এই ওয়েবসাইটে আর আপডেট হবে না। আমাদের নতুন সাইট Parstoday Bangla
সমাজ-সংস্কৃতি
সোমবার, 10 মার্চ 2008 17:15

খাদ্যজনিত চর্মরোগ

সুপ্রিয় পাঠক, স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা বিষয়ক আলোচনা আপনার স্বাস্থ্যর আজকের পর্বে আমরা খাদ্যজনিত চর্মরোগ নিয়ে আলোচনা করবো। চর্মরোগের প্রকোপ বাড়ছে বলে সমপ্রতি ত্বক বিষয়ক এক সম্মেলনে বলা হয়েছে। দূষণ ও নানা রাসায়নিক উপাদানে গঠিত কসমেটিক ব্যবহারকে এর জন্য দায়ী করা হয়েছে। আপনাদের নিশ্চয়ই মনে আছে,  চর্মের ক্ষেত্রে যে, এসব রাসায়নিক উপাদান নানা জটিলতার সৃষ্টি করতে পারে সে কথা বিশেষজ্ঞদের বরাত দিয়ে ‘আপনার স্বাস্থ্যে’ আমরা অনেকবার উচ্চারণ করেছি। তবে একথা বোধহয় অনেকেই জানেন যে,  খাদ্যজনিত কারণেও নানা ধরনের চর্ম রোগ দেখা দিতে পারে। সুষম খাদ্যের অভাবের কারণে দেহের নানা রকম বিপত্তির পাশাপাশি চর্মেও তার প্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে। খাদ্য ঘাটতির ফলে দেহে সাধারণভাবে কি ধরণের চর্ম রোগ দেখা দিতে পারে তা নিয়ে আমরা কথা বলেছি বাংলাদেশের ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজের চর্ম ও যৌন রোগ বিভাগের প্রধান সহযোগী অধ্যাপক ডাক্তার শাহাবউদ্দিন আহমেদ চৌধুরী সাথে ।  এখানে তার সাক্ষাৎকারটি উপস্থাপন করা হলো । 

রেডিও তেহরান : খাদ্যজনিত চর্ম রোগ কি ভাবে দেখা দেয়?

ডাক্তার শাহাবউদ্দিন আহমেদ চৌধুরী : প্রধানত খাদ্য ঘাটতির কারণে খাদ্যজনিত এই চর্ম রোগ দেখা দিয়ে থাকে । আবার কিছু কিছু  ক্ষেত্রে খাদ্যের এই উপাদানগুলো যদি আমরা বেশি পরিমাণে গ্রহণ করি  তাহলে এই অতিরিক্ত খাদ্য গ্রহণের ফলেও খাদ্যজনিত চর্মরোগ দেখা দিতে পারে । ঘাটতি জনিত চর্মরোগগুলো সাধারণত দরিদ্র দেশগুলোতে হয়ে থাকে।  খাবারের  পরিমাণ বা খাবারের মধ্যে যদি বিশেষ কোন উপাদান সবসময় কম থাকে, অথবা খাদ্যগ্রহণকারী ব্যক্তি যদি এমন কোন রোগে ভূগে থাকেন যাতে উপযুক্ত খাদ্যগ্রহণ করার পরও তার অন্ত্র এই খাবার থেকে  প্রয়োজনীয় উপাদান  গ্রহণ করতে পারে না ।  ফলে খাদ্যজনিত এ চর্মরোগ হয়ে থাকে ।  আর  ধনী বা উন্নত দেশগুলোতে এ্যালকোহল গ্রহণের একটা প্রচলন রয়েছে । এই এ্যালকোহল গ্রহণের ফলে মানুষের দেহে খাদ্য থেকে প্রয়োজনীয় উপাদান গ্রহণ ও তার ব্যবহার কমে যায় । ফলে এই মদ সেবনকারীদেরও  খাদ্য ঘাটতি জনিত রোগ দেখা দিতে পারে ।  এছাড়া কিছু মানসিক রোগী যারা  খেতে চায় না অথবা অস্বাভাবিক খাদ্য গ্রহণ করে থাকেন তাদেরও   খাদ্য ঘাটতি জনিত সমস্যা দেখা দিতে পারে । এছাড়া সাধারণত জটিল অপারেশনের পরে খাদ্যের ঘাটতি জনিত চর্ম রোগ দেখা দিতে পারে। 

রেডিও তেহরান : আচ্ছা যে চর্ম রোগ দেখা দিচ্ছে সেটি যে খাদ্যজনিত চর্ম রোগ তা নির্ণয় করার কোনো উপায় আছে কি

