কিংবা ফযিলতের স্থান নেই। মানবাধিকারের এই আধুনিক চিন্তাদর্শ বিভিন্ন ক্ষেত্রেই ইসলামী মানবাধিকার চিন্তার সাথে বা এর শিক্ষাগুলোর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বরং বহু ক্ষেত্রেই সাংঘর্ষিক। ইসলামের দৃষ্টিতে মানুষের স্থান অনেক উর্ধ্বে। এতো উর্ধ্বে যে ফেরেশতাদের সেজদা পাবার যোগ্য এবং আল্লাহর প্রতিনিধিত্বের বৈশিষ্ট্যের অধিকারী। স্বাভাবিকভাবেই আল্লাহর এই সৃষ্টি মূল্যহীন হতে পারে না। পবিত্র কুরআনেও বহুবার মানুষের মর্যাদা ও সম্মান সম্পর্কে কথা বলা হয়েছে। তাই এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, বর্তমানে বিশ্ব মানবাধিকার ঘোষণায় যা কিছু বলা হয়েছে সেসব ঐশী দ্বীন বিশেষ করে দ্বীনে ইসলামের বৈশিষ্ট্যগুলোর ছিটেফোঁটামাত্র।

 

মানবাধিকারের গুরুত্বপূর্ণ একটি মূলনীতি হলো স্বাধীনতা ও মুক্তি। বিশ্ব মানবাধিকার ঘোষণায় এ বিষয়টির ওপর জোর দেওয়া হয়েছে যথাযথভাবেই। আর ইসলাম এ বিষয়টির ওপর ভীষণ গুরুত্ব দিয়েছে। ইসলামের দৃষ্টিতে পৃথিবীর প্রতিটি মানুষ স্বাধীন অবস্থায় জন্ম নিয়েছে, তাই তাদের অধিকার রয়েছে স্বাধীন জীবন যাপন করার। ইমাম আলী (আ) বলেছেনঃ “অন্য কারো গোলাম হয়ো না কেননা আল্লাহ পাক তোমাকে মুক্ত করে সৃষ্টি করেছেন।” উল্লেখ্য যে, বিশ্বাস এবং বাক-স্বাধীনতার মতো বহুরকম স্বাধীনতার ব্যাপারে ইসলামের নির্দেশ রয়েছে। দুঃখজনকভাবে পশ্চিমাদের দৃষ্টিতে স্বাধীনতার বাস্তব অর্থ হলো নীতি-নৈতিকতা থেকে দূরে অবস্থানের স্বাধীনতা, লাগামহীনতা এমনকি অন্যদের অবমাননা করার স্বাধীনতা-যার পরিণতিতে পতন আর বিচ্যুতির কোনো বিকল্প নেই। অথচ ইসলামের দৃষ্টিতে মানুষের মৌলিক একটি অধিকার হলো ন্যায়ানুগ আচরণ।#

আজ থেকে প্রায় প্রায় ৩০০ বছর আগে ওয়াহাবি মতবাদের প্রবক্তা আবদুল ওয়াহহাব নজদি সৌদ বংশের সহায়তা নিয়ে ইবনে তাইমিয়ার বিভ্রান্ত চিন্তাধারা প্রচার করতে থাকে। তার ভুল দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে নজদি অলি-আওলিয়ার উসিলা দিয়ে দোয়া করা, তাদের মাজারে মানত করা ও শ্রদ্ধা জানানোসহ অলি-আওলিয়ার মাজার ও কবর জিয়ারতের মত ইসলামের মৌলিক কিছু ইবাদত এবং আচার-অনুষ্ঠানকে হারাম ও শির্ক বলে ঘোষণা করেছিল।  ফলে ওয়াহাবিরা মাজার ও পবিত্র স্থানগুলো ধ্বংস করে আসছে। শুধু তাই নয় নজদি তার চিন্তাধারার বিরোধীদেরকে কাফির ও তাদেরকে হত্যা করা ওয়াজিব বলে উল্লেখ করত।

৮ ই শাওয়াল (শুক্রবার) ইসলামের ইতিহাসের এক শোকাবহ দিন। ৮৮ বছর আগে এই দিনে ওয়াহাবি ধর্মদ্রোহীরা পবিত্র মক্কা ও মদিনায় ক্ষমার অযোগ্য কিছু পাপাচার ও বর্বরতায় লিপ্ত হয়েছিল। ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা যখন পবিত্র জান্নাতুল বাকি কবরস্থানে বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.)'র দ্বিতীয়, চতুর্থ, পঞ্চম ও ষষ্ঠ নিষ্পাপ উত্তরসূরির পবিত্র মাজার জিয়ারত করছিলেন তখন ওয়াহাবি দুর্বৃত্তরা সেখানে ভাঙ্গচুর ও লুটপাট অভিযান চালায় এবং ওই নিষ্পাপ ইমামদের পবিত্র মাজারের সুদৃশ্য স্থাপনা ও গম্বুজগুলো মাটির সঙ্গে গুড়িয়ে দেয়।

 

এরপর বর্বর ও ধর্মান্ধ ওয়াহাবিরা আরো কিছু পবিত্র মাজারের অবমাননা করে এবং এইসব মাজারের গম্বুজ ও  স্থাপনাগুলো ভেঙ্গে-চুরে ইসলাম অবমাননার ন্যক্কারজনক তাণ্ডব চালায়। এইসব মাজার ছিল বিশ্বনবী (সা.)'র  ঘনিষ্ঠ আত্মীয়-স্বজন,সাহাবি, স্ত্রী, বংশধর ও খ্যাতনামা আলেমদের।

জান্নাতুল বাকি কবরস্থানে এসে বিশ্বনবী (সা.) বলতেন, “ তোমাদের ওপর সালাম! হে বিশ্বাসীদের আবাসস্থল! আল্লাহ চাইলে আমরাও শিগগিরই তোমাদের সঙ্গে মিলিত হব। হে আল্লাহ, আল-বাকির (জান্নাতুল বাকি কবরস্থানের) অধিবাসীদের ক্ষমা করুন।”

 

সুন্নি ও শিয়া সূত্রে বর্ণিত হাদিস অনুযায়ী বিশ্বনবী  হযরত মুহাম্মাদ (সা.) তাঁর সাহাবায়ে কেরাম ও আত্মীয়-স্বজনদের কবরে সালাম দিতেন।

বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.) গোটা সৃষ্টি জগতের জন্য রহমত (রাহমাতুললিল আলা’মিন) হিসেবে তাঁর যুগের  ও অন্য সব অনাগত যুগের মুসলমানদের জন্য সত বা মহত লোকদের কবর জিয়ারতের ব্যাপারে নিজের সুন্নাত ও কর্মপন্থা শিখিয়ে গেছেন।

 

মহান আল্লাহর ইচ্ছায় নেককার কবরবাসী সালাম ও দোয়া শুনতে পান। বিশ্বনবী (সা.) নিশ্চয়ই জানতেন যে, মুসলমান নামধারী এক শ্রেণীর মানুষ সুদূর ভবিষ্যতে তাঁর এইসব সুন্নাত পদদলিত করবে এবং মক্কা ও  মদিনায় মুসলমানদের রক্ত ঝরাবে এবং বেদাআত বা কুপ্রথা প্রতিরোধের নামে তাঁর পবিত্র আহলে বাইত বা নিষ্পাপ ইমামদের পবিত্র মাজারগুলোসহ  তাঁর  ঘনিষ্ঠ আত্মীয়-স্বজন, স্ত্রী, সাহাবি,  বংশধর ও খ্যাতনামা আলেমদের মাজারগুলো গুড়িয়ে দেবে।

