এই ওয়েবসাইটে আর আপডেট হবে না। আমাদের নতুন সাইট Parstoday Bangla
রাজনীতি

পৃথিবীর ইতিহাস সত্য ও মিথ্যার দ্বন্দ্বের ইতিহাস। সত্য ইতিহাস হচ্ছে সভ্যতার প্রকৃত দর্পণ। আর প্রকৃত ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেয়া ছাড়া কোনো জাতি উন্নতি ও অগ্রগতির সোপানগুলো অতিক্রম করতে পারে না। কিন্তু বলা হয় শক্তিমান ও বিজয়ীরাই ইতিহাস লেখে। জালিম ও আধিপত্যকামী শক্তিগুলো যুগে যুগে ইতিহাসকে তাদের স্বার্থে করেছে বিকৃত। বিশেষ করে উপনিবেশবাদী পশ্চিমা শক্তিগুলো দেশে দেশে তাদের শোষণ-লুণ্ঠন, হত্যাযজ্ঞ ও বর্বরতাসহ নানা অপরাধকে ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা করেছে, কিংবা সেইসব অপরাধের পক্ষে নানা অপযুক্তি দেখিয়ে সেগুলোকে বৈধ ও অনিবার্য বলে দেখানোর চেষ্টা করেছে। 

 

অবশ্য বড় ধরনের অপরাধগুলো কখনও পুরোপুরি গোপন রাখা যায় না এবং হাজারো অপযুক্তি দেখিয়েও সেসবকে বৈধ বলে চালিয়ে দেয়া যায় না। বিশ্বের নানা অঞ্চলে উপনিবেশবাদী ব্রিটেনের অপরাধযজ্ঞও এমনই একটি বিষয়। ভারত উপমহাদেশের বৃহত্তর বাংলায় ১১৭৬ বাংলা সনের তথা ১৭৬৯-৭০ খ্রিস্টাব্দের মহা-দুর্ভিক্ষকে অনেক গবেষকই ব্রিটিশদের পরিকল্পিত গণহত্যা বলে মনে করছেন।  সেই থেকে ১৮টি দশক তথা ১৮০ বছর ধরে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদীরা বৃহত্তর বাংলা ও ভারতের নানা অঞ্চলে ক্ষুধাকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে প্রায় দশ কোটি মানুষকে হত্যা করেছে বলে তারা প্রামাণ্য নানা তথ্য-উপাত্ত তুলে ধরেছেন।

 

বলা হয় ১৭৬৯ থেকে ১৭৭৩ সালের খরায় নিহত হয়েছিল এক কোটি বাঙ্গালি। বৃহত্তর বাংলার এক তৃতীয়াংশ জনসংখ্যা কমে যায় এর ফলে। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ইংরেজরা একদল বিশ্বাসঘাতক ও লোভী কর্মকর্তা আর ব্যবসায়ীর সঙ্গে ষড়যন্ত্র পাকিয়ে প্রহসনের এক যুদ্ধে বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজ-উদ-দৌলাকে পরাজিত ও শহীদ করার ৫ বছরের মধ্যেই ঘটানো হয় এই কৃত্রিম দুর্ভিক্ষ।  এ দুর্ভিক্ষে বাংলার মানুষ যখন ক্ষুধার জ্বালায় মরছিল তখন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কর্মকর্তারা লন্ডনে তাদের মনিবদের কাছে চিঠি পাঠিয়ে জানিয়েছিল যে তারা বাণিজ্য হতে ও বিপুল পরিমাণ খাদ্য রপ্তানি করে সর্বোচ্চ মাত্রার মুনাফা অর্জন করেছে! 

 

এ সময় ইংরেজরা পুতুল সরকার হিসেবে মিরজাফরকে নামেমাত্র নবাবের  পদে রাখলেও রাজস্ব আদায় ও ব্যয়ের পূর্ণ কর্তৃত্ব পায় তাদের কোম্পানি। আর এই সুযোগে কোম্পানির লোকেরা খাজনা আদায়ের নামে অবাধ লুণ্ঠন ও অত্যাচার শুরু করে দেয়।  বিপুল অংকের খাজনা পরিশোধ করতে গিয়ে কৃষকরা অর্থহীন ও শস্যহীন হয়ে পড়েছিল। ফলে তাদের চাষাবাদের ক্ষমতা রহিত হয়ে যায়। এ অবস্থায় আগেই সব শস্য বিক্রি করতে বাধ্য হওয়ার পর  খরা দেখা দেয়ায় কৃষকরা সপরিবারে মারা যায় অনাহারে। ব্রিটিশদের অনুচর মুসলমান-বিদ্বেষী জমিদাররা অতি উচ্চ হারের খাজনা মওকুফ করলে বা খাজনার চড়া হার সহনীয় পর্যায়ে নামিয়ে আনলে এবং কিছুটা খাদ্য ত্রাণ সাহায্য হিসেবে বিতরণ করা হলে এই গণহত্যা ঘটতো না।  

 

সুজলা সুফলা শস্য-শ্যামল ও নদীমাতৃক বাংলা পৃথিবীর সবচেয়ে উর্বর অঞ্চলগুলোর মধ্যে অন্যতম। বাংলাকে বলা হত গোটা ভারতবর্ষের সবচেয়ে বড় শস্য-ভাণ্ডার। গোলা ভরা ধান আর পুকুর ভরা মাছ ছিল সে সময়কার বাংলার সাধারণ চিত্র। গ্রামাঞ্চলের প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই ছিল পুকুর যা এখনও আছে। কিন্তু ব্রিটিশদের দানবীয় হস্তক্ষেপ আগুন জ্বালিয়ে দিল এই সুখের রাজ্যে। ব্রিটিশরা বাংলার ক্ষমতা দখলের পর থেকে এ অঞ্চলে ত্রিশ থেকে ৪০টি ছোট-বড় দুর্ভিক্ষ হয়েছে। এসব দুর্ভিক্ষে নিহতের যেসব সংখ্যা ব্রিটিশ উপনিবেশবাদী শাসকরা উল্লেখ করে গেছে নিহতের প্রকৃত সংখ্যা তার চেয়েও অনেক বেশি হতে পারে। 

 

বাংলায় ব্রিটিশ শাসকদের মাধ্যমে সর্বশেষ বড় দুর্ভিক্ষটি ঘটানো হয় ১৯৪২ থেকে ১৯৪৫ সালের মধ্যে। ব্রিটিশদের দেয়া তথ্য অনুযায়ী এ তিন বছরে কমপক্ষে চার কোটি মানুষ মারা যায় অনাহারে।

১৯৪২ সালের মে মাসে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে জাপানি সেনারা বার্মা দখল করে নেয়। ওদিকে সুভাস চন্দ্র বসুর নেতৃত্বে স্বাধীনতাকামী ভারতের জাতীয় সেনাদলও পূর্ব দিক থেকে ভারতে হামলা করতে পারে বলে ব্রিটিশ দখলদাররা আশঙ্কা করছিল। এ সময় নিষ্ঠুর ব্রিটিশরা পোড়ামাটির নীতি গ্রহণ করে। এ কূটচাল অনুযায়ী জাপানি সেনারা যাতে খাদ্য পেতে না পারে সে জন্য সব খাদ্য কিনে নেয় ব্রিটিশরা। অনেক ক্ষেত্রে ব্রিটিশ সেনারা খাদ্য লুট করে ও বহু স্থানীয় অধিবাসীকে হত্যা করে। জাপানিদের হাতে বিতাড়িত ব্রিটিশ সেনারা আশ্রয় নিতে থাকে কোলকাতা ও চট্টগ্রামে। ব্রিটিশ সরকার তাদের জন্য খাদ্য কিনতে থাকায় খাদ্যের দাম আকাশস্পর্শী হয়ে ওঠে। 

 

জাপানি সেনারা যাতে বঙ্গোপসাগরে নৌকা ব্যবহার করতে না পারে সে জন্য জেলেদের প্রায় ৭০ হাজার নৌকা আটক করে ব্রিটিশ সরকার। ফলে একদিকে যেমন মাছ ধরা অসম্ভব হয়ে পড়ে তেমনি ধান ও পাট বাজারে আনাও কৃষকদের জন্য অসম্ভব হয়ে পড়ে। ফলে সাধারণ মানুষের অর্থনীতি ভেঙ্গে পড়ে। বিমানবন্দর, সেনা-ঘাঁটি ও শরণার্থী শিবিরের মত নানা স্থাপনা নির্মাণের জন্য ব্রিটিশরা প্রায় দুই লাখ বাঙ্গালির জমি কেড়ে নেয়। ফলে তারা হয়ে পড়ে গৃহহারা। 

 

ব্রিটিশ সরকার ভারতের অন্যান্য অঞ্চল থেকে বাংলায় খাদ্য পাঠানোর ওপরও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। জাপানিরা সম্ভাব্য হামলার সময় যাতে খাদ্য না পায় সে জন্য এই বর্বর পদক্ষেপ নেয় দখলদার ব্রিটিশ সরকার।

 

অন্যদিকে অপেশাদার ব্যবসায়ীদেরকে এ সুযোগ দেয়া হয় যে তারা যে কোনো অঞ্চল থেকে খাদ্য সংগ্রহ করে খুব চড়া দামে তা সরকারের কাছে বিক্রি করতে পারবে। এভাবে বাংলার সমস্ত খাদ্য-শস্য জমা হতে থাকে কেবল সরকারি গুদামে। অন্যদিকে খাদ্য-শস্যের দাম আগুন হয়ে ওঠে। আর অসাধু ব্যবসায়ীরা আরও চড়া দামে সরকারের কাছে শস্য বিক্রির আশায় বাজারে খাদ্য না বেচে মজুতদারির আশ্রয় নেয়।

 

এদিকে ব্রিটিশ সরকার সেনাদের ব্যয়ভার মেটানোর জন্য ব্যাপক পরিমাণ কাগুজে নোট ছাপায়। ফলে দেখা দেয় মুদ্রাস্ফীতি। অন্য কথায় জনগণের কাছে থাকা অর্থের ক্রয়মূল্য কমে যায়।  এভাবে দেখা দেয় কৃত্রিম দুর্ভিক্ষ। কিন্তু দখলদার ব্রিটিশ সরকার তা স্বীকার করেনি এবং জরুরি অবস্থাও ঘোষণা করেনি, ত্রাণ সাহায্য দেয়া তো দূরের কথা।

 

যুদ্ধের আগে দখলদার ব্রিটিশ সরকার প্রায় দুই কোটি টন খাদ্য কিনেছিল। ৪২-৪৩ সনে রেকর্ড মাত্রায় উদ্বৃত্ত খাদ্য ছিল বলেও ওই সরকার স্বীকার করেছিল। বাংলার শোচনীয় অবস্থার কথা ব্রিটেনের সংসদে তোলা হয়। ফলে ৪৩ ও ৪৪ সনে ভারতে মাত্র প্রায় ৫ লাখ টন খাদ্য পাঠানোর উদ্যোগ নেয়া হয়। অথচ কেবল ৪৩ সনে ব্রিটেনের ৫ কোটি নাগরিকের জন্য কেনা হয়েছিল এক কোটি টন খাদ্য।  ব্রিটেনের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী চার্চিল বার বার ভারতে খাদ্য রপ্তানি করতে অস্বীকৃতি জানিয়ে আসছিল যদিও দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে প্রায় ২৫ লাখ ভারতীয় ব্রিটেনের সেনাবাহিনীতে যোগ দেয়।

বলা হয় সেই দুর্ভিক্ষে বাঙালীদের মৃত্যুতে তৎকালীন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী জেনারেল উইনস্টন চার্চিল উল্লাস করেছিল!

 

অস্ট্রেলিয়ান প্রাণ-রসায়নবিদ ড. গিদেন পলইয়া তৎকালীন বাংলার ঐ দুর্ভিক্ষকে ‘মানবসৃষ্ট গণহত্যা’ বলে অভিহিত করেছেন। কারণ চার্চিলের নীতিই ঐ দুর্যোগের জন্য দায়ী ছিল। ১৯৪২ সালেও বাংলায় বাম্পার ফলন হয়েছিল। কিন্তু ব্রিটিশরা বিপুল পরিমাণ খাদ্যশস্য ভারত থেকে ব্রিটেনে নিয়ে যায়। যার ফলে এখানে ব্যাপক খাদ্যাভাব দেখা যায়।

বর্তমান সময়ের পশ্চিমবঙ্গ, উড়িষ্যা, বিহার এবং বাংলাদেশে ঐ দুর্ভিক্ষ দেখা দিয়েছিল।

 

এই কৃত্রিম দুর্ভিক্ষে অনাহারে ধুকে ধুকে মরতে থাকা মানুষের ছবি এঁকে বিখ্যাত হয়েছিলেন শিল্পী জয়নুল আবেদিন।

মধুশ্রী মুখার্জির লেখায় ঐ দুর্ভিক্ষ-পীড়িত মানুষদের কথা উঠে এসেছে। দুর্ভিক্ষে নিহতদের পরিবার সদস্য এবং দুর্ভিক্ষে বেঁচে যাওয়া মানুষদের জবানিতে ঐ চরম সময়ের কথা উঠে এসেছে।

চার্চিলের ঐ গোপন যুদ্ধ নিয়ে তিনি লিখেন: ‘মা বাবারা তাদের ক্ষুধার্ত ছেলেমেয়েদেরকে কুয়াতে ও নদীতে ফেলে দিতো। অনেকে ট্রেনের সামনে নিজেকে ফেলে দিয়ে আত্মহত্যা করতো। ক্ষুধার্ত মানুষ ভাতের মাড় চেয়ে ভিক্ষা করতো। শিশুরা পাতা, ফুল, ঘাস এবং বিভিন্ন তৃণমূল খেত। মানুষ এতই দুর্বল ছিল যে তারা তাদের প্রিয়জনদের দাফন পর্যন্ত করতে পারতো না।’

 

দুর্ভিক্ষে বেঁচে যাওয়া এক ব্যক্তি মুখার্জিকে বলেন, ‘শেষকৃত্য করার মত কারও গায়ে শক্তি ছিল না। বাংলার গ্রামগুলোতে মরদেহের স্তূপ থেকে কুকুর শিয়ালরা তাদের ভুরিভোজ করতো। মায়েরা খুনিতে পরিণত হয়েছিল, গ্রামগুলো হয়ে পড়ে পতিতা-পল্লী। আর বাবারা ছিল কন্যা সন্তান পাচারকারী।’

মনি ভৌমিক নামের একজন বিখ্যাত চিকিৎসাবিদ, সেই দুর্ভিক্ষ নিয়ে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা তুলে ধরে জানান, তাকে এক মুঠো খাবার দেয়ার জন্য তার নানী তার অল্প খাবারটুকুও তাকে দিয়ে দিতেন। এতে তিনি না খেয়ে মারা যান।

 

১৯৪৩ সালে ক্ষুধার্ত মানুষের দল কলকাতায় এসে ভিড় জমায় যাদের বেশিরভাগই রাস্তায় মারা যায়। এরকম ধ্বংসযজ্ঞের মাঝে হৃষ্টপুষ্ট ব্রিটিশ সেনাদের উপস্থিতিকে ‘ভারতে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে শেষ রায়’ হিসেবে দেখেন ইংরেজ-ভক্ত জওয়াহারলাল নেহরু।

চার্চিল খুব সহজেই এই দুর্ভিক্ষটি এড়াতে পারত। এমনকি কয়েক জাহাজ খাবার পাঠাইলেই অনেক উপকার হতো। কিন্তু একে একে দুজন ভাইসরয়ের আবেদনকে একগুঁয়েমির সাথে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। এমনকি তিনি তার পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতির আবেদনের প্রতিও কর্ণপাত করেননি।

নেতাজি সুভাস চন্দ্র বসু তখন অক্ষ শক্তির পক্ষ নিয়ে লড়াই করছিলেন। তিনি মায়ানমার (বার্মা) থেকে চাল পাঠানোর প্রস্তাব করেন। ব্রিটিশরা তো তার চাল আসতে দেয়নি এমনকি সুভাস বসুর প্রস্তাবের খবরটি পর্যন্ত চাপা দিয়ে রেখেছিল।

 

নিষ্ঠুর চার্চিল বাঙালীদেরকে মৃত্যুর মিছিলে রেখে খাদ্য শস্য ব্রিটিশ সেনা ও গ্রিক নাগরিকদের জন্য পাঠাচ্ছিল। তার কাছে ‘ভুখা বাঙালীর না খেয়ে থাকার চেয়ে সবল গ্রিকদের না খেয়ে থাকা অনেক গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার।’ তার এই মতকে সমর্থন দিয়েছিল তৎকালীন ‘ভারত ও বার্মা বিষয়ক’ ব্রিটিশ মন্ত্রী লিওপল্ড এমেরি।

এমেরি ছিল একজন কড়া উপনিবেশবাদী। তারপরও তিনি চার্চিলের ‘হিটলারের মত মনোভাবের’ নিন্দা করেছিল। চার্চিল শস্য পাঠানোর জন্য এমেরির জরুরি আবেদন এবং তৎকালীন ভাইসরয় আর্চিবাল্ড ওয়াভেল এর প্রার্থনার উত্তর দেয় একটি টেলিগ্রামে। সেখানে চার্চিল লিখেছিল, গান্ধী কেন তখনো মরেন নি!

 

ওয়াভেল লন্ডনকে অবহিত করে যে ঐ দুর্ভিক্ষটা ‘ব্রিটিশ শাসিত অঞ্চলে মানুষের উপর নামা সবচেয়ে বড় দুর্যোগ’। তিনি বলেন, যখন হল্যান্ডে খাদ্যাভাব দেখা দেয় তখন বলা হয় ‘খাদ্য-জাহাজ অবশ্যই সরবরাহ করা হবে। এর উল্টো উত্তরটিই বরাদ্দ থাকে ইন্ডিয়াতে খাবার সরবরাহের বেলায়।’

চার্চিল কি অজুহাতে এখানে খাবার পাঠানোর অনুমতি দেয়নি? বর্তমানে চার্চিলের পরিবারের সদস্য ও তার সমর্থকরা বলার চেষ্টা করেন যে ব্রিটেন জরুরী খাদ্য সরবরাহ কাজে জাহাজগুলোকে নিযুক্ত করতে চাচ্ছিল না। কারণ যুদ্ধের জন্য সব জাহাজ প্রস্তুত রাখতে হয়েছিল। কিন্তু মধুশ্রী মুখার্জির লেখায় সব প্রমাণ বের হয়েছে, সব রহস্য উদঘাটিত হয়েছে যে তখন ঠিকই ব্রিটেনের জাহাজ অস্ট্রেলিয়া থেকে খাদ্য শস্য নিয়ে ইন্ডিয়ার পথ দিয়ে ভূমধ্যসাগরের দিকে রওনা হতো।

 

ভারতীয়দের প্রতি চার্চিলের বিদ্বেষ একটি জানা ঘটনা। চার্চিল তার ওয়ার কেবিনেট বা যুদ্ধকালীন মন্ত্রীসভার বৈঠকে এই দুর্ভিক্ষের জন্য ইন্ডিয়ানদেরকেই দায়ী করে। ‘এরা খরগোশের মত বাচ্চা পয়দা করে’ -এমন অশালীন মন্তব্যও বের হয়েছে তার মুখ থেকে। ভারতীয়দের প্রতি তার মনোভাব এমেরির কাছে তুলে-ধরা তার বক্তব্য থেকেই স্পষ্ট হয়ে যায়। চার্চিল বলেছিল ‘আমি ইন্ডিয়ানদের ঘৃণা করি। তারা একটি জঘন্য ধর্মের জঘন্য মানুষ ( বিশ্রী ধর্মের বিশ্রী মানুষ’)’। চার্চিল অন্য এক সময় বলেছিল ‘ভারতীয়রা হচ্ছে জার্মানদের পর সবচেয়ে জঘন্য মানুষ।’

 

মুখার্জির মতে, ‘ভারতের প্রতি চার্চিলের মনোভাব ছিল একেবারে চরম এবং তিনি ইন্ডিয়ানদেরকে ভীষণ ঘৃণা করতেন। তারা যে আর ইন্ডিয়াকে বেশিদিন নিজেদের করে রাখতে পারছে না -এই অভাব-বোধ থেকেই তার এই তীব্র ঘৃণা জন্মাতে পারে। চার্চিল হাফিংটন পোস্টে লেখেন, অ-শ্বেতাঙ্গ লোকদের পেছনে গম খরচ করা অনেক খরচের ব্যাপার, তাও আবার বিদ্রোহীদের পেছনে যারা ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের কাছে স্বাধীনতা দাবি করে আসছে। চার্চিল তার সংরক্ষিত খাদ্যশস্য যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে ইউরোপীয়দের খাওয়ানোকেই শ্রেয় মনে করলেন।’

 

১৯৪৩ সালের অক্টোবর মাস। তখন দুর্ভিক্ষ চরম সীমায়। ওয়াভেলকে নিয়োগ উপলক্ষে একটি বিশাল ভোজ-উৎসবে চার্চিল বলেছিল, ‘আমরা যখন পেছনের বছরগুলোর দিকে তাকাই তখন দেখতে পাই একটি অঞ্চলে তিন প্রজন্ম পর্যন্ত কোন যুদ্ধ নেই, দুর্ভিক্ষ পালিয়ে গেছে। শুধু সাম্প্রতিক সময়ে সংগঠিত যুদ্ধ আমাদেরকে সেই পুরনো স্বাদ দিচ্ছে…মহামারি আর নেই..ইন্ডিয়ান ইতিহাসে এই সময়কালটা একটি সোনালী অধ্যায় হিসেবে ইতিহাসের পাতায় লেখা থাকবে। ব্রিটিশরা তাদেরকে শান্তি দিয়েছিল, শৃঙ্খলা দিয়েছিল এবং দিয়েছিল গরীবদের জন্য ন্যায়বিচার এবং বিদেশী আক্রমণের শঙ্কা থেকে মুক্তি।’!!!