ডাক্তার শাহাবউদ্দিন আহমেদ চৌধুরী :হ্যা , খাদ্যজনিত চর্ম রোগের কিছু লক্ষণ রয়েছে । খাদ্যের বিভিন্ন উপাদানের অভাবে এ লক্ষণগুলো প্রকাশ পায় । আর খাদ্যের এ উপাদানগুলো হচ্ছে , আমিষ বা প্রোটিন, কার্বোহাইড্রেড বা শর্করা , ফ্যাট বা চর্বি , ভিটামিন বা খাদ্যপ্রাণ, খনিজ লবন ও পানি । খাদ্যের এসব  উপাদানের  অভাবে বিভিন্ন ধরনের উপসর্গ দেখা দেয় এবং একই ব্যক্তির একাধিক খাদ্যঘাটতি জনিত রোগের লক্ষণ একসাথেও দেখা দিতে পারে এবং প্রত্যেকটা রোগের জন্য আলাদা আলাদা লক্ষণ রয়েছে ।

রেডিও তেহরান : খাদ্যজনিত চর্ম রোগের প্রসঙ্গ ধরে আমরা এবারে জানতে চাচিছ খাদ্য কয়    প্রকার?

ডাক্তার শাহাবউদ্দিন আহমেদ চৌধুরী : খাদ্যকে আমরা সাধারণত ৬ ভাগে ভাগ করে থাকে । যেমন  আমিষ বা প্রোটিন, কার্বোহাইড্রেড বা শর্করা , ফ্যাট বা চর্বি , ভিটামিন বা খাদ্যপ্রাণ, খনিজ লবন ও পানি  । তবে প্রোটিন বা আমিষ, কার্বোহাইড্রেট বা শর্করা এবং ফ্যাট বা চর্বি এই ৩ টি হলো দেহের প্রধান এনার্জি উৎপাদক খাদ্য ।  আর এই এনার্জীকে ব্যবহার করার জন্য শরীরে প্রয়োজন হয় বিভিন্ন রকমের ভিটামিন ।  এছাড়া রয়েছে খনিজ লবন এবং সব খাদ্যের বড় খাদ্য পানি ।

রেডিও তেহরান : ডাক্তার শাহাবউদ্দিন আহমেদ এই যে আপনি একটু আগে বললেন, খাদ্যে যে শক্তিদায়ক উপাদান রয়েছে তা গ্রহণ করার জন্য চাই ভিটামিন। যাকে খাদ্যপ্রাণ বলা হয়ে থাকে। এখন এই ব্যাপারটি কি একুট পরিস্কার ভাবে আমাদের বুঝিয়ে দিবেন?

ডাক্তার শাহাবউদ্দিন আহমেদ চৌধুরী : জি আপনি ঠিকই বলেছেন ভিটামিনগুলোকে আমাদের খাদ্যের প্রাণ বলা হয় ।  অর্থাৎ  আমরা যে খাদ্যগুলো খেয়ে থাকি  শক্তি উৎপাদক আমিষ, শর্করা এবং চর্বি  এই খাদ্যগুলো শরীরে ব্যবহার করার ক্ষেত্রে বিভিন্ন স্তরে বিভিন্ন প্রকার ভিটামিনের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয় এবং ভিটামিন ছাড়া এই খাদ্যগুলো আমাদের শরীরের জন্য কর্মক্ষম নয় বলে আমরা ধরে নিতে পারি । এই ভিটামিনগুলোকে আমরা সাধারণত ২ ভাগে ভাগ করে নেই । একটা হলো ফ্যাট সলিবুল ভিটামিন বা চর্বিতে দ্রবণীয় এবং অপরটি হলো ওয়াটার সলিবুল ভিটামিন বা পানিতে দ্রবণীয় । এই ফ্যাট সলিবুল ভিটামিন হলো ভিটামিন এ, ভিটামিন ডি ও  ভিটামিন কে । আর পানিতে দ্রবীভূত হয় এমন খাদ্যপ্রাণ হলো ভিটামিন ডি, ভিটামিন বি ও ভিটামিন সি । তবে অনেকরকম ভিটামিন বি রয়েছে যেমন- ই১, ই২, ই৩, ই১২ ।  এধরনের ভিটামিনগুলো আমাদের শরীরে একান্তভাবে প্রয়োজন ।

রেডিও তেহরান : আচ্ছা ডাক্তার শাহাবউদ্দিন আহমেদ, খাদ্যে প্রয়োজনীয় ভিটামিন না থাকলে বা কম থাকলে সে জন্য কি চর্ম রোগ দেখা দিতে পারে?