 

বিশ্বনবী (সা.) কবর জিয়ারতের সুন্নাতকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দান করেছিলেন। সম্ভবত এর অন্যতম কারণ এটাও ছিল যে এর মাধ্যমে তিনি মুসলমানদের মধ্যে বিভেদকামী এই ওয়াহাবি-সালাফি গোষ্ঠীর মুনাফেকি বা কপট চরিত্র উন্মোচন করবেন। এই সুন্নাতের মাধ্যমে বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.) এটা স্পষ্ট করেন যে, একটি গতিশীল ইসলামী সমাজ সবসময় তার মৃত ব্যক্তিদের স্মরণ করে যেই মৃত ব্যক্তিরা মৃত্যুর পরেও খোদায়ী রহমত পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করছেন। অন্যদিকে শহীদদের অবস্থা আরো উন্নত। স্বয়ং মহান আল্লাহ বলেছেন,

 ‘যারা আল্লাহর রাস্তায় নিহত হয়েছে তাদের তোমরা মৃত ভেবো না, বরং তারা জীবিত এবং তাদের প্রতিপালকের কাছ থেকে জীবিকা-প্রাপ্ত।’ (সুরা আলে ইমরান-১৬৯)

অন্য একটি আয়াত হতে জানা যায় এই বিশেষ জীবন (বারজাখের জীবন) শুধু শহীদদের জন্যই নয়, বরং আল্লাহর সকল অনুগত ও সৎকর্মশীল বান্দার জন্য নির্ধারিত।

মহান আল্লাহ্ বলেছেন :

 ‘যারা আল্লাহ্ ও তাঁর প্রেরিত পুরুষের আনুগত্য করবে তারা সেই সব ব্যক্তির সঙ্গে থাকবে নবীগণ, সত্যবাদিগণ, শহীদগণ ও সৎকর্মশীলদের মধ্য হতে যাদের তিনি নিয়ামত দিয়েছেন। তারা কতই না উত্তম সঙ্গী!’ (সুরা নিসা-৬৯)

যদি শহীদগণ আল্লাহর কাছে জীবিত থাকেন ও জীবিকা লাভ করেন তবে যে কেউ আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের অনুগত হবে, সেও শহীদদের সাথে থাকবে, (যেহেতু রাসূল নিজেও তাঁর আনীত নির্দেশের আনুগত্যকারী, সেহেতু তিনিও এই সুবিধার অন্তর্ভুক্ত)। কারণ এ আয়াতে আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্যকারীরা শহীদদের সঙ্গে থাকবেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে। যদি শহীদরা মৃত্যুর পর আল্লাহর কাছে জীবিত থাকেন তবে তারাও অর্থাত আল্লাহ ও নবী-রাসূলদের আনুগত্যকারীরাও আল্লাহর কাছে জীবিত রয়েছেন ও বারজাখী জীবনের অধিকারী।

 

বিশ্বনবী (সা.)’র জন্য এটা কতই না হৃদয় বিদারক যে তাঁর প্রিয় আহলে বাইত, সাহাবি ও ঘনিষ্ঠ আত্মীয়-স্বজনের মাজারগুলো গুড়িয়ে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেয়া হয়েছে! জান্নাতুল বাকি কোনো সাধারণ কবরস্থান নয়। এখানে রয়েছে অন্তত সাত হাজার সাহাবির কবর। এখানে রয়েছে বিশ্বনবী (সা.)’র ফুপি বা পিতার বোন হযরত সাফিয়া ও আতিকার কবর। এখানেই রয়েছে বিশ্বনবী (সা.)’র শিশু পুত্র হযরত ইব্রাহিম (তাঁর ওপর অশেষ শান্তি বর্ষিত হোক)-এর কবর। এই পুত্রের মৃত্যুর সময় বিশ্বনবী (সা.) অশ্রু-সজল চোখে বলেছিলেন, “চোখগুলো থেকে পানি ঝরছে এবং হৃদয় শোকাহত, কিন্তু আমরা আল্লাহর সন্তুষ্টি উদ্রেককারী কথা ছাড়া অন্য কিছুই বলব না। আমরা তোমার জন্য শোকাহত হে ইব্রাহিম!”

 

জান্নাতুল বাকি হচ্ছে সে স্থান যেখানে সমাহিত হয়েছেন বিশ্বনবী (সা.)’র চাচা হযরত আবু তালিব (রা.)’র স্ত্রী ফাতিমা বিনতে আসাদ (সালামুল্লাহি আলাইহা)। এই মহীয়সী নারী বিশ্বনবী (সা.)-কে লালন করেছিলেন নিজ সন্তানের মত স্নেহ দিয়ে এবং তাঁকে কবরে রাখার আগে বিশ্বনবী (সা.) এই মহান নারীর প্রতি সম্মান প্রদর্শনের জন্য নিজেই ওই কবরে কিছুক্ষণ শুয়েছিলেন। রাসূল (সা.) তার জন্য তালকিন উচ্চারণ করেছিলেন শোকার্ত কণ্ঠে।  

 

জান্নাতুল বাকি হচ্ছে সেই কবরস্থান যেখানে বেহেশতী নারীদের সর্দার তথা খাতুনে জান্নাত হযরত ফাতিমা (সা.) বিশ্বনবী (সা.)’র ইন্তিকালের পর যে ৯০ দিন নিজে বেঁচে ছিলেন প্রায়ই সেখানে গিয়েই শোক প্রকাশ করতেন। যেখানে বসে তিনি শোক প্রকাশ করতেন সেই স্থানটিকে বল হল বাইতুল হুজন বা শোক প্রকাশের ঘর। একই স্থানে কারবালার শোকাবহ ঘটনার পর  বিশ্বনবী (সা.)’র নাতি শহীদদের নেতা ইমাম হুসাইন (আ.) ও নিজের পুত্র হযরত আবুল ফজল আব্বাস (রা.) ’র জন্য শোক প্রকাশ করতেন মুমিনদের নেতা হযরত আলী (আ.)’র স্ত্রী উম্মুল বানিন (সা. আ.)। এখানেই মদিনাবাসী যোগ দিতেন শোক-অনুষ্ঠানে। এখানে প্রায়ই শোক প্রকাশের জন্য আসতেন ইমাম হুসাইন (আ.)’র স্ত্রী হযরত রাবাব (সা. আ.)। বিশ্বনবী (সা.)’র নাতনী ও ইমাম হুসাইন (আ.)’র বোন হযরত জয়নাব (সা. আ.) ও উম্মে কুলসুম (সা.আ.) নিয়মিত শোক প্রকাশের জন্য এখানেই আসতেন।

 

৮৮ বছর আগেও জান্নাতুল বাকিতে টিকে ছিল বিশ্বনবী (সা.)’র ১২ জন নিষ্পাপ উত্তরসূরির মধ্য থেকে তাঁর নাতি হযরত ইমাম হাসান (আ.), অন্য নাতি ইমাম হুসাইন (আ.)'র পুত্র ইমাম জয়নুল আবেদিন (আ.), তাঁর পুত্র ইমাম মুহাম্মাদ বাকির (আ.) ও বাকির (আ.)'র পুত্র ইমাম জাফর সাদিক (আ.)’র সুদৃশ্য মাজার। কিন্তু বর্তমানে এ এলাকায় টিকে রয়েছে একমাত্র বিশ্বনবী (সা.)’র মাজার। ওয়াহাবিরা বিশ্বনবী (সা.)’র পবিত্র মাজার ভাঙ্গার জন্য বেশ কয়েকবার উদ্যোগ নেয়ার পরও মুসলমানদের প্রতিরোধের মুখে ও ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার ভয়েই তা বাস্তবায়নের সাহস করেনি।

