এই ওয়েবসাইটে আর আপডেট হবে না। আমাদের নতুন সাইট Parstoday Bangla
বুধবার, 24 আগস্ট 2011 15:17

বিশ্ব কুদস দিবস-২০১১

কুদস দিবস আবারো এলো আমাদের দ্বারপ্রান্তে। বিশ্বজুড়ে তাই লক্ষ লক্ষ স্বাধীনতাকামী জনতা রাজপথে নেমে এসেছে কুদস মুক্তি এবং ফিলিস্তিনের মজলুম জনগণের প্রতি সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিতে। তাদের মুখে মুখে কুদস মুক্তির শ্লোগান। তাদের হাতে হাতে দখলদার ইসরাইল এবং তাদের দোসরদের বিরুদ্ধে জ্বালাময়ী শ্লোগান লেখা ফেস্টুন-ইসরাইল এবং আমেরিকাঃ ধ্বংস হোক, নিপাত যাক ইত্যাদি। আমরা গুরুত্বপূর্ণ এই দিবসটি নিয়ে আজকের আসরে কথা বলার চেষ্টা করবো।

 

ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের প্রতিষ্ঠাতা ইমাম খোমেনী (রহ) ১৯৭৯ সালের আগস্ট মাসে অর্থাৎ ইসলামী বিপ্লব বিজয়ের ছয় মাস অতিক্রান্ত হবার পর রমযান মাসের শেষ শুক্রবারকে কুদস দিবস হিসেবে ঘোষণা করেছিলেন। কুদস দিবসের ঘোষণায় তিনি বলেছিলেনঃ "আমি বহু বছর ধরে মুসলমানদেরকে দখলদার ইসরাইলের বিপদ সম্পর্কে সতর্ক করে আসছি। সাম্প্রতিক দিনগুলোতে ফিলিস্তিনী ভাইবোনদের ওপর তাদের পাশবিক হামলা আরো তীব্রতর হয়েছে। বিশেষ করে ফিলিস্তিনী সংগ্রামীদের ধ্বংস করার জন্যে তারা দক্ষিণ লেবাননে নির্বিচারে বোমা বর্ষণ করে যাচ্ছে। আমি বিশ্বের সকল মুসলমান এবং মুসলিম দেশগুলোর সরকারের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি, দখলদার ইসরাইল এবং তাদের মদদদাতাদের ওপর থেকে সহায়তার হাত গুটিয়ে নিন। সেইসাথে পবিত্র রমযান মাসের কদরের মর্যাদাময় দিনগুলোর অন্তর্ভুক্ত সর্বশেষ শুক্রবারকে কুদস দিবস হিসেবে মনোনীত করে বিভিন্ন আনুষ্ঠানিকতার মধ্য দিয়ে বিশ্ব মুসলমানের অধিকারের প্রতি সমর্থন জানানোর লক্ষ্যে ঐক্যবদ্ধ হবার জন্যেও বিশ্ব মুসলমানের প্রতি আমি আহ্বান জানাচ্ছি। এই আনুষ্ঠানিকতা ফিলিস্তিনের জনগণের ভাগ্য নির্ধারণে সহায়তা করবে।"

 

