এই ওয়েবসাইটে আর আপডেট হবে না। আমাদের নতুন সাইট Parstoday Bangla
রবিবার, 21 ডিসেম্বর 2008 18:52

বিশ্ব কুদস দিবস উপলক্ষে অধ্যাপক সিরাজুল হকের সাক্ষাৎকার

[ রমযানের শেষ শুক্রবার বিশ্ব কুদস দিবস। এই দিবসে বিশ্বের মুসলমানরা তাদের প্রথম ক্বেবলা মসজিদুল আকসাকে দখলদার ইহুদিবাদি ইসরাইলের কবল থেকে মুক্ত করার জন্যে ব্যাপকভাবে উজ্জীবিত হয়। বর্ণবাদী ইসরাইলের বিরুদ্ধে তারা প্রতিবাদ ও ক্ষোভ প্রদর্শন করে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের পাশাপাশি বাংলাদেশেও এই দিবস উদযাপন উপলক্ষে বিভিন্ন কর্মসূচি পালিত হয়। আমরা তাই এই দিবস উপলক্ষে বাংলাদেশের বিশিষ্ট সাংবাদিক অধ্যাপক সিরাজুল হকের একটি সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেছি। তাঁর সাক্ষাৎকারটি এখানে উপস্থাপন করা হলো ]

রেডিও তেহরান : অধ্যাপক সিরাজুল হক! আপনি জানেন নিশ্চয়ই যে, প্রতি বছরের ২৮ অক্টোবর বিশ্বব্যাপি কুদস দিবস হিসেবে পালিত হয় । বিশ্বের বিভিন্ন দেশের পাশাপাশি বাংলাদেশেও এই দিবসটি পালিত হয় । মুসলমানরা কুদস দিবসে ইসরাইলের বিরুদ্ধে তাদের ক্ষোভ ও অসন্তোষ প্রকাশ করে । তো প্রথমেই আমরা জানতে চাইব যে কুদস দিবসের তাৎপর্য কী ? কেন বিশ্বের মুসলমানরা এই দিবসে এভাবে উজ্জীবিত হয়ে উঠে ?

অধ্যাপক সিরাজুল হক : আসলে কুদস হচ্ছে মুসলমানদের প্রথম কেবলা এবং এটা শুধু মুসলমানদের নয়, এটা হচ্ছে মুসলমান, ইহুদী, খ্রীস্টান সকলেরই পবিত্র ভূমি । এটা সবার জন্যেই আযাদ ছিল । যাকে আমরা বাইতুল মোকাদ্দাস বলি । কিন্তু ৫০ বছরেরও বেশি সময় ধরে এই বায়তুল মোকাদ্দাস ইহুদিবাদী ইসরাইলের দখলে রয়েছে । তারা মুসলমানদের বঞ্চিত করে এটা দখলে রেখেছে । এ কারণে মুসলমানরা এটাকে সঠিকভাবে ব্যাবহার করতে পারছে না । বিশেষ করে ইসরাইল প্রতিষ্ঠার পর থেকে ইহুদিরা নির্বিচারে মুসলমানদের হত্যা করছে । এমনকি মসজিদে নামাজরত অবস্থায়ও তাদের হত্যা করছে । এটা একটা বিরাট ঘটনা যেটা কয়েক বছর আগে আল খলিল মসজিদে ঘটেছিল । কাজেই এটা মুসলমানদের একটা বেদনার কারণ বিশেষ করে ফিলিস্তিনী মুসলমানরা নানাভাবে ইহুদিবাদী ইসরাইল কর্তৃক নির্যাতিত হচ্ছে এবং এ কারণে এটা উদ্ধারের জন্য মুসলমানদের সংগ্রাম বা জিহাদ অত্যাবশ্যক । তারপরে ইরানে ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর বিপ্লবের মহান নেতা এবং ইসলামী রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা মরহুম ইমাম খোমেনী (রঃ) আবেদন করেন যে, রমজানের শেষ শুক্রবার হবে কুদস দিবস । এই কুদস দিবসে শুধু ফিলিস্তিনী বা মুসলমানদের দিবস নয় এটা হচ্ছে ইসলামেরও দিবস । যেকারণে ইমামের ঘোষণার পর সারা বিশ্বে যেখানে মুসলমান আছে এমনকি যেখানে মুসলমানরা সংখ্যালঘু সেখানেও তারা এটাকে বিভিন্নভাবে উদযাপন করে এবং এদিন তারা বিভিন্ন রকমের র্যানলি বা সমাবেশ ও সভার আয়োজন করে অথবা ফিলিস্তিনীদের প্রতি সমবেদনা জ্ঞাপন করে । সেই পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশেও প্রতিবছর কুদস দিবস পালিত হয়ে আসছে এবং এবারেও ২৩ শে রমজান কুদস দিবস সাড়ম্বরে পালিত হবে, র্যা লি হবে, বিক্ষোভ হবে। এটা হওয়া দরকার । শুধু রাজধানী ঢাকাতেই নয়, ঢাকার বাইরেও বিভিন্ন মফস্বল শহরে দিনটি পালিত হবে । এই দিবসের তাৎপর্য যেমন আগেও ছিল বিশেষ করে ইমাম খোমেনীর ঘোষণার পর এর তাৎপর্য বৃদ্ধি পেয়েছে ।

রেডিও তেহরান : আচ্ছা ! আপনি কি মনে করেন, কুদস দিবস যথাযথভাবে পালনের মাধ্যমে বাইতুল মোকাদ্দাস কি ইহুদিবাদীদের কবল থেকে মুক্ত করার চেতনা শক্তিশালী করা সম্ভব?