 

ব্রিটিশ ও কাফিরদের সহযোগী ইহুদিবাদী চরিত্রের অধিকারী ওয়াহাবিরা কেবল মদিনায় নয় পবিত্র মক্কায়ও ইসলামের অনেক নিদর্শন ও পবিত্র মাজার ধ্বংস করেছে। এইসব মাজারের মধ্যে রয়েছে মক্কায় জান্নাতুল মোয়াল্লা নামক কবরস্থানে অবস্থিত বিশ্বনবী (সা.)’র স্ত্রী ও  প্রথম মুসলমান  উম্মুল মুমিনিন হযরত খাদিজা (সা. আ.)’র পবিত্র মাজার এবং বিশ্বনবী (সা.)’র  পুত্র হজরত কাসেম (আ.), চাচা হযরত আবু তালিব (রা.) ও দাদা হযরত আবদুল মুত্তালিব (আ.)সহ অন্যান্য পারিবারিক সদস্যদের মাজার।

 

ওয়াহাবিরা মদীনায় ওহুদ যুদ্ধের ঐতিহাসিক ময়দানে বিশ্বনবী (সা.)’র চাচা শহীদদের নেতা হযরত হামজা (সা.)’র মাজারসহ অন্যান্য শহীদ সাহাবিদের মাজারও ধ্বংস করেছে। সাম্প্রতিক সময়ে ওয়াহাবিরা সিরিয়ায় বেশ কয়েকজন প্রখ্যাত সাহাবির মাজারে হামলা চালিয়ে সেইসব মাজারের অবমাননা করেছে। তারা বিখ্যাত সাহাবি হজর ইবনে ওদাই (রা.) মাজার ধ্বংস করে তার লাশ চুরি করে নিয়ে গেছে। এ ছাড়াও তারা কয়েকবার হামলা করেছে হযরত ইমাম হুসাইন (আ.)র বোন হযরত জয়নাব (সা. আ.)’র মাজারে।

 

ওয়াহাবিরা এভাবে ইসলামের ইতিহাসের নিদর্শনগুলো ধ্বংস করছে ঠিক যেভাবে বায়তুল মোকাদ্দাস শহরে মুসলমানদের পবিত্র প্রথম কেবলা এবং এর আশপাশের  ইসলামী নিদর্শনগুলো ধ্বংসের চেষ্টা করছে দখলদার ইহুদিবাদীরা। ফিলিস্তিনের অনেক ইসলামী নিদর্শন ধ্বংস করেছে ইহুদিবাদীরা। অনেকেই মনে করেন ওয়াহাবিদের পৃষ্ঠপোষক সৌদি রাজবংশ (যারা তুর্কি খেলাফতের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে ইংরেজদের সহায়তা করেছে এবং পুরস্কার হিসেবে হিজাজে বংশীয় রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেছে) ছিল একটি ইহুদিবাদী ইহুদি গোত্রেরই বংশধর। এরা মুখে মুখে মুসলমান বলে দাবি করলেও সব সময়ই ইসলামের শত্রুদের সহযোগী।

 

কেউ কেউ বলে থাকেন যে সৌদি রাজ-পরিবার আসলে “দোমনেহ” নামের বিভ্রান্ত ইহুদিবাদী গোষ্ঠীর বংশধর। এই গোষ্ঠী ভণ্ড  ইহুদিবাদী নবী ‘শাব্বিটি জিভি’র অনুসারী। তারা প্রকাশ্যে ইসলামের অনুসারী বলে দাবি করত। কিন্তু তারা বাস্তবেমদ্যপ ও নির্বিচার যৌনাচার বা যৌন অনাচারসহ নানা ঘৃণ্য কাজে অভ্যস্ত ছিল।

 

আজ থেকে প্রায় ৩০০ বছর আগে ওয়াহাবি মতবাদের প্রবক্তা আবদুল ওয়াহহাব নজদি সৌদ বংশের সহায়তা নিয়ে ইবনে তাইমিয়ার বিভ্রান্ত চিন্তাধারা প্রচার করতে থাকে। তার ভুল দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে নজদি অলি-আওলিয়ার উসিলা দিয়ে দোয়া করা, তাদের মাজারে মানত করা ও শ্রদ্ধা জানানোসহ অলি-আওলিয়ার মাজার ও কবর জিয়ারতের মত ইসলামের মৌলিক কিছু ইবাদত এবং আচার-অনুষ্ঠানকে হারাম ও শির্ক বলে ঘোষণা করেছিল।  ফলে ওয়াহাবিরা মাজার ও পবিত্র স্থানগুলো ধ্বংস করে আসছে। শুধু তাই নয় নজদি তার চিন্তাধারার বিরোধীদেরকে কাফির ও তাদেরকে হত্যা করা ওয়াজিব বলে উল্লেখ করত।

 

অথচ বিশ্বনবী (সা.) নিজে কবর জিয়ারত করতেন এবং বিশেষ করে তাঁর মাতা হযরত আমিনা (সালামুল্লাহি আলাইহা)’র কবর জিয়ারত করতে ছুটে যেতেন। তিনি নিজের মায়ের কবরের পাশে কাঁদতেন। (আল মুস্তাদরাক, খণ্ড-১, পৃ.৩৫৭, মদিনার ইতিহাস, ইবনে শাব্বাহ, খণ্ড-১, পৃ.১১৮) আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, মহানবী (সা.) বলেছেন, “তোমরা কবর জিয়ারত কর। এই জিয়ারত তোমাদেরকে পরকালের স্মরণে মগ্ন করবে।”

 

 

ওয়াহাবিরা আলে সৌদের বাহিনী নিয়ে বিভিন্ন অঞ্চলের জনগণের ওপর নৃশংসভাবে গণহত্যা চালিয়ে ত্রাস সৃষ্টি করত এবং জনগণকে ওয়াহাবি মতবাদ মেনে নিতে বাধ্য করত। প্রাথমিক পর্যায়ে যখন তাদের কেন্দ্রীয় শাসন ছিল না সে সময় ওয়াহাবিরা লুটপাট ও ডাকাতির মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করত। শহরগুলোতে লুটপাটের পর সেইসব অঞ্চলের ওপর দখলদারিত্ব ধরে রাখার ক্ষমতা তখনও তাদের ছিল না। ওয়াহাবিরা বিশ্বনবী (সা.)’র পবিত্র মাজারে এবং কারবালায় হযরত ইমাম হুসাইন (আ.) মাজারে হামলা চালিয়ে মূল্যবান অনেক সম্পদ, উপহার ও নিদর্শন লুট করেছিল।



ইসলামের পবিত্র ও ঐতিহাসিক নিদর্শনগুলো ধ্বংস করে ওয়াহাবিরা শুধু মুসলিম উম্মাহর হৃদয়কেই ক্ষত-বিক্ষত করেনি, একইসঙ্গে মানব সভ্যতার অবমাননার মত জঘন্য কলঙ্কও সৃষ্টি করেছে। কারণ, প্রত্যেক জাতি ও সভ্যতাই নিজের পুরনো ঐতিহাসিক চিহ্ন ও নিদর্শনগুলোকে শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে সংরক্ষণ করে। এ জন্য বিপুল অংকের অর্থ খরচ করে থাকে জাতিগুলো। অথচ ওয়াহাবিরা ইসলামের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শনগুলোও ধ্বংস করে দিচ্ছে যাতে ভবিষ্যত প্রজন্মগুলো এইসব নিদর্শন সম্পর্কে অজ্ঞ থাকে। এটা ইসলাম ও মানব সভ্যতার জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি।