 

চার্চিল যে শুধু বর্ণবাদীই ছিল তা নয়, একইসঙ্গে ছিল এক বড় মাপের মিথ্যুকও।

 

নিশ্চিতভাবেই বলা যায়, এই দুর্ভিক্ষপীড়িত বাংলায় চার্চিলের পলিসি আসলে ভারতের প্রতি ব্রিটিশদের আগের পলিসিরই অনুকরণ। ভিক্টোরিয়া শাসনকালের শেষের দিকে গণহত্যা বিশেষজ্ঞ মাইক ডেভিস দেখান যে ব্রিটিশদের ১২০ বছরের ইতিহাসে ৩১ টি ভয়ানক দুর্ভিক্ষ দেখা দিয়েছিল। অথচ  ব্রিটিশদের আসার আগের দুই হাজার বছরে ১৭টি দুর্ভিক্ষ দেখা দিয়েছিল।

 

তার বইয়ে ডেভিস ঐ দুর্ভিক্ষের গল্পগুলো বলছিলেন যেখানে ২৯ মিলিয়ন ইন্ডিয়ান (প্রায় তিন কোটি ইন্ডিয়ান) মারা গিয়েছিল। ঐ লোকগুলো আসলে ব্রিটিশ পলিসির কারণে মারা গিয়েছিল। ১৮৭৬ সালে খরার কারণে যেখানে ডেকান বা দাক্ষিণাত্যের মালভূমিতে কৃষকেরা সর্বস্বান্ত হচ্ছিলেন সে বছর ইন্ডিয়াতে ধান ও গমের নেট উদ্বৃত্ত হয়েছিল। কিন্তু ভাইসরয় রবার্ট বুলওয়ার লিটন জোর দেন যে ইংল্যান্ডে  শস্য রপ্তানি করা থেকে কোন কিছুই তাকে বিরত রাখতে পারবে না। 

 

১৮৭৭ ও ১৮৭৮ সালে দুর্ভিক্ষের চরমসীমায় শস্য ব্যবসায়ীরা রেকর্ড পরিমাণ শস্য রপ্তানি করেছিল। যখন কৃষকরা না খেয়ে মরছিল তখন ‘সবধরনের ত্রাণ কাজকে নিরুৎসাহিত করার জন্য’ সরকার থেকে নির্দেশনা দেয়া হয়েছিল।

 

শুধু শ্রমিক ছাউনিতে ত্রাণ দেয়া হতো। ঐ শ্রমিক ছাউনিগুলোতে যে পরিমাণ খাবার সরবরাহ করা হতো তার চেয়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নাৎসি বন্দী শিবিরে বেশি খাবার সরবরাহ করা হতো। 

 

যখন লাখ লাখ ইন্ডিয়ান মারা যাচ্ছিল তখন লিটন ভারতীয়দের কষ্ট লাঘবের কোন চেষ্টাই করেনি। বরং ইন্ডিয়ার সম্রাজ্ঞী হিসেবে রাণী ভিক্টোরিয়ার অভিষেক আয়োজন নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন। এক সপ্তাহ ব্যাপী ঐ ভোজন উৎসবে ৬৮ হাজার অতিথি আপ্যায়িত হয়েছিল যেখানে রাণী জাতির কাছে ‘সুখ, সমৃদ্ধি ও কল্যাণের’ প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। 

 

১৮৯০’র দিকের দুর্ভিক্ষে প্রায় ১৯ মিলিয়ন ভারতীয় (প্রায় দুই কোটি) মারা গেছে বলে অনুমান দ্য লেনসেট সাময়িকীর। ১৯০১ সালে  চিকিৎসাবিজ্ঞানের এই সাময়িকীতে এর উল্লেখ পাওয়া যায়। মৃত্যুহার এত বেড়ে যাওয়ার পেছনে কারণ ছিল ব্রিটিশরা দুর্ভিক্ষকালীন ত্রাণ বিতরণ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল। 

 

ডেভিস বলেন, ১৮৭২ থেকে ১৯২১ পর্যন্ত এই সময়কালটিতে ভারতীয়দের গড় আয়ু ২০ শতাংশ কমে এসেছিল। তাই এটা খুব বিস্ময়ের ব্যাপার না যে, হিটলারের প্রিয় সিনেমা ছিল ‘দ্য লাইবস্ অব এ বেঙ্গল ল্যান্সার’ যেখানে দেখানো হয়েছিল গোটা কয়েক ব্রিটিশ কিভাবে এই বিশাল জনগোষ্ঠীকে দাসত্বের শৃঙ্খলে আটকে রেখেছিল। নাৎসি নেতা ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী এডওয়ার্ড ওড (আর্ল অব হ্যালিফ্যাক্স) এর সাথে বলেন যে, তার প্রিয় সিনেমা ওটা কারণ ‘এভাবেই একটি উচ্চতর জাতির আচরণ করা উচিত’ এবং এই ছায়াছবি দেখা নাৎসিদের জন্য বাধ্যতামূলক বলা হতো।

 

যেখানে ব্রিটেন অন্যান্য জাতিসমূহের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেছে সেখানে ইন্ডিয়া এই গণহত্যার বিষয়টি কার্পেটের তলায় লুকিয়ে রাখার চেষ্টা করছে। মাও মাও হত্যাকাণ্ডের জন্য কেনিয়ার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেছে ব্রিটেন। অন্যান্য জাতিও আমাদের জন্য ভালো উদাহরণ উপস্থাপন করে রেখেছে। 

 

যেমন ইহুদিবাদী ইসরাইল কথিত গণহত্যা বা হলোকাস্টের কথা বলে এখনো  মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার আদায় করছে জার্মানির কাছ থেকে এবং তারা জার্মানির কাছ থেকে সামরিক সহায়তাও আদায় করে নিচ্ছে। যদিও অনেকেই মনে করেন যতটা প্রচার করা হয় তার দশ ভাগের একভাগ ইহুদিকেও হত্যা করেনি হিটলারের নাৎসি বাহিনী।
আর্মেনিয়াও দাবি করে যে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে তুর্কি বাহিনী  ১৮ লক্ষ আর্মেনিয়ানকে সুপরিকল্পিতভাবে হত্যা করেছে।  তুরস্ক এই অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে। (তারা বলে, কেবল আর্মেনীয় বিদ্রোহী ও লুটেরাদেরই হত্যা করা হয়েছে যুদ্ধক্ষেত্রে।) জোসেফ স্ট্যালিনের কাতিয়ান হত্যাকাণ্ডের কথা ভুলবে না পোলিশরা। চাইনিজরা এখনো জাপানের কাছ থেকে ক্ষমা প্রার্থনার দাবি জানিয়ে আসছে। 

 

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নানকিং এ ৪০ হাজার খুন হয় এবং অসংখ্য নারী ধর্ষিত হয়। এবং তারপর এক মজার ঘটনা ঘটলো ইউক্রেনে। ইউক্রেনিয়ানরা তাদের দেশে দেখা দেয়া দুর্ভিক্ষের পেছনে স্টালিনের অর্থনৈতিক নীতিকে দায়ী করেছেন। এমনকি তারা এর নতুন নামকরণ করেছেন। নামটা হলোকাস্টের অনেক কাছাকাছি ‘হলোদমোর’। 

 

 উল্লেখ্য ১৯৪৩ সালের দিকে মিত্র বাহিনীর হয়ে ইউরোপ, আফ্রিকা ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াতে ২৫ লক্ষ ভারতীয় সেনা যুদ্ধ করেছিল। ব্রিটেনের তেমন কোন খরচ ছাড়া-ই বিশাল পরিমাণ অস্ত্রশস্ত্র, গোলাবারুদ, কাঁচামাল সরবরাহ করা হয়েছে এখান থেকে। ইউরোপে জাহাজে করে পাঠানোর ক্ষেত্রেও ব্রিটেনের তেমন খরচ করতে হয়নি। 

 

ভারতের  কাছে ব্রিটেনের যে ঋণ তা দুদেশের কেউই অবজ্ঞা করতে পারবে না। ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহাসিক টিম হার্পার ও ক্রিস্টোফার বেইলির মতে, ‘ভারতীয় সেনা, বেসামরিক শ্রমিক ও ব্যবসায়ীদের কল্যাণেই ১৯৪৫ সালের বিজয় সম্ভবপর হয়েছিল। তার মূল্য হচ্ছে খুব দ্রুত ভারতের  স্বাধীনতা।’

 

২৫০ বছরের ঔপনিবেশিক লুটপাটের ক্ষতিপূরণের জন্য পর্যাপ্ত সম্পদ নেই পুরো ইউরোপেও। অর্থের কথা না হয় বাদই দিলাম একটা ক্ষমা প্রার্থনা করার মত সৎ সাহসও কি নাই ব্রিটিশদের? অথবা তারা কি চার্চিলের মত নিজেদেরকে এই আত্মপ্রবঞ্চনা দিয়েই রাখবে যে, ভারতে ইংরেজদের শাসন ছিল একটা ‘স্বর্ণযুগ’ (গোল্ডেন এজ)? 

 

বলা হয় হিটলার লাখ লাখ ইহুদিকে হত্যা করেছিল জাতিগত বিদ্বেষ বা ঘৃণার কারণে। কিন্তু ব্রিটিশ সরকার কেন কোটি কোটি বাঙালীকে হত্যা করেছিল? ব্রিটিশরা ভারত ছেড়ে যাওয়ার পরও বাংলা  ও ভারতে অনেক দুর্ভিক্ষ হয়েছে। কিন্তু এসব দুর্ভিক্ষে যত মানুষ মারা গেছে তার সংখ্যা ব্রিটিশদের সৃষ্ট কৃত্রিম দুর্ভিক্ষ ও বর্বর আচরণে নিহত মানুষের এক দশমাংশেরও কম হবে।

 

দুর্নীতিবাজ ও বর্বর ব্রিটিশদের অন্ধ-অনুচর টাইপের একদল বাঙালী ও ভারতীয় বুদ্ধিজীবী বলেন, ব্রিটিশ দখলদাররা নাকি এ অঞ্চলে সুশাসন, আইনের শাসন ও গণতন্ত্র এনেছে ইত্যাদি! 

 

অথচ এর আগে নবাবদের আমলে, মোঘল শাসনে ও সুলতানি যুগে কখনও এমন নিষ্ঠুরভাবে খাদ্য-শস্যকে গুদামে রেখে সাধারণ জনগণকে হত্যা করেনি কোনো সরকার। ব্রিটিশ শাসকদের এসব অপরাধ মানবজাতির অতীতের সব অপরাধের নৃশংসতাকেও ছাড়িয়ে গেছে। তাই অনেকেই বলেন, মানবতার বিরুদ্ধে সেইসব অপরাধের জন্য ব্রিটিশ শাসকদের বিচার করা উচিত ছিল আন্তর্জাতিক যুদ্ধ-অপরাধ আদালতে ঠিক যেভাবে জার্মান নাৎসিদের বিচার করা হয়েছিল আন্তর্জাতিক যুদ্ধ-অপরাধ আদালতে। আজও নাৎসিদের খুঁজে বেড়ানো হয় বিচার করার জন্য।

 

বৃহত্তর বাংলায় যে হলোকাস্ট চালিয়েছিল ব্রিটিশ দখলদাররা সে জন্য কি ব্রিটেনের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ আদায় করা কি উচিত নয়? বাঙ্গালী জাতির যদি মান-সম্মানবোধ বলে কিছু থেকে থাকে তাহলে ৪২-৪৩ সনে ক্ষমতায় থাকা চার্চিল ও তার আগে ক্ষমতায় থাকা ব্রিটিশদের সব অপরাধের  ক্ষতিপূরণ আদায় করার জন্য তাদের সক্রিয় হতে হবে। সাদা চামড়ার ইহুদিদের হত্যার জন্য যদি জার্মান নাৎসিদের বিচার হতে পারে তাহলে কালো চামড়ার বাঙ্গালীদের ওপর গণহত্যার বিষয়টি কি তাদের জাতীয় ইতিহাসের একটি কালো অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হতে পারে না? এ নিয়ে কেনো আজও একটি স্মৃতি-স্তম্ভও গড়া হয়নি?

 

দেশে দেশে সুপরিকল্পিত নানা গণহত্যার হোতা সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটেন, আমেরিকা, ইহুদিবাদী ইসরাইল এবং তাদের সহযোগী শক্তিগুলো ও তাদের সেবাদাস সরকার আর অন্ধ অনুসারীদের ধিক্কার দিয়ে আজ বলা উচিত:

এ কোন্ সভ্যতা  আজ মানুষের চরম সত্তাকে করে পরিহাস?

কোন্ ইবলিস আজ মানুষেরে ফেলি মৃত্যুপাকে করে পরিহাস?

... জড়পিণ্ড হে নিঃস্ব সভ্যতা!

তুমি কার দাস?

অথবা তোমারি দাস কোন্ পশুদল!

মানুষের কী নিকৃষ্ট স্তর!

যার অত্যাচারে আজ প্রশান্তি; মাটির ঘর: জীবন্ত কবর

মুখ গুঁজে প’ড়ে আছে ধরণীর ‘পর।.....

তাহাদেরি শোষণের ত্রাস

করিয়াছে গ্রাস

প্রশান্তির ঘর,

যেথা মুখ গুঁজে আছে শীর্ণ ধরণীর ‘পর ।  

হে জড় সভ্যতা!

মৃত-সভ্যতার দাস স্ফীতমেদ শোষক সমাজ!

মানুষের অভিশাপ নিয়ে যাও আজ;

তারপর আসিলে সময়

 বিশ্বময়

তোমার শৃঙ্খলগত মাংসপিণ্ডে পদাঘাত হানি’

নিয়ে যাব জাহান্নাম দ্বারপ্রান্তে টানি’;

আজ এই উৎপীড়িত মৃত্যু-দীর্ণ নিখিলের  অভিশাপ বও:

ধ্বংস হও

তুমি ধ্বংস হও।।

 

[ তথ্যসূত্র: ‘নতুন ঢাকা ডাইজেস্ট’-এ প্রকাশিত ‘ভারতের ভুলে যাওয়া গণহত্যা’, ১১৭৬ সালের মনন্তর (উইকিপিডিয়া) ও Anil Chawla’র লেখা ‘THE GREAT HOLOCAUST OF BENGAL’ ] #

 

মু. আমির হোসেন/১৬

 

 

 

 

 

মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে দরিদ্র দেশ ইয়েমেনে ২০১৫ সালের ২৬ মার্চ থেকে শুরু হওয়া সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের চলমান আগ্রাসনে অন্তত নয় হাজার ৪০০ ইয়েমেনি নিহত হয়েছে। আহত হয়েছে অন্তত ৩০ হাজার। জাতিসংঘের হিসেব অনুযায়ী নিহতদের অন্তত সাড়ে তিন হাজারই বেসামরিক নাগরিক। নিহত শিশু ও নারীর সংখ্যা ২ হাজারেরও বেশি বলে জানানো হয়েছে। এ ছাড়াও ২৫ লাখ ইয়েমেনি হয়েছে গৃহহারা ও শরণার্থী এবং প্রায় ২ কোটি ইয়েমেনি হয়েছে খাদ্যসহ নানা ধরনের জরুরি ত্রাণ সাহায্যের মুখাপেক্ষী।



বিশ্ব সমাজ বন্ধ করতে পারছে না দুর্বলের ওপর সবলের এই আগ্রাসন। হাসপাতাল, স্কুল ও মসজিদ কিছুই বাদ যাচ্ছে না ধ্বংসযজ্ঞ থেকে। 


ইয়েমেনে যাতে ত্রাণ সাহায্য যেতে না পারে সে জন্য দেশটিতে অবরোধ আরোপ করে রেখেছে সৌদি সরকার। অসহায় ইয়েমেনিদের নেই কোনো ভূগর্ভস্থ আশ্রয়-কেন্দ্র। বোমা হামলার সময় সেখানে বাজে না কোনো সাইরেন! সুপেয় বা পরিষ্কার পানির অভাবে ভুগছে ৫০ শতাংশ ইয়েমেনি। জাতিসংঘের হিসেব অনুযায়ী ইয়েমেনের ৮০ শতাংশ মানুষ তথা প্রায় দুই কোটি ইয়েমেনি এখন ত্রাণ সাহায্যের মুখাপেক্ষী। কারণ, সৌদি হামলায় ধ্বংস হয়ে গেছে দেশটির ক্ষেত-খামার ও উৎপাদন ব্যবস্থা। বাজারগুলোতে পণ্য সরবরাহ খুবই সীমিত। সাধারণ মানুষ সেইসব জরুরি পণ্য খুব চড়া দাম দিয়ে কেনার সামর্থ্য রাখে না।


আন্তর্জাতিক ত্রাণ সংস্থা অক্সফাম বলেছে, ইয়েমেনে সংঘাত চলতে থাকায় বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে বড় মানবীয় ত্রাণ-চাহিদা জরুরি হয়ে দেখা দিয়েছে। ইয়েমেনের এক কোটি ৪৪ লক্ষ মানুষ এখন ক্ষুধার্ত এবং খাদ্যের দাম ব্যাপক মাত্রায় বেড়ে যাওয়ায় তাদের বেশির ভাগই চড়া দাম দিয়ে খাদ্য কিনতে সক্ষম নয়। ইয়েমেনের ক্ষেত-খামার ও বাজারগুলো সৌদি হামলায় ধ্বংস হয়ে গেছে এবং অঘোষিত নিষেধাজ্ঞার ইয়েমেনে পণ্য আমদানি বন্ধ রয়েছে বলে সংস্থাটি জানিয়েছে। দীর্ঘ মেয়াদি জ্বালানী সংকটের কারণে ইয়েমেনে কৃষি উৎপাদনে ধস নেমেছে বলেও সংস্থাটি উল্লেখ করেছে। 

 

এদিকে জাতিসংঘ ইয়েমেনে ত্রাণ সহায়তা দিতে দাতা দেশগুলোর কাছে অর্থের আবেদন জানিয়েও কোনো সাড়া পায়নি। ইয়েমেনে সৌদি হামলায় হাজার হাজার বেসামরিক ইয়েমেনি নিহত হতে থাকায় সম্প্রতি সৌদি সরকারের ওপর অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে ব্রিটেন ও ইউরোপীয় জোটের ওপর চাপ জোরদার হয়েছে। গত ১৫ মার্চ ইয়েমেনের হাজ্জা প্রদেশে একটি জনাকীর্ণ বাজারের ওপর সৌদি বিমান হামলায় ১১৯ জন ইয়েমেনি নিহত হলে জাতিসংঘসহ বিশ্ব সমাজ সৌদি হামলার নিন্দা জানায়। ওই হামলায় নিহতদের অনেকেই ছিল ও নারী শিশু।

 

বর্বর-ওয়াহাবি মতবাদকেন্দ্রীক রাজতান্ত্রিক সৌদি সরকার গণতন্ত্রের দোহাই দিয়ে ইয়েমেনে আগ্রাসান শুরু করে। অথচ সৌদিতে নেই রাজনৈতিক দল, সংসদ ও বাক-স্বাধীনতার অস্তিত্ব! সৌদি সরকার ইয়েমেনে তার পছন্দের এক ব্যক্তি ও দেশটির সংসদের কাছে ক্ষমতা ত্যাগকারী জন-সমর্থনহীন সাবেক সরকার-প্রধান মানসুর হাদিকে ক্ষমতায় বসানোর জন্য গোটা ইয়েমেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছে!


সৌদি সরকারকে সর্বাত্মক সহায়তা দিচ্ছে মার্কিন সরকার, ব্রিটেন, ইহুদিবাদী ইসরাইলসহ সৌদি অর্থ-সহায়তার কাঙ্গাল কয়েকটি আরব সরকার।


সৌদি সরকার প্রতিবেশী ইয়েমেনকে মনে করে তার একটি উপনিবেশ। এই দেশটিতে কে ক্ষমতায় থাকবে বা থাকবে না তা ইয়েমেনি জনগণের ন্যায্য অধিকার হলেও রিয়াদ তাতে হস্তক্ষেপ করতে অভ্যস্ত। তাই এই দেশটির ওপর এর আগেও হামলা চালিয়েছে সৌদি সরকার। ইয়েমেনের তেল-সমৃদ্ধ দু’টি প্রদেশ প্রায় ৮০ বছর ধরে দখল করে রেখেছে সৌদি রাজতান্ত্রিক সরকার। ওই প্রদেশগুলো ৭০’র দশকে ইয়েমেনের কাছে ফেরত দেবে বলে কথা দিয়েছিল সৌদি সরকার। কিন্তু বলদর্পী সৌদি সরকার নিজের সেই ওয়াদা পদদলিত করেছে।


মধ্যপ্রাচ্যে স্বৈরশাসক বিরোধী আরব গণজাগরণে জোয়ারে তিউনিশিয়া, মিশর ও লিবিয়ায় পরিবর্তন আসার সময়ে ইয়েমেনের জনগণও দেশটিতে গণতান্ত্রিক এবং স্বাধীন সরকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলন জোরদার করে। ফলে ক্ষমতাচ্যুত হয় সালেহ সরকার এবং এরপর অদক্ষতা ও অযোগ্যতার প্রেক্ষাপটে ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হয় সৌদি রাজার ক্রীড়নক মানসুর হাদি সরকার।


এ অবস্থায় ইয়েমেনের জাইদি শিয়া সম্প্রদায় তথা হুথিদের নেতৃত্বাধীন আনসারুল্লাহ ম্যুভম্যান্ট দেশটির সবচেয়ে বড় দল ও শক্তি হিসেবে ইয়েমেনি সংসদের নানা রাজনৈতিক দলের বেশিরভাগেরই সমর্থন নিয়ে গঠন করে বিপ্লবী সরকার। এ সরকারের প্রতি সমর্থন রয়েছে দেশটির সশস্ত্র বাহিনীর। এই বিপ্লবী সরকার মার্কিন, ইসরাইলি ও সৌদি আধিপত্যবাদের ঘোর বিরোধী। তাই সৌদি সরকারের দৃষ্টিতে শিয়া হওয়া ও কথিত ইরানপন্থী হওয়াই জনপ্রিয় আনসারুল্লাহর বড় অপরাধ! অথচ ইয়েমেনের সাবেক প্রেসিডেন্ট আলী আবদুল্লাহ সালেহও ছিলেন জাইদি শিয়া। তার প্রায় ৩৩ বছরের শাসনও সৌদি সরকার মেনে নিয়েছিল। ইরানের সাবেক শাহ সরকারও ছিল শিয়া। কিন্তু তার সঙ্গে সহাবস্থানে থাকতে ও তাকে মাথায় তুলে রাখতে আরব রাজা-বাদশাহদের কখনও কোনো সমস্যা হয়নি!


তাৎপর্যপূর্ণ পরিহাস হল সৌদি আরব সম্প্রতি জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিটির প্রধান হয়েছে! পয়সার জোরে কি সব পাপই মোচন করা যায়? এ বছরের শুরুতেই সৌদি সরকার শেখ নিমরসহ ৪৭ ব্যক্তির মাথা দেহ থেকে কেটে বিচ্ছিন্ন করার মাধ্যমে মৃত্যুদণ্ড দিয়ে ইংরেজি নব-বর্ষের উৎসব পালন করেছে! এ নিয়ে ইউরোপ ও পাশ্চাত্যে প্রতিবাদ ও নিন্দা-সমালোচনা দেখা গেলেও একই সৌদি সরকারের মাধ্যমে ইয়েমেনের প্রায় ৮ হাজার মানুষের মস্তক বিচ্ছিন্ন করা সত্ত্বেও এ নিয়ে বিশ্বের বড় বড় মিডিয়াগুলো প্রায় নীরব! মানবাধিকার সংস্থাগুলোর তৎপরতা কেবল মৌখিক নিন্দা ও প্রতিবাদের মধ্যেই সীমিত। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ এ পর্যন্ত ইয়েমেনে সৌদি হামলার নিন্দা জানাতে ব্যর্থ হয়েছে।


বর্বর সৌদি সরকারের কাছে গত ৫ বছরে অন্তত দশ বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র বিক্রি করেছে ব্রিটেন। মার্কিন সরকার নিষিদ্ধ গুচ্ছ বোমাসহ অস্ত্র দিয়েছে আরও বেশি মূল্যের। সৌদিকে অস্ত্র দিচ্ছে ফ্রান্স ও জার্মানি। সৌদির চলতি বাজেটে উন্নয়ন খাতে ১০০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি অর্থের ঘাটতি দেখা দিয়েছে। অথচ অস্ত্র কিনতে অর্থের অভাব হয় না সৌদির! তেলের দর কমে যাওয়ায় সৌদি বাজেটে ঘাটতি দেখা দিয়েছে! ইরান ও রাশিয়ার তেলের আয়ে ধস নামানোর জন্য সৌদি সরকার নিজেই তেল উৎপাদন বিপুল মাত্রায় বাড়িয়ে এই জ্বালানী পণ্যের দাম প্রায় পানির পর্যায়ে নামিয়ে আনতে চেয়েছে। আর এখন এরই কুফল ভোগ করছে খোদ সৌদি সরকার ও তার অর্থনীতি!