১৯৭৯ সালে কুদস দিবস ঘোষণার পর থেকে প্রতি বছরই দিবসটি পালিত হয়ে আসছে। প্রতিবছরই আগের বছরের তুলনায় আরো বেশি জাঁকজমকপূর্ণভাবে পালিত হচ্ছে কুদস দিবস। বিশ্ব কুদস দিবস কেবল ফিলিস্তিনের সংগ্রামী জনগোষ্ঠির প্রতি সমর্থন প্রদান কিংবা কুদস শরিফ মুক্তির লক্ষ্যে ইহুদিবাদী ইসরাইলের মোকাবেলা করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। গত তিন দশকে বিশ্ব কুদস দিবস বিশ্বের সকল বলদর্পী শক্তি এবং আধিপত্যবাদী ব্যবস্থার বিরুদ্ধে সংগ্রামের প্রতীকে পরিণত হয়েছে। ইমাম খোমেনী (রহ) এ সম্পর্কে বলেছিলেনঃ "কুদস দিবস এমন একটি দিবস যে দিবসে অসহায় ও দুর্বল জাতিগুলোর ভাগ্য সম্পর্কে অবহিত হওয়া উচিত, উচিত বলদর্পী শক্তিগুলোর বিরুদ্ধে দুর্বল জাতিগুলো নিজেদের অস্তিত্বের ঘোষণা দেওয়া। ইরানী জাতি যেভাবে বলদর্পীদেরকে নাকে খৎ দিয়ে ছেড়েছে, তেমনিভাবে সকল জাতির উচিত বলদর্পীদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো এবং অনৈতিকতার শেকড় উপড়ে ফেলা।"

 

ইসলামী বিপ্লবের মহান নেতা কুদস দিবসকে ইসলামের জাগরণ দিবস হিসেবে উল্লেখ করে বলেছেনঃ কুদস দিবস হচ্ছে ইসলামের দিবস। কুদস দিবস ইসলামের পুনর্জাগরণ দিবস। ইমাম খোমেনী (রহ) বিশ্বাস করতেন,কুদস দিবস ইসলামের পুনর্জাগরণ দিবস, তাই মুসলমানদেরকে তাদের আধ্যাত্মিক শক্তি এবং বৈষয়িক সামর্থ সম্পর্কে সচেতন হতে হবে। বিশ্বব্যাপী মুসলমানের সংখ্যা এখন এক শ কোটির ওপরে, তাদের পৃষ্ঠপোষক হিসেবে আল্লাহ আছেন,ইসলাম এবং তাদের ইমানও তাদের পৃষ্ঠপোষক,তাহলে আর ভয় কীসের?" কুদস দিবস ঘোষণার তিন দশক পর ইমাম খোমেনী (রহ) এর কথাগুলোর বেশিরভাগই বাস্তবে প্রতিফলিত হয়েছে। বিশেষ করে এ বছরের কুদস দিবস অন্যান্য বছরের তুলনায় একেবারেই আলাদা। কেননা কুদস শরিফ মুক্তির আশা অন্যান্য সময়ের চেয়ে এবার অনেক বেশি অনুভূত হচ্ছে।

ইমাম খোমেনী (রহ) ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন, ইসলামী জাগরণ পুনরায় সংঘটিত হবে, তাঁর সেই ভবিষ্যদ্বাণীর বাস্তবায়ন এখন পরিলক্ষিত হচ্ছে। উত্তর আফ্রিকা থেকে শুরু করে পারস্য উপসাগরীয় শেখ শাসিত অঞ্চলে ইসলামের জাগরণই তার প্রমাণ। এ অঞ্চলের জনগণ ইসলামী আদর্শ ও শিক্ষায় উজ্জীবিত হয়ে ডান-বাম কিংবা জাতীয়তাবাদী নির্বিশেষে ঐক্যবদ্ধ হয়ে পশ্চিমাদের মদদপুষ্ট স্বৈরশাসকদের বিরুদ্ধে অভ্যুত্থান ঘটিয়েছে। মার্কিন নেতৃত্বাধীন পশ্চিমা আধিপত্যবাদী শক্তিগুলো মিশর, তিউনিশিয়া, লিবিয়া, বাহরাইন এবং ইয়েমেনসহ অন্যান্য মুসলিম দেশের গণঅভ্যুত্থানকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করতে যে চেষ্টা চালিয়েছে, আরব মুসলমানদের জাগৃতির কারণে তা ব্যর্থ হয়েছে। তারা এখন এই আত্মবিশ্বাস ফিরে পেয়েছে যে, ইসলামী শিক্ষার আলোকে আল্লাহর ওপর ভরসা করে জুলুমের শেকড় উপড়ে ফেলা সম্ভব। যদিও পশ্চিমারা এমনকি কোনো কোনো আরবদেশও জনগণের ওপর দমন পীড়ন চালিয়ে এইসব স্বৈরাচারকে রক্ষা করতে চেয়েছিল। কিন্তু জনগণের ওপর জুলুম চালানোর ফলে স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন আরো গতি পেয়েছে। জুলুম যতো কঠোরই হোক না কেন, স্বৈরাচারদের পতন নিশ্চিতই ঘটবে।