 

ওয়াহাবিরা  অতীতেও জান্নাতুল বাকিতে হামলা চালিয়ে নিষ্পাপ ইমামদের মাজার ধ্বংস করেছিল। প্রথমবার তারা হামলা চালিয়েছিল হিজরি ১২২১ সালে (১৮০০ খ্রিস্টাব্দে)। (এ সময় হিজাজে সৌদি ওয়াহাবিদের গঠিত প্রথম বিদ্রোহী ও অবৈধ সরকারটি নির্মূল হয়েছিল তুরস্কের ওসমানিয় খেলাফতের মাধ্যমে। ) সে সময়  ওয়াহাবিরা দেড় বছর ধরে মদীনাকে অবরুদ্ধ করে শহরটি দখল করতে সক্ষম হয় এবং বিশ্বনবী (সা.) পবিত্র মাজারের দামী পাথর ও সোনা-রূপাসহ মূল্যবান জিনিষগুলো লুট করে এবং জান্নাতুল বাকি কবরস্থানে ধ্বংসযজ্ঞ ও লুটপাট চালায়। তারা হামলা পবিত্র মক্কায়ও হামলা চালিয়েছিল।  

 

তারা ওই একই বছর কেবল বিশ্বনবী (সা.)’র মাজার ছাড়া মক্কা ও মদীনায় সব মাজার ধ্বংস করে। শ্রদ্ধার জন্য নয়, বরং জনগণের ব্যাপক প্রতিরোধের মুখে ও ভয়াবহ পরিণামের ভয়ে বিশ্বনবী (সা.)’র মাজার ধ্বংস করার সাহস তারা করেনি। ওয়াহাবিরা মক্কা ও মদিনার কাজি বা বিচারকদের অপসারণ করে সেখানে নিজেদের কাজি নিয়োগ করে। নবনিযুক্ত ওয়াহাবি কাজি বিশ্বনবী (সা.)’র মাজার বা কবর জিয়ারত থেকে জনগণকে বিরত রাখার চেষ্টা করতেন। মক্কা ও মদিনার জনগণকে জোর করে ওয়াহাবি মতবাদ মেনে নিতে বাধ্য করেছিল ওয়াহাবিরা।

 

ধর্মপ্রাণ সুন্নি ও শিয়া মুসলমানরা অর্থ ব্যয় করে আবারও জান্নাতুল বাকির মাজারগুলো পুনর্নির্মাণ করেন। কিন্তু ওয়াহাবিরা দ্বিতীয়বার মক্কা দখলের পর পর ১৩৪৪ বা ১৩৪৫ হিজরিতে তথা ১৯২৫ সালে মদীনা অবরোধ করে এবং প্রতিরোধাকামীদের পরাজিত করে এই পবিত্র শহর দখল করে।  ওসমানিয় পুলিশদের শহরের বাইরে হটিয়ে  দিয়ে এবারও তারা জান্নাতুল বাকিতে অবস্থিত নবী (সা.)- পরিবারের নিষ্পাপ ইমামদের মাজারসহ সব মাজার ধ্বংস করে এবং লুটপাট চালায়। মুসলমানরা এই দিনটিকে ইয়াওমুল আলহাদাম বা ধ্বংসের দিন বলে অভিহিত করেছেন।

   
ওয়াহাবিরা এখানে বিশ্বনবী (সা.)’র  পিতা  হযরত আবদুল্লাহ (আ.), পুত্র ইব্রাহিম (আ.), মুমিনদের নেতা আলী (আ.)’র স্ত্রী উম্মুল বানিন প্রমুখের মাজারও ধ্বংস করে। এ ছাড়াও তারা মদীনায় ওহুদ পাহাড়ের মসজিদসহ এখানে বিশ্বনবী (সা.)’র চাচা হযরত হামজা (আ.)’র মাজার এবং ওহুদের অন্যান্য শহীদ সাহাবিদের মাজার ধ্বংস করে। এখানে ১২ জন শহীদ ও সাহাবিদের মাজারের মধ্যে হযরত মুসআব বিন উমাইর (রা.), জাফর বিন শামস (রা.) ও আবদুল্লাহ বিন জাহাসের মাজার ছিল লক্ষণীয়। 

 

বৃহস্পতিবার, 15 আগস্ট 2013 13:19

মুসলিম সভ্যতা ও সংস্কৃতি- (৭৭তম পর্ব)

সেই প্রাচীনকাল থেকে আজ পর্যন্ত পশ্চিমা উপনিবেশবাদীরা বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রাচ্যের দেশগুলোতে বাহ্যত বিভিন্ন দেশ ও জাতি অধিকার ও স্বাধীনতার প্রতি সমর্থনের কথা বলে পক্ষান্তরে সেই দেশগুলোর ওপর তাদের আধিপত্য বা উপনিবেশিকতা চাপিয়ে দিয়েছিল। গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের নামে উপনিবেশবাদীরা বিভিন্ন দেশ ও জাতির সম্পদগুলো লুট করে নিয়েছে এবং বিভিন্ন যুদ্ধ বাধিয়েছে। এটা তাহলে কী ধরনের গণতন্ত্র? ইউরোপ ও পশ্চিমা গণতন্ত্রের স্বরূপ তুলে ধরার পাশাপাশি ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে এই মতবাদগুলোকে বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করবো।

 

ডেমোক্রেসির সংজ্ঞা নিয়ে জ্ঞানের মানবিক বিভাগে বেশ মতানৈক্য রয়েছে। ইতিহাসের সূচনা থেকেই মানুষ গণতন্ত্র , স্বাধীনতা এবং নিজের অধিকার আদায় বা প্রতিষ্ঠার পেছনে সচেষ্ট ছিল। দ্বীনে ইসলাম প্রতিষ্ঠার সূচনালগ্ন থেকেই  ডেমোক্রেসি বা গণতন্ত্রের মূলনীতিগুলোকে যথার্থ এবং যুক্তিগ্রাহ্যভাবে প্রতিষ্ঠা করেছিল। অথচ ইউরোপসহ পশ্চিমা দেশগুলোতে সেই ডেমোক্রেসি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বহু ঘাত-প্রতিঘাতের পর। পশ্চিমা বিশ্বের ডেমোক্রেসি নিয়ে কথা বলার আগে আমরা রোম এবং গ্রিসের মতো দেশগুলোতে ডেমোক্রেসি কীভাবে তার দৃপ্ত পদভার রেখেছিল সেই ইতিহাসের দিকে একবার নজর বুলানো যাক।

 