মার্কিন ব্যাংকে সৌদি রাজ-পরিবারের যত অর্থ গচ্ছিত আছে তা চাইতে গেলে সৌদি সরকারকে সন্ত্রাসী আখ্যা দিয়ে মার্কিন সরকার হয়তো কখনও সে অর্থ ফেরত দেবে না, যেমনটা ফেরত পায়নি ইরানের ক্ষমতাচ্যুত শাহ। মার্কিন সরকারের তথ্য অনুযায়ী নাইন এলিভেনের কথিত ১৫ জন হামলাকারীর মধ্যে ১৩ জনই ছিল সৌদি!
যতদিন সৌদির অর্থ ও তেল আছে ততদিন মার্কিন সরকার, ব্রিটেন, জার্মানি ও ফ্রান্সের মত শোষক সরকারগুলো সৌদিকে চুষতেই থাকবে। আর এ সময়ে সৌদি রাজ-সরকার যত অপরাধই করুক বা যত গণহত্যাই চালাক না কেন তা ইঙ্গ-মার্কিন ও ইসরাইলি স্বার্থেরই অনুকূল হওয়ায় তারা সৌদি সরকারকে কখনও মানবাধিকার লঙ্ঘনের দায়ে অভিযুক্ত করবে না।


আমরা অনেকেই হয়তো ভাবছি-হায় ইয়েমেন! হায় তার দারিদ্র! ইরান ও তার কয়েকটি মিত্র-সরকার ছাড়া বিশ্বের বেশিরভাগ সরকারই সৌদি অর্থের প্রভাবে এবং শ্রমিক-স্বার্থ বা অস্ত্র-বিক্রির স্বার্থ বজায় রাখতে ইয়েমেনে সৌদি গণহত্যার বিরুদ্ধে তেমন কোনো কঠোর প্রতিক্রিয়া বা প্রতিবাদ দেখাচ্ছে না। কিন্তু অর্থের কাছে বিবেকের এই দাসত্বই কি বেশি লজ্জাজনক নয়? স্বাধীনচেতা ইয়েমেনিরা দরিদ্র হলেও অর্থের দাস নয়। তারা জীবন দেবে তবু সম্মান ও স্বাধীনতাকে বিসর্জন দেবে না। এক বছর ধরে সৌদি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে ইয়েমেনের বিপ্লবী জনগণ। এক্ষেত্রে শিয়া ও সুন্নি সবাই একই কাতারে রয়েছে। তবে ইয়েমেনের মরু-অঞ্চল ও কম জনসংখ্যা অধ্যুষিত দক্ষিণাঞ্চলে সৌদি মদদপুষ্ট আল-কায়দা ও দায়েশের সন্ত্রাসীরা তাদের অবস্থান জোরদার করছে।


ইয়েমেনিদের পাল্টা হামলায় ধ্বংস হয়েছে বহু আগ্রাসী বিমান, ড্রোন ও হেলিকপ্টার এবং সৌদি যুদ্ধ-জাহাজ। বেশ কয়েকজন জেনারেলসহ অন্তত সাড়ে তিন হাজার সৌদি সেনাও নিহত হয়েছে ইয়েমেনিদের পাল্টা হামলায়। তাই এটা স্পষ্ট ইয়েমেনে সৌদি আগ্রাসন এ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়েছে। ইয়েমেনের চোরাবালি থেকে মুক্ত হতে হলে হুথিদের সঙ্গে আপোষ করতেই হবে সৌদি সরকারকে।


সৌদি সরকার ইয়েমেনে যুদ্ধ-অপরাধে জড়িত বলেও মানবাধিকার সংস্থাগুলোর পক্ষ থেকে অভিযোগ ও আশঙ্কা ব্যক্ত করা হচ্ছে।

 

এই প্রেক্ষাপটে সৌদি সরকার আগামী ১৮ এপ্রিল ইয়েমেনের হুথিদের সঙ্গে আবারও আলোচনায় বসবে বলে জানিয়েছে। এ থেকে বোঝা যায় সৌদি সরকার এটা বুঝতে পেরেছে যে, ইয়েমেনে গায়ের জোরে কিছু করা যাবে না, বরং রাজনৈতিক সমঝোতা প্রয়োজন।

 

ওদিকে সম্প্রতি ইরানের একজন শীর্ষস্থানীয় সেনা কর্মকর্তাও প্রকাশ্যে ঘোষণা করেছেন যে, তেহরান ইয়েমেনের জনগণকে সহায়তার অংশ হিসেবে সেখানে সামরিক উপদেষ্টা পাঠাতে পারে যেমনটি দেশটির সামরিক উপদেষ্টারা সহায়তা দিচ্ছে সিরিয়ার আসাদ সরকারকে। 

 

ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর ডেপুটি চিফ অফ স্টাফ ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মাসুদ জাজায়েরি এ ঘোষণা দিয়ে বলেছেন, ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান তার সাধ্য অনুযায়ী ইয়েমেনের জনগণকে যে কোনোভাবে সহায়তা দেয়ার বিষয়টিকে তার দায়িত্ব বলে অনুভব করছে। 

 

জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় সাময়িক যুদ্ধ-বিরতির মধ্যে সৌদি সরকার ও ইয়েমেনের বিপ্লবী সরকারের সঙ্গে কয়েক দফা আলোচনা এ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়েছে। ফলে যুদ্ধ ক্রমেই দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে।

 

 

এদিকে ব্রিটেনের দৈনিক গার্ডিয়ান এক প্রতিবেদনে লিখেছে, ইয়েমেনে এক বছর ধরে হামলা চালিয়েও সৌদি সরকার তার প্রধান লক্ষ্য তথা ক্ষমতাচ্যুত মানসুর হাদিকে ইয়েমেনে পুনরায় ক্ষমতাসীন করতে ব্যর্থ হয়েছে। দৈনিকটি লিখেছে, সৌদি সরকার মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের ক্রমবর্ধমান প্রভাব ঠেকানোর যে আশা করেছিল তাও ব্যর্থ হয়েছে। ইয়েমেনে সৌদি হামলা চলতে থাকায় আল-কায়দা ও আইএসআইএল বা দায়েশ লাভবান হচ্ছে বলেও দৈনিকটি মন্তব্য করেছে।  #

 

রেডিও তেহরান /আমির হোসেন

 

 

 

মুসলমানদের প্রথম কিবলা ও ফিলিস্তিন দখলদার ইহুদিবাদী ইসরাইলের সঙ্গে আরব রাজা-বাদশাহদের এবং বিশেষ করে সৌদি আরবের ঘনিষ্ঠতা ক্রমেই জোরদার হচ্ছে। 

 

সম্প্রতি তেলআবিব বিশ্ববিদ্যালয়ের জাতীয় নিরাপত্তা বিষয়ক গবেষণা সংস্থা এক গবেষণা-রিপোর্টে জানিয়েছে, পারস্য উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদ বা পিজিসিসি-ভুক্ত সরকারগুলোর সঙ্গে বহু বছর ধরে গোপন সামরিক ও বাণিজ্য সম্পর্ক রয়েছে ইসরাইলের। 

 

ওই গবেষণা-রিপোর্টে বলা হয়েছে, ২০০১ সালের ঘটনাকে কেন্দ্র করে চাপের মুখে-থাকা সৌদি সরকার ইসরাইলের সঙ্গে আরব বিশ্বের আপোষ-রফার ও সম্পর্ক স্বাভাবিক করার প্রস্তাবটি তুলেছিল।ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্ক গভীরতর করাই ছিল ওই প্রস্তাবের উদ্দেশ্য। রিয়াদ ও তেলআবিব ইরান সম্পর্কিত বিষয়সহ নানা বিষয়ে নিয়মিত গোপন-যোগাযোগ এবং শলা-পরামর্শ করে যাচ্ছে।


ইসরাইলি ওই সংস্থার একই রিপোর্টে আরও এসেছে, ইসরাইলের নানা কোম্পানি পারস্য-উপসাগরীয় আরব সরকারগুলোকে নিরাপত্তা সংক্রান্ত নানা পরামর্শ দিয়ে আসছে। ইসরাইলি কোম্পানিগুলো রাজতান্ত্রিক এই সরকারগুলোর নানা ধরনের বিশেষ বাহিনীকে প্রশিক্ষণ দিচ্ছে এবং তাদেরকে অত্যাধুনিক নানা প্রযুক্তি দিয়ে সাহায্য করছে। 

 

এদিকে বর্ণবাদী ইসরাইল ও সৌদি সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের গোপন বৈঠক ও যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে। ইসরাইল পারস্য উপসাগরীয় রাজতান্ত্রিক সরকারগুলোর কাছে অস্ত্র বিক্রির ক্ষেত্রে সব ধরনের সীমাবদ্ধতা উঠিয়ে নিয়েছে। তবে এই সরকারগুলোর কাছে বিক্রি-করা ইসরাইলি অস্ত্রের ওপর মেইড-ইন-ইসরাইল বা ইসরাইলের তৈরি পণ্য- এ জাতীয় কথা সংযুক্ত করা যাবে না বলে তেল-আবিব শর্ত দিয়ে রেখেছে।

 

তেলআবিব বিশ্ববিদ্যালয়ের জাতীয় নিরাপত্তা বিষয়ক গবেষণা সংস্থার রিপোর্টে আরও বলা হয়েছে, সৌদি সরকারসহ পিজিসিসি’র অনান্য রাজতান্ত্রিক সরকার মনে করে ইহুদিবাদী ইসরাইলের সঙ্গে প্রকাশ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করা হলে তাতে লাভের চেয়ে ক্ষতিই বেশি হবে এবং আরব বিশ্বের জনমত তাদের ওপর ক্ষিপ্ত হবে। তাই ইসরাইলের সঙ্গে চলমান গোপন সম্পর্ক ও সহযোগিতা গোপন রাখাকেই তারা বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। 


ইসরাইলের ন্যাশনাল নিউজ ওয়েব সাইটের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইসরাইলের একটি উচ্চপদস্থ প্রতিনিধি দল কয়েক সপ্তাহ আগে সৌদি আরব সফর করেছে।
সম্প্রতি সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী আদেল জোবাইর ও সৌদি গোয়েন্দা প্রধান গোপনে তেলআবিব সফর করেছে বলে রুশ বার্তা সংস্থা স্পুটনিক খবর দিয়েছিল।


আসলে তেলআবিবের সঙ্গে রিয়াদের ঘনিষ্ঠতা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এতই জোরদার হয়েছে যে এ সম্পর্ককে এখন আর গোপন বলা যায় না। সম্প্রতি মিউনিখে সাবেক সৌদি গোয়েন্দা প্রধানের সঙ্গে উষ্ণ করমর্দন করেন ইসরাইলি যুদ্ধমন্ত্রী মোশে ইয়ালোন। মিউনিখে অনুষ্ঠিত নিরাপত্তা বিষয়ক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে ইয়ালোন বলেছিলেন, ইসরাইল বর্তমানে পারস্য উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর সঙ্গে, বিশেষ করে সৌদি আরবের সঙ্গে গোপনে যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছে।


বাহরাইনের সঙ্গেও ইসরাইলের বহুমুখী ঘনিষ্ঠতা ক্রমেই বাড়ছে বলে খবর এসেছে। বাহরাইনের রাজা হামাদ সম্প্রতি ইসরাইলের একজন ধর্মযাজক-কর্মকর্তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে বলেছেন, পিজিসিসি’র পর আরব লিগের বৈঠকেও হিজবুল্লাহকে সন্ত্রাসী দল হিসেবে ঘোষণা করার প্রস্তাব তুলতে হবে। এরিমধ্যে পিজিসিসি ও আরব লিগের মন্ত্রী পরিষদ হিজবুল্লাহকে সন্ত্রাসী বলে ঘোষণা করেছে। মার্ক শিনয়িইর নামের ওই ইসরাইলি কর্মকর্তা বলেছেন, ইরান এখন আরব-ইসরাইল আপোষ প্রক্রিয়ার জন্য বাধা নয়, বরং তেহরান পিজিসিসি ও ইসরাইল উভয়ের জন্যই শত্রু হওয়ায় বিষয়টি আরব-ইসরাইল আপোষের ক্ষেত্রে একটি বড় সুযোগে পরিণত হয়েছে।

 

বাহরাইনের রাজা খলিফা ওই ইসরাইলি কর্মকর্তাকে বলেছেন, পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের আরব সরকারগুলো ইরানের বিরুদ্ধে ইসরাইলকে বন্ধু বলে মনে করে। খলিফা তাকে আরও বলেছেন, কয়েকটি আরব সরকারের কাছে ইসরাইলের সঙ্গে প্রকাশ্য কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার বিষয়টি এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র।

 

পিজিসিসি বা পারস্য উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের বেশিরভাগ সরকারই ওয়াহাবি-তাকফিরি চিন্তাধারা প্রচার-প্রসারের কাজে সক্রিয়। এইসব সরকার তাদের বিরুদ্ধে ক্রমবর্ধমান গণ-অসন্তোষকে ধামাচাপা দিতে পাশ্চাত্য ও ইহুদিবাদী ইসরাইলের সহায়তায় গড়ে তুলেছে আল-কায়দা, আইএসআইএল বা দায়েশ ও আননুসরার মত বিভিন্ন তাকফিরি-ওয়াহাবি সন্ত্রাসী গোষ্ঠী। আর এইসব গোষ্ঠী শিয়া-সুন্নি মতভেদকে পারস্পরিক ঘৃণায় রূপান্তরিত করে মাজহাবি দাঙ্গা ছড়ানোর চেষ্টা করছে।

 

পিজিসিসির সরকারগুলো ইহুদিবাদী ইসরাইল-বিরোধী ইসলামী ইরান, সিরিয়া ও ইরাক সরকারকে সুন্নি-বিদ্বেষী শিয়া সরকার বলে অপবাদ দিচ্ছে। এ ছাড়াও তারা লেবাননের জনপ্রিয় ইসলামী প্রতিরোধ আন্দোলন হিজবুল্লাহ ও ইয়েমেনের জনপ্রিয় বিপ্লবী আন্দোলন আনসারুল্লাহকে সুন্নি-বিদ্বেষী বলে প্রচার করছে। অথচ এইসব সরকার ও আন্দোলন সুন্নি ফিলিস্তিনি জাতিকে সবচেয়ে বেশি সহায়তা দিয়ে আসছে। অন্যদিকে এইসব আরব রাজা-বাদশাহরা যদি সুন্নি ইসলামী আন্দোলনগুলোর সমর্থক হত তাহলে তারা মিশরের ইসলামপন্থী ব্রাদারহুড সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করতে মার্কিন সরকার ও মিশরের সশস্ত্র বাহিনীকে সহায়তা দিত না। তারা যদি সুন্নিদের প্রতি দরদি হত তাহলে মজলুম ফিলিস্তিনি জাতির সহায়তায় এগিয়ে আসত এবং ইসরাইলের বিরুদ্ধে সংগ্রামের পথ ধরত। অথচ তারা ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করছে যদিও পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে মুসলমানদের বিরুদ্ধে শত্রুতার ক্ষেত্রে ইহুদিরাই সবচেয়ে কঠোর।


সৌদি সরকারের ইসরাইল-প্রীতির পাশাপাশি ইরান-বিদ্বেষী ভূমিকা জোরদারের বিষয়টিও লক্ষণীয়। সম্প্রতি রিয়াদ তুচ্ছ এক অজুহাতে ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করেছে। একই কাজ করেছে সৌদির লেজুড় বাহরাইন এবং  সৌদি অর্থের কাঙ্গাল সুদান ও জিবুতির মত কয়েকটি দরিদ্র দেশ। (এর আগে পবিত্র হজের সময় মিনায় কয়েক হাজার হাজি হত্যার ঘটনায় ইরানের সঙ্গে কঠোর আচরণ করে রিয়াদ। ওই ঘটনায় ৪০০'রও বেশি ইরানি হাজি নিহত হন।) এমনকি ইরানের অর্থনীতিকে দুর্বল করার জন্য বিশ্ব-বাজারের সস্তায় তেল বিক্রি করছে রিয়াদ। সৌদি সরকার এখন মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের সব পণ্য বর্জনের আন্দোলন গড়ে তুলতে চাইছে।

 

আরব রাজা-বাদশাহদের মুনাফেকি চরিত্র দিনকে দিন স্পষ্ট হচ্ছে দায়েশ এবং নানা ধরনের তাকফিরি সন্ত্রাসীদের প্রতি তাদের সর্বাত্মক সহায়তার নীতি থেকে। তারা এইসব সন্ত্রাসী গোষ্ঠীকে সর্বাত্মক সহায়তা দিলেও এখন তাদের দমনের জন্য আন্তর্জাতিক জোট গঠনের কথা বলছে মুখে মুখে।

 

সম্প্রতি মিশরের একজন সংসদ সদস্য ইসরাইলি রাষ্ট্রদূতকে নিজের বাসায় দাওয়াত করে খাওয়ান। এ ঘটনার পর ওই সংসদ সদস্য প্রকাশ্যে জুতা-হামলার শিকার হন সংসদেই। আরব বিশ্বের জনমতের কাছে ইসরাইলের প্রতি ঘৃণা যে কতটা স্বাভাবিক এ ঘটনা তার একটি দৃষ্টান্ত। 

 

অনেকেই বলে থাকেন যে ইহুদিবাদীদের সঙ্গে সৌদি শাসক-গোষ্ঠীর নাড়ির টান রয়েছে। আলে-সৌদ গোষ্ঠী এক সময় ইহুদি ছিল বলে কোনো কোনো ইতিহাস বিশ্লেষক উল্লেখ করে থাকেন। এই গোষ্ঠীর আদি পুরুষদের কেউ কেউ বহু পরে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে এবং আরবদের মধ্যে অনুপ্রবেশ করে। কিন্তু ইসলাম ধর্মকে তারা মনে-প্রাণে মেনে নেয়নি। ফলে তাদের আচার-আচরণে ইহুদিবাদের প্রভাব থেকে যায় বলে ওই বিশ্লেষকরা মনে করেন। 


এ ছাড়াও ইতিহাসে এসেছে, বর্তমান সৌদি আরবের প্রতিষ্ঠাতা আবদুল আজিজ ইবনে সৌদ মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের পূর্বসূরি তথা ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের সহায়তায় হিজাজ অঞ্চলের শাসক হওয়ার সুযোগ পান। তুর্কি খিলাফতের বিরুদ্ধে বিদ্রোহে ভূমিকা রাখা এবং ইসলামের নামে বিকৃত ও উগ্র চিন্তাধারায় ভরপুর ওয়াহাবি মতবাদের পৃষ্ঠপোষক হওয়ার পুরস্কার হিসেবেই ব্রিটেন সৌদ বংশকে ক্ষমতাসীন করেছে। আর এর বিনিময়ে ইবনে সৌদ ইসরাইলকে মেনে নেবেন বলে ওয়াদা দিয়েছিলেন এবং কিয়ামত পর্যন্ত (এ বংশের পক্ষ থেকে) ব্রিটেনের অভিমতের বিরুদ্ধে কিছু না করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। ১৯১৭ সালের দোসরা নভেম্বর ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী ব্যালফোর ফিলিস্তিনে ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা হবে বলে ঘোষণা দিয়েছিলেন। ওই ঘোষণা ব্যালফোর ঘোষণা নামে ইতিহাসে খ্যাত। এ ঘোষণা দেয়ার আগে ব্রিটিশরা সৌদি রাজা আবদুল আজিজের কাছ থেকে লিখিত সম্মতিপত্র আদায় করেছিল। ওই চিঠিতে লেখা ছিল:



“আমি বাদশাহ আবদুল আজিজ ইবনে আবদুর রহমান--ফয়সলের বংশধর ও সৌদের বংশধর-- হাজার বার স্বীকার করছি ও জেনেশুনে বলছি যে, মহান ব্রিটিশ সরকারের প্রতিনিধি স্যার কুকাস-এর সামনে স্বীকারোক্তি করছি এই মর্মে যে, গরিব ইহুদিদেরকে বা অন্য কাউকে ব্রিটিশ সরকার যদি ‘ফিলিস্তিন’ দান করে দেন তাহলে এতে আমার কোনো ধরনের আপত্তি নেই। বস্তুত: আমি কিয়ামত পর্যন্ত ব্রিটিশ সরকারের অভিমতের বাইরে যাব না।” (নাসিরুস সাইদ প্রণীত ‘আলে সৌদের ইতিহাস’ )
উল্লেখ্য, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় তুর্কি খেলাফতের বিরুদ্ধে ব্রিটেন সৌদিদেরকে তথা সৌদি বংশের লোকদের ব্যবহার করে। ফলে তুর্কি সরকার ওয়াহাবিদের রাজধানী ‘দারইয়া’ শহরটি দখল করে নেয়। আর সৌদি সর্দার আমির আবদুল্লাহকে গ্রেফতার করে প্রথমে কায়রোতে ও পরে তুরস্কে পাঠিয়ে দেন মিশরের শাসক মুহাম্মাদ আলী পাশা। তুর্কি খেলাফতের সরকার আমির আবদুল্লাহকে বিশ্বাসঘাতক হিসেবে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করে।



কিন্তু বিশ্বযুদ্ধে তুরস্কের অবস্থা দুর্বল হয়ে গেলে ব্রিটিশরা আবারও সৌদ গোত্রের লোকদের নিয়ে ষড়যন্ত্র শুরু করে। ব্রিটেন ইবনে সৌদের সঙ্গে কুখ্যাত ‘দারান’ চুক্তি স্বাক্ষর করে ১৯১৫ সালে। কুয়েতের শেখ জাবির আল সাবাহ ছিল সে সময় ব্রিটিশদের আরেক দালাল। ব্রিটিশরা এই দালালের মাধ্যমে ইবনে সৌদের সঙ্গে চুক্তি করেছিল। চুক্তি অনুযায়ী ব্রিটিশ সরকার সৌদ-পরিবারকে প্রতি বছর ষাট হাজার পাউন্ড ভাতা দিতে থাকে। পরে এ ভাতা বাড়িয়ে এক লাখ পাউন্ড করা হয়। এ ছাড়া তুরস্কের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করার জন্য সৌদ গোষ্ঠীকে তিন হাজার রাইফেল ও তিনটি মেশিনগান উপহার দেয় ব্রিটেন। (সূত্র: নজদ ও হিজাজের ইতিহাস, পৃ-২১০)



ব্রিটিশ সরকার আবদুল আজিজ ইবনে সৌদের ক্ষমতা গ্রহণের উৎসবে পাঠিয়েছিল স্যার কুকাসকে প্রতিনিধি হিসেবে। রাজা উপাধিতে বিভূষিত করে কুকাস তাকে বলেছিল, “হে আবদুল আজিজ, আপনি শক্তিশালী ব্যক্তিত্বের অধিকারী।”



উত্তরে রাজা বলেছিল, “আপনারাই আমার এ ব্যক্তিত্ব সৃষ্টি করেছেন ও এ সম্মান দান করেছেন। যদি মহান ব্রিটিশ সাম্রাজ্য না থাকত তাহলে এখানে আবদুল আজিজ আল-সৌদ নামে কেউ আছে বলেই জানত না। আমি তো আপনাদের (ব্রিটিশদের) মাধ্যমেই ‘আমির আবদুল আজিজ ইবনে সৌদ’ শীর্ষক খেতাবটি অর্জন করতে পেরেছি। আমি আপনাদের এই মহানুভবতা আজীবন ভুলব না। আর আমার বিগত আচরণ ছিল আপনাদের সেবক ও ফরমানবরদার (গোলাম) হিসেবে আপনাদের ইচ্ছাগুলো বাস্তবায়ন করা।” ওই উৎসবে কুকাস ব্রিটিশ সরকারের দেয়া শাহী তামগা বা মেডেল রাজা আজিজের গলায় পরিয়ে দেয়। কুকাস বলে যায়: “অচিরেই আমরা আপনাকে হিজাজ ও তার আশপাশের অঞ্চলগুলোর বাদশাহ বলেও ঘোষণা করব এবং তখন হিজাজকে ‘সৌদি সাম্রাজ্য’ বলে ঘোষণা করা হবে।“ এ কথা শুনে রাজা আজিজ স্যার কুকাসের কপালে চুমু খায় ও বলে: "আল্লাহ যেন আমাদেরকে (সৌদিদেরকে) আপনাদের খেদমত (দাসত্ব) করার ও ব্রিটিশ সরকারের সেবা (গোলামি) করার তৌফিক দেন।" ( মুহাম্মাদ আলী সাইদ লিখিত ‘ব্রিটিশ ও ইবনে সৌদ’, পৃ-২৬) #

 

রেডিও তেহরান/এএইচ

 

 

 

 

 

এক: বিশ্বের বিপ্লবগুলোর ইতিহাসে ইরানের ইসলামী বিপ্লবের রয়েছে অনন্য দীপ্তি। কিংবদন্তীতুল্য নানা সাফল্য আসমানি ঔজ্জ্বল্যে ভাস্বর এ বিপ্লবকে পরিণত করেছে হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বিপ্লবে। এ ছিল যেন এক আলোর বন্যা এবং মানবীয় ও ইসলামী শক্তির অনন্য বিস্ফোরণ! অনেক প্রতিকূলতা আর বাধা সত্ত্বেও অনবদ্য ও অভূতপূর্ব নানা সাফল্যের গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায় ইরানের ইসলামী বিপ্লবকে ক্রমেই এগিয়ে নিচ্ছে বৈশ্বিক এক মহা-বিপ্লবের চূড়ান্ত লক্ষ্যগুলোর ভিত্তি প্রতিষ্ঠার দিকে। যে লক্ষ্যগুলো বাস্তবায়িত হলে বিশ্বে থাকবে না অজ্ঞতা ও পাপাচারের আঁধার; থাকবে মানবিকতা ও ন্যায়বিচারসহ সবগুলো সুন্দর মূল্যবোধের অফুরন্ত আলো এবং স্বাধিকারহারা মানুষেরা ফিরে পাবে তাদের সমস্ত অধিকার। তাই এরিমধ্যে বিশ্বের নানা অঞ্চলের সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক নানা আন্দোলনের জন্য এ বিপ্লব পরিণত হয়েছে এক আদর্শ গাইড বা অনুকরণীয় মডেলে।

 

ইরানের ইসলামী বিপ্লব জাতিগুলোর প্রতিরোধ সংগ্রামের ইতিহাসে এক স্বর্ণোজ্জ্বল অধ্যায় সূচিত করেছে। কারণ, এ বিপ্লব কেবল ইরানেই বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনে তাগুতি ও সাম্রাজ্যবাদের শীর্ষস্থানীয় এক অনুচর রাজতান্ত্রিক সরকারকে উৎখাত করেনি। এ বিপ্লব ‘প্রাচ্যও নয়, পাশ্চাত্যও নয়-বরং ইসলামই শ্রেষ্ঠ’-এই নীতির আলোকে আধিপত্যকামী শক্তিগুলোসহ বিশ্ব-সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধেও এক বলিষ্ঠ প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে। তাই এ বিপ্লবের আবেদন কোনো বিশেষ অঞ্চলে সীমিত থাকেনি। ফিলিস্তিন ও কাশ্মিরের মজলুম জনগণসহ মুক্তিকামী জাতিগুলোর কাছে ইরানের ইসলামী বিপ্লব হয়ে ওঠে অনুপ্রেরণার এক অফুরন্ত উৎস। এইসব কারণেই গত চার দশক ধরে এ বিপ্লব নব্য-উপনিবেশবাদী ও সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলোর জন্য প্রধান আতঙ্ক হয়ে বিরাজ করছে। খাঁটি মুহাম্মাদি ইসলামের পতাকাবাহী এ বিপ্লব ইসলামী আইন, সংস্কৃতি ও মূল্যবোধের ক্ষেত্রে কখনও বিন্দুমাত্র আপোষ করেনি। জালিমের বিরুদ্ধে ইরানের ইসলামী সরকারের কঠোর প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ এবং মজলুমের পক্ষে সর্বাত্মক সাহায্য ও সমর্থনই এই বাস্তবতার বড় প্রমাণ।

 