ডাক্তার শাহাবউদ্দিন আহমেদ চৌধুরী : জ্বি ভিটামিন ‘এ’র অভাবে আমাদের শরীরের চামড়া অনেকটা ব্যঙ্গের চামড়ার মতো হয়ে যায় । চামড়াটা হয়ে পড়ে শুকনো, খসখসে এবং চামড়ার চুলের গোড়ায় সাধারণত ছোট ছোট গোটা হয়ে যায় । এটাকে আমরা মেডিক্যাল ভাষায় বলি সাইনো ডার্মা । ভিটামিন ডি সাধারণত মানুষের ত্বক বা চামড়াতেই তৈরি হয় , সূর্যের আলোর সাহায্যে । ভিটামিন ডি’র অভাবে সাধারণত কোন চর্ম রোগের লক্ষণ প্রকাশ পায় না । শুধুমাত্র কিছু ক্ষেত্রে চুল পড়ে যেতে পারে ।  কেননা এর প্রধান কাজ হলো মানুষের দেহের হাড়ে। ভিটামিন ‘কে’,  মানব দেহের ভিতরে অন্ত্রের মধ্যে তৈরি হয় এবং এর অভাবে রক্তের ক্ষমতা কমে যায় । ফলে ভিটামিন ‘কে’র অভাবে মানবদেহে  রক্ত ঝরার মত রোগ  দেখা দেয় । অর্থাৎ চামড়ার নিচে রক্ত জমাট বাঁধার মতো লক্ষণ প্রকাশ পেতে পারে । এছাড়া পানিতে দ্রবীভূত  ভিটামিনের মধ্যে রয়েছে ভিটামিন বি এবং থায়ামিন  । এসবের অভাবে হয় বেরিবেরি । এরপর রয়েছে ভিটামিন ই২  এর অভাবে সাধারণত বিভিন্ন ধরনের ঘা দেখা দেয়  এবং দেহের ত্বক বা চমড়া কালো হয়ে যায় ।

রেডিও তেহরান : খাদ্যজনিত চর্ম রোগ নিয়ে আপনি আমাদের রেডিও তেহরানের শ্রোতাদের উদ্দেশ্যে আর কিছু বলবেন কি?

ডাক্তার শাহাবউদ্দিন আহমেদ চৌধুরী :  খাদ্য ঘাটতি জনিত রোগ যতটা না দারিদ্রতার কারণে হয় তার চেয়ে বেশি হয় জ্ঞানের অভাবে ।  এমনকি অনেক ধনী বা উচ্চবিত্তদের মাঝেও খাদ্য ঘাটতিজনিত রোগ দেখা দেয়। কারণ তারা সাধারণত প্রোটিন বা আমিষ জাতীয় খাদ্য বেশি খেয়ে থাকেন  এবং  শাকসব্জিগুলো পারত পক্ষে খান বা খেলেও খুব কম পরিমাণে খান । এজন্য টাকাকড়ি বা অর্থ নয় বরং জ্ঞানই হচ্ছে খাদ্য ঘাটতি জনিত চর্ম রোগ দূর করার প্রধান উপায় । সেজন্য সুষম খাদ্য যেখানে আমিষ থাকবে, শর্করা থাকবে, ভিটামিন থাকবে, অর্থাৎ যে খাদ্যে সব ধরনের খাদ্যের উপাদান রয়েছে এ ধরনের খাদ্য খেয়ে আমরা খাদ্য ঘাটতিজনিত রোগ থেকে রক্ষা পেতে পারি । আর বিশেষ করে শিশুরা যখন মাতৃ দুগ্ধ ছেড়ে স্বাভাবিক খাদ্যে খেতে শুরু করে তখন খুব কেয়ারফুল হতে হবে ।