ডেমোক্রেসি একটি গ্রিক শব্দ। দুটি শব্দের মিশ্রণে এই পরিভাষাটির জন্ম হয়েছে।  একটি হলো ডেমোস, অপরটি ক্রেসিয়া। ডেমোস মানে হলো জনগণ আর ক্রেসিয়া মানে হলো হুকুমাত এবং শক্তি বা ক্ষমতাপ্রাপ্ত। তার মানে ডেমোক্রেসি বলতে বুঝায় জনগণের ক্ষমতা বা শাসন। খ্রিষ্টপূর্ব পঞ্চম শতাব্দিতে এথেন্সে ডেমোস মানে বুঝাতো এমন এক জনসমাবেশকে যারা হুকুমাতের কাজগুলো বাস্তবায়নের জন্যে সমবেত হতো। আর ডেমোক্রেসি বলতে বুঝাতো সেইসব শাসনব্যবস্থাকে যেই শাসন ব্যবস্থা সকল জনগণের হাতেই ন্যস্ত হয়। অবশ্য প্রাচীন এথেন্সের ডেমোক্রেসি আর বর্তমান কালের ডেমোক্রেসির মধ্যে অঅকাশ পাতাল পার্থক্য রয়েছে। এথেন্সে জনগণ এক জায়গায় সমবেত হতো নিজেদের সমাজের জন্যে প্রয়োজনীয় আইন কানুন প্রণয়ন করার জন্যে। সকল নাগরিকেরই দায়িত্ব ছিল আইন প্রণয়নকারী সমাবেশে অংশ নেওয়া এবং নীতি নির্ধারণে ভূমিকা রাখা।

 

অবশ্য দাসেরা-সমাজের একটি বিশাল অংশ হওয়া সত্ত্বেও এবং সেই সমাজের কাজগুলোর দায়িত্ব তাদের ওপর থাকার পরও- নারীদের সাথে সাথে তাদেরও অধিকার ছিল না নীতি নির্ধারণের জন্যে অনুষ্ঠিত ভোটাভুটিতে অংশ গ্রহণ করার। প্রাচীনকালের রোমানরাও এক ধরনের ডেমোক্রেসি চর্চা করেছিল। তবে এথেন্সের মতো এতোটা বিশাল পরিসরের ডেমোক্রেসি চর্চার সুযোগ তাদের হয় নি। রেণেসাঁসের যুগে অর্থাৎ খ্রিষ্টিয় চৌদ্দ, পণর এবং ষোল শতকে ইউরোপের চিন্তা চেতনা ও সংস্কৃতির জগতে ব্যাপক পরিবর্তনের সুযোগ হয়েছিল। রেণেসোঁসের ফলে ডেমোক্রেসির ভিত্তিতে মৌলিক পরিবর্তন, উন্নয়ন ও বিকাশ দ্রুততর হয়েছিল। ষোলো শতকের শুরুতে প্রোটেস্টানিজমের প্রতিষ্ঠাতা ও জার্মান পাদ্রী মার্টিন লুথার ক্যাথলিক ধর্মের মূলনীতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন এবং খোদার সাদা ও মানুষের মধ্যকার সম্পর্কের ক্ষেত্রে গির্যার মধ্যস্থতা বা ভূমিকাকে অস্বীকার করেছিলেন।

 

প্রোটেস্টান্ট ধর্মে মানুষের মর্যাদা ও বিবেকের শ্রেষ্ঠত্বের প্রতি যেমন সম্মান প্রদর্শন করা হয়েছে তেমনি সৃষ্টি জগতে মানুষের অবস্থানেরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এ সময় বহু প্রোটেস্টান্ট গির্যা প্রতিষ্ঠিত হয় যার অনেকগুলোরই কাঠামো ছিল ডেমোক্রেটিক। সেই ষোলো শতকেই ক্যাথলিক এবং প্রোটেস্টান্ট গির্যার বিশ্বাস ছিল যে শাসকদের রাজনৈতিক শক্তির উৎস হচ্ছে জনগণ।        

 

রেণেসাঁসের যুগ থেকেই ইউরোপের কোনো কোনো দেশে ধীরে ধীরে মৌলিক পরিবর্তনের সূচনা ঘটে। বৃটেনের জনগণ সেই ১২১৫ সালেই তাদের রাজাকে বাধ্য করেছিল মেগনাকার্টা নামে মানুষের ব্যক্তি অধিকার বিষয়ক সর্বপ্রথম সনদটি প্রবর্তন করতে। এই আইনটি পাশ হবার পর বৃটিশরা তাদের সরকারের মুখোমুখি হবার প্রেক্ষাপট তৈরিতে সচেষ্ট হয়। বৃটেনের জনগণ ১৬৮৮ সালে যে অভ্যুত্থান ঘটিয়েছিল, ঐ অভ্যুত্থানের মাধ্যমে সেদেশে সংসদীয় শাসন ব্যবস্থা প্রবর্তিত হয়। কিন্তু এরই মাঝে বৃটেনের বিশিষ্ট দার্শনিক জন লক জনগণের জান, মাল এবং স্বাধীনতার প্রতি সরকারী সমর্থনের পাশাপাশি রাজনৈতিক ব্যাপারেও জনগণের পূর্ণ ক্ষমতার দাবী জানান।

 

ইউরোপের অন্যান্য দেশেও অভিন্ন চিন্তার প্রবর্তন ঘটতে দেখা যায়। যেমন ফ্রান্সে জন্ম নিয়েছিলেন শার্ল দ্য মন্টেসকিও, ফ্রাঁসোয়া ভলতেয়ার এবং জন জ্যাক রুশোর মতো দার্শনিকের। তাঁদের মতো দার্শনিকের আবির্ভাবের মধ্য দিয়ে সেদেশে ডেমোক্রেটিক চিন্তার বিকাশ ও বাস্তবায়নের সুছনা ঘটে। ১৭৮৯ খ্রিষ্টাব্দে ফরাশি বিপ্লবের ক্ষেত্রে এইসব চিন্তাদর্শের ভূমিকা ছিল অপরিসীম।

 

ভলতেয়াররাও জনগণের স্বাধীনতা ও অধিকারের প্রতি সরকারের আগ্রাসনের বিরোধিতা করতেন। সামাজিক চুক্তি নামক বইতে রুশোও লিখেছেন জনগণ কেবল সেই শক্তিরই আনুগত্য করবে যেই শক্তির বৈধতা রয়েছে। তিনি প্রকৃত শাসক বলতে জনগণকেই বোঝাতেন। ফরাশি বিপ্লব ইউরোপীয় ডেমোক্রেসির ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা বলে পরিগণিত, কেননা ঐ বিপ্লব মুক্তি এবং স্বাধীনতার মতো বিশ্বাসগুলোকে দৃঢ়তা দিয়েছিল। ১৭৭৫ খ্রিষ্টাব্দে সংঘটিত আমেরিকার বিপ্লবও পাশ্চাত্যের ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে পরিগণিত। মার্কিন উপনিবেশবাসীরা এসেছিল ইউরোপের বিভিন্ন দেশ থেকে। তারাই তাদের স্বাধীনতার দাবীতে বিদ্রোহ সংগ্রাম করেছিল। তাদের স্বাধীনতা ও মুক্তির দাবীর মুখে ১৭৭৬ সালে একটি ঘোষণাপত্র লিখিত হয়। ‘মার্কিন স্বাধীন ঘোষণা’ নামে পরিচিত এই স্মারকটি মহাদেশীয় কংরগ্রেসে গৃহীত হয়েছিল। এই ঘোষণাটিকে ডেমোক্রেসির ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ সনদ বলে মনে করা হয়। শিল্প বিপ্লব এবং শ্রমিক শ্রেণীর আন্দোলনকেও ইউরোপে ডেমোক্রেসির বিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। বিশ শতকের শুরুতে ইউরোপের নতুন চিন্তাদর্শের প্রভাবে এশিয়া এবং আফ্রিকার দেশগুলোতেও ডেমোক্রেসির বিস্তার ঘটে।

 