পুঁজিবাদী ও তথাকথিত সমাজবাদী পরাশক্তির রক্তচক্ষুকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে আধুনিক যুগের ধর্ম-বিদ্বেষী পরিবেশে ইসলামের ভিত্তিতে যে একটি বিপ্লব ঘটানো ও জনগণের সমর্থন নিয়ে ইসলাম-ধর্ম-ভিত্তিক রাষ্ট্র-ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব তা ছিল অবিশ্বাস্য। ইরানে ইসলামী বিপ্লব এমন সময় সংঘটিত হয় যখন ধর্ম ছিল কেবলই ব্যক্তিগত বিষয় এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ব্যক্তি ও সমাজ জীবন থেকে নির্বাসিত। ইরানের ইসলামী বিপ্লব আবারও প্রমাণ করেছে যে সত্যের জয় অনিবার্য এবং মুসলিম উম্মাহকে ও মুক্তিকামী জাতিগুলোকে চিরকাল মিথ্যার শেকল দিয়ে বেঁধে রাখা যাবে না। ইরানের ইসলামী বিপ্লব এমন সময় সফল হয়েছে যখন পশ্চিমা লিবারেলিজম বা কথিত উদার গণতন্ত্র ও প্রাচ্যের সমাজতন্ত্র মানুষের সমস্যাগুলো সমাধানে ব্যর্থ হয়েছে এবং আকর্ষণ-হারানো মানব-রচিত মতবাদগুলোর বিপরীতে ইসলামী বিপ্লব ও ইসলামী পুনর্জাগরণবাদ আদর্শ-প্রেমিক মুক্তিকামী মানুষ ও জাতিগুলোর কাছে আশার অনির্বাণ আলো হয়ে দেখা দিয়েছে।


যে বিপ্লব যত বেশি মহান ও যত বেশি উচ্চস্তরের নানা লক্ষ্য অর্জন করতে চায় সে বিপ্লবকে তত বেশি বাধা আর বঞ্চনার শিকার হতে হয়। ইরানের ইসলামী বিপ্লবও এর ব্যতিক্রম নয়। অন্যায় ও জুলুমের বিরুদ্ধে আপোষহীন ভূমিকার কারণে ইরানের ইসলামী বিপ্লব বিশ্বের জালিম ও তাগুতি শক্তিগুলোর মধ্যে ব্যাপক আতঙ্ক সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছে। ইরানের নেতৃত্বে বিশ্ব-মুসলিম ঐক্যবদ্ধ হয়ে জালিম শক্তিগুলোর নাম ও নিশানা মুছে দিতে পারে- এই আতঙ্ক জালিম এবং তাগুতি শক্তিগুলোর ঘুম কেড়ে নেয়। ফলে ইরানে ইসলামী বিপ্লবের বয়স এক বছর না পেরোতেই সাম্রাজ্যবাদীদের এজেন্ট বাথিস্ট সাদ্দামকে দিয়ে চাপিয়ে দেয়া হয় ইরানের ওপর যুদ্ধ। এর আগে তেহরানে বিপ্লবী ছাত্ররা বিশ্বের মুসলিম জাতিগুলোর বিরুদ্ধে নানা ষড়যন্ত্রে লিপ্ত মার্কিন সরকারের দূতাবাস দখল করে নেয়। কারণ, এই দূতাবাসকে ইসলামী বিপ্লবসহ মুসলিম জাতিগুলোর বিরুদ্ধে নানা ষড়যন্ত্র এবং মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সরকারের পক্ষে গুপ্তচরবৃত্তির প্রধান আস্তানা হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছিল।

 

কূটনীতিকের ছদ্মবেশধারী মার্কিন দূতাবাসের ৫২ জন গোয়েন্দা-কর্মী বা গুপ্তচরকে ইরানের বিপ্লবী ছাত্ররা ৪৪৪ দিন পর্যন্ত আটক রাখে। তাদেরকে মুক্ত করার জন্য মার্কিন সরকার রাতের আঁধারে ইরানে হামলার পরিকল্পনা নেয়। কিন্তু এক অলৌকিক ধূলি ঝড়ে কয়েকটি মার্কিন জঙ্গি বিমান ও হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত হওয়ায় ওই অভিযান পুরোপুরি ব্যর্থ হয়। অবশেষে মার্কিন সরকার ইরানসহ এ অঞ্চলে হস্তক্ষেপ করবে না ও আমেরিকায় আটক ইরানের সমস্ত সম্পদ ফেরত দেবে- এই প্রতিশ্রুতি দিলে তেহরান ওই মার্কিন গুপ্তচরদের ছেড়ে দেয়। মার্কিন সরকার ইসলামী বিপ্লবীদের ওই চপেটাঘাতকে কখনও ভুলতে পারেনি। মূলত ওই ব্যর্থতার কারণেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে পরাজিত হয় ডেমোক্রেট দলীয় সাবেক প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টার। একই ঘটনার প্রেক্ষাপটে ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করে মার্কিন সরকার এবং ইরানের ওপর আরোপ করে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞাসহ নানা একতরফা নিষেধাজ্ঞা যা আজও অব্যাহত রয়েছে।


অন্যদিকে ইসলামী বিপ্লবের পরপরই মধ্যপ্রাচ্যের বিষফোঁড়া হিসেবে খ্যাত ইহুদিবাদী ইসরাইলের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করে ফিলিস্তিনি জাতির ন্যায্য অধিকারের জন্য সোচ্চার ইরানের ইসলামী বিপ্লবী সরকার। এ সরকার তেহরানস্থ ইসরাইলি দূতাবাস বন্ধ করে দিয়ে তা ফিলিস্তিনি সংগ্রামীদের দান করে দেয় দূতাবাস হিসেবে ব্যবহার করতে। মোটকথা সাম্রাজ্যবাদের প্রধান মোড়ল মার্কিন সরকার, আগ্রাসী সোভিয়েত ইউনিয়ন ও দখলদার ইহুদিবাদী ইসরাইলের বিরুদ্ধে ইরানের ইসলামী বিপ্লবী সরকার যেসব কঠোর ও প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ নিয়েছিল, বিশ্বের অন্য কোনো সরকার তেমন পদক্ষেপ নেয়ার কথা চিন্তাও করতে পারেনি। মিশরের গণ-জাগরণ-পরবর্তী নির্বাচনে বিজয়ের সুবাদে ক্ষমতা-পাওয়া ও মাত্র এক বছরের জন্য ক্ষমতায় টিকে-থাকা ইসলামপন্থী মুরসি কিংবা তুরস্কের ক্ষমতাসীন এরদোগানের সরকারের মধ্যে ইরানের ইসলামী বিপ্লবের এইসব বিপ্লবী বৈশিষ্ট্যের বিন্দুমাত্র ছায়াপাতও দেখা যায়নি। ইরানের ইসলামী বিপ্লবের রূপকার মরহুম ইমাম খোমেনী বিশ্ববাসীর কাছে এটা তুলে ধরেন যে মার্কিন সরকার হচ্ছে ইসলামের এবং জাতিগুলোর স্বাধীনতা ও উন্নতির প্রধান শত্রু। তাই তিনি মার্কিন সরকারকে বড় শয়তান বলে অভিহিত করতেন।


যাই হোক, ইরানের ইসলামী বিপ্লবের এইসব আপোষহীন ও সংগ্রামী বৈশিষ্ট সাম্রাজ্যবাদী মহলে কাঁপন ধরিয়ে দেয়। এ বিপ্লব যাতে দেশে দেশে মুক্তিকামীদের কাছে রফতানি হতে না পারে সে জন্য সাদ্দামের মাধ্যমে ইরানের ওপর চাপিয়ে দেয়া হয় ৮ বছরের দীর্ঘ যুদ্ধ। সে যুদ্ধে রাজতান্ত্রিক আরব সরকারগুলোসহ বিশ্বের ২৬টি দেশ ইরানের বিরুদ্ধে ইরাকের সাদ্দাম সরকারকে সহায়তা দিয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বিজয়ী হয় ইরান। ইরানে আগ্রাসন শুরু করার জন্য ইরাকের সাদ্দাম সরকারকে দায়ী করে ক্ষতিপূরণ দিতে বলে জাতিসংঘ।

                                                                                        (২) 

ইসলামী বিপ্লবের ঐতিহ্যবাহী, সৃষ্টিশীল ও নতুন নানা বাণী আর চিন্তাধারার প্রভাবে দেশে দেশে ইসলামী পুনর্জাগরণ আন্দোলনগুলোর মনোবল চাঙ্গা হয়ে ওঠে ও ইসলামী রাজনৈতিক তৎপরতা জোরদার হতে থাকে। ফিলিস্তিন ও কাশ্মিরসহ বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের মুক্তি- আন্দোলনগুলো গভীরভাবে প্রভাবিত হয় ইরানের ইসলামী বিপ্লবের মাধ্যমে। বিশেষ করে, মধ্যপ্রাচ্যে তথা পশ্চিম এশিয়ায় এ বিপ্লবের গভীর প্রভাব আন্তর্জাতিক সম্পর্কের পুরনো সমীকরণকে বদলে দেয় । এ ছাড়াও এই বিপ্লব পরাশক্তিগুলোর একচেটিয়া কর্তৃত্ব বা দাপটকে বিভিন্ন অঞ্চলে মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ণ করে। ফলে পরাশক্তিগুলো এ বিপ্লবের প্রভাব ছড়িয়ে পড়ার ব্যাপারে আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়ে। ইসলাম যে আধুনিক যুগেও বিশ্বের একটি বড় ও প্রধান শক্তি তা উপলব্ধি করে সাম্রাজ্যবাদী মহল। ইসলামের রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক শক্তিকে যে উপেক্ষা করা সম্ভব নয় তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে ইসলাম-বিদ্বেষী নানা মহলের কাছে।


এ অবস্থায় ইরানের ইসলামী বিপ্লব যাতে অন্য দেশগুলোতে রফতানি হতে না পারে এবং এ বিপ্লব অঙ্কুরেই বিনষ্ট হয় সে আশায় ইরাকের সাদ্দামকে দিয়ে ইরানের ওপর চাপিয়ে দেয়া হয় যুদ্ধ। কিন্তু ইসলামের শক্তিতে বলিয়ান ইরানি মুজাহিদরা সাম্রাজ্যবাদের এই ষড়যন্ত্র ব্যর্থ করে দেন।


ইরানের ইসলামী বিপ্লবের আগ পর্যন্ত পাশ্চাত্য সমাজতন্ত্র তথা সমাজবাদী শিবিরকেই তার সবচেয়ে বড় শত্রু বলে মনে করত। কিন্তু ইরানের ইসলামী বিপ্লবের পর পাশ্চাত্য ইসলামকেই তার প্রধান শত্রু হিসেবে টার্গেট করে এবং যাতে বিশ্বব্যাপী ইসলামী ঐক্য গড়ে উঠতে না পারে সে জন্য মুসলিম দেশ আর জাতিগুলোর মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির কর্মসূচি হাতে নেয়। একই প্রেক্ষাপটে ইসলাম ধর্মকে বিকৃতভাবে উপস্থাপন করার এবং ইসলামের অপব্যাখ্যার ভিত্তিতে সন্ত্রাসী ও চরমপন্থি নানা গোষ্ঠী গড়ে তোলারও পদক্ষেপ নেয় তারা। মাজহাবগত মতপার্থক্যকে দাঙ্গায় পরিণত করার জন্য এইসব গোষ্ঠীকে ব্যবহার করতে থাকে পাশ্চাত্য।

 

ইরানে ইসলামী বিপ্লব বিজয়ী হওয়ার পর পরই টাইম ম্যাগাজিনের এক নিবন্ধে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলা হয় যে গোটা মুসলিম উম্মাহ জেগে উঠছে। মুসলিম উম্মাহ যদি জেগে ওঠে তাহলে তারা ঐক্যবদ্ধ ও সংঘবদ্ধ হবে। আসলে বৃহত্তর ইসলামী ঐক্য ছিল সব যুগেই ইসলামের শত্রুদের জন্য একটি বড় আতঙ্কের বিষয়। ইরানের ইসলামী বিপ্লব মুসলিম জাতিগুলোর মধ্যে আত্ম-বিশ্বাস জোরদারের অনুপ্রেরণা হয়ে ওঠে। মুসলিম জাতিগুলোর সচেতন শিক্ষিত সমাজের অনেকেই এটা উপলব্ধি করতে থাকেন যে পাশ্চাত্যের ব্যর্থ মতবাদ ও সংস্কৃতির কাছে মাথা বিকিয়ে দেয়ার মত লজ্জাজনক আর কিছুই হতে পারে না। মোট কথা ইরানের ইসলামী বিপ্লবের আধ্যাত্মিক ও নৈতিক প্রভাব ক্রমেই জোরদার হতে থাকে। পশ্চিমা পুঁজিবাদী শক্তি ও অন্যান্য আধিপত্যকামী মানব-রচিত মতবাদের মোকাবেলায় ইসলামের ভিত্তিতে যে শক্তিশালী প্রতিরোধ এবং সংগ্রামী রাষ্ট্র-ব্যবস্থা গড়ে তোলা যায় ইরানের ইসলামী বিপ্লব তার গৌরবোজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। ইসলামকে আঁকড়ে ধরার মাধ্যমেই যে মুসলিম জাতিগুলো সম্মান অর্জন করতে পারে ইরানের ইসলামী বিপ্লব তাও বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরেছে।

 

মুসলমানদের প্রথম কিবলার শহর বায়তুল মুকাদ্দাসকে ইহুদিবাদী দখলদারদের হাত থেকে মুক্ত করার জন্য ইরানের ইসলামী বিপ্লবের রূপকার ইমাম খোমেনী (রা) রমজানের শেষ শুক্রবারকে বিশ্ব-কুদস দিবস বলে ঘোষণা করেন। আর মুসলিম মাজহাবগুলোর মধ্যে নৈকট্য গড়ে তোলার জন্য ১২ রবিউল আউয়াল থেকে ১৭ রবিউল আউয়ালকে ঘোষণা করা হয় ঐক্য সপ্তাহ। ইসলামী ঐক্য প্রতিষ্ঠার ইতিহাসে ইরানের ইসলামী বিপ্লবী রাষ্ট্রের এ দু’টি প্রভাবশালী পদক্ষেপ অমর হয়ে থাকবে।


আসলে ইরানে জনগণের ব্যাপক অংশগ্রহণের ভিত্তিতে ইসলামী শরিয়তী আইন-কেন্দ্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা পাশ্চাত্যের রাষ্ট্র-ব্যবস্থাসহ তাদের নিয়ন্ত্রিত বিশ্ব-ব্যবস্থার জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইসলামী ইরানের ক্রমবর্ধমান প্রভাবকে স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হয়েছে বিশ্বের পরাশক্তিগুলো। আর এতে কেবল ইরানের নয় ইসলামেরও সম্মান বৃদ্ধি পেয়েছে। এর ফলে এটা স্পষ্ট হয়েছে যে বিশ্ব-অঙ্গনে ইসলামী শক্তির বাস্তবতা ও প্রভাবকে উপেক্ষা করা সম্ভব নয়।


ইসলাম বিশ্বের নানা জাতি ও ধর্মের অনুসারীদের সঙ্গে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের নীতিতে বিশ্বাসী। ইরানের ইসলামী বিপ্লবের উদ্যোগে নানা জাতি ও ধর্মের মধ্যে সংলাপ আর শান্তিপূর্ণ নানা পদক্ষেপ ইসলামের এ নীতি তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছে। তাই এটা আবারও প্রমাণিত হল যে ইসলাম শান্তির ধর্ম এবং এ ধর্ম অন্যদের ওপর জোর করে কিছু চাপিয়ে দিতে চায় না।


অন্যদিকে ইরানের ইসলামী বিপ্লবের রাজনৈতিক ও আধ্যাত্মিক প্রভাবকে ক্ষুণ্ণ করার লক্ষ্যেই মার্কিন চিন্তাবিদ হান্টিংটন সভ্যতার মধ্যে সংঘাতের তত্ত্ব উপস্থাপন করেছেন।


ইরানের ইসলামী বিপ্লবকে অঙ্কুরেই বিনষ্ট করার জন্য নানা ভাষাভাষী ও জাতির এই দেশটিতে জাতিগত দাঙ্গা এবং বিভেদ উসকে দেয়ার চেষ্টা করেছিল সাম্রাজ্যবাদীরা। কিন্তু ইসলামের বর্ণবাদ-বিরোধী নীতি ও সাম্যের বাণীতে উদ্বুদ্ধ ইসলামী বিপ্লব দেশটির শিয়া ও সুন্নি মুসলমানসহ কুর্দি, তুর্কি, আরবি, লোর, বালুচ ও ফার্সি ভাষাভাষী সব ইরানির মন জয় করতে সক্ষম হয়। তাই ইসলামী বিপ্লবের পর অনুষ্ঠিত প্রথম গণভোটে ইরানের শতকরা প্রায় ৯৮ শতাংশ ভোটার দেশটিকে ইসলামী প্রজাতন্ত্রে পরিণত করার পক্ষে ভোট দেন।


ইরানের জনগণ ইসলামী সংবিধানের পক্ষেও ভোট দেন। এই সংবিধানে সংখ্যালঘু ধর্মীয় সম্প্রদায়সহ সব জাতি ও গোত্রের অধিকারগুলো রক্ষার কথা বলা হয়েছে।


ইরানের ইসলামী বিপ্লবের আরেকটি বড় বৈশিষ্ট্য হল এর গণমুখিতা। এ বিপ্লব ছিল জনগণের বিপ্লব। তাই দেশ গড়া ও পরিচালনাসহ প্রতিটি বিষয়ে জনগণের মতামত নেয়াকে গুরুত্ব দেয় ইরানের ইসলামী রাষ্ট্রের সংবিধান। ইরানে ইসলামী বিপ্লবের পর প্রায় প্রতি বছরই গড়ে একটি করে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। এমনকি যুদ্ধের সময়ও নির্বাচন পেছানো হয়নি। দেশটির প্রেসিডেন্ট, সংসদ সদস্য ও বিশেষজ্ঞ পরিষদের সদস্যরা সরাসরি জনগণের ভোটে নির্বাচিত হন। আর ইরানের সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচিত হন বিশেষজ্ঞ পরিষদের মাধ্যমে। ইরানের নির্বাচনে বিপুল সংখ্যক ভোটারের অংশগ্রহণও এ বিপ্লবের অন্যতম বড় সাফল্য। এ সাফল্য ইরানি জাতির রাজনৈতিক পরিপক্কতাকেই তুলে ধরে।

 

( ৩)

ইরানের ইসলামী বিপ্লব একটি খাঁটি ইসলামী বিপ্লব। কারণ, এ বিপ্লব খাঁটি মুহাম্মাদি ইসলামকে প্রতিষ্ঠা ও বাস্তবায়িত করতে চায়। এ কারণেই এ বিপ্লবের শত্রুর অভাব যেমন নেই তেমনি তা বিশ্বের মুক্তিকামী ও ইসলাম-প্রেমিক জনগণের মধ্যে এত বিপুল সাড়া জাগাতে সক্ষম হয়েছে।


অন্য কথায় ইরানের ইসলামী বিপ্লবের বৈশিষ্ট মূলত খাঁটি মুহাম্মাদি ইসলামেরই বৈশিষ্ট। ইসলামী ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হযরত আয়াতুল্লাহিল উজমা খামেনেয়ী খাঁটি মুহাম্মাদি ইসলামের বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে বলেছেন, খাঁটি মুহাম্মাদি ইসলাম হলো ন্যায়-নীতি ও মর্যাদার ইসলাম যা অসহায়-‘বঞ্চিত ও দুর্বলদের পৃষ্ঠপোষকতা দেয় এবং যা ইসলাম নিরীহ ও মজলুমদের অধিকার রক্ষা করে। এই ইসলাম শত্রুদের বিরুদ্ধে জিহাদ করতে বলে ও ফেতনা-ফ্যাসাদ সৃষ্টিকারী বলদর্পীদের ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে। এই ইসলাম আধ্যাত্মিকতা, ফজিলত ও নৈতিকতাপূর্ণ, আর এই ইসলামই হলো খাঁটি ইসলাম।’


ইরানের ইসলামী বিপ্লবের প্রভাব সম্পর্কে বিশ্লেষণ করতে গিয়ে মার্কিন চিন্তাবিদ হান্টিংটন বলেছেন, ‘আধুনিক যুগের রাজনৈতিক ইসলাম ইরানের ইসলাম বিপ্লব থেকেই অনুপ্রেরণা পেয়েছে। এই ইসলাম তথা রাজনৈতিক ইসলাম নিজেকে পাশ্চাত্যের প্রতিদ্বন্দ্বী বলে মনে করে। আর এই ইসলাম মার্কিন বিশ্ব-ব্যবস্থার জন্য সবচেয়ে বড় বিপদ।’ তাই এটা বলা যায় মূলত ইরানের ইসলামী বিপ্লবের রাজনৈতিক ও আধ্যাত্মিক প্রভাবকে ক্ষুণ্ণ করার লক্ষ্যেই মার্কিন চিন্তাবিদ হানটিংটন সভ্যতার মধ্যে সংঘাতের তত্ত্ব উপস্থাপন করেছেন। 

 

ডক্টর মিশেল জনসন লন্ডন থেকে প্রকাশিত জি-ও পলিটিকাল স্ট্রাটেজি সাময়িকীকে একটি সাক্ষাৎকার দেন। ১৯৮৬ সালের ২১ জুলাই সংখ্যায় তাঁর ঐ সাক্ষাৎকারটি ছাপা হয়। ঐ সাক্ষাৎকারে তিনি ইরানের ইসলামী বিপ্লব সম্পর্কে তাঁর মতামত দিতে গিয়ে বলেছেন-ইরানের ইসলামী বিপ্লব ষোল শতকের পর পশ্চিমাদের ওপর মুসলমানদের প্রথম বিজয় হিসেবে পরিগণিত হচ্ছে। এই বিপ্লবের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকটি হলো ইসলাম নির্ভরতা। বিপ্লবের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে এই ইসলামী আদর্শই কাজ করেছে।

 

দল-মত-মাজহাব নির্বিশেষে ইরানের ইসলামী বিপ্লবে জনগণের ব্যাপক উপস্থিতি সম্পর্কে ফরাসি বিশিষ্ট লেখক,সাংবাদিক এবং মধ্যপ্রাচ্য বিশেষজ্ঞ এরিক রোলো বলেছেন, ইরানের বিপ্লবই একমাত্র ধর্মীয় বিপ্লব যেখানে ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা পর্যন্ত একত্রে মিলেমিশে আন্দোলন করেছিল। ব্রিটিশ গবেষক এবং ইরান বিষয়ক বিশেষজ্ঞ প্রেড হ্যালিডে শাহের বিরুদ্ধে জনগণের বিশাল বিক্ষোভকে মানব ইতিহাসের সবচেয়ে বড়ো গণবিক্ষোভ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।


ফরাসি চিন্তাবিদ মিশেল ফুকো ইরানের ইসলামী বিপ্লব নিয়ে গবেষণা করেছিলেন। তিনি বলেছেন, 'আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করতাম, জনগণের ইচ্ছা-আকাঙ্ক্ষা বা প্রত্যয় অনেকটা খোদা কিংবা আত্মার মতোই অদৃশ্য, চোখে দেখা যায় না...কিন্তু আমরা তেহরানে এবং সমগ্র ইরানে একটি জাতির সামষ্টিক ইচ্ছা লক্ষ্য করেছি। এটা খুবই প্রশংসনীয় এবং বিরল একটি ঘটনা।'

 

উত্তর-আধুনিক চিন্তাধারায় প্রভাবিত ফরাসি চিন্তাবিদ মিশেল ফুকো ইরানের ইসলামী বিপ্লব পরিদর্শনে এসেছিলেন। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা এবং ইরানী জনগণের ঐক্য ও সংহতি দেখে তিনি অভিভূত হয়েছেন। তিনি তাঁর ‘নিষ্প্রাণ বিশ্বের প্রাণ ইসলামী বিপ্লব’ নামক গ্রন্থে লিখেছেন, ‘বাস্তবতা হলো এই বিপ্লবী ঘটনার উদাহরণ ইতিহাসে বিরল। কারণ, এই বিপ্লবে পুরো একটি জাতি তার আশা আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন দেখেছে। আমি জানি না, আমার সাথে অন্যরা একমত হবে কি হবে না! কিন্তু আমি তেহরানে এবং সমগ্র ইরানে সমগ্র জাতির আশা আকাঙক্ষার প্রতিফলন দেখেছি। যে জাতি অক্লান্ত পরিশ্রম করে নিজেদের স্থায়ী ইচ্ছার প্রকাশ ঘটায়, আমাদের উচিত তাদের প্রতি সম্মান দেখানো। কেননা বিশ্বের অন্য কোথাও তা দেখা যায় না।’

 

ফ্রান্সের বিশিষ্ট সাংবাদিক পিয়ের ব্যালান্সে ইসলামী বিপ্লবী আন্দোলন চলাকালে তেহরানে ছিলেন। তিনি 'ইরান,আল্লাহর নামে বিপ্লব' নামক গ্রন্থে লিখেছেন, ‘যে বিষয়টি আমাকে বিস্মিত করেছে তাহলো একটি জাতির প্রায় সমস্ত মানুষ মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে....যা সত্যিই অবাক করার মতো ব্যাপার। এরকমও দেখেছি, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা দল বেঁধে এসে বলছে আমরা সবাই এক, সবাই কুরআনের সমর্থক, সবাই মুসলমান, আমাদের মাঝে কোনো ভেদাভেদ নেই।'


