এই ওয়েবসাইটে আর আপডেট হবে না। আমাদের নতুন সাইট Parstoday Bangla
শনিবার, 03 এপ্রিল 2010 16:37

ভয়াবহ ষড়যন্ত্রের কবলে আল আকসা মসজিদ

ভয়াবহ ষড়যন্ত্রের কবলে আল আকসা মসজিদ
বায়তুল মোকাদ্দাস শহর দখল হবার পর চল্লিশ বছরেরও বেশি সময় অতিবাহিত হয়েছে। বর্তমানে এই শহরের মধ্যমনি ও মুসলমানদের প্রথম কেবলা আল আকসা মসজিদ অতীতের অন্য যে কোন সময়ের চেয়ে বেশি বিপদের সম্মুখীন। ইসরাইল বায়তুল মোকাদ্দাস শহরকে ইহুদিকরণ এবং আল আকসা মসজিদকে ধ্বংসের জন্য অনেক আগে থেকে চেষ্টা চালিয়ে এলেও সম্প্রতি এ সংক্রান্ত তৎপরতা আরও জোরদার করেছে। আল আকসা মসজিদের অদূরে আল খারাব বা হাহুরবা নামক ইহুদি উপাসনালয় উদ্বোধন এবং পূর্ব বায়তুল মোকাদ্দাস বা জেরুজালেমে আরও এক হাজার ছয়'শ নয়া ইহুদি বাড়ী নির্মাণের ঘোষণা, আল আকসা মসজিদ তথা বায়তুল মোকাদ্দাসকে ঘিরে ইসরাইলের ভয়াবহ ষড়যন্ত্রেরই সুস্পষ্ট প্রমাণ। আজকের আসরে আমরা আল আকসা মসজিদ তথা বায়তুল মোকাদ্দাস শহরকে ঘিরে ইসরাইলের নানা ষড়যন্ত্র সম্পর্কেই বিস্তারিত আলোচনা করব।

 

আল আকসা মসজিদের অদূরে ইহুদি উপাসনালয় চালু এবং নয়া ইহুদি বসতি নির্মাণের ঘোষণা আসার পর ফিলিস্তিনীরা ভীষণ ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছে। প্রতিবাদের ঝড় উঠেছে। কোন কোন পর্যবেক্ষক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে বলেছেন, ফিলিস্তিনে তৃতীয় ইন্তিফাদা বা গণ আন্দোলন শুরু হতে পারে । আল আকসা মসজিদের অদূরে যে ইহুদি উপাসনালয়টি চালু করা হয়েছে, প্রথমেই সে সম্পর্কে খানিকটা বলে নিচ্ছি। আঠারো শতাব্দির প্রথম দিকে আল-খারাব ইহুদি উপাসনালয়টি নির্মাণ করা হয়। হিব্রু ভাষায় এই উপাসনালয়ের নাম হচ্ছে হাহুরবা। নির্মিত হবার কিছু দিন পরই উপাসনালয়টি ধ্বংস হয় ও পরে আবার র্নিমাণ করা হয়। অবশেষে ১৯৪৮ সালে আরব-ইসরাইল যুদ্ধের সময় তা আবারও ধ্বংস হয়ে যায়। ঐ যুদ্ধের পর থেকে ইসরাইল উপাসনালয়টিকে অত্যন্ত প্রাচীন ও ঐতিহাসিক হিসেবে প্রচার চালায় এবং ঐ একই অজুহাতে তা পুনর্নিমাণ শুরু করে। ইহুদি উপাসনালয়টি আল আকসা মসজিদের খুব কাছেই অবস্থিত এবং উগ্র ইহুদিবাদীরা এই উপাসনালয় চালুকে আল আকসা মসজিদ ধ্বংস করে এর স্থলে সুলাইমান উপাসনালয় নির্মাণের ক্ষেত্রে এক ধাপ অগ্রগতি বলে মনে করছে।

 