ডেমোক্রেসি বা গণতন্ত্র যদিও পশ্চিমাদের ক্ষেত্রে বিচিত্র সুবিধা বয়ে এনেছিল, কিন্তু পশ্চিমা উপনিবেশবাদীরা ঐ ডেমোক্রেসিকে অন্যান্য দেশের অভ্যন্তরে হস্তক্ষেপ করা এবং সেসেব দেশের ধন-সম্পদ লুট করে নেওয়ার অজুহাত বা হাতিয়ার হিসেবে কাজে লাগিয়েছিল। উপনিবেশবাদী দেশগুলো নিজেদেরকে অন্যদের চেয়ে শ্রেষ্ঠতরো বলে ভাবতো। আর মুসলমানদেরসহ যেসব দেশের ওপর পশ্চিমারা তাদের উপনিবেশিকতা আরোপ করতো তাদেরকে পশ্চাদপদ বলে গণ্য করতো। এ কারণে তারা চাইতো তাদের উপনিবেশভুক্ত দেশগুলোর সংস্কৃতিকে তাদের আদর্শ তথা চিন্তা-চেতনা ও সংস্কৃতির আদলে সাজাতে। এর ফলে পক্ষান্তরে যা হতো তা ছিলো উপনিবেশ কবলিত দেশগুলোর নিজস্ব সংস্কৃতির বিরুদ্ধে পশ্চিমাদের এক ধরনের আগ্রাসন, যে আগ্রাসনের লক্ষ্য হলো অন্য দেশের নিজস্ব সংস্কৃতিকে ঝেঁটিয়ে বিদায় করে তার স্থলে নিজেদের সংস্কৃতি চাপিয়ে দেওয়া।

 

অথচ ইসলাম হচ্ছে একটি পরিপূর্ণ জীবন ব্যবস্থা। এই জীবন বিধানে মানুষের সমগ্র জীবনের জন্যে সার্বিক কল্যাণ ও মঙ্গলের বিষয়গুলো সুস্পষ্টভাবে নিহিত রয়েছে। এগুলোর একটি হলো স্বাধীনতা ও গণতন্ত্র। এই গণতন্ত্র আর স্বাধীনতার বিধান অনুযায়ী রাসূলে খোদা (সা) ইসলামী সমাজ গড়েছিলেন। ইমাম আলী (আ) এর খেলাফত এবং তাঁর বক্তৃতাগুলোর প্রতি দৃষ্টি দিলেই সে বিষয়টি আরো সুস্পষ্টভাবে ফুটে উঠবে।#

 

৫ আগস্ট(রেডিও তেহরান): ঈদের এখনো কয়েকদিন বাকি আছে। ঈদের পোশাক কেনার পর এখন শুরু হবে ঈদের খাবার কেনার আয়োজন। ভোক্তা যাতে খাদ্যসামগ্রী কেনার সময় স্বাস্থ্যগত বিবেচনায় সতর্ক হতে পারেন এমন কয়েকটি বিষয় সম্পর্কে আগাম জানানোই এ লেখাটির উদ্দেশ্য।

 

অবশ্য এসব সতর্কতা ঈদের পরেও কাজে লাগবে।

 

ঈদের সেমাই কেনার সময় আমাদের পরামর্শ হচ্ছে ভাজা সেমাই নয় বরং কাঁচা সেমাই কিনুন, ঘরে নিয়ে ভেজে নিন। কারণ অধিকাংশ সেমাই তৈরির কারখানা অত্যন্ত অস্বাস্থ্যকর অবস্থায় সেমাই তৈরি করে থাকে। বিশেষ করে এগুলো শুকানোর পদ্ধতি অত্যন্ত নিম্নমানের। মূলত খোলা আকাশের নিচে রোদে শুকানো এসব সেমাইতে মাছি বসে প্রচুর, ধুলাবালিও পড়ে। সেমাই রান্নার প্রক্রিয়ায় এগুলো থেকে আসা সব জীবাণু মরে যায় না। কিন্তু কাঁচা সেমাই কিনে ঘরে ভেজে নিলে ভাজার তাপে জীবাণুগুলো নিশ্চিতভাবে মারা যায়। বাজারে পাওয়া ভাজা সেমাইতে সে সুবিধাটুকু না পাওয়ারই সম্ভাবনা। অবশ্য কাঁচা সেমাই কেনার সময় ধব্ধবে সাদা সেমাই না কেনার জন্যও পরামর্শ রইলো। কারণ এগুলো ধবধবে সাদা করার জন্য হাইড্রোজ ব্যবহার করা হয়, যা ক্ষতিকর। দেখতে ভালো না হলেও কম সাদা কাঁচা সেমাই কেনা তাই সবচেয়ে ভালো।

 

লাচ্ছা সেমাইও অনেকের বেশ প্রিয়। তবে রঙিন লাচ্ছা দেখতে সুন্দর হলেও তা পরিহার করুন। কারণ রঙিন লাচ্ছায় থাকে টেক্সটাইল কালার। এসব টেক্সটাইল কালার চর্মরোগ, এলার্জি, হাঁপানি, শ্বাসকষ্ট, পাকস্থলীর গোলযোগ, পেপটিক আলসার, রক্তকণিকার গোলযোগ, লিউকেমিয়া বা ব্লাড ক্যান্সার, লিভারের নানা গোলযোগ, লিভার সিরোসিস, লিভার ক্যান্সার, কিডনির মারাত্মক ক্ষতি ইত্যাদি সৃষ্টি করতে পারে। তাই সাদা লাচ্ছাই কিনুন এবং তা যেন অবশ্যই কম তেল-চর্বিযুক্ত হয়। কারণ এসব নিম্নমানের তেল ও চর্বি সহজে হজম হয় না।

 

চিনি কেনার সময় বেশি সাদা চিনি কেনা অনুচিত। কারণ চিনিকে ধবধবে সাদা করতে ব্যবহৃত হয় ক্ষতিকর হাইড্রোজ। এ হাইড্রোজ নিয়ে অনেকের মধ্যে বিভ্রান্তি আছে। অনেকে মনে করেন হাইড্রোজ মানে সোডিয়াম হাইড্রক্সাইড; কিন্তু আসলে তা নয়।

 

হাইড্রোজ মানে সোডিয়াম হাইড্রোসালফাইড বা সোডিয়াম ডাইথায়োনাইট। এটি ব্লিচিং এজেন্ট বলে চিনির স্বাভাবিক লালচে রঙকে এ দিয়ে সাদা করা হয়। দেখতে সুন্দর হলেও এটি মুখগহ্বর ও পাকস্থলীর জন্য ইরিটেন্ট। ফলে মুখে প্রদাহ এবং পাকস্থলীতে এসিডের অতিরিক্ত নিঃসরণ ঘটে; এটি নিয়মিত ব্যবহারে যা আলসারে রূপ নিতে পারে।

 

এছাড়া গরম পানিতে এ চিনি মেশানোর পর সালফার ডাইঅক্সাইড তৈরি হয়, যা পানির সাথে মিশে সালফিউরাস এসিডে রূপান্তরিত হয়, ফলে পাকস্থলীর এসিড নিঃসরণ ও আলসার সৃষ্টির প্রবণতা আরো বেড়ে যায়।

 