ইরানে মার্কিন কূটনীতিক জন স্ট্যাম্পল তাঁর লেখা "ইরান বিপ্লবের নেপথ্যে " নামক গ্রন্থে লিখেছেন,"বিপ্লব সংক্রান্ত বার্তা বিশ্বস্ততার সাথে এবং সবচে দ্রুত এক শহর থেকে আরেক শহরে পৌঁছানোর মাধ্যম ছিল মসজিদ। বিশ্বস্ত এবং উচ্চ মর্যাদা সম্পন্ন আলেমদের মাধ্যমেই এই কাজটি পরিচালিত হতো।" ইরানের সাবেক প্রেসিডেন্ট আহমাদিনেজাদের উপদেষ্টা এবং বিখ্যাত যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ প্রফেসর হামিদ মাওলানা বলেছেন-ইরানের ইসলামী বিপ্লব মসজিদের মাধ্যমে সংগঠিত ও পরিচালিত হয়েছে।

 

ইসলামী বিপ্লব বিজয়ের নেপথ্যে আলেম সমাজ এবং মসজিদের ভূমিকার একটা সংক্ষিপ্ত চিত্র লক্ষ্য করা যাবে ‘ক্ষমতার মরীচিকা’ নামক গ্রন্থে। এই বইটি লিখেছেন ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের লেখক রবার্ট গ্রাহাম। তিনি লিখেছেন, ‘বাস্তবতা হলো এই যে, ইরানের আলেম সমাজ জনগণের মাঝেই বসবাস করেন। সেজন্যেই জনগণের সাথে তাঁদের সম্পর্ক বা যোগাযোগ খুবই ঘনিষ্ঠ। তাই জনগণের চিন্তা-চেতনা,আবেগ-অনুভূতি সম্পর্কে তাঁরা অন্যদের চেয়ে বেশি জানেন এবং বোঝেন। আর মসজিদ হলো আপামর জনগণের জীবন প্রবাহের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। যখন আলেম সমাজ কোনো নীতি-আদর্শের বিরোধিতা করেন,তখন জনগণ তাঁদের ঐ দৃষ্টিভঙ্গিকে কঠিন পরিস্থিতির মাঝেও গ্রহণ করতে দ্বিধা করে না। অন্যদিকে,আলেমদের যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং মসজিদ পদ্ধতি সর্বস্তরের জনগণের সাথে যোগাযোগ ও সম্পর্ক স্থাপনের একটা বিশাল শক্তি হিসেবে কাজ করে।’ 


রুশ লেখক নিকোলা মিশিন ইমাম খোমেনী (রহ) সম্পর্কে লেখা তাঁর বইতে লিখেছেন- ‘ইরানের ইসলামী বিপ্লব মানুষের অন্তর কেড়ে নিয়েছে। ইমাম খোমেনী (রহ) এর নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত ইসলামী বিপ্লবের মূল্য ছিল এই যে, তিনি মার্কিন বিশ্ব-সাম্রাজ্যবাদকে উপেক্ষা করে বলেছেন-আমাদের নিজস্ব মূল্যবোধ রয়েছে, সেটা হলো কোরআনের মূল্যবোধ। তিনি বিশ্বাস করতেন যে পশ্চিমা গণতন্ত্রের চেয়ে ইসলামী গণতন্ত্র অনেক বেশি পরিপূর্ণ। বিশ্ববাসীকে তিনি বুঝিয়েছেন, মুসলিম বিশ্বে সবচেয়ে মূল্যবান বস্তু হলো আলকুরআন।এই কোরআন যার সাথে থাকে সে বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি।’

 

আসলে বস্তুতন্ত্রের নাগপাশে আবদ্ধ পৃথিবীতে ইরানের ইসলামী বিপ্লবের ঔজ্জ্বল্য ছিল বিস্ময়কর একটি ঘটনা। বিপ্লব বিজয়ের ঘটনাকে ইমাম খোমেনী (রহ) মোজেজা বলে অভিহিত করে বলেছেন-সমাজে একটা আত্মিক পরিবর্তন এসেছে। আমি এটাকে আল্লাহর পক্ষ থেকে মোজেজা ছাড়া অন্য কোনো নামে অভিহিত করতে পারছি না।

 

বিশ্বব্যাপী বিপ্লব বিষয়ক গবেষক এবং সমাজ বিজ্ঞানী মিসেস স্কচপোল তেদা বলেছেন, বিদেশী পর্যবেক্ষকদের জন্যে ইরানের ইসলামী বিপ্লবী আন্দোলন এবং শাহের পতন ছিল একটা আকস্মিক বিস্ময়। শাহের মিত্রদের থেকে শুরু করে সাংবাদিক,বুদ্ধিজীবী,রাজনীতিবিদ, সমাজ বিজ্ঞানী-সবাই বিপ্লবের ঘটনাকে অবিশ্বাস্য একটা ব্যাপার বলে মত দিয়েছেন।


ইরানের ইসলামী বিপ্লব মানব জীবনে বস্তুগত চাহিদার বিষয়টি অস্বীকার না করেই বিশ্ববাসীর কাছে এ বার্তা পৌঁছে দেয় যে, হযরত মুসা (আঃ), হযরত ঈসা (আঃ) ও সর্বশেষ রাসূল হযরত মোহাম্মাদ (সাঃ) যে সমাজ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন, সে ধরনের সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে পারলেই ন্যায়বিচার ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠিত করা সম্ভব।


ফরাসি সমাজ বিজ্ঞানী মিশেল ফুকো এ সম্পর্কে বলেছেন, ‘আধ্যাত্মিকতা ছিল ইরানের ইসলামী বিপ্লবের মূলভিত্তি। এ বিপ্লব পুরনো চিন্তাধারার প্রতি ফিরে যাওয়ার পরিবর্তে আধ্যাত্মিকতা সম্পর্কে সম্পূর্ণ নতুন দৃষ্টিভঙ্গি পেশ করেছে। এ বিশেষত্ব ইরানের ইসলামী বিপ্লবকে বিশ্বের অন্যান্য বিপ্লব থেকে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য দান করেছে এবং নিজেই একটি আদর্শে পরিণত হয়েছে।’ ইরানের ইসলামী বিপ্লবে মুগ্ধ হয়ে মিশেল ফুকো এ বিপ্লবকে "প্রথম অত্যাধুনিক বিপ্লব" বলে অভিহিত করেছিলেন। এছাড়া তিনি অন্য এক লেখায় এ বিপ্লবকে "গণজাগরণের আধুনিকতম রূপ" বলে উল্লেখ করেন। 

 

প্রখ্যাত ব্রিটিশ সমাজ বিজ্ঞানী এন্টনি গিডেনস বলেছেন, ‘কার্ল মার্কস, দুরখিইম ও ভেবেরের মত বিখ্যাত সমাজবিজ্ঞানীরা তাদের সমাজ বিজ্ঞান বিষয়ক তত্ত্বে মোটামুটি যে ধারণা দেয়ার চেষ্টা করেছেন, তা হচ্ছে, মানব জীবন থেকে ধর্ম আস্তে আস্তে বাদ পড়ে যাচ্ছে এবং সেকুলারিযম বা ধর্মহীনতা ধর্মের যায়গাটি দখল করে নিচ্ছে। কিন্তু আশির দশকে ইরানের ইসলামী বিপ্লবের বিজয়ের পর আমরা ঐসব চিন্তাবিদের ভবিষ্যদ্বাণীর বিপরীত স্রোতধারা লক্ষ্য করেছি।’ 

 

(৪)

 

ইরানের ইসলামী বিপ্লব মানব জীবনে বস্তুগত চাহিদার বিষয়টি অস্বীকার না করেই বিশ্ববাসীর কাছে এ বার্তা পৌঁছে দেয় যে, হযরত মুসা (আঃ), হযরত ঈসা (আঃ) ও সর্বশেষ রাসূল হযরত মোহাম্মাদ (সাঃ) যে সমাজ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন, সে ধরনের সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে পারলেই ন্যায়বিচার ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব।


ইরানের ইসলামী বিপ্লব গণ-ভিত্তিক ও গণমুখী। এ প্রসঙ্গে বলতে হয় যে, পশ্চিমা গণতন্ত্র আর ইসলামী গণতন্ত্রের মধ্যে মৌলিক পার্থক্যটি হলো ন্যায় চিন্তার মধ্যে। ধর্ম ভিত্তিক জনগণের শাসন ব্যবস্থায় ন্যায়বিচার একটি মৌলিক ও কেন্দ্রীয় বিষয়। কারণ ইসলামে কোনোরকম বৈষম্য গ্রহণযোগ্য নয়। ইসলাম সামাজিক এবং অর্থনৈতিক বিভিন্ন ক্ষেত্রে ন্যায় প্রতিষ্ঠার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে।

 

সমকালীন প্রাচ্য বা পাশ্চাত্যের অন্য কোনো মতবাদ যেমন জাতীয়তাবাদ, পুঁজিবাদ, সমাজতন্ত্র কিংবা সোশ্যালিজমের মতো মতবাদগুলো ইরানের ইসলামী বিপ্লবের ওপর বিন্দুমাত্র প্রভাবও খাটাতে পারে নি।


জার্মান বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর ইয়াভেশ ওসভেস ইসলামী বিপ্লবের অর্থবহ একটি ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘যে সময় বস্তুবাদের কর্তৃত্ব চলছিল, আধ্যাত্মিকতা বিরোধী চিন্তা ও বস্তুতান্ত্রিকতা যখন পুরো সমাজকে নিজস্ব বৃত্তে আবদ্ধ করে রেখেছিল সে সময় ধর্ম ও আধ্যাত্মিকতার যে পুনর্জাগরণ এসেছে তা ইমাম খোমেনী (রহ) এবং ইসলামী বিপ্লবের কাছে ঋণী।’


মার্কিন এম.আই.টি. বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ফিশার সামাজিক-সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে ইসলামী বিপ্লবের প্রভাব সম্পর্কে বলেন, ‘ইমাম খোমেনী (রহ) এর কাছে বিপ্লব কেবল একটা রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক বিপ্লব ছিল না, বরং একটা আধ্যাত্মিক ও ইসলামী বিপ্লব ছিল যার ফলে, সরকার, শাসনব্যবস্থা এবং সামাজিক আচরণের ক্ষেত্রে ব্যাপক পরিবর্তন আসা উচিত। মানুষের জীবনযাত্রায়ও ইসলামী বিপ্লব পরিবর্তন আনবে।’ 


রুশ রাজনীতিবিদ সের্গেই বাবুরিন ইরানের ইসলামী বিপ্লবে ইসলামের ভূমিকা সম্পর্কে বলেছেন, ‘ইসলামী বিপ্লব কেবল ধর্মীয় কোনো বড় আন্দোলনই নয়, একইসঙ্গে তা মানুষের স্বাধীনতা ও মুক্তির জন্যে সামাজিক ন্যায়বিচার-ভিত্তিক একটি রাজনৈতিক পট পরিবর্তনও বটে।’


কানাডার বিশিষ্ট মনীষী রবার্ট কোলেস্টোন ইসলামী বিপ্লবের প্রভাব সম্পর্কে বলেছেন, ‘আমি একজন পশ্চিমা অমুসলিম হিসেবে বলছি, এটা একটা অলৌকিক ঘটনা যে এক ঐশী ধর্ম এই আধুনিক বিশ্বে বিপ্লব ঘটিয়েছে এবং ন্যায় প্রতিষ্ঠার পথে এগিয়ে যাচ্ছে।’


দৈনিক লিবারেশন পত্রিকার সাংবাদিক মিসেস ক্লার বেরির বলেছেন, ‘ইরানের ইসলামী বিপ্লবী আন্দোলনের নিজস্ব ও স্বতন্ত্র যুক্তি আছে। আমি উপলব্ধি করছি যে এই আন্দোলনের একটা লক্ষ্য আছে যাকে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যগামী একটি মানুষের পদক্ষেপের সাথে তুলনা করা যায়। ইরানীরা একাত্ম হয়ে মিছিল করে। তারা ব্যাপক পরিশ্রমী। তারা ক্লান্তও হয় আবার নতুন করে প্রশ্বাস নিয়ে পুনরায় কাজ শুরু করে।’


ইরানের ইসলামী মুসলিম বিশ্বের আলেম ও চিন্তাবিদদের মধ্যে গভীর প্রভাব ফেলতে সক্ষম হয়েছে। মুসলিম বিশ্বের কোনো কোনো চিন্তাবিদসহ অনেকেই মনে করতেন ইসলামের সঙ্গে রাজনীতির কোনো সম্পর্ক নেই। ইসলাম ও রাজনীতি তাদের দৃষ্টিতে সম্পূর্ণ ভিন্ন ও সাংঘর্ষিক বিষয়। কিন্তু ইরানের ইসলামী বিপ্লবের সাফল্য তাদের অনেকেরই দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দেয়। রাজনীতি ও ইসলামের মধ্যে সম্পর্ক বিষয়ে ইরানের ইসলামী বিপ্লবের রূপকার মরহুম ইমাম খোমেনী বলেছেন, ‘পবিত্র কুরআন ও মহানবীর (সা) হাদিসে রাষ্ট্রীয় শাসন বা হুকুমাত ও রাজনীতি সম্পর্কে এত বেশি বিধান এসেছে যে অন্য কোনো বিষয়ে ইসলামের এত ব্যাপক বিধান নেই। আর এইসব বিধান সম্পর্কে উদাসীনতাই মুসলিম বিশ্বে নানা সংকট ও বিপত্তি সৃষ্টির কারণ।’

 

মুসলিম চিন্তাবিদদের অনেকেই ইসলামকে একটি ত্রুটিমুক্ত ও পরিপূর্ণ ধর্ম হিসেবে স্বীকার করলেও তারা মনে করতেন যেহেতু প্রচলিত রাজনীতিতে প্রতারণা, মিথ্যা কথা বলা ও প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করার মত নানা অনৈতিক বিষয় জড়িয়ে আছে তাই ইসলাম ধর্মের মত পবিত্র বিষয়কে রাজনীতির মাধ্যমে কলুষিত করা উচিত হবে না। কিন্তু মরহুম ইমাম খোমেনী এ জাতীয় চিন্তাধারাকে ইসলামের জন্য বড় ধরনের বিপর্যয় বলে অভিহিত করেছেন এবং এ ধরনের চিন্তাধারার প্রসারকে ইসলামের শত্রুদের মারাত্মক ষড়যন্ত্র বলে উল্লেখ করেছেন। এ ধরনের ভুল ধারণার মাধ্যমে উপনিবেশবাদীরা মুসলিম বিশ্বে তাদের শোষণই জোরদার করতে চায় বলে মরহুম ইমাম খোমেনী হুঁশিয়ারি দিয়ে গেছেন। আসলে রাজনীতি বলতে প্রচলিত অর্থে অনেক খারাপ কাজ বা ধারণাকে বোঝানো হলেও ইসলামের দৃষ্টিতে রাজনীতি বলতে ‘রাষ্ট্র-পরিচালনার নীতি’-কে বোঝানো হয়। মানব সমাজের বস্তুগত ও আধ্যাত্মিক কল্যাণই এই নীতির লক্ষ্য। তাই এ অর্থে রাজনীতি ও ইসলামের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই বলে ইমাম খোমেনী তুলে ধরেছেন। রাজনীতির ক্ষেত্রে খোদায়ী বিধান পালন করা ছাড়া ইসলাম অর্থহীন ও বিচ্যুত হতে বাধ্য বলে তিনি মনে করতেন।

 

                                                                                         (৫) 

 

ইরানের ইসলামী বিপ্লবের সাফল্যের এক বড় কারণ ছিল এর কিংবদন্তীতুল্য নেতা ও তাঁর নেতৃত্ব। অলৌকিক বিপ্লবী নামে খ্যাত মরহুম ইমাম খোমেনীকে বোঝা ও জানা ছাড়া তার প্রতিষ্ঠিত ইসলামী বিপ্লবকে বোঝা সম্ভব নয়। অন্যদিকে ইমাম খোমেনী (র)-কে বুঝতে হলে ইরানের সমকালীন ইতিহাস- বিশেষ করে, ইসলামী বিপ্লবের প্রেক্ষাপট সম্পর্কে সম্যক ধারণা রাখা জরুরি।


ইরানের ইসলামী বিপ্লবের রূপকার ইমাম খোমেনী (রহ.) একাধারে এমন একটি ঐতিহ্যের উত্তরসূরি ও এই ধারার সফল পরিপূর্ণতাদানকারী যে ধারার আলোকে ইরানের আলেম, জনগণ এবং এমনকি বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায়েরও সবাইই মুজতাহিদ ফকিহদের আনুগত্য করতেন। ইরানের ঐতিহ্যবাহী আলেমগণ সুপ্রাচীন কাল থেকেই জনগণের বাস্তব সমস্যা সমাধানে ভূমিকা রাখতেন ও জনগণকে প্রয়োজনীয় দিক-নির্দেশনা দিতেন।


ইমাম খোমেনী (র.) যোগ্যতা ও অবদানের দিক থেকে সমসাময়িক যুগের সব মুজতাহিদকে ছাড়িয়ে গেছেন, যদিও অতীতের মুজতাহিদদের সংগ্রাম বা আন্দোলনগুলো চূড়ান্ত রূপ লাভ করে ইমামের নেতৃত্বে। এ প্রসঙ্গে ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ডক্টর হামিদ আলগার বলেছেন: "আয়াতুল্লাহ খোমেনী (র.)'র কাছে যাওয়ার সুযোগ যাদের হয়েছে তারা জানেন যে তিনি মানবাদর্শের এক মূর্ত প্রতীক। তিনি কেবল নৈতিক, বুদ্ধিবৃত্তিক, রাজনৈতিক ও আধ্যাত্মিক যোগ্যতার এক অপূর্ব সমন্বয়ের মাধ্যমে ইরানে এরূপ বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখতে সক্ষম হয়েছেন। তিনি প্রচলিত মারজা-ই-তাকলিদের তথা অনুসরণযোগ্য মারজা'র সীমা ছাড়িয়ে গেছেন। একজন মুসলমানকে দেখতে হবে ইমাম খোমেনীর নেতৃত্বের ধরণের প্রতি যার মাধ্যমে তিনি বিপ্লবে নৈতিক ও আধ্যাত্মিক গতি দান করেছেন। এটা এখন উল্লেখযোগ্য এক দৃষ্টান্ত যে রাজনৈতিক ক্ষেত্রে বিপ্লব পরিচালনায় তিনি যে অবদান রেখেছেন তা সাম্প্রতিককালের ইতিহাসে অতুলনীয় এবং সে ভূমিকা পণ্ডিত, দার্শনিক ও আধ্যাত্মবাদী হিসেবে তার পরিচিতিকে ছাড়িয়ে গেছে।’


হামিদ আলগার আরও বলেছেন: ‘আধুনিক মুসলিম মানসিকতাসম্পন্ন লোকেরা মনে করেন, দর্শন ও আধ্যাত্মবাদ বাস্তবতা-বহির্ভূত, সামাজিক ও রাজনৈতিক ভূমিকায় অপ্রযোজ্য এবং তা এমনি এক অবাস্তব জিনিস যার সাথে মুসলিম ও ইসলামী বিশ্বের বিরাজমান সমস্যার কোনো সম্পর্ক নেই। আয়াতুল্লাহ খোমেনী এ ধারণার বিরুদ্ধে এক জীবন্ত উদাহরণ। তাঁর কাজ এ দুটি ধারণার মধ্যে সমন্বয় ঘটিয়েছে। তিনি যে বিপ্লব করেছেন তা শুধু যে রাজনৈতিক ও কৌশলগত ব্যাপার ছিল তা নয়, আধ্যাত্মবাদের এক অন্তর্নিহিত শক্তির মাধ্যমেও তা নিখুঁত-নির্ভুলভাবে পরিচালিত হয়েছে।’


হামিদ আলগার আরো লিখেছেন: "১৯৭৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে তিনি দেশে ফিরে আসলেন। কিন্তু তিনি সাথে করে কোনো সম্পদ নিয়ে এলেন না। কোনো রাজনৈতিক দলও তিনি গঠন করেননি। কোনো গেরিলা যুদ্ধও পরিচালনা করেননি। কোনো বিদেশী শক্তির সাহায্যও তিনি নিলেন না। অথচ এর মধ্যেই তিনি ইসলামী আন্দোলনের তর্কাতীত নেতৃত্বে সমাসীন হলেন।" 



ইমাম খোমেনী (র.) ইসলামের একজন যথার্থ প্রতিনিধি হিসেবে কথা বলতেন। তিনি কোনো ক্ষুদ্র গ্রুপের এমনকি আলেম সমাজের প্রতিনিধি হিসেবেও কথা বলতেন না। বরং ইসলামের একজন আলেম হিসেবে ও ইরানের একজন নাগরিক হিসেবে যাবতীয় সমস্যার ওপর কথা বলাকে নিজের দায়িত্ব মনে করতেন। তাঁর সব ঘোষণার মধ্যেই দেখা যেত এক স্থায়ী আবেদন। তিনি বলতেন, ইসলামে আলেমদের বিশেষ মর্যাদা ও গুরুত্ব রয়েছে। তাই তাঁরা শুধু পাঠ্যসূচীর অন্তর্ভুক্ত কিতাব-পত্র পড়বেন এবং পড়াবেন এ পর্যন্তই তাঁদের দায়িত্ব সীমাবদ্ধ নয়। বিশ্বনবী (সা.)'র হাদিসের শিক্ষা অনুযায়ী তাঁদের দায়িত্ব আরো অনেক ব্যাপক ও মহান। তাঁরা নবী (সা.)'র উত্তরাধিকারী। তাই নিছক মাদ্রাসার কোণায় বসে পাঠ্যসূচির বই-পুস্তক নিজে পড়া ও অন্যদের পড়ানোর মাধ্যমে নবীর উত্তরাধিকারের দায়িত্ব পালন করা সম্ভব নয়। লোকজনদের পথ দেখানোর ব্যাপারে তাঁদের দায়িত্বের পরিধি অনেক ব্যাপক ও বিস্তৃত। ইমাম খোমেনী শুধু আলেম সমাজেরই প্রতিনিধিত্বমূলক কথা বলতেন না, বরং সমগ্র মুসলিম জাতির উদ্দেশ্যেই তাঁর বক্তব্য ছিল উচ্চকিত।



মোটকথা নবী-রাসূলগণের সুযোগ্য উত্তরাধিকারী মহান মুজতাহিদ হযরত ইমাম খোমেনী (র.)'র নেতৃত্বে ইসলামী বিপ্লবের সফলতার মৌলিক কারণগুলো হল-ফকিহ মুজতাহিদদের গতিশীল ইজতিহাদ, ইসলামের আদর্শের অবিকৃত সাংগঠনিক রূপ যা বহুমাত্রিক যোগ্যতাসম্পন্ন আলেমদের নেতৃত্বে সংগঠিত এবং সর্বোপরি কারবালায় প্রকৃত ইসলামের জন্য প্রাণ উৎসর্গকারী শহীদদের নেতা হযরত ইমাম হুসাইন (আ.)'র শাহাদতের প্রতি ইরানি জনগণের শোক-ভালবাসাকে শক্তিতে পরিণত করে বিপ্লবে প্রাণ সঞ্চার করা। এ তিনটি মৌলিক কারণকে সমন্বিত করে ইমাম খোমেনী (র.) ইসলামী বিপ্লবকে যৌক্তিক পরিণতি দান করেছেন। আর এটা একদিকে যেমন তাঁর সবচেয়ে বড় সাফল্য, অন্যদিকে তা ইসলামী পুনর্জাগরণের জন্যও সবচেয়ে বড় যুগান্তকারী ঘটনা।

 

ইমাম খোমেনী (রহ.) প্রধান দু’টি লক্ষ্যকে সামনে রেখে ইসলামী বিপ্লব সফল করেন এবং দেশে ইসলামী সরকার প্রতিষ্ঠা করেন। এর একটি হলো- ইসলাম-ভিত্তিক আদর্শ সমাজ গঠন। আর অপরটি হলো- আল্লাহ-তায়ালা মানুষকে পৃথিবীতে নিজের প্রতিনিধি বলে যে ঘোষণা দিয়েছেন, সেই মর্যাদায় উত্তীর্ণ হওয়ার ক্ষেত্রে সহযোগিতা করা। ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব না হলে এ দু’টি লক্ষ্য সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়। ইসলাম ধর্মমতে, একজন নেতা হবেন ধর্ম-বিশেষজ্ঞ ও দূরদর্শী। যে কোন সমাজের জন্যই সব কিছুর আগে একজন সুযোগ্য নেতা জরুরি। ইমাম খোমেনী (রহ.) ছিলেন তেমনি একজন নেতা, যিনি কেবল আল্লাহর ওপর নির্ভর করতেন এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনই ছিল তার সব কাজের প্রধান উদ্দেশ্য। তিনি ছিলেন ব্যক্তি স্বার্থের ঊর্ধ্বে। দুনিয়া, আখিরাত, মানুষ এবং সৃষ্টির লক্ষ্য-উদ্দেশ্যের বিষয়ে ঐশী দৃষ্টিভঙ্গির অধিকারী ছিলেন এই মহান নেতা। তিনি মানুষকে আল্লাহর প্রতিনিধি হওয়ার উচ্চ মর্যাদায় পৌঁছে দিতে চেয়েছেন। 