 

মধ্যপ্রাচ্যে ইসলামী গণজাগরণের গুরুত্বপূর্ণ একটা প্রভাব লক্ষ্য করা যাবে ফিলিস্তিনে। এরফলে তথাকথিত মধ্যপ্রাচ্য শান্তি আলোচনা মুখ থুবড়ে পড়েছে। গত দুই দশক ধরে ইসরাইল এবং আমেরিকা মধ্যপ্রাচ্য শান্তি আলোচনা নামের ঐ প্রক্রিয়া চালু করার মাধ্যমে অধিকৃত ফিলিস্তিনের ছোট্ট একটি অংশ ফিলিস্তিনকে দিয়ে ইসরাইল নামক অবৈধ রাষ্ট্রটিকে বৈধতা দিতে চেয়েছিল। কিন্তু তারা নিজেরাই প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে সেই আলোচনা প্রক্রিয়ায় অচলাবস্থার সৃষ্টি করে। এ কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে স্বয়ং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। কেননা তারা চেয়েছিল ইসরাইলকে সহায়তা করার মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যে তাদের আধিপত্যবাদী লক্ষ্য বাস্তবায়ন করতে। আলোচনা প্রক্রিয়া বন্ধ হয়ে যাবার ফলে তাদের সেই আশায় গুড়েবালি হয়েছে।

 

মিশরের সাবেক স্বৈরাচারী শাসক হোসনি মোবারকের পতনের মধ্য দিয়ে সেই আলোচনা প্রক্রিয়ার কবর রচিত হয়। মোবারক ছিল ঐ আলোচনা প্রক্রিয়ার প্রধান খুঁটি। সে ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বস্ত মিত্র। মধ্যপ্রাচ্যে মোবারকের স্থলাভিষিক্ত হবার মতো সুযোগ্য বিশ্বস্ত এমন কোনো মিত্র আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেই যার মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যে তাদের লক্ষ্য বাস্তবায়ন করতে পারে। এরকম একটি পরিস্থিতিতে ফিলিস্তিনের স্বশাসন কর্তৃপক্ষও ইসলামী জাগরণের কল্যাণে হামাসের সাথে পুনরায় সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। ঐ চুক্তির গুরুত্বপূর্ণ একটি দিক হলো-আসছে সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘ সাধারণ অধিবেশনে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের ঘোষণা প্রদানের সিদ্ধান্ত। এই সিদ্ধান্ত ইসরাইল এবং আমেরিকাকে দিশেহারা করে দিয়েছে। তারা তাই যে কোনো উপায়ে চাচ্ছে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের প্রস্তাব উত্থাপনের পথে বাধার সৃষ্টি করতে।  যেখানে তারা চেয়েছিলো আলোচনা প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ফিলিস্তিনকে ছোট্ট একটি অংশ দিয়ে দিতে,সেখানে ফিলিস্তিনীরা এখন স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের প্রস্তাব জাতিসংঘে উত্থাপন করতে যাচ্ছে যা তাদের স্বীকৃতিরই নামান্তর। এটাই এখন ইসরাইল-আমেরিকার মাথাব্যথার কারণ। ফিলিস্তিনীদের দীর্ঘদিনের সেই স্বপ্ন বাস্তবায়িত হোক, কুদস দিবসে সমগ্র বিশ্বের মুসলমানদের পক্ষ থেকে ফিলিস্তিনীদের জন্যে এটাই হোক সবার আন্তরিক দোয়া। 

 

মন্তব্য লিখুন


Security code
রিফ্রেস দিন