এছাড়া কাশি, হাঁপানি, পালমোনারি ইডিমা বা ফুসফুসে পানি জমা, এমনকি নিউমোনাইটিস্ বা ফুসফুসের জটিল সংক্রমণ ঘটাতে পারে হাইড্রোজ । ময়দা দিয়ে তৈরি খাদ্যসামগ্রীকেও ধবধবে সাদা করতে ব্যবসায়ীরা হাইড্রোজ ব্যবহার করে। আমাদের তাই ধবধবে সাদা চিনি, সেমাই ইত্যাদি পরিহার করা উচিত। দেশি চিনি দেখতে খুব আকর্ষণীয় না হলেও এতে হাইড্রোজ দেয়া হয় না বলে স্বাস্থ্যসম্মত। তাছাড়া দেশি চিনির মিষ্টত্বও বেশি। ফলে অল্প পরিমাণ দেশি চিনিতে অনেকটা মিষ্টি স্বাদ পাওয়া যায়, যা বিদেশি সাদা চিনিতে পেতে পরিমাণে বেশি লাগবে। ফলে বিদেশি চিনির বদলে দেশি চিনি ব্যবহারে অর্থ সাশ্রয়ের পাশাপাশি স্বাস্থ্য ঝুঁকিও কম থাকে।

 

ঈদে গরম মশলাও বিক্রি হয় প্রচুর। গরম মশলার দারুচিনিতে ভেজাল দেওয়া হয় লালচে দেখতে গজারি বা অন্যান্য ছাল দিয়ে। গজারির ছাল স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর নয়, তবে সতর্ক হলে এ ফাঁকিটুকু পরিহার করা সম্ভব। দারুচিনি কেনার সময় বাছাই করে পাতলা ছাল দেখে কিনবেন, মোটা ও গন্ধহীনগুলো নয়।

 

ঈদে জর্দা খাওয়ার জন্য জাফরানি রং কিনতে গিয়ে আপনি ঠকবেন এটা মোটামুটি নিশ্চিত। কারণ জাফরানি রং অত্যন্ত দামি। দশ-বিশ টাকার জাফরানি রং কোন দোকানির পক্ষে বিক্রি করা সম্ভব নয়। জাফরানি রংয়ের বদলে তাই বিক্রি হয়ে থাকে একই রকম দেখতে টেক্সটাইল কালার, যা থেকে শারীরিক ক্ষতির কথা আগেই বলা হয়েছে। এক্ষেত্রে আমাদের পরামর্শ হলো রংহীন জর্দা খাওয়ার অভ্যাস করুন। নিতান্তই জর্দাকে দেখতে রঙিন করতে হলে গাজর-বিটের কুচি বা কমলার খোসা পিষে রসটুকু ব্যবহার করা যেতে পারে। একইভাবে পোলাও বা বিরিয়ানিতেও কৃত্রিম রংয়ের ব্যবহার বর্জন করুন।

 

পোলাও-বিরিয়ানি বা কোর্মাতে ঘি ব্যবহার না করাই ভাল। আজকাল বাজারের অধিকাংশ ঘি কী দিয়ে তৈরি হয় তা ম্যাজিস্ট্রেট রুকন-উদ্-দৌলার মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে আমরা অনেক আগেই জেনেছি। ঘি পরিহার করে তাই সয়াবিন দিয়ে রান্না করাই ভালো। এতে স্বাস্থ্যঝুঁকি কমার পাশাপাশি রক্তে কোলেস্টেরল জমার আশংকাও কমবে। ইদানীং কেউ কেউ খাঁটি সরিষার তেলের পোলাও-বিরিয়ানি রান্না করছেন। এর স্বাদও চমৎকার। তবে সরিষার তেলটি খাঁটি কিনা তা নিশ্চিত হতে হবে। কারণ বাজারে বিভিন্ন কোম্পানির বিক্রি করা সরিষার তেলে স্বাভাবিকের চাইতে অস্বাভাবিক বেশি ঝাঁজ দেখেই বুঝা যায় যে এগুলো নকল সরিষার তেল।

 

এলাইল আইসোথায়োসায়ানেট নামের রাসায়নিক উপাদান সরিষার তেলের ঝাঁজের জন্য দায়ী। এটি কেমিক্যালসের দোকানে কিনতে পাওয়া যায় এবং মানুষের অজ্ঞতার কারণে প্রস্তুতকারকরা এ উপাদানটি স্বাভাবিক পরিমাণের চেয়েও বেশি করে মিশিয়ে ভেজাল সরিষার তেলকে বিশুদ্ধ বলে চালিয়ে দেয়। স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি ঝাঁজওয়ালা এসব তেল শরীরের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।

 

আমাদের বাজারের অধিকাংশ হলুদ-মরিচ-ধনে-জিরার পাউডারে ভেজাল পাওয়া গেছে। বিশেষ করে হলুদ ও মরিচের গুঁড়ায় পাওয়া গেছে টেক্সটাইল কালার। এসব নকল মশলা দিয়ে রান্না করা তরকারিতে স্বাভাবিক স্বাদ থাকে না আবার তরকারিও হয় অধিক রঙিন।। এগুলো স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। অধিকাংশ মশলা কোম্পানির ভেজালের এ অত্যাচারের ফলে আমাদেরকে আবারো শিল-নোড়ার যুগে ফিরে যেতে হয় কিনা কে জানে।

 

টেক্সটাইল কালারের কারণে বাজারের অধিকাংশ সস্ ও আচার খাওয়ার অযোগ্য। ইউরোপের বাঙ্গালিদের জন্য বাংলাদেশের দুটি কোম্পানি শুকনা মরিচের আচার রপ্তানি করতে গিয়ে বিপাকে পড়েছে। সেসব দেশ আমাদের দেশের মতো নয় যে কেন্দ্রীয় সংস্থার পরীক্ষা ছাড়াই যা খুশি খাদ্যসামগ্রী বিদেশ থেকে আমদানি করা যায়। তারা পরীক্ষা করে শুকনা মরিচের আচারে ক্যান্সার তৈরি করে বলে নিষিদ্ধ রং সুদান রেড পেয়েছে। তারা অবাক হয়েছে যে কয়েক দশক আগে বিশ্বব্যাপী নিষিদ্ধ রং সুদান রেড বাংলাদেশ তার খাদ্যসামগ্রীতে মেশায় কি করে। তারা তো আর জানে না যে আমরা সুদান রেড উৎপাদন করি না, এটি আমদানি করা হয়, আমদানির অনুমতি যারা দেন তারা জানেন না যে এটি অত্যন্ত বিষাক্ত।

 

ক্ষতিকর বা নিষিদ্ধ টেক্সটাইল কালার আমাদের দেশে জ্যাম জেলি চানাচুর বিস্কুট কেক লজেন্স চকলেট আইসক্রিম দই মিষ্টি ইত্যাদি তৈরিতে এখনও দেদার ব্যবহৃত হচ্ছে। জনগণের স্বাস্থ্যের বিষয় বিবেচনা করে এগুলো নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজনীয়তার কথা বিভিন্ন সরকারি মহলের কাছে আমরা দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছি। আমাদের দেশে শরবত তৈরিতে ব্যবহৃত প্রায় সব পাউডার গ্রানিউলস্ ও কন্সেনট্রেটে ক্ষতিকর বা নিষিদ্ধ টেক্সটাইল কালার রয়েছে। শরবত ব্যবহারে তাই সাবধান হওয়া উচিত।

 

আমাদের উপলব্ধি করা উচিত যে দই হলুদ রঙের হতে পারে না। যত গাঢ় দুধ দিয়েই তা তৈরি হোক না কেন দই সাদাই থাকবে, বড় জোর অফ-হোয়াইট হতে পারে, কিন্তু হলুদ কখনোই নয়। আপনার স্বাস্থ্যঝুঁকির কথা বিবেচনা করে যেসব মিষ্টির দোকানে টেক্সটাইল কালার মেশানো হলুদ রঙের দই বিক্রি হয় সেগুলো বর্জন করুন, সাদা রংয়ের দই কিনুন। মিষ্টির বেলাতেও একই কথা প্রযোজ্য, স্বাস্থ্যরক্ষার কারণে কৃত্রিম রঙহীন মিষ্টি খাওয়ার অভ্যাস করুন।