সুপ্রিয় পাঠক, এতোক্ষণ খাদ্যজনিত চর্মরোগ নিয়ে যে আলোচনা হলো তা থেকে আমরা নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছি যে  দামি খাবার দাবার মানেই সুষম খাদ্য নয়। তাছাড়া সাধারণ ভাবে দারিদ্রতা নয় বরং খাদ্য সংক্রান- সঠিক জ্ঞান না থাকার ফলেই সুষম খাদ্য গ্রহণ করা অনেক সময় সম্ভব হয় না। খাদ্য সর্ম্পকে সঠিক জ্ঞান থাকলে সীমিত বাজেট বা অল্প খরচের মধ্যে আমাদের পক্ষে সুষম খাদ্য গ্রহণ করা বা পরিবারে জন্য সুষম খাদ্যের যোগান দেয়া সম্ভব হয়ে উঠতে পারে। সুষম খাদ্য গ্রহণ করা হলে কেবল যে চর্ম রোগের হাত থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে তা নয় বরং আরো অনেক রোগ ব্যাধির হাত থেকেও রক্ষা পাওয়া সম্ভব হবে। দেহকে সু্‌স্থ্য রাখার স্বার্থে স্বাস্থ্য বিধি মেনে চলা দরকার সে কথাটা এ সাথে সবাইকে মনে করিয়ে দিতে চাই। স্বাস্থ্য রক্ষার ব্যাপারকে শিকলের সাথে তুলনা করা যায়। শিকলের কোনো একটা অংশ দুর্বল হয়ে গেলে তখন পুরো শিকল তার কার্যকারিতা হারায়। তাই সমস্ত শিকল সমভাবে জোরদার এবং অটুট থাকে সেদিকে সবার নজর দিতে হবে। একক ভাবে শিকলের কোনো একটি অংশকে শক্তিশালী করা হলে তাতে যথাযথ উপকার হবে না। অর্থাৎ স্বাস্থ্য রক্ষার একটি মাত্র বিধি পালন করা হলে তাতে স্বাস্থ্য রক্ষার গোটা বিষয়টা মোটেও রক্ষা করা হবে না এবং শেষ পর্যন্ত স্বাস্থ্য রক্ষা হবে।#

 

সোমবার, 10 মার্চ 2008 17:07

চুল পড়া

এ কথা বোধহয় অনেকেই জানেন না, যে কোনো সময়ই আমাদের মাথার দশ শতাংশ চুল বিশ্রামরত অবস্থায় থাকে। দুই তিন মাস এভাবে বিশ্রামরত থাকার পর এসব চুল পড়ে যেতে থাকে। আর ওই জায়গায় নতুন করে চুল গজাতে থাকে। চুলের এই বৃদ্ধি দুই থেকে ছয় বছর পর্যন্ত চলতে পারে। এ সময় প্রতি মাসে চুল গড়ে প্রায় এক সেন্টিমিটার করে বৃদ্ধি পায়। অর্থাৎ যে কোনো সময়ই মাথার ৯০ শতাংশ চুলই বৃদ্ধিরত অবস্থায় থাকে। কাজেই চুলের বৃদ্ধি সংক্রান্ত এই চক্রের অংশ হিসেবে মাথা থেকে কিছু কিছু চুল পড়াকে স্বাভাবিক হিসেবে গণ্য করা যেতে পারে। তবে নানা কারণে মাথার চুল পড়া হঠাৎ করে বেড়ে যেতে পারে। খাদ্যে জিংক সহ কিছু কিছু প্রয়োজনীয় উপাদানের ঘাটতি বা কোনো কঠিন অসুখ-বিসুখ কিংবা অপারেশনের পর পর মাথার চুল পড়তে পারে। হরমোন যেমন থাইরয়েড গ্রনি'র তৎরতা বেড়ে যাওয়ায় বা হ্রাস পাওয়ার কারণেও মাথার চুল পড়া শুরু হতে পারে। এ ছাড়া সন্তান হওয়ার তিন মাস পরে কোনো কোনো মহিলার চুল হঠাৎ করে পড়তে থাকে এবং দেহের হরমোন সংক্রান্ত জটিলতার কারণেই এমনটা ঘটে থাকে। সাধারণ ভাবে গর্ভকালে নারী দেহে নানা রকম হরমোনের পরিমাণ বেড়ে যায়। এ সময়  দেহে হরমোনের পরিমাণ বেড়ে যাওয়ার কারণে চুল পড়া বন্ধ থাকে। সন্তান জন্মগ্রহণ করার পর দেহের  হরমোন স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে এলে  এসব চুল  পড়তে শুরু করে। সে সময় দেহ আবার চুল বৃদ্ধি ও ঝরে যাওয়ার পুরানো চক্রে ফিরে যায়। চুল নিয়ে এতো কথা বলা হলো রেডিও তেহরানের এক শ্রোতা ভাইয়ের চিঠির প্রসংগে। ভারতের বাকুড়া জেলার তালডাংরা থানার পিয়ারডোবা ডাকঘরের রাজপুর গ্রাম থেকে শ্রোতা ভাই সাইফুদ্দিন খান চুল উঠে যাওয়ার সমস্যায় ভুগছেন বলে জানিয়েছেন। তার বয়স ১৯ বলে চিঠিতে উল্লেখ করেছেন। এই সংকটের হাত থেকে এই শ্রোতা ভাই কি করে রক্ষা পেতে পারেন তা জানতে চেয়েছেন। এ ব্যাপারে আমরা কথা বলেছি বাংলাদেশের  ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজের ত্বক  ও যৌন ব্যাধি বিভাগের প্রধান, সহযোগী অধ্যাপক ডা. শাহাবউদ্দিন আহমেদ চৌধুরীর সাথে। এখানে তার সাক্ষাৎকারটি উপস্থাপন করা হলো ।

রেডিও তেহরান : আচ্ছা ডাক্তার শাহাবুউদ্দিন আহমেদ চৌধুরী প্রথমেই আমরা জানতে চাইবো মানব দেহে কি কি ধরনের চুল থাকে ?

