এই ওয়েবসাইটে আর আপডেট হবে না। আমাদের নতুন সাইট Parstoday Bangla
মঙ্গলবার, 14 আগস্ট 2012 18:19

বিশ্ব কুদস দিবস-২০১২

প্রায় ৬৪ বছর আগে (১৯৪৮ সনে) মধ্যপ্রাচ্যের প্রাণকেন্দ্রের পাশে এবং এশিয়া, আফ্রিকা ও ইউরোপের সংযোগ-স্থলের কাছে সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলোর সহায়তায় গড়ে তোলা হয়েছে অবৈধ রাষ্ট্র ইহুদিবাদী ইসরাইল। বর্ণবাদ, ফ্যাসিবাদ ওউগ্র ইহুদিবাদী মতবাদের চরম প্রকাশ ঘটিয়ে সন্ত্রাস ও জবর দখলের মাধ্যমে ফিলিস্তিনের বুকে রোপণ করা হয় ইসরাইল নামের এই বিষ-বৃক্ষ। তেল ও নানা দামী সম্পদে সমৃদ্ধ আরব বিশ্বকে ক্রমান্বয়ে গ্রাস করা এবং চিরতরে নতজানু রাখার লক্ষ্যে ব্রিটিশ ও মার্কিন সাম্রাজ্যবাদী শক্তির সর্বাত্মক সহায়তা নিয়ে বিষাক্ত ক্যান্সার বা বিষ-ফোঁড়ার মতই পরিপুষ্ট করা হয়েছে এই অবৈধ রাষ্ট্রকে। সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন ও ইউরোপের উপনিবেশবাদী কিছু শক্তিও এই বিষ-বৃক্ষের অঙ্কুরোদগম এবং সার্বিক বিকাশে রেখেছে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। আর এসবই করা হয়েছে পৃথিবীর বুক থেকে ফিলিস্তিনি নামের একটি সভ্য ও প্রাচীন জাতিকে প্রায় নির্মূল অথবা ছন্নছাড়া উদ্বাস্তু জাতিতে পরিণত করার সুপরিকল্পিত ও পর্যায়ক্রমিক চক্রান্তের আওতায়।

 

 বৌদ্ধ কোনো জনগোষ্ঠী যদি আজ এ দাবি করে যে একসময় বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহণকারী অশোক ভারতের অধিপতি ছিলেন বলে ভারতে আবারও বৌদ্ধ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে হবে, কিংবা বাংলাদেশে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী পাল রাজবংশের উত্তরাধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য এই দেশে বৌদ্ধ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা জরুরি,  তাহলে তা হবে যেমন অগণতান্ত্রিক, অমানবিক ও হাস্যকর দাবি তেমনি তৌরাত বা বাইবেলে উল্লেখিত বনি ইসরাইলের শাসন বা  প্রাচীন ইসরাইল রাষ্ট্র পুনপ্রতিষ্ঠার নামে  ফিলিস্তিনে ইসরাইল প্রতিষ্ঠাও সম্পূর্ণ অযৌক্তিক এবং উদ্ভট উদ্যোগ হিসেবে পুরোপুরি অবৈধ। কারণ, হাজার হাজার বছর ধরে ফিলিস্তিনের আসল ও আদি অধিবাসী হিসেবে ফিলিস্তিনিরাই এই ভূখণ্ডের মূল মালিক। ইতিহাসেও দেখা যায় বহিরাগত ইহুদিরা প্রাচীন যুগেও অল্প সময়ের জন্য এ অঞ্চলে শাসন-কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছিল। কিন্তু সেই প্রাচীন যুগেই বহু নবী-রাসূলকে হত্যার জন্য অভিশপ্ত ও লাঞ্ছিত ইহুদি জাতি সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছিল বিক্ষিপ্তভাবে।

 