অধ্যাপক সিরাজুল হক : এটা অবশ্যই সম্ভব । কারণ আমরা দুইটা ঘটনার কথা বলতে পারি । লেবাননে ইসরাইল যেভাবে জবরদখল করেছিল, এই ফিলিস্তিনীদের হামাস, জেহাদ বা অন্যান্য সংগঠনের আন্দোলন এবং তাদের প্রতি বিশ্ব মুসলিমের সমর্থনের কারণেই তারা লেবানন থেকে বিতাড়িত হতে বাধ্য হয়েছে । দ্বিতীয়ত, গাজা থেকে সম্প্রতি যে ইহুদি বসতি প্রত্যাহার করা হয়েছে এটা ইসরাইলের কোন করুণা নয় । ফিলিস্তিনী বিভিন্ন সংগঠনসহ সকল ফিলিস্তিনীর সংগ্রাম এবং বিশ্ব মুসলিমের প্রতিবাদ মিছিল ও কুদস দিবস উপলক্ষে প্রতি বছর যে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করা হয় বিশেষ করে সারা বিশ্বের মুসলমানদের মধ্যে যে একটা চেতনা পরিলক্ষিত হয়, আল আকসা বা বাইতুল মোকাদ্দাস মুক্ত করার জন্য ; সেটারই ফলশ্রুতিতে এই ঘটনাগুলো ঘটেছে । কাজেই এটাকে আমরা আংশিক বিজয় বললেও ফিলিস্তিনীসহ বিশ্ব মুসলিমের একটা বিজয় বলতে পারি ।

রেডিও তেহরান : ফিলিস্তিনীদের দিকে তাকালে আমরা দেখতে পাই প্রায় প্রতিদিনই ইহুদিবাদী সেনারা ফিলিস্তিনীদের হত্যা করছে বা তাদের বাড়িঘর ভেঙ্গে দিচ্ছে বা তাদের নারী ও শিশুরা পর্যন্ত ইহুদিবাদীদের হামলা থেকে রেহাই পাচ্ছে না । ফলে অনেকে ইহুদিবাদী ইসরাইলকে সন্ত্রাসী রাষ্ট্র বলে অভিহিত করেন । এ ব্যাপারে আপনার দৃষ্টিভঙ্গি কি ?

অধ্যাপক সিরাজুল হক : ইহুদিরা যে সন্ত্রাসবাদী তাতে কোন সন্দেহ নেই । কারণ, ইহুদীদেরকে পাশ্চাত্য বিশ্ব এবং প্রাচ্যেরও কিছু কিছু পরাশক্তি তাদেরকে যেভাবে মদদ দিয়ে আসছিল সেই মদদের ফলে তারা ব্যাপক শক্তি অর্জন করেছে । এ কারণে তারা এখন আণবিক শক্তিরও অধিকারী । কথিত আছে ইসরাইলের কাছে ২০০ পারমাণবিক অস্ত্র রয়েছে । সারা বিশ্বে আমেরিকা পারমাণবিক অস্ত্রের ব্যাপারে বাগাড়ম্বর করে এবং এর বিরোধীতা করে বিশেষ করে ইরানের ওপর চাপ প্রয়োগ করে এবং ইরানকে একঘরে করে রাখার জন্য তারা চেষ্টা চালায় । কিন্তু ইসরাইলের কাছে তাদের দেয়া যে পারমাণবিক তথ্য রয়েছে সে ব্যাপারে আমেরিকা কোন কথা বলছে না বা অন্যকোন দেশও কিছু বলছে না । জাতিসংঘও এখন পর্যন্ত এ সমস্যার কোন সুরাহা করতে পারে নি । তাই আমরা বলতে পারি ফিলিস্তিনসহ গোটা বিশ্বের মুসলমানদের ওপর হামলা করার জন্য ইসরাইল এসব অস্ত্র মজুদ করেছে । ইসরাইলের প্রথম টার্গেট ফিলিস্তিন ও আরব রাষ্ট্রগুলো এবং এরপর ইরান তাদের টার্গেট।

রেডিও তেহরান : আমেরিকা একদিকে নিজেকে মানবাধিকারের সমর্থক বলে দাবি করছে, অন্যদিকে ইসরাইলী সন্ত্রাসবাদকেও তারা সমর্থন করছে যেটা আপনি বললেন, তাহলে মানবাধিকারের ব্যাপারে আমেরিকার দাবি কি প্রতারণা নয় ?