 

                                                                                     (৬)

 

ইরানের ইসলামী বিপ্লব হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বিস্ময় এবং ইসলামী মূল্যবোধ ও আধ্যাত্মিকতার এক অনন্য বিস্ফোরণ। এ বিপ্লবের সাফল্যের নানা দিক ও সাফল্য বা অগ্রযাত্রার কিছু কারণ এখানে তুলে ধরছি:


ইরানের ইসলামী বিপ্লব বদলে দিয়েছে বিশ্ব রাজনীতির সমীকরণ। প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের কথিত পরাশক্তির আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ করে এ বিপ্লব জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইসলামকে তুলে ধরেছে সমসাময়িক যুগের সবচেয়ে প্রভাবশালী ও চ্যালেঞ্জিং শক্তি হিসেবে। বিশেষ করে মরহুম ইমাম খোমেনী ও তার সুযোগ্য উত্তরসূরি আয়াতুল্লাহ খামেনেয়ীর নেতৃত্বে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদী শক্তির প্রতি ইরানি জাতির প্রবল চপেটাঘাত বিশ্ব-সাম্রাজ্যবাদী শক্তি-বলয় তথা ইবলিসি শক্তিগুলোর একাধিপত্যকে নড়বড়ে করে দিয়েছে। বিগত হাজার বছরের ইতিহাসে ইসলামী শক্তির এমন প্রবল উত্থান এবং ইসলামের গৌরবময় পতাকার এত উচ্চতর অবস্থান আর কখনও ঘটেনি। এ বিপ্লবের বিস্ময়কর সাফল্যগুলোর শীর্ষে রয়েছে আধুনিক যুগে একটি সফল ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা যা গণভিত্তিক ইসলামী শাসন-ব্যবস্থাকে ক্রমেই বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয় করে তুলছে বলে সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলো আতঙ্কিত।



এ ছাড়াও ইরানের মহান ইসলামী বিপ্লবের আরো কিছু সাফল্যের মধ্যে রয়েছে: নাগরিক সুবিধা ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা, সামাজিক নিরাপত্তা দান, ইসলামী ও খোদামুখী আধ্যাত্মিক পরিবেশের বিস্তার, বিশ্ববাসীর কাছে ইসলামের প্রকৃত শত্রুদের সনাক্ত করা, ইসলামের আলোকে সাংস্কৃতিক বিপ্লব তথা কুরআনের শিক্ষা বিস্তার, হিজাবের সংস্কৃতি চালু ও সৎকাজের আদেশ আর অসৎ কাজে প্রতিরোধ এবং সুস্থ ধারার চলচ্চিত্রসহ শিল্প-মাধ্যমের ইসলামীকরণ, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে অসাধারণ সাফল্য, প্রতিরক্ষায় স্বনির্ভরতা ও স্বয়ংসম্পূর্ণতা, বিশ্বে মার্কিন নিয়ন্ত্রিত এক-মেরু-কেন্দ্রিক ব্যবস্থাকে ভেঙ্গে দেয়া, স্বাধীনচেতা সরকার ও মুসলিম দেশগুলোর সাথে সম্পর্কোন্নয়ন, ইরাক, ফিলিস্তিন, লেবানন ও আফগানিস্তানের শরণার্থীদের আশ্রয় প্রদান, আল্-কুদস ও ফিলিস্তিনকে মুসলিম বিশ্বের প্রধান ইস্যু হিসেবে তুলে ধরে এ ক্ষেত্রে ফিলিস্তিনি জাতিসহ বিশ্ব মুসলিমকে জাগিয়ে তোলার চেষ্টায় অসামান্য সাফল্য অর্জন, আশুরা, জিহাদ ও পবিত্র হজের মূল চেতনার বিস্তারসহ প্রকৃত এবং জরুরি ইসলামী চেতনাগুলোর বিস্তার।

ইরানের ইসলামী বিপ্লবের এক বিরল সৌভাগ্য এটা যে এই আন্দোলনের নেতা ইমাম খোমেনী (র.) ছিলেন প্রজ্ঞাবান, সাহসী ও অকুতোভয়। তিনি ছিলেন সময়ের গতি-প্রকৃতি অনুধাবনে সক্ষম। সাধারণ মানুষের প্রতি তাঁর সহমর্মিতা ও আকুতি ইসলামী জাগরণকে করেছে বেগবান। তাঁর নেতৃত্বের কারণেই ইরানি জাতি অবসাদ ও হতাশার মত শয়তানী শক্তিগুলোকে পরাজিত করতে সক্ষম হয়েছে। ইমাম ছিলেন দ্বিধাহীন ও নিঃশঙ্ক আত্মত্যাগের এক প্রোজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। 


ইমাম খোমেনী (র.)'র ব্যাপক দূরদৃষ্টি ও ইস্পাত-কঠিন খোদায়ী সংকল্প তাঁকে দিয়েছে কিংবদন্তীতুল্য জনপ্রিয়তা। কেবল তাঁর নামই কিংবা তাঁর মুখনিঃসৃত প্রতিটি কথায় টগবগ করে উঠত বিপ্লবী জনতার রক্ত এবং হৃদয়। আর এই সব কিছুরই প্রধান কারণ হল ইমাম তাঁর কর্মতৎপরতা, কর্মকৌশল ও আচার-আচরণে বিশ্বনবী (সা.)'র প্রকৃত সুন্নাত অনুসরণ করেছেন এবং খাঁটি মুহাম্মাদি ইসলামের চেতনায় জাগিয়ে তুলেছিলেন ইরানের আলেম সমাজ ও জনগণকে।

 

মরহুম ইমাম খোমেনী প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের সাংস্কৃতিক চিন্তাধারা বা মতাদর্শের মোকাবেলায় ইরানের মুসলিম সমাজে বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.)'র আদর্শকে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করেছেন। ইমামের খোদাভীতি ও একনিষ্ঠতাও ছিল বিশ্বনবী (সা.)'র নুরানি আদর্শের প্রতিফলন। ফলে তাঁর নেতৃত্ব বা দিক-নির্দেশনার সুবাদে ঈমান ও আধ্যাত্মিকতার প্রেরণায় ইরানি জাতি এতটা উজ্জীবিত হয়েছিল যে তাদের সব স্তরে, বিশেষ করে যুব সমাজের মধ্যে জিহাদ ও শাহাদতের সংস্কৃতির বিস্ময়কর প্রভাব বিশ্ববাসীকে অভিভূত করে।

 

 ইমাম খোমেনী (রহ.)-র দৃষ্টিতে এ পৃথিবীর সব কিছুই কেবল ততক্ষণ পর্যন্তই গুরুত্বপূর্ণ ও মূল্যবান, যতক্ষণ পর্যন্ত তা আল্লাহর নৈকট্য লাভ ও ঐশী কল্যাণের মাধ্যম হিসেবে কাজে লাগে। ‘নেতৃত্ব’ কেবল তখনি গুরুত্বপূর্ণ যখন তা আল্লাহর সৃষ্টির সেবা করার দায়িত্ব হিসেবে গণ্য হয়। ইমাম খোমেনী (রহ.) বিশ্বাস করতেন- শাসন-কর্তৃত্ব একমাত্র আল্লাহর। এ কারণে তিনি বহুবার বলেছেন, আমাকে সেবক বলবেন। সর্বোচ্চ নেতা বলার চেয়ে এটা বলাই ভালো। তিনি মানুষকে অত্যন্ত পবিত্র ও সম্মানজনক সত্ত্বা বলে মনে করতেন। তার মতে, প্রতিটি মানুষের ভেতরে সত্য পথকে উপলব্ধি করার এবং সেই পথে চলার ক্ষমতা রয়েছে। এ কারণে তিনি মানুষকে সজাগ ও সচেতন করার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন। ইরানি জাতিকে সঠিকভাবে চিনতে পেরেছিলেন হযরত ইমাম খোমেনী (রহ.)।

মিশরের খ্যাতনামা সাংবাদিক হাসানাইন হাইকালকে দেয়া এক সাক্ষাতকারে তিনি বলেছিলেন,


‘আমি গোটা জাতিকে চিনি। আমি তাদের ভেতরের খবর জানি এবং তাদের ভাষাতেই আমি কথা বলি। আমি জানি তাদের মনের ভেতর এখন কি বিরাজ করছে। আমি দেশের সব দুর্বল পয়েন্টগুলো সম্পর্কে অবহিত। গত অর্ধ শতকের ঘটনাবলীর সাক্ষী আমি। ইরানি জাতির দুর্দশার কারণ যে ভীতি-আতঙ্ক, তা আমি জানতাম।’ 


ইমাম খোমেনী (রহ.) শুধু যে, দেশ ও দেশের মানুষকেই সঠিকভাবে উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন তাই নয়, তিনি আসল বা প্রধান শত্রুকেও সঠিকভাবে চিহ্নিত করতে পেরেছিলেন। তিনি আমেরিকাকে প্রধান শত্রু বলে মনে করতেন। তিনি বলেছেন, ইরানসহ মুসলিম জাতিগুলোর সব দুঃখ-দুর্দশার মূলে রয়েছে আমেরিকা। ইমাম খোমেনী(রহ.) জুলুম ও দুর্নীতির সঙ্গে কখনোই আপোষ করেননি। অন্যায় ও জুলুমের বিরুদ্ধে সংগ্রামকে তিনি নবী-রাসূলদের দায়িত্বের ধারাবাহিকতা হিসেবে মনে করতেন। তিনি বলতেন, দুর্নীতিবাজ শক্তির সঙ্গে আপোষ না করার কারণে যারা সমালোচনা করে তারা সব কিছুকেই বৈষয়িক দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করে। তার মতে জালিম সরকারগুলোর সঙ্গে আপোষের অর্থ হলো মানব সমাজের ওপর জুলুম করা। এ কারণে নানা হুমকি ও চাপের মুখেও অন্যায় ও জুলুমের কাছে মাথা-নত করেননি ইমাম খোমেনী (রহ.)।

 

                                                                         (  ৭)

 

ইরানের ইসলামী বিপ্লবকে চিনতে হলে ও বুঝতে হলে এর রূপকার ইমাম খোমেনী (র)-কেও চিনতে হবে। ইমাম খোমেনী (র) ছিলেন যেন বর্তমান যুগের এক ঐশী ব্যক্তিত্ব । তিনি তার পেছনে গোটা জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করতে পেরেছিলেন। তার কথায় গোটা জাতি উঠেছে ও বসেছে, যুদ্ধ করেছে ও অকাতরে জীবন দিয়েছে। বিশ্বে অনেক ব্যক্তিত্বই আছেন যাদের সম্পর্কে বলা হয়, তিনি এলেন, দেখলেন ও জয় করলেন। কিন্তু তাদের অনেকেই শেষ পর্যন্ত জনপ্রিয়তা ধরে রাখতে পারেননি। ইমাম খোমেনী (র) যখন বিপ্লবের কাণ্ডারি হিসেবে আবির্ভূত হন তখন দেশটি প্রায় আড়াই কোটি মানুষের মধ্যে এক কোটি মানুষ উপচে পড়েছিল তেহরানে তাকে সম্বর্ধনা দিতে। আর তার মৃত্যুর সময় শোক মিছিলে যোগ দিয়েছিল জাতির আরও বেশি মানুষ।


ইমাম খোমেনীকে যখন কোটি কোটি মানুষ সম্বর্ধনা দিতে তেহরানে সমবেত হয় সে সময় তাকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, আপনার অনুভূতি কি? তিনি বলেছিলেন, ‘বিশেষ কোনো অনুভূতি নেই। এই জনতা যদি আমায় সমর্থন নাও করতো তবুও আমি দুঃখিত হতাম না। অর্থাৎ খোদায়ী দায়িত্ব পালনই হল বড় কথা।’


এটা স্পষ্ট, ঐশী নেতাদের কাছে খোদায়ী মিশন বা দায়িত্ব পালনের আহ্বানে কেউ সাড়া দিল কি দিল না তা বড় কথা নয়। ইমাম খোমেনী (র) বলেছিলেন, ‘হে খোদা! কেউ জানুক বা না জানুক, তুমি তো জান আমরা শুধু তোমার ধর্মের পতাকাকে উঁচু করে তুলে ধরার জন্যই বিপ্লব করেছিলাম, ক্ষমতা বা অন্য কোনো স্বার্থের জন্য নয়।’ লোভ-লালসার ঊর্ধ্বে উঠে কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য যদি কোনো কাজ করা হয় তাহলে তা সফল হয় এবং তা স্থায়ী ও স্মরণীয় হয় বলে ইমাম খোমেনী উল্লেখ করতেন। ইরানের ইসলামী বিপ্লব ও এর মহান নেতা ইমাম খোমেনী (র) সম্পর্কেও এই মহাসত্যটি প্রযোজ্য। বিপ্লবের পর ইমাম খোমেনী (র)’র সন্তান বা আত্মীয়রা সরকারি কোনো উঁচু পদ গ্রহণ করেননি। অর্থ-বিত্ত ও ক্ষমতার আশপাশে তার সন্তানরা কেউ থাকুক তা তিনি কখনও চাননি, বরং কঠোরভাবে এর বিরোধিতা করে গেছেন।


ইমাম খোমেনী (রহ.) ছিলেন ইসলামের পথে অকুতোভয় সৈনিক। আল্লাহ ছাড়া কাউকেই তিনি ভয় করতেন না। তিনি একবার বলেছিলেন, ‘আমি কখনোই ভীত-সন্ত্রস্ত হইনি। আমি আমার জীবনকে মুসলমানদের রক্ষার জন্যই প্রস্তুত করেছি এবং আমি এখন শাহাদাতের জন্য অপেক্ষা করছি।’ 


স্বৈরাচারী শাহের বিরুদ্ধে গণ-আন্দোলনের সংগঠক অনেক আলেমকে শহীদ করেছিল ইসরাইলি-মদদপুষ্ট শাহের গোয়েন্দা বাহিনী। বহু আলেমকে হেলিকপ্টারে উঠিয়ে আকাশ থেকে লবণ হ্রদে ফেলা দেয়া হয়েছিল। ফলে তারা তৎক্ষণাৎ শহীদ হয়েছেন। মরহুম ইমাম খোমেনীর ক্ষেত্রেও এমন ব্যবস্থা নেয়ার জোরালো আশঙ্কা ছিল। কিন্তু ইমাম নিজেই শাহাদতের জন্য সদা-প্রস্তুত ছিলেন এবং শাহাদত তার কাছে কখনও দুঃখজনক বিষয় বলে মনে হত না। 

 

রাসূল (সা.)-র দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে ইমাম খোমেনী মনে করতেন, যেসব শক্তিধর দেশ কখনোই জুলুম ও বঞ্চনার তিক্ত স্বাদ পায়নি, সেগুলোর পক্ষ থেকে সাহায্য আসার অপেক্ষায় মুসলমানদের থাকা উচিত নয়। যে কেউই ইমাম খোমেনী (রহ.)-র জীবন প্রণালী সঠিকভাবে বিশ্লেষণ করলে এটা উপলব্ধি করতে পারবে যে, এই নেতার পুরো জীবন ছিল ইসলাম-ভিত্তিক। তিনি সাধারণ জীবনযাপন করেছেন। বিশ্বজুড়ে বিলাসিতার যে প্রবণতা চলছে, সেটাকে তিনি কখনোই পরোয়া করেননি। ৮ বছর ধরে ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের সর্বোচ্চ ক্ষমতাধর ব্যক্তি ছিলেন ইমাম খোমেনী। কিন্তু বিলাসিতা ও অহংকার তাকে ছুঁতে পারেনি।

 

ইরানের ইসলামী বিপ্লবের রূপকার ইমাম খোমেনী (রহ.) ছিলেন নম্র, বিনয়ী ও ভারসাম্যপূর্ণ। ইরানের বিপ্লব সফল করার জন্য তিনি কখনোই কৃতিত্ব নিতেন না। তিনি বলতেন, ইসলামী বিপ্লব আল্লাহর পক্ষ থেকে অনুগ্রহ। তিনি ইসলামী বিপ্লবের বিজয়ে অহংকারী না হতে জনগণকে সব সময় পরামর্শ দিতেন এবং এ জন্য আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতেন। ইমাম খোমেনী (রহ.) দেশের জনগণের স্বার্থ ও কল্যাণকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিতেন এবং তাদের কল্যাণের জন্য সব সময় চেষ্টা চালিয়ে গেছেন। দেশের নেতা-কর্মীদের যখন পরামর্শ দিতেন, তখন জনগণের সেবা করার গুরুত্বের কথা স্মরণ করিয়ে দিতেন। তারই নেতৃত্বের পথ ধরে আজ ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান এগিয়ে গেছে বহু দূর। ইমাম খোমেনী (রহ.) আজও ইরানের সব নেতার আদর্শ।

                                                                              (৮)

 

স্বৈরশাসক শাহের পতন ছিল ইসলামের অলৌকিক শক্তিরই প্রকাশ। কারণ, গোটা পাশ্চাত্য ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং তার স্থানীয় দোসররা ছিল শাহের ঘনিষ্ঠ মিত্র। তারা শাহের শাসন রক্ষার জন্য ব্যাপক প্রচেষ্টা, জুলুম-নির্যাতন ও হত্যাকাণ্ড চালিয়েছিল।


মরহুম ইমাম খোমেনী বিপ্লবের নেতৃত্ব দেয়ার সময় যেসব উচ্চতর লক্ষ্যের কথা বলতেন এবং আল্লাহর ওয়াদা বাস্তবায়নের যে দৃঢ় আশাবাদ বা গভীর বিশ্বাসের কথা তুলে ধরতেন তা যে বাস্তবায়িত হবে শাহের শাসনের শেষের দিকেও পশ্চিমা বিশ্লেষক ও বিশেষজ্ঞদের কাছে তা অকল্পনীয় বা পুরোপুরি অসম্ভব বলে মনে হত। কিন্তু ১৯৭৯ সালের ১১ ই ফেব্রুয়ারি বিশ্বকে অবাক করে দিয়ে আধুনিক যুগের প্রথম ইসলামী রাষ্ট্র ও রাষ্ট্র ব্যবস্থার রক্তিম সূর্য উদিত হয় ইরানে।

  

ইরানের ইসলামী বিপ্লবের বিরুদ্ধে যে কেবল ইঙ্গ-মার্কিন নেতৃত্বাধীন পাশ্চাত্যই শত্রুতা শুরু করেছিল তা নয়, সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতৃত্বাধীন শক্তিগুলোও রাষ্ট্র ব্যবস্থায় ইসলামের পুনরুত্থানকে সহ্য করতে পারছিল না। গুপ্তচরবৃত্তির আস্তানা হিসেবে ব্যবহৃত তেহরানস্থ মার্কিন দূতাবাস থেকে উদ্ধার করা গোপন দলিলই এর প্রমাণ। ওই দলিলে দেখা গেছে ইরানের ডান ও বামপন্থীরা ইসলামী বিপ্লবকে বানচাল করার জন্য ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল।


এ ছাড়াও ইরানের বিরুদ্ধে সাদ্দামের চাপিয়ে দেয়া যুদ্ধের সময়ও প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের সব শক্তি এবং তাদের স্থানীয় সেবাদাস সরকারগুলো ইসলামী ইরানের বিরুদ্ধেই ঐক্যবদ্ধ অবস্থান নিয়েছে। উভয় শিবিরই সাদ্দামকে ইরানের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক সহায়তা দিয়েছে। কিন্তু ইমাম খোমেনী (র.)'র সতর্ক ও দূরদর্শী নেতৃত্ব ইরানের ইসলামী বিপ্লবকে প্রাচ্য এবং পাশ্চাত্যের সব ষড়যন্ত্র থেকে রক্ষা করেছে। এর কারণ, তিনি ইসলামী নীতিমালার ওপর নির্ভর করেছিলেন এবং মহান আল্লাহর ওপরই ভরসা করতেন।


ইরানের ইসলামী বিপ্লবের রূপকার ও অবিসম্বাদিত নেতা মরহুম ইমাম খোমেনী’র নেতৃত্বে ইসলামী বিপ্লব সফল হওয়ার ঘটনাটি ছিল হাজার বছরের মধ্যে এক অনন্য ঘটনা। এ বিপ্লব হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বিপ্লব। বিশ্বের বহু বিপ্লব শুরুর দিকে কিংবা মাঝপথেই হারিয়েছে বিপ্লবের ঘোষিত মূলনীতি ও প্রথম দিককার বৈশিষ্ট। পাল্টা বিপ্লব ও প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির চাপে হারিয়ে গেছে সেইসব বিপ্লব কিংবা আপোষ করতে বাধ্য হয়েছেন সেইসব বিপ্লবের নেতা। রাজতন্ত্র বিরোধী ফরাসি বিপ্লব ও সমাজবাদী রুশ বিপ্লব এর সাক্ষ্য। এইসব বিপ্লবের ঘোষিত মূল লক্ষ্যসহ নানা লক্ষ্য কখনও অর্জিত হয়নি। কিন্তু ইরানের ইসলামী বিপ্লব তার লক্ষ্য এবং আদর্শ থেকে কখনও বিচ্যুত হয়নি। এর মূল কারণ হল, এ বিপ্লবের প্রধান নেতাসহ শীর্ষস্থানীয় নেতৃবৃন্দ কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন ও পবিত্র কুরআনে বর্ণিত খোদায়ী দায়িত্ব পালনকেই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন।

 

১৫ বছরের নির্বাসিত জীবনের অবসান ঘটার পর ইসলামী বিপ্লবের স্থপতি ও ইসলামী প্রজাতন্ত্রের প্রতিষ্ঠাতা ইমাম খোমেনী (র)-কে যখন কোটি কোটি মানুষ সম্বর্ধনা দিতে তেহরানে সমবেত হয় সে সময় তাকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, আপনার অনুভূতি কী? তিনি বলেছিলেন, ‘বিশেষ কোনো অনুভূতি নেই। এই জনতা যদি আমায় সমর্থন নাও করতো তবুও আমি দুঃখিত হতাম না।’ অর্থাৎ খোদায়ী দায়িত্ব পালনই হল বড় কথা সাফল্য বা ব্যর্থতা নয়।


ক্ষমতা বা খ্যাতি অর্জনের বিন্দুমাত্র লোভ থাকলে ইমাম খোমেনী (র.) এতটা সফল হতে পারতেন না। ইসলাম সম্পর্কে পরিপূর্ণ জ্ঞান ও দৃষ্টিভঙ্গির অধিকারী ইমাম খোমেনী অবশ্য হঠাৎ করে ধুমকেতুর মত ইরানের আকাশে আবির্ভূত হয়েছিলেন তা মনে করা ঠিক হবে না। ইমাম খোমেনী (র) ছিল যুগ যুগ ধরে খাঁটি মুসলিম আলেম এবং তাদের সংগ্রাম, জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও প্রজ্ঞার সফল সমন্বয়কারী। ইসলামের ইতিহাস, উপনিবেশবাদী ও সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলোর নানা ষড়যন্ত্র এবং সমসাময়িক যুগের নানা আন্দোলন ও বিপ্লবগুলোর দুর্বলতা আর শক্তির দিকগুলো থেকে তিনি শিক্ষা নিয়েছিলেন। ফলে গোটা জাতি তার পেছনে ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল ও শেষ পর্যন্ত তার পেছনেই ঐক্যবদ্ধ থেকেছে। 


ইসলামের খণ্ডিত বা একপেশে ব্যাখ্যা এবং অপব্যাখ্যার বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন মরহুম ইমাম খোমেনী। বিপ্লবী মুসলিম আলেম ও শিক্ষিত জনগণের উদ্দেশে তিনি বলেছিলেন: ‘আপনারা ইসলামের বিধি-বিধান ও এর সামাজিক নানা সুফলগুলো লিখে প্রচার করুন। প্রচারের পদ্ধতি ও কর্মতৎপরতাকে পরিপূর্ণ করুন। আত্মবিশ্বাসী হউন। জেনে রাখুন যে আপনারা এ কাজে সফল হবেন। ইসলামকে যথাযথভাবে জনগণের কাছে তুলে ধরুন যাতে যুব প্রজন্ম এটা না ভাবে যে রাজনীতির সঙ্গে আলেমদের কোনো সম্পর্ক নেই এবং ধর্মকে রাজনীতি থেকে আলাদা রাখতে হবে। ধর্মকে রাজনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন রাখা এবং আলেম সমাজকে রাজনীতি ও সামাজিক বিষয়ে হস্তক্ষেপ করতে না দেয়ার বিষয়টি উপনিবেশবাদীদের তৈরি করা কথা ও তারাই এ মিথ্যা ধারণা প্রচার করেছে। যারা ধর্মে বিশ্বাসী নয় তারাই এ জাতীয় কথা প্রচার করে।’

 