১৮ শতাব্দিতে এক ইহুদি ধর্মযাজকের ভবিষ্যদ্বানীর ভিত্তিতে উগ্র ইহুদিবাদীরা এখন এই ভ্রান্ত বিশ্বাস পোষন করতে শুরু করেছে যে, আল আকসা মসজিদের ধ্বংসস্তুপের উপর ইহুদি উপাসনালয় নির্মিত হবে। ঐ ভবিষ্যদ্বানীর অজুহাতে তারা আল আকসা মসজিদসহ মুসলমান ও খ্রীষ্টানদের ধর্মীয় স্থানগুলো ধ্বংসের প্রকিয়া জোরদার করেছে। ইহুদিবাদী ইসরাইল ২০০১ সালে আল খারাব বা হাহুরবা উপাসনালয় নির্মাণের পরিকল্পনা অনুমোদন করে। উপাসনালয়টির নির্মাণ কাজ শেষ হবার পর ইসরাইলের উগ্র প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর বানী পাঠের মধ্য দিয়ে গত ১৫ই মার্চ এর উদ্বোধন করা হয়েছে। ইহুদিবাদীদের ভ্রান্ত বিশ্বাসের একটি হলো, উপাসনালয়টি নির্মাণ শেষ হবার পরের দিনটি আল আকসা মসজিদের ধ্বংসাবশেষের উপর সুলাইমান উপাসনালয় নির্মাণ প্রক্রিয়া শুরুর দিবস। কাজেই আল খারাব বা হাহুরবা উপাসনালয়টির পুন:নির্মাণকে মুসলমানদের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি সরাসরি হুমকি হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে। এ কারণে বায়তুল মোকাদ্দাসসহ অন্যান্য এলাকার ফিলিস্তিনী জনগণ ইহুদিবাদী ইসরাইলের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ শুরু করেছে।

 

ইসরাইল অতীতেও নানাভাবে আল আকসা মসজিদ ধ্বংসের চেষ্টা চালিয়েছে। মসজিদের নীচ দিয়ে সুড়ঙ্গ খনন এর মধ্যে অন্যতম। এসব সুড়ঙ্গ মসজিদের পিলারগুলোকে দুর্বল করে দিয়েছে। এছাড়া, ১৯৭০ সালে এক উগ্র ইহুদিবাদী আল আকসা মসজিদের একাংশে আগুন লাগিয়ে দিয়েছিল। দখলদার ইসরাইল গত কয়েক মাস ধরে ১২টি উগ্র ইহুদিবাদী সংগঠনের সহযোগিতায় আল আকসা মসজিদ ধ্বংসের প্রচেষ্টা বৃদ্ধি পেয়েছে। মসজিদে ফিলিস্তিনীদের প্রবেশে বাধা দেয়া হচ্ছে। ইহুদিবাদীরা এখন আল আকসা মসজিদের চার পাশে ৬২ টি ইহুদি উপাসনালয় এবং বেশ কিছু ইহুদিবাদ প্রচারকেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। এর মাধ্যমে তারা আল আকসা মসজিদের উপর অবরোধ আরও কঠোর করতে চাচ্ছে,যাতে মসজিদে মুসলমানদের যাতায়াত হ্রাস পায়। ইহুদিবাদীরা এখন প্রকাশ্যেই দম্ভের সাথে ঘোষণা করছে যে, আল আকসা মসজিদ ধ্বংস করে সেখানে ইহুদি উপাসনালয় নির্মাণ করা হবেই।

 

আল আকসা মসজিদ ধ্বংসের জন্য ইসরাইলী নানা ষড়যন্ত্র নস্যাৎ করতে ফিলিস্তিনীরা এখনও আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। আল আকসা মসজিদ রক্ষার আন্দোলনে বায়তুল মোকাদ্দাসের মুসলিম অধিবাসীরাই বেশি অগ্রগামী। কাজেই ইসরাইল এখন বায়তুল মোকাদ্দাস থেকে মুসলমানদের বিতাড়নের চেষ্টা চালাচ্ছে। নানা অজুহাতে ফিলিস্তিনীদের বাড়ী-ঘর ও দোকানপাট দখল করে নিচ্ছে। বায়তুল মোকাদ্দাসের জনসংখ্যা কাঠামোয় পরিবর্তন আনতে সেখানে বেশ কিছু ইহুদি উপশহর নির্মাণ করা হয়েছে। ফিলিস্তিনীদের সাংস্কৃতিক পরিচিতি মুছে ফেলার জন্যেও ইসরাইল উঠেপড়ে লেগেছে।