অধ্যাপক সিরাজুল হক : ইরাকে হামলা করার আগে ও পরে আমেরিকার জনগণ যেভাবে সেদেশের প্রশাসনের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছিল, মিথ্যা গণতন্ত্রের অজুহাত দেখিয়ে সেখানে তারা জবরদখল করে আছে এবং সেখানে তাদের অস্ত্র কামান, গুলি যা কিছু আছে সবগুলোই নিয়োজিত রয়েছে । মুসলমানদের ওপর এমনকি জনগণের ওপর যে অত্যাচার তারা চালাচ্ছে নির্বিশেষে এটা প্রমাণ করে যে তারা সবচেয়ে বড় সন্ত্রাসী এবং সেখানে নারী, শিশু, বৃদ্ধ এমনকি আমেরিকান সৈন্যও তো প্রতিদিন মারা যাচ্ছে । অথচ আমেরিকার জনগণ এ ব্যাপারে মিছিল, মিটিং, বিক্ষোভ প্রদর্শন করছে । অথচ বুশ প্রশাসন সেটাকে উপেক্ষা করে মিথ্যা ও ভূয়া গণতন্ত্রের নামে ইরাকে জবরদখল করে আছে এবং সেখান থেকে নড়তে চায় না । এটা তাদের একটা বিরাট সন্ত্রাসী কর্মকান্ড । এখানে যে লোকগুলো মারা যাচ্ছে প্রতিদিন, এই মারা যাওয়াটা কি সন্ত্রাসী কর্মকান্ডের ফল নয় ? সেখানে গেরিলারা যে হামলা করছে এই গেরিলাদেরকে তারাই পুরস্কৃত করছে এবং গেরিলারাও যে যুদ্ধ করে যাচ্ছে এই সন্ত্রাসের ভাগী আসলে আমেরিকা ।

রেডিও তেহরান : আগামীকাল কুদস দিবসের কর্মসূচীকে সামনে রেখে আপনি আমাদের শ্রোতাদের উদ্দেশ্যে আরো কিছু বলবেন ?

অধ্যাপক সিরাজুল হক : শ্রোতাদের উদ্দেশ্যে বলার হলো এটা যে, আজকে ইসরাইলের কবল থেকে করাল গ্রাস থেকে আল কুদস মুক্ত করার জন্য শুধু ফিলিস্তিনীরাই যথেষ্ট নয় বিশেষ করে আরব জাহানের যে রাষ্ট্রগুলো, এরা কিছুটা নীরবতা পালন করে যাচ্ছে । তাদের যে ক্ষোভ অথবা নিন্দা অথবা প্রতিবাদ সেটা সেভাবে নয় যেভাবে আরব বিশ্বের বাইরের মুসলিম রাষ্ট্রগুলো বা অন্যান্য মুক্তিকামী জনগণ করছে । কাজেই আজকের সারা বিশ্বের মুসলমানদের এবং যারা স্বাধীনতার পক্ষের শক্তি তাদের এবং যারা মানবতার পক্ষের শক্তি তাদের উচিত হবে ফিলিস্তিনী জনগণকে মুক্ত করার জন্য এবং আল কুদসকে মুক্ত করার জন্য ফিলিস্তিনীদের সাথে একাত্মতা ঘোষণা করা এবং এই কাজের জন্য সারাবিশ্বে বিশেষ করে সংখ্যাগুরু মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর মুসলমানদের দায়িত্ব হচ্ছে মবিলাইজেশন এবং জনমত গঠন করা এবং আমেরিকা, ইসরাইল ও অন্যান্য পরাশক্তি যারা ইসরাইলকে মদদ দিচ্ছে তাদের বিরুদ্ধে একটা শক্তিশালী জনমত গড়ে তোলা এবং আমি মনে করি ইমাম খোমেনী (রঃ)র এই যে আহবান এবং তিনি বলেছেন এটা ইসলামের দিবস । তো যদি এটা ইসলামের দিবস হয়ে থাকে তাহলে মুসলমানদেরকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে এই দিবসকে যথাযথভাবে পালনের মাধ্যমে সারা বিশ্বের মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করা , ঐসব মানুষকে যারা দুর্বলের মুক্তি কামনা করে এবং যারা সন্ত্রাস বা এ ধরনের হীন সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে তাদেরকে ঐক্যবদ্ধ করতে হবে । সংঘবদ্ধ করতে হবে সুসংহত করতে হবে । এভাবে আস্তে আস্তে আশা করা যায় সফলতা আসবে । তবে আয়াতুলাহ খামেনী এ ব্যাপারে গুরুত্বপূর্ণ একটি কথা বলেছেন । সশস্ত্র লড়াই ছাড়া সেখান থেকে ইসরাইলকে হঠানো সম্ভব নয় । এবং সশস্ত্র লড়াই এখন ফিলিস্তিনীরা যেভাবেই হোক করে যাচ্ছে এবং আমাদের উচিত হবে তাদের প্রতি অকুন্ঠ সমর্থন জানানো ।#


মন্তব্য লিখুন


Security code
রিফ্রেস দিন