আজ আমরা খাঁটি ইসলামের মোকাবেলায় বিকৃত ইসলামের নানা রূপ লক্ষ্য করছি। ইমাম খোমেনী (র) এইসব বিকৃত ইসলামকে বলতেন আমেরিকান ইসলাম। এই ভেজাল ইসলামের বৈশিষ্ট্য হল, সাম্রাজ্যবাদের ক্রীড়নক হওয়া এবং জুলুম ও শোষণের মোকাবেলায় নীরব থাকা।


আজ আমরা দেখছি যে মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে ইসলামের নাম ব্যবহার করে কেউ কেউ ক্ষমতায় আসা সত্ত্বেও জালিম মার্কিন সরকার ও ইহুদিবাদী ইসরাইলের সঙ্গে জোট বেধেছে তারা। তারা ইসলামী ইরানের বিরুদ্ধে তৎপরতা চালাচ্ছে এবং তাকফিরি-ওয়াহাবি গোষ্ঠীর মত ধর্মান্ধ নানা গোষ্ঠীকে সন্ত্রাসী তৎপরতায় নিয়োজিত করেছে। এইসব গোষ্ঠী ইসরাইলি ও মার্কিন জুলুমের ব্যাপারে নীরব রয়েছে। এটা স্পষ্ট যেসব কথিত আন্দোলন বা বিপ্লব খাঁটি ইসলামী চেতনা এবং ইসলামের সংগ্রামী ধারা থেকে দূরে থাকবে সেইসব আন্দোলন কখনও সফল হবে না ও জনগণের হৃদয় জয় করতে সক্ষম হবে না। এ ধরনের কথিত আন্দোলন মাজহাবি দ্বন্দ্ব এবং জাতীয়তাবাদী ও সাম্প্রদায়িক চেতনাকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে সাময়িক কোনো লক্ষ্য অর্জন করতে সক্ষম হলেও সুদূরপ্রসারী কোনো লক্ষ্য অর্জনেও সফল হবে না। 

 

ইমাম খোমেনীর সূচিত সফল ইসলামী বিপ্লব ও আদর্শ কেবল ইরানের জনগণকেই জাগিয়ে তোলেনি। এ আদর্শের প্রভাব ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে। বিশ্বের সব মজলুম জাতিকে সহায়তা দেয়া ছিল ইমাম খোমেনী (র) ও তার সূচিত বিপ্লবের অন্যতম প্রধান মূলনীতি। ইমাম খোমেনী এ প্রসঙ্গে বলেছেন, ‘হে মুসলমানরা, হে মুসলিম আলেম সমাজ! ইরানি জাতির মত আপনারাও ইসলাম ও মুসলমানদের সেবায় নিয়োজিত হন। প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের জালিমদের প্রত্যাখ্যান করুন। বিজাতীয় শোষক এবং তথাকথিত বিশেষজ্ঞ ও তেল-খাদকদের বিতাড়িত করুন। লাঞ্ছনা ও অপমানে ভরপুর কয়েকদিনের আরাম আয়েশের চেয়ে শাহাদত ও মর্যাদাকে প্রাধান্য দিন যেমনটি গুরুত্ব দিয়েছে ইরানের বীর মুসলিম জাতি। সামরিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনে ইরানি জাতির মতই শত্রুর ওপর কর্তৃত্বশীল হোন। শত্রুদের প্রচারণায় ভীত হবেন না। মহান আল্লাহ আপনাদের সঙ্গে রয়েছেন।’


ইমাম খোমেনীর ইসলামী বিপ্লব এভাবেই মুসলিম জাতিগুলোর মধ্যে আত্ম-বিশ্বাস এবং স্ব-নির্ভরতার চেতনা জাগিয়ে তোলার চেষ্টা করেছে।

 

                                                                   (৯)


ইরানের ইসলামী বিপ্লব খাঁটি-ইসলাম-নির্ভর বলেই এ বিপ্লবের প্রতি মহান আল্লাহর সহায়তা ছিল ও আছে এবং তা অব্যাহত থাকবে ভবিষ্যতেও। একই কারণে ইরানের ও বিশ্বের ইসলাম-অনুরাগী সচেতন জনগণও এ বিপ্লবকে লুফে নিয়েছেন। বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের মুসলিম চিন্তাবিদ ও এমনকি অনেক অমুসলিম চিন্তাবিদের কাছেও এটা স্পষ্ট যে ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানই হচ্ছে বর্তমান বিশ্বের একমাত্র খাঁটি ইসলামী রাষ্ট্র। কানাডীয় বিশেষজ্ঞ এরিক উইলবার্গ হচ্ছেন এমনই একজন চিন্তাবিদ।


ভারত উপমহাদেশের বিখ্যাত ইসলামী চিন্তাবিদ মাওলানা মওদুদি বলেছিলেন, ইরানের ইসলামী বিপ্লব আমার হৃদয়ের স্পন্দন। ইসলামী ইরানের অকুণ্ঠ প্রশংসা করেছিলেন বাংলাদেশের বিশিষ্ট আলেম মাওলানা মুহাম্মাদ উল্লাহ হাফেজজি হুজুর। তিনি ইরানি যুবকদের জিহাদ জজবা, নারীদের হিজাব এবং ইমাম খোমেনীর সুরাত ও সিরাতে তথা চেহারা-বেশভূষা ও আচরণে বিশ্বনবী (সা)’র সুন্নাতের উপস্থিতির প্রশংসা করেছিলেন। এ ছাড়াও ইরানের ইসলামী বিপ্লবকে সমর্থন জানিয়েছিলেন মাওলানা আবদুর রহিমসহ আরও অনেক প্রখ্যাত বাংলাদেশী ইসলামী চিন্তাবিদ ও আলেম।

লন্ডনের মুসলিম ইন্সটিটিউটের সাবেক প্রধান ডক্টর কলিম সিদ্দিকি, ভারতীয় চিন্তাবিদ ডক্টর সেলিম মানসুর, মার্কিন চিন্তাবিদ ডক্টর হামিদ আলগারও ইসলামী বিপ্লবের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। ইসলামী বিপ্লবের সাফল্যে গভীরভাবে প্রভাবিত হয়ে অনেক পশ্চিমা অমুসলিম নাগরিক ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছেন। এইসব নাগরিকদের মধ্যে রয়েছেন ইতালির প্রখ্যাত ধনকুবের ও ফিয়াট কোম্পানির মালিকের একমাত্র ছেলে অ্যাডওয়ার্দো অ্যাগনিলি।


ইরানের ইসলামী বিপ্লব দেশে ইসলামপন্থী দলগুলোর জন্য গর্বের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। মরহুম আয়াতুল্লাহ খোমেনীর ব্যক্তিত্ব ও চিন্তাধারা বিভিন্ন দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণার বিষয়বস্তুতে পরিণত হয়েছে। ইমাম খোমেনীর ‘বেলায়েতে ফকিহ’ বা সর্বোচ্চ ইসলামী আইনবিদের শাসনের ধারণাটি রাজনৈতিক ইসলাম সম্পর্কিত পশ্চিমা গবেষকদের গবেষণার অন্যতম প্রধান বিষয় হিসেবে আলোচিত হচ্ছে।


ইমাম খোমেনী (র)’র আধ্যাত্মিক-ব্যক্তিত্ব ও প্রভাবের অলৌকিক আকর্ষণ সম্পর্কে অনেক সাংবাদিক ও ব্যক্তিত্ব নানা মন্তব্য করেছেন। প্রখ্যাত ইসলামী চিন্তাবিদ ও তুলনামূলক ধর্মতত্ত্বের গবেষক মরহুম আহমদ দিদাত বলেছিলেন, ইমাম খোমেনী এমন একজন ব্যক্তিত্ব যাকে দেখলেই আপনার চোখে পানি চলে অসবে।
ইমাম খোমেনীর মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করে বক্তব্য রেখেছিলেন বিশ্বের প্রখ্যাত অনেক চিন্তাবিদ ও রাষ্ট্রনায়ক। কিউবার বিপ্লবী নেতা ফিডেল ক্যাস্ত্রো বলেছিলেন, ইমাম খোমেনী বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ বিপ্লবী নেতা।


ইরানের ইসলামী বিপ্লবের বর্তমান প্রধান নেতা তথা বর্তমান সর্বোচ্চ নেতা হযরত আয়াতুল্লাহিল উজমা খামনেয়ী বলেছেন, ইমাম খোমেনীর নাম বা পরিচয় তুলে ধরা ছাড়া বিশ্বের কোথাও ইরানের ইসলামী বিপ্লবের পরিচিতি তুলে ধরা সম্ভব নয়।  


ইসলামের খণ্ডিত বা একপেশে ব্যাখ্যা এবং অপব্যাখ্যার বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন মরহুম ইমাম খোমেনী। বিপ্লবী মুসলিম আলেম ও শিক্ষিত জনগণের উদ্দেশে তিনি বলেছিলেন: ‘আপনারা ইসলামের বিধি-বিধান ও এর সামাজিক নানা সুফলগুলো লিখে প্রচার করুন। প্রচারের পদ্ধতি ও কর্মতৎপরতাকে পরিপূর্ণ করুন। আত্মবিশ্বাসী হউন। জেনে রাখুন যে আপনারা এ কাজে সফল হবেন। ইসলামকে যথাযথভাবে জনগণের কাছে তুলে ধরুন যাতে যুব প্রজন্ম এটা না ভাবে যে রাজনীতির সঙ্গে আলেমদের কোনো সম্পর্ক নেই এবং ধর্মকে রাজনীতি থেকে আলাদা রাখতে হবে। ধর্মকে রাজনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন রাখা এবং আলেম সমাজকে রাজনীতি ও সামাজিক বিষয়ে হস্তক্ষেপ করতে না দেয়ার বিষয়টি উপনিবেশবাদীদের তৈরি করা কথা ও তারাই এ মিথ্যা ধারণা প্রচার করেছে। যারা ধর্মে বিশ্বাসী নয় তারাই এ জাতীয় কথা প্রচার করে।’

 

ইরানের ইসলামী বিপ্লব কেবল রাজনৈতিক ক্ষেত্রেই পরিবর্তন আনেনি সাংস্কৃতিক, সামাজিক, শিক্ষা, জ্ঞান-বিজ্ঞান ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে। ইরানের ইসলামী বিপ্লবের আগের দেশটি চলচ্চিত্র ও বর্তমান চলচ্চিত্র দেখলেই চলচ্চিত্রে বড় ধরনের পরিবর্তন, বিশেষ করে ইসলামী মূল্যবোধের প্রভাব স্পষ্টভাবে চোখে পড়বে। অতীতে ইরানের চলচ্চিত্র পরিণত হয়েছিল পশ্চিমা সংস্কৃতি, অশ্লীলতা ও অশালীন কাহিনী প্রচারের মাধ্যমে।


ইমাম খোমেনী (র)’র ঐশী ব্যক্তিত্ব ইরানি যুব সমাজের ওপর গভীরভাবে প্রভাব ফেলেছিল। এ মহানায়কের ডাকে লাখ লাখ যুবক ইসলামী বিপ্লব ও পরবর্তীকালে পবিত্র প্রতিরক্ষা যুদ্ধে জীবন দান করেছে।

 

ইসলামী বিপ্লবের বিজয়ের প্রাক্কালে ইমাম খোমেনী (র) বাধ্যতামূলক সামরিক প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণকারী শিক্ষা-নবীশ সেনাদেরকে বিপ্লবে যোগ দেয়ার আহ্বান জানান যাতে তারা বিপ্লবী জনগণের নানা তৎপরতায় সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে। এই যুবকরা ইমামের আহ্বানে সাড়া দিয়ে সামরিক শিবিরগুলো পরিত্যাগ করে। কিন্তু মাথার বিশেষ অংশের ছোট চুল দেখে তাদেরকে সহজেই সনাক্ত করতে পারত শাহের গোয়েন্দা বা নিরাপত্তা বাহিনী। ফলে তাদেরকে আবারও সামরিক শিবিরে ফিরিয়ে নেয়ার সুযোগ থাকত। এ অবস্থায় ইরানের বিপ্লবী যুব ও ছাত্র সমাজের সবাই তাদের চুলের বিশেষ অংশকে শিক্ষানবিশ সেনার স্টাইলে ছোট করে ফেলে যাতে কারা শিক্ষানবিশ সেনা ও কারা সাধারণ যুবক তা সনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে। সে যুগে লম্বা চুল রাখা ছিল যুব সমাজের কাছে খুব প্রিয় ফ্যাশন। কিন্তু তারা তাদের প্রাণপ্রিয় নেতা ইমাম খোমেনীর আহ্বানে চুল ছোট করতে দ্বিধা বোধ করেনি। এ থেকেও যুব সমাজের ওপর ইমাম খোমেনীর গভীর প্রভাবের কথা অনুমান করা যায়।

                                                                   (১০)

 

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিপ্লবের সাথে ইরানের ইসলামী বিপ্লবের পার্থক্যের প্রধান দিকগুলোর মধ্যে নারী-পুরুষের মানবীয় মর্যাদার প্রতি গুরুত্ব অন্যতম।


ইরানের ইসলামী বিপ্লব নারী সম্পর্কে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেছে। এ বিপ্লবের পর থেকেই সব ক্ষেত্রেই নারীর মর্যাদা প্রতিষ্ঠার প্রতি গুরুত্ব দেয়া হয়। ইসলামী বিপ্লবের রূপকার মরহুম ইমাম খোমেনী (রঃ) নারীকে উচ্চতর মর্যাদা দিতেন এবং এমনকি সমাজে পুরুষের তুলনায় নারীর ভূমিকা বেশি বলে মনে করতেন। তাঁর মতে, নারী সমাজই একটি জাতিকে মানুষ হিসেবে গড়ে তোলে, আর তাকে এ কাজ থেকে বিরত রাখা হলে জাতি পরাজয় ও অধঃপতনের শিকার হবে। তিনি বলতেন, নারীই সমাজে সব কল্যাণের উৎস এবং সমাজের সৌভাগ্য ও অধঃপতন নির্ভর করে নারীর ওপর। এটা স্পষ্ট, মুসলিম নারীর মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা ইরানের নারী সমাজের মর্যাদাকে উন্নত করেছে। আর এই উন্নত চিন্তাধারা বাস্তবায়নে অগ্রণী ভূমিকা রেখেছেন মরহুম ইমাম খোমেনী (রঃ)। তিনি তাঁর রাজনৈতিক ও ধর্মীয় ওসিয়তনামায় নারী সমাজকে ইসলামী রাষ্ট্র ব্যবস্থার গর্ব বলে উল্লেখ করেছেন।


ইসলামী ইরানের সংবিধানের ২১ তম ধারায় সব ক্ষেত্রে নারীর অধিকার নিশ্চিত করাকে সরকারের দায়িত্ব বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এই ধারায় আরো বলা হয়েছে, নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সব নাগরিককে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, মানবীয়, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অধিকারের ক্ষেত্রে সমান সুযোগ দিতে হবে। ইরানের বিশ সালা উন্নয়ন কর্মসূচীতে আধ্যাত্মিক ও পার্থিব বা বস্তুগত ক্ষেত্রসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে নারীর অবস্থান উন্নত করার ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।


শারীরিক ও মানসিক বৈশিষ্ট্যের আলোকে ইসলামী ইরানে নারী ও পুরুষের সমান অধিকার রয়েছে। পড়াশুনা, চাকরী, মালিকানা ও ভোটাধিকারসহ সব ক্ষেত্রেই মেয়েরা পুরুষের সমান অধিকার ভোগ করছেন এবং এগিয়ে যাচ্ছে পুরুষের সমপর্যায়ে বা অনেক ক্ষেত্রে তারা বেশি এগিয়ে গেছেন পুরুষের তুলনায়।
ইসলামী বিপ্লবের আগে ইরানে নারীকে কেবল পণ্য বলে ভাবা হত। ইরানী নারী সমাজ বিজাতীয় চিন্তার জালে বন্দি হয়ে পড়েছিল। কিন্তু ইসলামী বিপ্লবের পর ইরানের নারী পবিত্র প্রতিরক্ষা যুদ্ধ, শিক্ষা, বৈজ্ঞানিক অগ্রগতি ও দেশগড়াসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব্যাপক মাত্রায় ভূমিকা রেখেছেন।


মার্কিন লেখক ও অনুবাদক পল স্পার্কম্যান ইরানী নারী সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্রে সঠিক চিত্র তুলে ধরার জন্য "দা" নামক একটি বইয়ের অনুবাদ করেছেন। এ বইয়ে প্রতিরক্ষা যুদ্ধ সম্পর্কে এক ইরানী নারীর স্মৃতিচারণ তুলে ধরা হয়েছে। স্পার্কম্যান বলেছেন, "ইরানী সমাজের সর্বত্র নারীর সক্রিয় ভূমিকা দেখা যায়। আমার বিশ্বাস ইরানী মেয়েরা পুরুষের চেয়ে বেশি ক্ষমতাধর। তাই আমি ইরানের নারী সমাজ সম্পর্কে বিশ্ববাসীর কাছে সঠিক ছবি তুলে ধরার জন্য "দা" বইটির অনুবাদ করেছি।" 

 

ইসলামী বিপ্লবের আগে ইরানে শিক্ষিত নারীর সংখ্যা ছিল খুবই কম। কিন্তু বিপ্লবের পর সাংস্কৃতিক পরিবেশ অনুকূল হওয়ায় সাধারণ ও উচ্চ শিক্ষা ক্ষেত্রে ইরানী নারীর উপস্থিতি বহু গুণ বেড়েছে। তারা নানা পরীক্ষায় ভাল রেজাল্ট করছেন। বর্তমানে ইরানে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শতকরা ৬০ ভাগ বা তারও বেশি শিক্ষার্থী নারী। উদ্ভাবন ও আবিষ্কারের ওপর ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হযরত আয়াতুল্লাহিল উজমা খামেনেয়ী ব্যাপক গুরুত্ব দেয়ায় ইরানে সাফল্য ও খ্যাতি অর্জন করছেন অনেক মহিলা বিজ্ঞানী এবং বিশ্বের বিভিন্ন বিজ্ঞান অলিম্পিয়াডে ইরানী মেয়েরা দেশের সম্মান বাড়াচ্ছেন।


ইসলামী ইরানের সংসদে, পৌরসভার মেয়র পদে, নানা মন্ত্রী পদে এবং এমনকি ভাইস প্রেসিডেন্ট পদেও বেশ কয়েক জন নারী দায়িত্ব পালন করেছেন ও এখনও করছেন। নিরাপত্তা বাহিনীতে ও পুলিশ কর্মকর্তা পদেও নারী রয়েছেন। 


ইরানে ডাক্তারদের শতকরা ৪৯ ভাগই মহিলা এবং শতকরা ৪০ ভাগ বিশেষজ্ঞ ডাক্তার ও শতকরা ত্রিশ ভাগ বড় বিশেষজ্ঞ ডাক্তারই মহিলা। 

 

ইরানে পারিবারিক বিচার সংক্রান্ত আদালতে মহিলারা উপদেষ্টার কাজ করছেন। ফলে মহিলা ও শিশুদের নিরাপত্তা বেড়েছে। প্রশাসন ও পুলিশ বিভাগসহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে ইরানী নারীর সাফল্য দর্শনীয়। সচিব ও উচ্চ পদস্থ উপদেষ্টা পর্যায়ে অধিষ্ঠিত হয়েছেন অনেক ইরানী মহিলা। ইরানের মহিলা সাংসদদের প্রচেষ্টার ফলে চাকরিসহ বিভিন্ন সামাজিক ও নাগরিক অধিকারের ক্ষেত্রে ইরানী নারীর উন্নয়ন এবং সুরক্ষার জন্য নানা আইন পাশ হয়েছে।

 

ইরানে ইসলামী বিপ্লব বিজয়ের পরপরই পশ্চিমা চিন্তাধারা ও সংস্কৃতির অনুরাগী একদল নারী হিজাব বা পর্দা বাধ্যতামূলক করার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানায়। তাদের ডাকে মুষ্টিমেয় একদল নারী তেহরানের সড়কে নেমে আসে পর্দা ছাড়াই। তারা বহন করছিল একটি ব্যানার যাতে লেখা ছিল ‘ স্বাধীনতার বসন্তেই নারী- স্বাধীনতা নেই’ । অন্যদিকে ইসলামী বিপ্লবের সমর্থক নারীদের আহ্বানে তেহরানে সমবেত হন লাখ লাখ হিজাবধারী ও পর্দানশীন নারী।

 

উল্লেখ্য, ইরানের ইসলামী বিপ্লবী আন্দোলন গড়ে তোলার ক্ষেত্রে নারীর ভূমিকা ছিল বেশ লক্ষণীয়। তারা সে সময় প্রতিটি জনসভা, শোভাযাত্রা ও প্রতিবাদ-মিছিলেও অংশ নিয়েছেন। জিহাদের ময়দানে ইরানি পুরুষদের ব্যাপক অংশগ্রহণের পেছনেও রয়েছে ধার্মিক মায়েদের এবং পরিবারের অন্যান্য নারীর উৎসাহ ও নানা অবদান। 

 

ইসলামী শিক্ষার আলোকে শালীনতা ও সম্ভ্রম বজায় রেখে ইসলামী ইরানের নারী ঘরে-বাইরে গৌরবময় ভূমিকা রাখতে সক্ষম হয়েছেন। তাই মুসলিম বিশ্বের মহিলাদের জন্য ইরানের নারী সমাজ অনুকরণীয় আদর্শ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছেন।

                                                                                      (১১)


ইরানের ইসলামী বিপ্লব হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বিপ্লব। এ বিপ্লব কেবল ইরানি জাতির জন্যই নয় বরং গোটা মুসলিম উম্মাহ ও মানব জাতির জন্যেও গৌরবের মাধ্যম। কারণ, এ বিপ্লব বিশ্বের সাম্রাজ্যবাদী পরাশক্তিসহ জালিম শক্তিগুলোর মধ্যে মহা- আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। ইরানের ইসলামী বিপ্লব কী করে এতটা শক্তি ও প্রভাবের অধিকারী হল তা একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। আসলে এ বিপ্লবের স্থপতি ইমাম খোমেনী (র)’ র আহ্বান ছিল হৃদয়ের গভীর থেকে উচ্চারিত এমন এক আহ্বানের প্রতিধ্বনি যা উচ্চারিত হয়েছিল ইসলামের মহানায়কদের কণ্ঠে। এ বিপ্লব কাবিলের সঙ্গে হাবিলের, নমরুদের সঙ্গে হযরত ইব্রাহিমের, ফেরাউনের সঙ্গে হযরত মুসার, আবু জাহিল ও আবু লাহাবের মত কাফির-মুশরিকদের সঙ্গে বিশ্বনবীর (সা)’র সংগ্রাম এবং ইয়াজিদসহ মুসলিম নামধারী স্বৈরশাসকদের সঙ্গে মহান ইমামদের দ্বন্দ্ব ও তাঁদের আন্দোলনেরই ধারাবাহিকতার ফসল। ইসলামের এই অতুলনীয় শক্তির বলেই মুসলিম বিশ্বে মার্কিন সরকারের সবচেয়ে বড় মিত্র শাহের সরকারকে উৎখাত করেছিলেন ইরানের ইসলামী বিপ্লবের নেতা ইমাম খোমেনী (র)। সেনা ও সামরিক শক্তির দিক থেকে শাহের সশস্ত্র বাহিনী ছিল বিশ্বের ষষ্ঠ বৃহৎ শক্তি।

 

দক্ষ কর্মী-বাহিনী ও অনুসারী গড়ে তোলা ছিল ইরানের ইসলামী বিপ্লবের সফলতার অন্যতম চাবিকাঠি। ১৯৬২ সনে ইমাম খোমেনী যখন প্রতিরোধ আন্দোলন গড়ে তোলার কার্যক্রম শুরু করেন তখন তাকে প্রশ্ন করা হয়েছিল আপনার কর্মী বাহিনী কোথায়? তিনি বলেছিলেন, তারা এখনও মায়ের কোলে রয়েছে।


ইরানে ইমাম খোমেনী (র)’র নেতৃত্বে ইসলামী বিপ্লব বিজয়ী হওয়ার পরপরই পশ্চিমা শাসক-চক্র ও তাদের নিয়ন্ত্রিত প্রচার মাধ্যমে বলা হত: এ বিপ্লব বড় জোর কয়েক মাস টিকবে! ইরানি মোল্লারা রাষ্ট্র পরিচালনার কি বোঝে? তারা কমিউনিস্টদের খপ্পরে পড়বে ও অচিরেই ক্ষমতা হারাবে!-ইত্যাদি।


কিন্তু তাদের সেইসব প্রচারণা ব্যর্থ হয়েছে। ইসলামী ইরান কেবল টিকেই থাকেনি, বরং বিশ্বের অন্যতম প্রধান প্রভাবশালী রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। বস্তুগত ও আধ্যাত্মিক নানা দিকে ইসলামী ইরান আজ বিশ্বের বিস্ময়ে পরিণত হয়েছে। বিপ্লবী এই দেশের ওপর নানা ক্ষেত্রে যতই চাপিয়ে দেয়া হয়েছে বাধা, নিষেধাজ্ঞা ও সংঘাত ততই দেশটি স্বনির্ভর বা উন্নত হয়েছে সেইসব ক্ষেত্রে।