 ১৯১৯ সালে সমগ্র ফিলিস্তিনের মাত্র ২.৫ শতাংশ জমি ছিল ইহুদিদের দখলে। সারা বিশ্বে ছড়িয়ে থাকা ইহুদি পুঁজিপতিরা গত শতকের প্রথম দিকে ফিলিস্তিনের কিছু জমি কিনে এবং ঘাঁটি ও দূর্গ বানিয়ে সেখানে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কাজ শুরু করে। পরবর্তীতে সন্ত্রাস ও অস্ত্রের জোরে তারা উচ্ছেদ করতে থাকে ফিলিস্তিনিদের। এর পরের ইতিহাস আরো করুণ। বিশ্বের অন্যতম প্রধান পরাশক্তি মার্কিন সরকার ও পুরনো সাম্রাজ্যবাদী শক্তি ব্রিটেনের চাপে জাতিসংঘকে দিয়েই স্বীকৃতি দেয়া হয় ইসরাইলকে। জাতিসংঘের ঘোষণায় ইসরাইলের পাশাপাশি ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কথা থাকলেও আজো তা বাস্তবায়িত হতে দিচ্ছে না সাম্রাজ্যবাদী ও ইহুদিবাদী মহল। ১৯৪৮ ও ১৯৬৭ সালের সালের যুদ্ধে ইসরাইল দখল করে নেয় যথাক্রমে পবিত্র বায়তুল মোকাদ্দাস শহরের পশ্চিমাঞ্চল ও মুসলমানদের প্রথম কিবলা  আল আকসা মসজিদ অধ্যুষিতপূর্ব বায়তুল মোকাদ্দাস। এভাবে রচিত হয় সভ্যতার এই যুগের সবচেয়ে কলঙ্কিত অধ্যায়।  ১৯৭৩ সালের যুদ্ধে ইসরাইল দখল করে নেয় সিরিয়ার গোলান এবং মিশরের সিনাই উপত্যকা। নীল থেকে ফোরাত পর্যন্ত ইহুদিবাদী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আগ্রাসী চিন্তা নিয়ে ১৯৮২ সালে দক্ষিণ লেবাননও দখল করে ইসরাইল।

 

 নির্দয় ইহুদিবাদী সেনারা বিভিন্ন যুদ্ধ ও গণহত্যা অভিযানে হতাহত করেছে লাখ লাখ ফিলিস্তিনি ও আরব মুসলমানকে। কিন্তু ইসরাইলের জন্য সবচেয়ে বড় বিপর্যয়ের সূচনা হয় ১৯৭৯ সালে ইরানে ইসলামী বিপ্লব বিজয়ী হওয়ায়। ইসরাইলের ঘনিষ্ঠতম মিত্র শাহের পতন ঘটে এ বিপ্লবে। বিপ্লবী ইরান সম্পর্ক ছিন্ন করে ইসরাইলের সঙ্গে। বিপ্লবীদের হাতে অপদস্থ হওয়া বড় শয়তান আমেরিকাও ইসলামী ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করতে বাধ্য হয় । তেহরানস্থ ইসরাইলি দূতাবাসকে রূপান্তর করা হয় ফিলিস্তিন দূতাবাসে। মুসলমানদের প্রথম কিবলা উদ্ধারের জন্য মুসলিম উম্মাহকে জাগিয়ে তোলার লক্ষ্যে ১৯৭৯ সালে রমজানের শেষ শুক্রবারকে “ বিশ্ব কুদস দিবস” বলে ঘোষণা করেন ইসলামী বিপ্লবের রূপকার মরহুম ইমাম খোমেনী (র.)। সেই থেকে প্রতি বছর পালিত হচ্ছে এই দিবস। ইরানের ইসলামী জাগরণে উদ্বুদ্ধ হয়ে লেবাননে গড়ে উঠে ইসরাইল বিরোধী গণ- প্রতিরোধ ও হিজবুল্লাহর সশস্ত্র সংগ্রাম। কয়েক বছর পর ফিলিস্তিনেও শুরু হয় ইন্তিফাদা জাগরণ ও গণ-প্রতিরোধ। গড়ে ওঠে সংগ্রামী দল ইসলামী জিহাদ ও হামাস। ফলে ২০০০ সালে লেবানন ছেড়ে পালিয়ে যায় ইসরাইলি সেনারা।

 

২০০৫ সালে ফিলিস্তিনের গাজাও ছেড়ে দিতে বাধ্য হয় দখলদার ইসরাইল। অবশেষে ২০০৬ সালে হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে ৩৩ দিনের সর্বাত্মক যুদ্ধে মারাত্মকভাবে বিপর্যস্ত হয় ইহুদিবাদী সেনারা।