ডাক্তার শাহাবুউদ্দিন আহমেদ চৌধুরী : নবজাতক শিশু যে চুল নিয়ে জন্ম নেয় সেগুলো একসময় সবই পড়ে য়ায় । এরপরে মানব দেহে যে নতুন চুল গজায় সেগুলো হালকা। আর বড় ও অধিক ঘন যে চুলগুলো মাথায় , ভ্রুতে থাকে এগুলোকে আমরা বলি টার্মিনাল হেয়ার । আবার প্রত্যেকটা চুল বিভিন্ন পর্যায় অতিক্রম করে । যেমন চুলের একটা গ্রোথ খাকে   এবং এই বাড়ন্ত কালটা হচ্ছে এক হাজার দিন । চুলের আর একটা স্টেজ রয়েছে যাকে আমরা রেস্টিং স্টেজ বলি । সাধারণত এর সময় একশ দিন হয়ে থাকে। এছাড়া এই দুই ধরনের চুলের মাঝামাঝি চুলের আরেকটা স্টেজ রয়েছে যার সময়কাল প্রায় ১০ দিন ।

রেডিও তেহরান : মানব দেহে সাধারণ ভাবে কি পরিমাণ চুল থাকে?

ডাক্তার শাহাবুউদ্দিন আহমেদ চৌধুরী : এটা মানব দেহের আকারের উপর নির্ভর করে। তবে মাথার চুল গণনা করে দেখা গেছে যে মাথায় সাধারণত এক লক্ষ চুল থাকে এবং এরমধ্যে গড়ে দৈনিক একশটি চুল পড়া স্বাভাবিক ।

রেডিও তেহরান : জ্বি এই চুল পড়ার সূত্র ধরেই জানতে চাইবো, চুল কেনো পড়ে ?

ডাক্তার শাহাবুউদ্দিন আহমেদ চৌধুরী : চুল পড়াকে বড় ভাবে দুই ভাগে ভাগ করা হয়। একটি হলো অস্থায়ী  এবং আরেকটা হলো স্থায়ী চুল পড়া । অস্থায়ী চুল পড়ার মধ্যে  অনেকগুলো ধরন রয়েছে । যেমন হঠাৎ করে মাথা, ভ্রু বা শরীরের যেকোন অংশে অল্প এলাকায় চুলগুলো পড়ে যাওয়া । হয়তো রাতে ঘুমালো, সকালে ওঠে দেখে মাথায় চুল নেই । এটাকে প্রচলিত ভাষায় বলা হয় কেউ চুল কেটে নিয়ে গেছে । আসলে এটা একটা রোগের জন্য হয় । এই অল্প এলাকায় চুল পড়া যখন পুরনো হয়ে যায় । তখন এটাকে আমরা বলি এলোকেশিয়া টোটালিস্ট । অর্থাৎ এ অবস্থায় পুরো মাথা এবং সমগ্র শরীরে চুল পড়ে যায় । সাধারণত কোন ওষুধ খেলে বিশেষ করে ক্যান্সারের ওষুধ খেলে এভাবে চুল পড়ে । কিছু চুল পড়া রয়েছে যেগুলো বড় ধরনের কোন রোগের কারণে হয়ে থাকে । যেমন অপারেশন হলে, অথবা মেয়েদের ডেলিভারী হলে, দীর্ঘদিন জ্বর থাকলে কিংবা  বেশি ডাইড কন্ট্রোল করলে ।

রেডিও তেহরান : আমাদের যে শ্রোতা ভাইটি চুল পড়ার কথা বলেছেন, তার চুল কেনো পড়ছে?