 

আম-কমলার তথাকথিত জুসগুলো মূলত কৃত্রিম, কিন্তু প্যাকেটের গায়ে উন্নত দেশের মতো ‘কৃত্রিম জুস’ কথাটি লেখা থাকে না। এগুলোতে আম-কমলার উপযুক্ত উপস্থিতি নেই। এগুলোতে এমন সব কৃত্রিম রং ব্যবহার করা হয় যা স্বাস্থ্যের জন্য নিরাপদ নয়। বিজ্ঞাপনের মোহে পড়ে বিশেষ করে বাচ্চারা যেন এসব তথাকথিত জুস নিয়মিতভাবে খেতে শুরু না করে সে বিষয়ে সতর্ক হোন। কারণ বাচ্চাদের লিভার-কিডনি-অস্থিমজ্জা-ফুসফুস সবই অপরিণত বলে ক্ষতিকর রংগুলো বড়দের চাইতেও বাচ্চাদের ক্ষতি করে বেশি।

 

অন্যান্যবারের মতো এবারের ঈদেও সম্ভবত প্রচুর কোল্ড ড্রিংকস্ খাওয়া হবে। মাঝেমধ্যে পরিমিত পরিমাণে কোল্ড ড্রিংকস্ খাওয়া ক্ষতিকর নয়, তবে বেশি পরিমাণে বা নিয়মিত খাওয়া ক্ষতিকর। বিশেষ করে বাচ্চাদেরকে কোলাজাতীয় কোনো কোল্ড ড্রিংকস্ দেবেন না। কারণ এর উচ্চ মাত্রার ক্যাফেইন বাচ্চাদের স্নায়ুকে উত্তেজিত করে, মেজাজ খিটখিটে করে, অস্থিরতা আনে, লেখাপড়ায় গভীর মনোসংযোগে বিঘœ ঘটায় ও কিডনিকে চাপে ফেলে।

 

অতিরিক্ত কোলাজাতীয় কোল্ড ড্রিংকস্ বড়দের জন্যও ক্ষতিকর, বিশেষ করে উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্তদের ও হৃদরোগীদের জন্য। এছাড়া উচ্চমাত্রার ক্যাফেইন হালকা নেশাও সৃষ্টি করে। বিকল্প হিসাবে আপনি বরফ মিশিয়ে লেবুর শরবত খান। পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ ও নিরাপদতম কোল্ড ড্রিংকস্ সম্ভবত বরফ মেশানো লেবুর শরবত। চেষ্টা করে দেখুন না অভ্যস্ত হতে পারেন কিনা।

 

বাজারে এখন বেশ কিছু এনার্জি ড্রিংকস্ বিভিন্ন নামে পাওয়া যাচ্ছে। মনে রাখতে হবে অতি উচ্চমাত্রার সুগার ও ক্যাফেইন উপাদানের কারণে এগুলো বাচ্চাদের জন্য নয়, প্রবীণদের জন্যও নয়। এছাড়া নিষিদ্ধ কোনো উত্তেজক এগুলোতে মেশানো হয়েছে কিনা জানার জন্য আমাদেরকে আরো কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে। ততদিন শুধু তরুণরা এগুলো পরিমিত মাত্রায় খেতে পারে, কিন্তু বৃদ্ধ ও বাচ্চারা কখনোই নয়।

 

কেউ যদি ভেবে থাকেন যে আমাদের দেশে তৈরি পণ্যগুলোতেই শুধু ভেজাল থাকে, অতএব এগুলোর বদলে বিদেশি খাদ্যসামগ্রী কেনাই ভালো তাহলে ভুল করবেন। আমদানিকৃত অনেক খাদ্যসামগ্রীতেও স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর বিভিন্ন উপাদানের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। এসব উপাদানের মধ্যে ক্ষতিকর রং, ক্ষতিকর টেস্টিং সল্ট এবং ক্ষতিকর কৃত্রিম মিষ্টিকারক প্রধান। অনেক সময় এরা উৎপাদন ও মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখও উল্লেখ করে না। ব্যবহৃত সবগুলো উপাদানও তারা অনেক ক্ষেত্রে উল্লেখ করে না। খুচরা মূল্য লেখা না থাকা এদের আরেক কারসাজি। বিদেশি কোম্পানিরা আমাদের দেশের কোনো কেন্দ্রীয় খাদ্যমান নিয়ন্ত্রণ সংস্থার অনুপস্থিতি ও দুর্বল মনিটরিং ব্যবস্থার পুরো সুযোগ নেয়। তাই বিদেশি খাদ্যসামগ্রী কেনার সময়ও সতর্কতার সাথে দেখেশুনে কেনার কোনো বিকল্প নেই।

 

বাংলাদেশে কার্যকরভাবে ভেজাল প্রতিরোধের জন্য ভোক্তা অধিকার আইন কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের  ফুড এন্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন বা এফডিএ-এর আদলে একটি কার্যকর কেন্দ্রীয় সংস্থার অধীনে খাদ্য ওষুধ ও প্রসাধনসামগ্রীর নিয়ন্ত্রণকে নিয়ে আসা এবং সংশ্লিষ্ট আইনগুলোকে যুগোপযোগীভাবে সংষ্কার করা আশু প্রয়োজন।

 

যতদিন তা না হচ্ছে ততদিন খাদ্যসামগ্রী কেনার সময় ভোক্তাদের কিছু সতর্কতা অবলম্বন এবং ভোক্তা অধিকার অধিদপ্তরে অভিযোগ দায়ের করাও জরুরি। অভিযোগ দায়েরের পদ্ধতি ও ঠিকানা ভোক্তা অধিকার অধিদপ্তরের ওয়েবসাইটে বিশদভাবে দেওয়া আছে।

 

শরীর আপনার। শরীরের ভালমন্দ দেখাশোনার দায়িত্বও প্রধানত আপনার। আমাদের মতো গরিব ও লুণ্ঠনের অর্থনীতির দেশে রাষ্ট্র ও সরকারের আইন-কানুন ও সেগুলোর প্রয়োগ আপনার সচেতনতার পরিপূরক মাত্র। খাদ্যসামগ্রীর মান নিয়ন্ত্রণের জন্য বিশেষজ্ঞদের দ্বারা পরিচালিত কোনো কেন্দ্রীয় সংস্থা এখনও আমাদের দেশে অনুপস্থিত বলে যতদিন পর্যন্ত খাদ্যের স্বাস্থ্যগত নিরাপত্তা বিষয়ে উপযুক্ত রাষ্ট্রীয় পরিবেশ তৈরি না হচ্ছে ততদিন আপনাকে আমাকে নিজেদের নিরাপত্তার স্বার্থেই খাদ্যের ভেজাল ও ক্ষতি বিষয়ে সচেতনতা ও সতর্কতার বোধকে আরো শাণিত করতে হবে। আসুন আমরা এ সতর্কতাকে নিয়মে-অভ্যাসে পরিণত করি।

 

সকলের জন্য ঈদ হোক অসীম আনন্দের ও সুস্বাস্থ্যের।

 

 

(বাংলাদেশে নিরাপদ খাদ্য আন্দোলনের অংশ হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ এ নিবন্ধটি লিখেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওষুধ প্রযুক্তি বিভাগের অধ্যাপক আ ব ম ফারুক।)