 

২০০৯ সালে গাজা পুনর্দখলের চেষ্টা চালিয়েও ইসরাইল লজ্জাজনকভাবে ব্যর্থ হয়। এভাবে ইসরাইল অপরাজেয় বলে যে দাবি করা হত তা যে অসার ও মিথ্যা প্রচারণা মাত্র তা প্রমাণিত হয়েছে।  ফিলিস্তিন ও ইসরাইল বিরোধী স্বাধীনচেতা শক্তিগুলোর বিরুদ্ধে পাশ্চাত্যের ব্যাপক অপপ্রচার সত্ত্বেও  পশ্চিমা বিশ্বসহ গোটা বিশ্বের মানুষ আজ ইসরাইলকে একটি ঘৃণ্য ও অমানবিক শক্তি বলেই মনে করে। অন্যদিকে ফিলিস্তিনিদের পক্ষে দিনকে দিন জোরদার হচ্ছে বিশ্ব জনমত। সাম্প্রতিক সময়ে তিউনিশিয়া ও মিশরসহ কয়েকটি আরব দেশের ইসলামী গণজাগরণ ইসরাইলকে আরো নিঃসঙ্গ ও দুর্বল করেছে। আর এসবই ইরানের ইসলামী বিপ্লবের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ প্রভাবের ফল। কুদস দিবস মুসলমানদের হারানো সম্মান পুনরুদ্ধারের চেতনাকে ক্রমেই শানিত করছে। ফিলিস্তিন সংকটই যে মুসলিম উম্মাহর প্রধান সংকট তা এ দিবসের প্রধান বার্তা।

 

 ইসলামী ঐক্য ও  মুসলমানদের সম্মিলিত প্রতিরোধের মাধ্যমে যে প্রথম কিবলাকে এবং গোটা ফিলিস্তিনকে মুক্ত করা সম্ভব তা অনেক আগেই স্পষ্ট হয়েছে। কুদস দিবসসহ বিভিন্ন উপলক্ষে মরহুম ইমাম খোমেনী (র.) ও ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হযরত আয়াতুল্লাহিল উজমা খামেনী বার বার এই বাস্তবতাকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন।  হিজবুল্লাহর প্রধান সাইয়্যেদ হাসান নাসরুল্লাহও ইসরাইলকে মাকড়শার ঘর বলে উল্লেখ করে থাকেন। আর তাই ফিলিস্তিন ও কুদস-মুক্তির প্রবল সম্ভাবনাকে তিরোহিত করার জন্যই ইসরাইল ও তার পক্ষের শক্তিগুলো মুসলমানদের মধ্যে নানা বিভেদ ছড়িয়ে দেয়ার চেষ্টা করছে। আপোসকামী ফিলিস্তিনি ও আরব নেতাদের সঙ্গে শান্তি আলোচনার নামে সময় ক্ষেপণ এবং অবৈধ ইহুদি বসতির সংখ্যা বাড়িয়ে চলেছে তেল-আবিব। সিরিয়ার চলমান সংকটকেও এই প্রেক্ষাপটেই দেখা উচিত। সিরিয়া ইসরাইল বিরোধী প্রতিরোধের অন্যতম প্রধান ফ্রন্ট বলেই প্রতিরোধকামী আসাদ সরকারকে দেশটির ক্ষমতা থেকে নামানোর চেষ্টা করছে ইসরাইল ও পাশ্চাত্য এবং তাদের সেবাদাস আঞ্চলিক সরকারগুলো। 

 

শত্রু ও মিত্রকে চিনতে মুসলমানরা যেন ভুল না করে এবংছোটখাটো স্বার্থ নিয়ে বিবাদে মেতে না থেকে  তারা কুদস ও ফিলিস্তিন মুক্ত করার প্রধান লক্ষ্য হাসিলের প্রচেষ্টা জোরদার করবে–এটাই হোক এবারের কুদস দিবসের মূল প্রার্থনা। #

 

রেডিও তেহরান/এএইচ/১৪

 

 

 

মন্তব্য লিখুন


Security code
রিফ্রেস দিন