ডাক্তার শাহাবুউদ্দিন আহমেদ চৌধুরী : আমাদের এই ভাইটি যে সমস্যার কথা বলেছেন, এই বয়সে সম্ভবত সেটি তার হরমোনের জন্য হয়ে থাকতে পারে । বয়ঃসন্ধি অতিক্রম করার পরে আমাদের শরীরে যে এ্যান্ড্রোজেন তৈরি হয় তার প্রভাবে বিশেষ প্যাটার্নে  মাথার চুল পড়ে যায় । এটাকে আমরা এ্যান্ড্রোজেনিক এলোকেশিয়া বা মেইল পেটার্ন এলোকেশিয়া বলি । এটা মূলত পুরুষের হয়  আবার কিছু কিছু ক্ষেত্রে মেয়েদেরও হয়ে থাকে । এছাড়া যদি কোন কারণে কারো মানসিক টেনশন, হতাশা বা দুশ্চিন্তা থাকে তখন  তারা অনেক সময় আসে- আসে- নিজের অজান্তেই মাথার চুল তুলে ফেলেন । যেমন টিভি দেখছেন অথবা সিনেমা দেখছেন অথবা লেখাপড়া করছেন কিন্তু হাতটা মাথায় এবং চুল তুলছেন । এছাড়া শরীরের কিছু অভ্যন্তরীণ রোগ যেমন ডায়াবেটিস, রক্ত চলাচল কমে যাওয়া, অথবা থাইরয়েড গ্লান্ডের কাজ বা ক্ষমতা কমে যাওয়ার ফলে চুল পড়ে যেতে পারে । এগুলো হলো অস্থায়ী কারণ । আবার বেশ কিছু চর্ম রোগের কারণে স্থায়ীভাবে চুল পড়ে যায় । তবে এই স্থায়ী চুল পড়ার একটা অন্যতম  কারণ হলো গরম চিরুণি দিয়ে যদি কেউ মাথা আচড়ায় অর্থাৎ চুলের সৌন্দর্য  বর্ধিত করার জন্য । যাকে আমরা হটকম এলোকেশিয়া বলি। এছাড়া অনেকেই রয়েছে যারা খুব টাইট করে চুল বাঁধেন । এই ক্ষেত্রেও স্থায়ীভাবে চুল পড়ে যেতে পারে । এছাড়া অনেক সময় মাথায় টিউমার হলে, বেশি চাপ পড়লে , প্রভৃতি কারণে স্থায়ীভাবে চুল পড়ে যেতে পারে ।

রেডিও তেহরান : শ্রোতা ভাই সাইফুদ্দিন খানকে চিকিৎসার জন্য কি করতে হবে?

ডাক্তার শাহাবুউদ্দিন আহমেদ চৌধুরী : প্রথমত তার কি ধরনের চুল পড়ছে এটাতো আমাদের কাছে অস্পষ্ট । তবে ১৯ বছর বয়সে সাধারণত যে চুল পড়ে সেটার সর্বাধিক কারণ হলো মেইল পেটার্ন এলোকেশিয়া বা এন্ড্রোজেনিক এলোকেশিয়া । অর্থাৎ মানুষ যখন বয়ঃসন্ধি অতিক্রম করে টিন এইজ পার হয় তখন শরীরে এন্ড্রোজেন তৈরি হয় যেটাকে বলা হয় সেক্স হরমোন ।এই হরমোনের ফলে চুলের উপর যে প্রভাব পড়ে এতে অনেকের চুল পড়ে যায় । অর্থাৎ  শরীরের যে অংশের চুল প্রয়োজন বিশেষ করে মাথায় সেখানে পড়ে যায় আর মেয়েদের ক্ষেত্রে যেখানে চুলের প্রয়োজন নেই সেখানে চুল গজায় । একই হরমোনের দুটো কাজ । স্বাভাবিক চুল যেখানে থাকার প্রয়োজন সেখানে চুল পড়ে যায় আর যেখানে কাঙ্খিত নয় সেখানে অনাকাঙ্খিত চুল গজায়। শ্রোতা ভাইটির ক্ষেত্রে মনে হয় এই বয়সে তার  চুল পড়ার এটিই কারণ হতে পারে । এক্ষেত্রে যা করা যেতে পারে তা হলো তাকে প্রথমত পরীক্ষা করতে হবে কি কারণে তার চুল পড়ছে ? যদি বয়সের কারণে হয়  তাহলে মিনক্সিডিল নামে একটা লোশন রয়েছে । এটি প্রেসারের ওষুধ হিসেবে ব্যবহৃত হয় । এই মিনক্সিডিল আমরা যদি মাথায় লাগাই তাহলে মাথায় চুল গাজাবে । তবে এই ওষুধের বিভিন্ন মাত্রা রয়েছে যেমন এক পার্সেন্ট, দুই পার্সেন্ট, ৫ পার্সেন্ট । চিকিৎসকের পরামর্শ মোতাবেক এই ওষুধের এর মাত্রা পর্যায়ক্রমে বাড়াতে হবে । এছাড়া যেহেতু এন্ড্রোজেনের জন্য চুল পড়ে যায় সেজন্য এই এন্ড্রোজেনের এগেইন্সটে আমরা যে  ওষুধগুলো দেই, মহিলাদের ক্ষেত্রে তার সাথে এস্ট্রোজেন যোগ করতে হবে । এই ওষুধগুলো  ব্যবহার করলে চুল পড়া বন্ধ হবে এবং অনেক ক্ষেত্রে চুল গজাবে । এ ছাড়া  খাদ্য ঘাটতি জনিত কারণে চুল পড়ছে কিনা সে ব্যাপারেও নিশ্চিত হওয়ার জন্য ডাক্তার শাহাবুউদ্দিন তাকে পরামর্শ দেন। যে খাদ্যের ঘাটতির জন্য চুল পড়ছে সে ঘাটতি পূরণ করা হলে চুল পড়া বন্ধ হয়ে যাবে বলে তিনি জানান। চুল পড়া বন্ধ না হলে আজকাল মাথায় চুল প্রতিস্থাপন করাও সম্ভব বলে তিনি জানান।

