এই ওয়েবসাইটে আর আপডেট হবে না। আমাদের নতুন সাইট Parstoday Bangla
সোমবার, 10 আগস্ট 2015 15:02

মোল্লা ওমরের রহস্যজনক মৃত্যু ও তালেবানের ভবিষ্যৎ

তালেবান ও আফগান সরকারের মধ্যে যখন আলোচনা চলছিল তখন হঠাৎ করে তালেবান নেতা মোল্লা ওমরের মৃত্যুর খবর বিশ্বের গণমাধ্যমগুলোর অন্যতম প্রধান শিরোনাম হিসেবে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। তার মৃত্যু তালেবানদের ভবিষ্যৎ ও আফগান পরিস্থিতির ওপর গভীর প্রভাব রাখতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। 


২০০১ সালে আফগানিস্তানে তালেবানরা ক্ষমতাচ্যুত হয়। আর সেই থেকে কখনও মোল্লা ওমরকে দেখা যায়নি। বলা হচ্ছে ওমর দুই বছর আগে পাকিস্তানের এক সামরিক হাসপাতালে মারা যায়। কিন্তু পাকিস্তান সরকারই খবরটি গোপন রেখেছে। 


তালেবান গোষ্ঠী গড়ে তোলার ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছিল মার্কিন সরকার, সৌদি আরব, আরব আমিরাত ও ব্রিটেন। তাই এই দেশগুলোর গোয়েন্দা সংস্থা ওমরের মৃত্যুর খবর জানতো না এমন সম্ভাবনা খুবই কম। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের কেউ কেউ বলছেন, পাকিস্তান সরকার হয়তো এই ভয়ের মধ্যে ছিল যে ওমরের মৃত্যুর খবর প্রচারিত হলে তালেবানদের ওপর তার নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। অর্থাৎ তালেবানরা কয়েক গ্রুপে ভাগ হয়ে যেতে পারে এবং পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থা তাদের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলতে পারে। কারণ পাকিস্তান তালেবান গোষ্ঠীকে তার রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করে আসছিল। মোল্লা ওমরের স্বাক্ষর করা বিবৃতি ব্যবহার করে ইসলামাবাদ গত প্রায় ১৪ বছর পর্যন্ত তালেবানকে ঐক্যবদ্ধ রাখতে সক্ষম হয়েছে।


নানা বিবৃতিতে মোল্লা ওমরের নাম ব্যবহার করে পাকিস্তান সরকার তালেবানের মধ্যে তার বিভিন্ন লক্ষ্য হাসিল করেছে। মোল্লা ওমরের কথিত সাম্প্রতিক ঈদের শুভেচ্ছা-বাণী থেকে বোঝা যায় পাকিস্তান কাবুল সরকারের বিরুদ্ধে তালেবানদের দিয়ে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার নীতি বজায় রাখতে চেয়েছে এবং এর মাধ্যমে তার নিজস্ব রাজনৈতিক অবস্থান গড়ে তুলতে চেয়েছে।


কিন্তু অবশেষে পাকিস্তান সরকার তালেবান ও আফগান সরকারের মধ্যে দ্বিতীয় দফা আলোচনা শুরুর প্রাক্কালে মোল্লা ওমরের মৃত্যুর খবর প্রকাশ করেছে। পাকিস্তানের এই পদক্ষেপের সঙ্গে প্রথম দফা তালেবান-আফগান সরকারের আলোচনায় ইসলামাবাদের সন্তুষ্টি বা অসন্তুষ্টির এবং আলোচনা অব্যাহত থাকার সম্পর্ক থাকতে পারে। 


মোল্লা ওমরের মৃত্যুর পর মোল্লা আখতার মোহাম্মাদ মানসুরকে তালেবানদের নতুন নেতা বলে ঘোষণা করা হয়েছে। মোল্লা আখতার তালেবানদের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় সেনা কমান্ডার ছিলেন। মার্কিন সরকার ও কাবুলের সঙ্গে আলোচনার বিষয়ে তার সঙ্গে মোল্লা ওমরের মতভেদ ছিল বলে জানা গেছে। মোল্লা ওমর আলোচনার বিরোধিতা করা সত্ত্বেও মানসুর আলোচনার প্রতি সমর্থন জানিয়ে আসছিলেন। তালেবানদের নতুন নেতা এই গোষ্ঠীর কেন্দ্রীয় পরিষদের সদস্যদের মাধ্যমে নির্বাচিত হননি এবং তালেবানদের সব গ্রুপ নতুন নেতাকে মেনে নেয়নি। 