 

সামরিক শিল্প, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, চিকিৎসা, বাণিজ্য, অর্থনীতি এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কসহ সামাজিক ও সাংস্কৃতিক নানা ক্ষেত্রেও ইসলামী ইরান আজ আলোচনার অন্যতম প্রধান কেন্দ্রবিন্দু। সামরিক শক্তিতে ইরান আজ এত উন্নত যে শত্রুরা সাদ্দামকে দিয়ে ইরানে হামলা চালানোর যুগের পর কখনও ইরানে প্রকাশ্যে কোনো অভিযান চালানোর কথা চিন্তাও করতে পারেনি। ইরান নিজের তৈরি একাধিক কৃত্রিম উপগ্রহ পাঠিয়েছে মহাকাশে।


ইরান আজ বিশ্বের সবচেয়ে নিরাপদ রাষ্ট্র। এ রাষ্ট্রের শহরগুলোতে একজন যুবতীও গভীর রাতে চলাফেরা করতে পারেন নিরাপদে। ইরানের আশপাশের নানা রাষ্ট্রে বিদেশী মদদে বিভিন্ন ধরনের সন্ত্রাস এবং জাতিগত ও সাম্প্রদায়িক সংঘাত নিয়মিত বিষয় হয়ে থাকলেও ইসলামী এই রাষ্ট্রে এসবের লেশমাত্রও নেই।
ব্যবসায়ী, পুঁজি-বিনিয়োগকারী, বিদেশী পর্যটক এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের লোকসহ সব শ্রেণীর জনগণের জন্য নিরাপত্তার দ্বীপ হল ইরান।


বিশ্বের সবচেয়ে স্বাধীন পররাষ্ট্র নীতির অধিকারী হল ইরান। দেশটি আজ পরিপূর্ণ অর্থেই স্বাধীন। ইসলামী এই দেশটির ক্ষমতার কাঠামো, রাজনীতি ও সংস্কৃতি বাইরের শক্তিগুলোর মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত ও প্রভাবিত নয়। বিশ্বের অন্যতম প্রধান ক্ষমতাধর দেশের শক্তিশালী নেতা হওয়া সত্ত্বেও ইরানের সর্বোচ্চ নেতা, প্রেসিডেন্ট এবং শীর্ষস্থানীয় নেতারা সবচেয়ে বিনয়ী ও জন-দরদি। ইরানের সংসদ ও সরকারের রয়েছে জনগণের কাছে জবাবদিহিতার কার্যক্রম। বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ছাত্র প্রকাশ্যেই প্রেসিডেন্টের সামনে দাঁড়িয়ে তার নানা কার্যক্রমের সমালোচনা করতে পারেন।

 

সামাজিক নিরাপত্তা ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতার দিক থেকেও ইরান আজ বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় দেশ। দেশটির নেতৃবৃন্দের খোদা-ভীতি ও সততাও শীর্ষ পর্যায়ের। 

 

ইরানের ইসলামী বিপ্লবের স্থপতি ইমাম খোমেনী যদি চাইতেন তাহলে তার সন্তানদেরকে বড় ধরনের রাষ্ট্রীয় পদে নিয়োগ দিতে পারতেন। কিন্তু তিনি তা করেননি, বরং রাষ্ট্রীয় বড় কোনো পদ গ্রহণ না করতে সন্তানদেরকে উপদেশ দিয়ে গেছেন।


ইরানই বিশ্বের একমাত্র ইসলামী গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র যেখানে প্রতি বছর কোনো না কোনো নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। ইরানের সংবিধান অনুযায়ী দেশটির ধর্মনিরপেক্ষ বা ইসলাম বিরোধী কোনো দল গঠন নিষিদ্ধ। ইরানে ইসলামী বিপ্লব বিজয়ী হওয়া সত্ত্বেও এর স্থপতি মরহুম ইমাম খোমেনী দেশটির শাসন ব্যবস্থা ইসলামী প্রজাতন্ত্র-ভিত্তিক হবে কিনা এবং নতুন সংবিধানের প্রতি জনগণের সমর্থন আছে কিনা তা গণভোটের মাধ্যমে যাচাইয় করে নিয়েছিলেন। ইরানের ভোটারদের ৯৮ শতাংশই ইসলামী রাষ্ট্র-ব্যবস্থা ও সংবিধানের পক্ষে ভোট দিয়েছিলেন। এর মাধ্যমে প্রমাণিত হয় যে প্রকৃত ইসলামী ব্যবস্থা বা ইসলামী শাসনও জোর করে চাপিয়ে দেয়া যায় না জনগণের ওপর।


ইসলামী ইরানের জনগণের প্রতি ইসলামী সরকারের অশেষ শ্রদ্ধাবোধের কারণে জনগণও এই বিপ্লবকে টিকিয়ে রাখার জন্য সব ধরনের ত্যাগ ও কষ্ট স্বীকার করেছে। এই দেশটিতে নানা রাজনৈতিক গোষ্ঠী ও ধারা বা উপধারা থাকলেও সব ধারার অনুসারী জনগণ ইসলামী শাসন-ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখার সমর্থক। আর তারই প্রমাণ পাওয়া যায় প্রতি বছর ইসলামী বিপ্লবের বিজয়-বার্ষিকীতে গণ-শোভাযাত্রায় সারা দেশের সব শ্রেণীর মানুষের অংশগ্রহণ থেকে। এমনকি ইরানের অমুসলিম সম্প্রদায়ের লোকেরাও এই শোভাযাত্রায় অংশ নিয়ে থাকেন।


ইরানের ইসলামী বিপ্লবের মহান স্থপতি ইমাম খোমেনীর (র) মত তার উত্তরসূরি ইরানের বর্তমান সর্বোচ্চ নেতাও এ বিপ্লবকে রক্ষার ক্ষেত্রে নানা দূরদর্শিতা দেখাতে সক্ষম হয়েছেন। ইসলামী বিপ্লবের অসমাপ্ত লক্ষ্যগুলো অর্জনের জন্য তিনি সচেষ্ট। যে কোনো বিপ্লব ধ্বংস হতে পারে কতগুলো প্রধান কারণে। যেমন, বিজাতীয় ধ্যান-ধারণার অনুপ্রবেশ, ধর্মের নামে চরমপন্থা বা বাড়াবাড়ি, বিপ্লবী কর্মসূচি অসম্পূর্ণ রাখা, সুবিধাবাদীদের উত্থান, ভবিষ্যতের অস্পষ্ট পরিকল্পনা, আদর্শ ও উদ্দেশ্যের বিচ্যুতি। এ ধরনের নানা সমস্যা মোকাবেলার ব্যাপারে ইরানের বিপ্লবী নেতৃবৃন্দ ছিলেন প্রথম থেকেই সচেতন। বিপ্লব টিকে থাকার রহস্য লুকিয়ে আছে এখানেই।
ইরানের ইসলামী বিপ্লবের নেতা ও সংগঠকরা বিপ্লবী তৎপরতা শুরু করার আগেই নিজেদেরকে দুনিয়ার লোভ-লালসা থেকে মুক্ত রাখার অনুশীলন করেছিলেন ব্যাপক মাত্রায়। দেশটিতে নেতৃত্বের শীর্ষ পর্যায়ে সেই ধারার প্রভাব এখনও রয়েছে।


ইরানের ইসলামী বিপ্লব এটা প্রমাণ করেছে যে একটি জাতি ঐক্যবদ্ধ থাকলে ও ন্যায়-নীতিতে অবিচল থাকলে জালিম শাসক ও তার সহযোগীরা যতই শক্তিশালী হোক না কেন তার পতন অনিবার্য এবং পরাশক্তিগুলো এমন জাতির কোনো ক্ষতিই করতে সক্ষম হবে না। ইমাম খোমেনী (র) এ কারণেই বলতেন, আমেরিকা আমাদের কোনো ক্ষতিই করতে পারবে না। বিশ্বের মুক্তিকামী ও ইসলামী ভাবাপন্ন দলগুলোর জন্য ইরানের ইসলামী বিপ্লবে রয়েছে বহু শিক্ষণীয় দিক। বিশ্বের মুক্তিকামী শক্তিগুলো যদি আত্মশুদ্ধির প্রশিক্ষণ নেয় এবং তারা যদি ঐক্যবদ্ধ হয়ে জালিম পরাশক্তিগুলোর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায় তাহলে বিশ্বকে আরও বেশি নিরাপদ করা ও বিশ্ব-ইসলামী বিপ্লবের পরিবেশ সৃষ্টি করা সহজ হয়ে উঠবে।


ইরানের ইসলামী বিপ্লবের প্রভাবেই গড়ে উঠেছে ফিলিস্তিনের ইন্তিফাদা আন্দোলন এবং হামাস ও ইসলামী জিহাদের মত সংগ্রামী দল। লেবাননের হিজবুল্লাহর ইসরাইল-বিরোধী কিংবদন্তীতুল্য সাফল্যের মূলেও রয়েছে ইরানের ইসলামী বিপ্লবী চেতনার সেই জনপ্রিয় ঐতিহাসিক শ্লোগান: প্রতিটি দিনই আশুরা ও প্রতিটি ময়দানই কারবালা।


আজকের আলোচনা শেষ করব ইরানের ইসলামী বিপ্লবের স্থপতি মরহুম ইমাম খোমেনীর প্রতি নিবেদিত ‘রুহুল্লাহ! দেখ তোমার জন্য আমি কি করেছি!’ শীর্ষক একটি কবিতার কিছু অংশের ভাবার্থ শুনিয়ে:


তুমি চেয়েছিলে ‘ফানাফিল্লাহ’, ব্যাকুল ছিলে হতে বিলীন আমার মাঝে
আমি তোমাকে দিয়েছি ‘বাকাবিল্লাহ’- পেলে স্থায়িত্ব আমার সঙ্গে
মানুষের মধ্যে তোমার পদচারণ ছিল সত্যকে নিয়ে
আমি সত্যকে করলাম প্রকাশিত মানুষের মাঝে তোমাকে দিয়ে
তুমি সবকিছু ছেড়েছ আমার জন্যে
তোমায় দিলাম সবই যা চেয়েছিলে মোর কাছে ...
তুমি নিজেকে ভুলেছ আমার তরে
আমি তোমার জাতিকে আত্মভোলা করেছি তোমার জন্যে
তুমি ছিলে মম আশিক আমি মাশুক
তাই তোমার জাতিকে করলাম তোমার আশিক ....
তুমি বলেছিলে: তারা এখনও তাদের মায়ের কোলে আছে
আমি করলাম তাদের আমার সেনা, হিজবুল্লাহ তোমার জন্যে
তুমি কেঁদেছিলে আমার জন্যে
তাই আমি তোমার ভক্তদের কাঁদালাম তোমার বিরহে
আমি যা চেয়েছি তুমিও তাই চাইতে
ফলে জাতিকে দিয়েও তাই চাওয়ালাম যা যা চাইতে তুমি
তুমি ক্রুদ্ধ হয়েছিলে আমার জন্যে
তাই জনগণকে বিক্ষুব্ধ করলাম তোমার প্রেমে
তুমি ভুলে গিয়েছিলে তোমার ব্যথা আমার তরে
তাই আমি মানুষকে ভুলিয়ে দিলাম তাদের ব্যথা তোমার জন্য
তুমি ছিলে একনিষ্ঠ আমার আনুগত্যে
তাই জনগণকে করেছি তোমার অনুগত
তুমি আমার জন্য কথা বলতে
তাই জনগণকে তোমার জন্য কথা বলালাম
তুমি আমার শত্রুকে শত্রু ভাবতে আমার বন্ধুকে তোমার বন্ধু করতে
আমি তাই তোমাকে ও তোমার সেনাকে করেছি সফল ...
তুমি আস্থাশীল ছিলে আমাতে
তাই আমি মরুর ধূলিকেও করলাম আমার সেনা তোমার জন্য
তুমি ভয় করতে আমাকে তাই শত্রুর হৃদয়ে জাগালাম তোমার ভয়...
তুমি গভীর রাতে আসতে আমার কাছে
আমি জনতাকে পাঠালাম তোমার কাছে দিনের আলোয় ...
তোমার চোখে অশ্রু বইত আমার জন্য
তাই জনগণের চোখে অশ্রু বইয়ে দিলাম তোমার জন্য
... তুমি এ দুনিয়া হতে চাওনি কিছুই
আমি তাই তোমাকে দিলাম ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান। #

 

রেডিও তেহরান/এএইচ 

 

 

সম্প্রতি (২৩ জানুয়ারি, শনিবার) মার্কিন দৈনিক নিউইয়র্ক টাইমস সিরিয়ায় সংকট সৃষ্টিতে মার্কিন ও সৌদি গোয়েন্দা সংস্থার গোপন সহযোগিতার কথা ফাঁস করেছে।

 

দৈনিকটি কয়েকজন মার্কিন কর্মকর্তার উদ্ধৃতি দিয়ে লিখেছে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ২০১৩ সালে সিরিয়ায় লড়াইরত বিদ্রোহী তথা সন্ত্রাসীদের গোপনে সাহায্য করতে মার্কিন গোয়েন্দা-সংস্থা সিআইএ’র প্রতি নির্দেশ দেন। আর এই গোপন মিশনের শরিক ও অর্থের যোগানদাতা হিসেবে সিআইএ বেছে নেয় সৌদি সরকারকে। সৌদি সরকার সন্ত্রাসীদের বিপুল অংকের অর্থ ছাড়াও যোগান দেয় অস্ত্রের। আর সিআইএর একে-৪৭ রাইফেল ও ট্যাংক-বিধ্বংসী রকেট চালানোর প্রশিক্ষণ দেয়। ২০১৩ সাল থেকে সন্ত্রাসীদেরকে গোপনে অস্ত্র, অর্থ ও প্রশিক্ষণ দিয়েছে সিআইএ। সন্ত্রাসীদের প্রশিক্ষণ দেয়া হয় জর্দানে সিআইএ’র মাধ্যমে। প্রশিক্ষিত এইসব সন্ত্রাসীর অনেকেই পরে যোগ দেয় তাকফিরি-ওয়াহাবি সন্ত্রাসী গোষ্ঠী দায়েশ তথা আইএসআইএল-এ।


ওই মার্কিন কর্মকর্তারা নিউইয়র্ক টাইমসকে আরও জানিয়েছেন, আসাদ সরকারকে উৎখাতের লক্ষ্যে সূচিত এ মিশনের জন্য সৌদি সরকার কয়েক শত কোটি ডলার যুগিয়েছে। তবে আরও বেশি অর্থ দিয়েছে পারস্য উপসাগরীয় কয়েকটি দেশের রাজতান্ত্রিক সরকার।


সৌদি আরব থেকে এভাবে বিপুল অংকের অর্থ নেয় বলেই সৌদি সরকার ইয়েমেন ও বাহরাইনসহ বিভিন্ন অঞ্চলে মানবাধিকার পদদলন করে আসলেও মার্কিন সরকার প্রকাশ্যে এ ব্যাপারে রিয়াদের সমালোচনা করতে চায় না।


নিউইয়র্ক টাইমসের ওই প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, তৎকালীন সৌদি গোয়েন্দা-প্রধান বন্দর বিন সুলতান সিরিয়ায় তৎপর সন্ত্রাসীদের জন্য হাজার হাজার কালাশিনকভ রাইফেল ও লাখ লাখ গুলি কেনার অর্ডার দেন। আর সিআইএ’র প্রধান ক্রোয়েশিয়া থেকে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র সন্ত্রাসীদের জন্য কেনার সৌদি পদক্ষেপে সহায়তা দেন।

 

মার্কিন দৈনিকটি আরও জানিয়েছে, ‘আলওয়ার চেনার’ সাংকেতিক নামে এইসব সহযোগিতা বিনিময় হয়েছে সৌদি ও মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার মধ্যে। রিয়াদের সঙ্গে ওয়াশিংটনের এ ধরনের ব্যাপক ও দ্বিপাক্ষিক গোয়েন্দা সহযোগিতা চলে আসছে দশকের পর দশক ধরে।


আজ পশ্চিমা ও কয়েকটি আরব সরকার দায়েশ বা আইএসআইএলকে সন্ত্রাসী গোষ্ঠী বলে অভিহিত করে আসলেও মূলত কয়েকটি আরব দেশের গোয়েন্দা সংস্থা - বিশেষ করে, মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ ও ইসরাইলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ এবং সৌদি গোয়েন্দা সংস্থার তত্ত্বাবধানে ২০১১ সালে গড়ে তোলা হয় এই ওয়াহাবি সন্ত্রাসী গোষ্ঠী। দায়েশের আজ যে এত ব্যাপক অস্ত্র ও অর্থ-বল এবং মধ্যপ্রাচ্যে এই সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর যে এত ব্যাপক সহিংসতা ও নৃশংসতা তার জন্ম, বিস্তার ও ক্রম-বিকাশ ইসরাইলি-মার্কিন ও সৌদি সরকারের সর্বাত্মক সহায়তারই ফসল।


দুধ-কলা দিয়ে যে সাপটিকে পশ্চিমারা পুষেছে এতদিন ধরে সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আসাদকে ক্ষমতাচ্যুত করার জন্য তাদের সেই প্রকল্প ৫ বছরের সব চেষ্টার পর ব্যর্থ হলেও দায়েশ নামক সেই সাপ আজ তাদের এবং এমনকি তাদের মিত্রদের জন্যও দানবীয় হুমকিতে পরিণত হয়েছে। দায়েশের সহযোগী অন্য সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলো সম্পর্কেও একই কথা প্রযোজ্য।


দায়েশসহ সিরিয়ার আসাদ-বিরোধী সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোকে সহায়তা দিয়ে এসেছে ইহুদিবাদী ইসরাইল। এ ছাড়াও সৌদি আরব, কাতার, তুরস্ক ও জর্দানসহ পশ্চিমা শক্তির সেবাদাস সরকারগুলোও সহায়তা দিয়েছে এইসব ওয়াহাবি-তাকফিরি সন্ত্রাসী গোষ্ঠীকে। ইহুদিবাদী ইসরাইলের যুদ্ধ-মন্ত্রী মোশে ইয়ালুন সম্প্রতি বলেছিলেন, সিরিয়ায় ইরানের উপস্থিতি বা প্রভাবের চেয়ে সেখানে দায়েশের উপস্থিতি ইসরাইলের কাছে বেশি পছন্দনীয়। ইসরাইল চায় দায়েশের মত তাকফিরি-ওয়াহাবি গোষ্ঠীগুলো মুসলিম, বিশেষ করে ইসরাইলের আশপাশের আরব দেশগুলোতে ছড়িয়ে পড়ুক যাতে এই দেশগুলো গৃহযুদ্ধের আগুনে জ্বলতে থাকে এবং ইসরাইল নিরাপদ থাকে।

 

এদিকে ইহুদিবাদী ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু সম্প্রতি বলেছেন, সৌদি আরব এখন তেলআবিবকে ‘শত্রুর পরিবর্তে বন্ধু’ হিসেবে দেখে। তিনি আরও দাবি করেছেন, এটি ফিলিস্তিন ইস্যুতে সৌদি নীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের আভাস।


সম্প্রতি পাশ্চাত্যের সঙ্গে পরমাণু সমঝোতার জের ধরে তেহরানের ওপর থেকে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা উঠে গেছে। শুরু থেকেই ওই সমঝোতার প্রচণ্ড বিরোধিতা করে এসেছে সৌদি আরব ও ইহুদিবাদী ইসরাইল। নিষেধাজ্ঞা উঠে যাওয়ার ফলে মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের ভূমিকা জোরদার হবে বলে তারা শঙ্কিত।



গত সপ্তাহে মার্কিন দৈনিক ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল খবর দেয়, ইরানের পরমাণু সমঝোতার জের ধরে আরব শক্তিগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক শক্তিশালী করার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে ইসরাইল।


উগ্র তাকফিরি সন্ত্রাসী গোষ্ঠী সৃষ্টি হয়েছে ওয়াহাবি মতবাদকে কেন্দ্র করে যা প্রচার করেন সৌদি আলেমরা এবং বাস্তবায়ন করে সৌদি সরকার। রিয়াদ ও তেল আবিব প্রকাশ্যে দায়েশের বিরুদ্ধে কথা বললেও এই মুসলমানদের প্রথম কিবলা ও ফিলিস্তিন দখলদার ইসরাইল এবং সৌদি আরবের বিরুদ্ধে দায়েশ এখন পর্যন্ত কোনো হামলা চালায়নি। বরং দায়েশের সন্ত্রাসী সেনারা ইসরাইলি হাসপাতালে নিয়মিত চিকিৎসা-সেবাও পাচ্ছে।


এটা স্পষ্ট যে দায়েশ বা আইএসআইএল এখনও পশ্চিমাদের নানা এজেন্ডা বাস্তবায়নের হাতিয়ার হিসেবেই ব্যবহৃত হচ্ছে। পশ্চিমাদের সহায়তাপুষ্ট এই গোষ্ঠী এখন ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের স্টাইলে সন্ত্রাসী হামলা চালানোর জন্য বিশেষ ধরনের ড্রোন তৈরি করছে বলে জানা গেছে।

 

দায়েশ এরই মধ্যে ইরাকে বেশ কয়েকবার ড্রোন ব্যবহার করেছে বলে মনে করা হচ্ছে। পশ্চিমাদের সহায়তা ছাড়া দায়েশ কখনও ড্রোন বানাতে পারত না। দায়েশ পশ্চিমাদের সহায়তা নিয়েই এ পর্যন্ত বেশ কয়েকবার সিরিয়ায় রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহার করেছে।


আলকায়দা ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর আমেরিকায় হামলা চালিয়েছে-এই অজুহাত দেখিয়ে মার্কিন সরকার প্রথমে আফগানিস্তানে দখলদারিত্ব প্রতিষ্ঠা করেছিল। রহস্যজনক ওই হামলার সঙ্গে মার্কিন সরকার ও গোয়েন্দা সংস্থার যোগসাজশ ছিল বলে মনে করা হয়। অন্য কোনো দেশে হস্তক্ষেপের জন্য মার্কিন সরকার আবারও একই ধরনের নাটক মঞ্চস্থ করতে পারে বলে অনেকে আশঙ্কা করছেন।


ওদিকে ইয়েমেনের সরকারী সেনা মুখপাত্র বলেছেন, ইঙ্গ-মার্কিন ও ইসরাইলি জঙ্গি বিমান সরাসরি ইয়েমেনে হামলা চালাচ্ছে। কারণ, যুদ্ধক্ষেত্রে এফ-সিক্সটিনের মত উন্নত জঙ্গি বিমান চালানোর মত দক্ষতা সৌদি পাইলটদের নেই। সৌদি আরব ইয়েমেনের বিরুদ্ধে আমেরিকার দেয়া নিষিদ্ধ অস্ত্র ক্লাস্টার বোমা বা গুচ্ছ বোমাও ব্যবহার করে যাচ্ছে। তাই এটা স্পষ্ট মার্কিন, ইসরাইলি ও সৌদি সরকার এখন বিশ্ব-অঙ্গনে দুষ্কৃতির তিন প্রধান অক্ষে পরিণত হয়েছে।


দায়েশ ইসলামের নামে ধর্মান্ধতায় লিপ্ত হওয়ায় সরলমনা ও বিভ্রান্ত কিছু ব্যক্তি ছাড়া এখন পর্যন্ত কোনো দেশের মুক্তিকামী জনগণ  কিংবা কোনো বিপ্লবী ও সচেতন ইসলামী আন্দোলন বা সংগঠন এই ওয়াহাবি-তাকফিরি গোষ্ঠীকে সমর্থন দেয়নি।


সম্প্রতি কাশ্মিরের হুররিয়াত কনফারেন্সের চেয়ারম্যান সাইয়্যেদ আলী শাহ গিলানি বলেছেন, ভারত উপমহাদেশে- বিশেষ করে, কাশ্মিরে সন্ত্রাসী গোষ্ঠী দায়েশের প্রতি মুসলমানদের কোনা সমর্থন নেই। তিনি বলেছেন, দায়েশ যদি সত্যিই ইসলাম বা মুসলিম-দরদি হত তাহলে তারা মুসলমানদের প্রথম কিবলা আল-আকসা মসজিদকে ইসরাইলের দখল থেকে মুক্ত করার জন্য সচেষ্ট হত। মজলুম ফিলিস্তিনিরা ছয় দশকেরও বেশি সময় ধরে ইসরাইলের মাধ্যমে নির্যাতন, গণহত্যা এবং বিতাড়নের শিকার হয়ে আসছে। দায়েশ কেবল মুসলিম দেশগুলোর মুসলমানদের মধ্যে হানাহানি ও সহিংসতারই কারণ হয়েছে বলে তিনি জানান। আর তাই দায়েশের অপরাধযজ্ঞের কারণে ইসরাইলই লাভবান হচ্ছে বলে গিলানি স্মরণ করিয়ে দেন। # 

 

রেডিও তেহরান/এএইচ/২৬

 

 

 

পাতা 1 এর 175