রেডিও তেহরান : অর্থাৎ শ্রোতা ভাই সাইফুদ্দিন খানের অবিলম্বে একজন ডারমাটোলজিস্ট বা ত্বক বিশেষজ্ঞের স্মরণাপন্ন হওয়া উচিত বলে কি আপনি মনে করেন?

ডাক্তার শাহাবুউদ্দিন আহমেদ চৌধুরী : অবশ্যই । এক্ষেত্রে হতাশ না হয়ে যদি তিনি সঠিক চিকিৎসা নেন তাহলে ভালো হওয়ার সম্ভাবনাই সর্বাধিক ।

শ্রোতা ভাই ভাই সাইফুদ্দিন খানের মতো যারা চুল পড়ার সংকটে ভুগছেন তারা এই আলোচনা থেকে উপকৃত হবেন এবং দ্রুত চিকিৎসার জন্য একজন ভালো চিকিৎসকের সাথে যোগাযোগ করবেন বলে আশা করছি। #

 

 

সোমবার, 10 মার্চ 2008 17:02

নাকের প্রদাহ

আমরা যে  সব রোগে কষ্ট পাই তার মধ্যে নাকের প্রদাহ একটি সাধারণ রোগ। এ রোগে একবারও ভোগেন নি এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া সত্যিই খুব মুশকিলের ব্যাপার হয়ে দাঁড়াবে। তবে সময়মত সর্তক হলে  বিব্রতকর এই অসুখকে অনায়াসে প্রতিহত করা যেতে পারে। নাকের প্রদাহ ও তার প্রতিকার এবং চিকিৎসা নিয়ে রেডিও তেহরান থেকে প্রচারিত নিয়মিত সাপ্তাহিক স্বাস্থ্য বিষয়ক অনুষ্ঠান 'আপনার স্বাস্থ্য'  আলোচনা করেছেন সৌদি আরবে কর্মরত বাংলাদেশের নাক কান ও গলা বিশেষজ্ঞ ডা.মাহবুবুর রহমান। আলোচনার শুরুতেই ডাক্তার মাহবুব নাকের প্রদাহ কারণ কি সে সর্ম্পকে  আলোকপাত করেন। তিনি আমাদের বললেন, নাক দুই অংশে বিভক্ত । এর একটি হলো বর্হি নাক বা এক্সটার্নাল নোজ আর অন্যটি হলো নোজাল ক্যাভেটি বা ভেতরের অংশ। নাকের এই বাইরের অংশটি ত্বক দ্বারা আচ্ছাদিত এবং নাকের এই অংশে নানা ধরণের ইনফেকশন বা সংক্রমন হতে পারে। একই ভাবে নাকের ভেতরের অংশেও নানা ধরণের ইনফেকশন ঘটতে পারে। নাকের বাইরের অংশ চামড়া দিয়ে ঢাকা, কাজেই দেহের অন্যান্য স্থানে ত্বকে যে সব সংক্রমণ ঘটতে পারে। অনুরুপ সংক্রমণ নাকের এই বাইরের অংশও ঘটতে পারে। নাকের ভেতরের অংশে ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়া সৃষ্ট নানা ধরণের সংক্রমণ ঘটতে পারে। অথবা উভয়ই একত্রে প্রদাহ ঘটাতে পারে। এর্লাজি নাকের প্রদাহের আরেকটি কারণ। এ ছাড়া শারীরিক ও রাসায়নিক ট্রমার কারণেই নাকের প্রদাহ হতে পারে বলে ডা. মাহবুব জানিয়েছেন। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়াই কোনো কোনো নাকের ড্রপ দীর্ঘদিন ব্যবহার করা হলে তার ফলে নাকে রাসায়নিক ট্রমা হতে পারে। তবে নাকের প্রদাহের সবচেয়ে প্রধান কারণ হলো ভাইরাস। ভাইরাস দিয়ে নাকের প্রদাহের শুরু হয় এবং পরে সেখানে  ব্যাকটেরিয়া এসে হামলা করে।