তালেবানদের কাছে নতুন ও যোগ্য নেতা হিসেবে কয়েকজনের নামই শোনা যাচ্ছিল। তাদের একজন হলেন মোল্লা ওমরের ছেলে মোল্লা ইয়াকুব। তাদের পছন্দের আরেক তালিকার শীর্ষে ছিলেন মোল্লা আখতার মোহাম্মাদ মানসুর। তার সঙ্গে পাকিস্তানের খুব ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা রয়েছে। কাতারে তালেবানদের অফিস প্রতিষ্ঠায় তার ভূমিকা ছিল। তালেবানদের পছন্দের আরও এক তালিকার শীর্ষে রয়েছেন মোল্লা তাইয়্যেব আগা। তিনি কাতারে তালেবানদের রাজনৈতিক কার্যালয়ের প্রধান। তালেবানদের কেউ কেউ বলছেন এই গোষ্ঠীকে রক্ষার জন্য রাজনৈতিক সমাধানের পথ ধরতে হবে। আর তাইয়্যেব আগাই এই দায়িত্ব পালনের জন্য যোগ্য। এভাবে এই তিন তালেবান নেতার সম্ভাব্য নেতৃত্ব নিয়ে কোন্দল ছড়িয়ে পড়তে পারে। মোল্লা ওমরের পরিবার এরিমধ্যে মোল্লা মানসুরের হাতে বাইয়াত করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। অন্যদিকে মোল্লা তাইয়্যেব আগাও কাতারে তালেবানদের দপ্তর থেকে পদত্যাগ করেছেন। তালেবানদের শীর্ষস্থানীয় কমান্ডার মানসুর দাদ-আল্লাহ মোল্লা ওমরের ছেলের প্রতি সমর্থন ঘোষণা করেছেন। সম্প্রতি তিনি বলেছেন মোল্লা মানসুরের প্রতি বেশিরভাগ আফগানেরই সমর্থন নেই। দাদল্লাহ বর্তমানে আফগানিস্তানের দক্ষিণাঞ্চলে তালেবান যোদ্ধাদের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, যদি আফগান গোত্রপ্রধান ও আলেমরা আফগান তালেবানের জন্য সবার গ্রহণযোগ্য একজন নেতা নির্বাচন করতে ব্যর্থ হন তাহলে এই গোষ্ঠী কয়েকটি ভাগে ভাগ হয়ে যাবে। তার মতে এরিমধ্যে তালেবানদের মধ্যে মতভেদ বেড়ে গেছে এবং এই গোষ্ঠী কার্যত কয়েক ভাগে বিভক্ত হয়ে গেছে। মানসুর দাদল্লাহ’র ভাই মোল্লা দাদল্লাহ তালেবানদের কমান্ডার ছিলেন। তিনি ২০০৮ সালে হেলমান্দে নিহত হন।


তালেবানদের মধ্যে মতবিরোধের আরেকটি কারণ হল মোল্লা ওমরের মৃত্যু রহস্য। তাদের কেউ কেউ বলছে ওমরকে বিষ দিয়ে মারা হয়েছে। মানসুর দাদল্লাহ মনে করেন ওমর অসুখের কারণে মারা যাননি, বরং তাকে হত্যা করা হয়েছে।

তাইয়্যেব আগা মোল্লা ওমরের মৃত্যুর ব্যাপারে গোপনীয়তার প্রতিবাদেই কাতারস্থ তালেবান দপ্তর থেকে পদত্যাগের কথা ঘোষণা করেছেন। 


যাই হোক মোল্লা আখতার মানসুরের সহকারী হিসেবে মনোনীত হয়েছেন সেরাজউদ্দিন হাক্কানি ও হেইবাতউল্লাহ আখুন্দজাদেহ। পাকিস্তান আশা করছে তালেবানদের অন্যান্য গ্রুপ বা শাখাও এইসব মনোনয়ন মনে নেবে। কিন্তু বিপুল সংখ্যক তালেবান এই পদে সেরাজের মনোনয়নের বিরোধী। 


পাকিস্তান তালেবানের বর্তমান নেতাকে সমর্থন দিয়েছে এবং সব তালেবানকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানিয়েছে। অথচ পাকিস্তানের এই সমর্থনের ফলেই তালেবানদের মধ্যে মত-বিরোধ বাড়ছে।
তালেবানদের নতুন নেতা মোল্লা আখতার মো. মানসুর তার সাম্প্রতিক বাণীতে কাবুলের সঙ্গে শান্তি প্রক্রিয়ার বিরোধিতা করেছেন। পরে অবশ্য তিনি এই শান্তি প্রক্রিয়াকে স্বাগত জানিয়েছেন। এ থেকে বোঝা যায় তিনি তালেবানদের নানা গ্রুপের সমর্থন আদায়ের চেষ্টা করছেন। 


মোল্লা ওমরের মৃত্যুর ঘোষণা দেয়ার সময় বলা হয়েছে তালেবানের হাক্কানি গ্রুপের নেতা জালালউদ্দিন হাক্কানিও নিহত হয়েছে। প্রায় একই সময়ে পাকিস্তানের সন্ত্রাসী গ্রুপ লশকরে জাঙ্গাভির নেতা মালেক ইসহাকেরও নিহত হওয়ার খবর প্রচারিত হয়েছে। এ থেকে মনে করা হচ্ছে পাকিস্তান সরকার চরমপন্থী ও সন্ত্রাসী গ্রুপগুলোকে ভিন্নভাবে নিয়ন্ত্রণ করছে।