 

সম্প্রতি ফিলিস্তিনীদের ঐতিহাসিক স্থাপনা হযরত ইব্রাহিম(আঃ)'র মাজার এবং বেলাল মসজিদকে ইসরাইল তার জাতীয় সম্পদ হিসেবে ঘোষণা করেছে। এছাড়া, ইসরাইল নাবলুস শহরের অদূরে অবস্থিত সালমান ফার্সি মসজিদ ধ্বংস করে দিয়েছে। তবে আশার কথা হলো, ইসরাইলের নানামুখী চাপ ও হামলা সত্ত্বেও ফিলিস্তিনীরা তাদের মাতৃভূমি ও নিজস্ব পরিচিতি বিশেষ করে আল আকসা মসজিদ রক্ষার ব্যাপারে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। ফিলিস্তিনের রাজনৈতিক দল ও সংগঠনগুলো এবং আলেম-ওলামারা ইসরাইলের অন্যায় পদক্ষেপের ব্যাপারে জনগণকে সজাগ ও সতর্ক করে তুলছেন এবং যে কোন পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য প্রস্তুত থাকার আহ্বান জানাচ্ছেন। ফিলিস্তিনী সংগঠনগুলো বায়তুল মোকাদ্দাসে ইহুদি উপাসনালয় চালুর পর প্রতিক্রিয়ায় বলেছে, ইসরাইল ইতিহাস বিকৃতির পাশাপাশি ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক নির্দশনগুলোর ব্যাপারে প্রতারণা করছে। মুসলিম উম্মাহ কখনোই আল আকসা মসজিদসহ মুসলমানদের পবিত্র স্থানগুলোর ব্যাপারে আপোষ করবে না বলে এসব সংগঠন ঘোষণা করেছে। বায়তুল মোকাদ্দাসে ইহুদি উপাসনালয় চালুর পর ফিলিস্তিনীরা এতটাই প্রতিবাদমুখর হয়েছে যে, ইসরাইলী নিরাপত্তা বাহিনী পরিস্থিতি সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে এবং ইসরাইল কর্তৃপক্ষ, নিরাপত্তা বাহিনীকে সহযোগিতা করতে সেখানে বসবাসরত ইহুদিবাদীদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে।

 

হামাসের রাজনৈতিক দপ্তরের সদস্য মাহমুদ আয্‌যাহার বলেছেন, ফিলিস্তিনীরা আল আকসা মসজিদ রক্ষায় সর্ব শক্তি নিয়োগ করবে। তবে আল আকসা মসজিদ রক্ষায় মুসলিম বিশ্বের আন্তরিক ও জরুরি সহযোগিতা প্রয়োজন বলে তিনি ঘোষণা করেছেন। মাহমুদ আয্‌যাহার আরও বলেছেন, বর্তমানে বায়তুল মোকাদ্দাস বিশেষকরে আল আকসা মসজিদের পরিস্থিতি অতীতের অন্য যে কোন সময়ের চেয়ে বেশি সংকটময় ও বিপদজ্জনক এবং এ ব্যাপারে মুসলিম জাতি ও সরকারগুলোর যে কোন ধরনের অসতর্কতা ও অবহেলা অপুরণীয় ক্ষতি বয়ে আনতে পারে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মানুচেহে মোত্তাকিও এ বিষয়টির উপর গুরুত্বারোপ করে ইসলামী সম্মেলন সংস্থা বা ওআইসি-র মহাসচিব একমাল উদ্দিন এহসান উগলুর কাছে লেখা এক চিঠিতে আল আকসা মসজিদ ধ্বংসের ইসরাইলী তৎপরতা বন্ধে পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বায়তুল মোকাদ্দাসের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা ও এ ব্যাপারে করণীয় ঠিক করতে ওআইসি'র জরুরি বৈঠক আহ্বানেরও প্রস্তাব দিয়েছেন। #

 

 

মন্তব্য লিখুন


Security code
রিফ্রেস দিন