সচরাচর নাকের প্রদাহ সৃষ্টিকারী ভাইরাস গুলো হচ্ছে, রাইনো ভাইরাস,ইনফুলেয়েঞ্জা ভাইরাস, প্যারা ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাস প্রভৃতি।  ডা. মাহবুব রেডিও তেহরানকে আরো জানিয়েছেন, যার এ ধরণের সংক্রমণ ঘটেছে তার সংস্পর্শে গেলে এ ধরণের সংক্রমণ ঘটতে পারে অর্থাৎ এটি খুব ছোঁয়াচে রোগ।  সংক্রমণ ঘটার এক থেকে তিনদিন পরে সাধারণভাবে নাকের পেছনের দিকে খানিকটা জ্বালা হতে পারে। এরপরই হাঁচি এবং একই সাথে খানিকটা কাঁপুনি দেখা দিতে পারে বা শীত শীত লাগতে পারে। এরপর নাকের ঘ্রাণ শক্তিও হ্রাস পেতে পারে। এইসব লক্ষণ দেখা দেয়ার পর পরই নাক দিয়ে প্রচুর পানি পড়া শুরু হবে ও নাক বন্ধ হয়ে যাবে। এ সময়ে জ্বর আসতে পারে। ভাইরাসের হামলার পথ ধরে ব্যাকটেরিয়া নাকে হামলা চালানোর পর নাকের পানির রং বদলে যাবে। অর্থাৎ এগুলো হলুদাভ বা গাঢ় হলুদ বর্ণ ধারণ করবে। তবে এ জাতীয় নাকের প্রদাহ থেকে মারাত্মক কোনো জটিলতা দেখা না দিলেও এ জাতীয় রোগ বিব্রতকর হয়ে দাঁড়াতে পারে। আর সঠিকভাবে চিকিৎসা না করলে সেকেন্ডারী যে সব সংক্রমণ ঘটে তা পরবর্তীতে লিম্ব নোডগুলোকে আক্রমণ করতে পারে। নাকের পেছন দিক থেকে কান পর্যন্ত দুইটি টিউব গেছে, এই দুই টিউব থেকে সংক্রমণ কান পর্যন্ত ছড়িয়ে যেতে পারে।

নাকের প্রদাহের চিকিৎসার কথা উঠলেই প্রথমে দরকার সর্তকতার- এ কথা জানালেন ডা. মাহবুব।  এ জন্য এ জাতীয় কোনো রোগীর সংস্পর্শে যাওয়া যাবে না। রোগীর হাঁচি কাশির এলাকায় যাওয়া যাবে না। তবে এরপরও যদি কেউ এমন রোগে আক্রান্ত হয় তবে প্রথমেই তাকে বিছানায় বিশ্রাম নিতে হবে। এ ধরণের বিশ্রাম নেয়াটাই সবচেয়ে ভাল সুফল বয়ে আনে। এরপর রোগীকে প্যারাসিটামল জাতীয় বেদনানাশক ওষুধ সেবন করতে হবে। এ সব ক্ষেত্রে চিকিৎসকরা রোগীর আরামের কথা বিবেচনা করে তাকে এন্টি হিসটামিন ও নাকের ড্রপও দিয়ে থাকেন। গরম পানির বাষ্প যদি এ সময় গ্রহণ করা হয় তবে রোগী আরাম পাবে বলে ডা.মাহবুব জানিয়েছেন। পরবর্তী পর্যায়ে প্রয়োজন পড়লে চিকিৎসক এন্টিবায়োটিকও দিতে পারেন বলে তিনি জানিয়েছেন। ভাইরাসের উপর এন্টিবায়োটিক কাজ করে না বলে ব্যাকটেরিয়া নাকে আক্রমণ চালালেই কেবল এন্টি বায়োটিক প্রদান করা হয়।  ডা. মাহবুবুর রহমান তার সাক্ষাৎকারে শেষের দিকে সবার উদ্দেশে জোর দিয়ে বলেছেন, সর্তকতাই এ জাতীয় রোগের হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার সবচেয়ে বড় উপায়।