প্রশ্ন হল কেন পাকিস্তান মোল্লা ওমরের মৃত্যুর খবর গোপন রেখেছিল? অনেকেই বলছেন, পাক সরকার তালেবান-কাবুল প্রথম দফা আলোচনার ব্যাপারে নাখোশ ছিল। কিংবা শান্তি প্রক্রিয়া গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে উপনীত হওয়া সত্ত্বেও দীর্ঘ দিন ধরে প্রকাশ্যে মোল্লা ওমরকে দেখা যাচ্ছে না বলে তার জীবিত থাকার বিষয়ে সন্দেহ ক্রমেই জোরদার হচ্ছিল। তাই বিষয়টি আর ধামাচাপা দেয়া সম্ভব হচ্ছিল না। আবার কেউ কেউ বলছেন, পাকিস্তান সরকারের দৃষ্টিতে বর্তমান সময়টি ওমরের মৃত্যু সংবাদ প্রচারের জন্য বেশি উপযোগী ছিল। কারণ, তারা এখন তালেবানকে আবারও ঐক্যবদ্ধ ও নিয়ন্ত্রণে রাখার ক্ষমতা অর্জন করেছে। মনে করা হচ্ছে পাক গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই দেশটির বর্তমান সরকারের নতুন নীতির আলোকে যুদ্ধ-বাজ ও মধ্যপন্থী তালেবানসহ সব চরমপন্থী গ্রুপগুলোকে নিয়ন্ত্রণের জন্যই ওমরের মৃত্যু সংবাদ এই সময়ে প্রচার করেছে। পাকিস্তান চীনের সঙ্গে সীমান্ত-বাণিজ্য জোরদার করাসহ বিদেশী পুঁজি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার জন্য নিরাপত্তার বিষয়টিকে গুরুত্ব দিচ্ছে। সম্প্রতি চীন পাকিস্তানের সঙ্গে ৪ হাজার ৬০০ কোটি ডলারের অর্থনৈতিক চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। চীন তার সিনঝিয়াং প্রদেশসহ সীমান্ত অঞ্চলে চরমপন্থীদের তৎপরতাকে সহ্য করতে প্রস্তুত নয়। মার্কিন সরকারও আফগানিস্তানে শান্তি প্রক্রিয়ার অগ্রগতি দেখতে চায়। আর তা পাকিস্তানের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করতে চায়। তাই পাক সরকারই তালেবানের নেতৃত্বে পরিবর্তন আনতে চাচ্ছিল বলে মনে করা হচ্ছে। কারণ, মোল্লা ওমর ছিলেন যুদ্ধবাজ যদিও তিনি এক পর্যায়ে আমেরিকার সঙ্গে আলোচনায় বসতে বাধ্য হয়েছিলেন। তালেবানদের পরিস্থিতি স্পষ্ট নয়। তবে মনে হচ্ছে কাবুলের সঙ্গে তালেবানের শান্তি আলোচনা অব্যাহত থাকুক তা এখনও মার্কিন ও পাক সরকারের কাম্য।


পাকিস্তানের সঙ্গে মোল্লা মানসুরের সুসম্পর্ক থাকায় তালেবানের পাকিস্তানিকরণ জোরদার হবে। পাকিস্তান এ আলোচনার মাধ্যমে তার কর্তৃত্ব বা প্রভাব বজায় রাখতে চায়। কিন্তু কাবুল সরকার আলোচনা স্থগিত রেখে ও পাক সরকারের কাছে প্রতিবাদ জানিয়ে এটাই বুঝিয়ে দিয়েছে যে ইসলামাবাদের প্রতি তার অবিশ্বাস রয়েছে। পাক সরকার আফগানিস্তানের ব্যাপারে দ্বিমুখী নীতি অনুসরণ করছে বলে অভিযোগ রয়েছে। মনে করা হচ্ছে সময় কেনার জন্যই পাকিস্তান এ সময়ে মোল্লা ওমরের মৃত্যুর খবর প্রচার করেছে যাতে তালেবান-কাবুল ভবিষ্যৎ আলোচনায় পাকিস্তানের নানা স্বার্থ রক্ষার পথ সুগম হয়। হয়ত এ জন্যই আফগান শান্তি আলোচনায় পাকিস্তানকে শরিক করতে সচেষ্ট আফগান প্রেসিডেন্ট আশরাফ গনি বলেছেন, ইসলামাবাদ কাবুলের সঙ্গে এক অঘোষিত যুদ্ধে লিপ্ত রয়েছে। #

 

রেডিও তেহরান/এএইচ

 

 

 

মন্তব্য লিখুন


Security code
রিফ্রেস দিন