এই ওয়েবসাইটে আর আপডেট হবে না। আমাদের নতুন সাইট Parstoday Bangla
মঙ্গলবার, 18 আগস্ট 2015 17:56

'চরমপন্থিরা বিশ্বকে পণবন্দি করার জোর চেষ্টা চালাচ্ছে'

সম্প্রতি সেনেগালের রাজধানী ডাকারে 'ইসলাম শান্তির ধর্ম' শীর্ষক একটি আন্তর্জাতিক সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়েছে। এই প্রবন্ধে ওই সেমিনার অনুষ্ঠানের উদ্দেশ্য ও পটভূমিসহ এর গুরুত্ব নিয়ে আলোচনা করব।  

 

সেনেগালের রাজধানী ডাকারে 'ইসলাম শান্তির ধর্ম' শীর্ষক আন্তর্জাতিক সেমিনার অনুষ্ঠানের আয়োজক ছিল আনসারউদ্দিন সোসাইটি নামের একটি ইসলামী সংস্থা। সংস্থাটির জন্ম হয়েছিল গত চল্লিশের দশকে সেনেগালে। ধীরে ধীরে এর কার্যক্রম নাইজেরিয়াসহ আরও অনেক আফ্রিকান দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। 


নাইজেরিয়া ও তার আশপাশের কয়েকটি দেশ বর্তমানে বোকো হারাম নামের একটি তাকফিরি-ওয়াহাবি গোষ্ঠীর নৃশংস সন্ত্রাসী তৎপরতার শিকার হয়েছে। এই গোষ্ঠী এখন গোটা পশ্চিম আফ্রিকার নিরাপত্তার জন্য এক বড় হুমকিতে পরিণত হয়েছে। বোকো হারামের নৃশংসতাগুলো ইসলামের নামে ঘটানো হচ্ছে বলে এ অঞ্চলে ইসলামের সুনাম ক্ষুণ্ণ হচ্ছে। তাই ইসলাম যে চরমপন্থা ও সহিংসতার ধর্ম নয় তা তুলে ধরার জন্য বিভিন্ন ইসলামী সংস্থার পক্ষ থেকে এ ধরনের একটি আন্তর্জাতিক সমাবেশের আয়োজন করা জরুরি হয়ে পড়েছিল। 


সেনেগালের মোট জনসংখ্যা এক কোটি ত্রিশ লাখ। দেশটির ৯৫ শতাংশ জনগণ মুসলমান। দেশটি এখনও উগ্রবাদ ও সহিংসতার থাবা থেকে মুক্ত রয়েছে। দেশটির ইসলামী সুশীল সমাজ ইসলামের শান্তিকামী ও ন্যায়বিচারকামী শিক্ষা তুলে ধরছে। সেনেগালে 'ইসলাম শান্তির ধর্ম' শীর্ষক আন্তর্জাতিক সেমিনার অনুষ্ঠানে সহায়তা দিয়েছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট ম্যাকি স্যাল।


সেনেগালের প্রেসিডেন্ট ম্যাকি স্যাল 'ইসলাম শান্তির ধর্ম' শীর্ষক আন্তর্জাতিক সেমিনারের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ইসলামকে শান্তি ও সহিষ্ণুতার ধর্ম হিসেবে উল্লেখ করেন এবং বিশ্বকে পণবন্দি করতে সক্রিয় চরমপন্থি তৎপরতার নিন্দা জানান। তিনি বলেছেন, 'প্রাণঘাতী সহিংসতার হৈ-চৈ বিশ্বজুড়ে শোনা যাচ্ছে এবং যন্ত্রণা ও হত্যার বীজ সর্বত্র ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে। চরমপন্থিরা সব দিক থেকে বিশ্বকে পণবন্দি করার জন্য জোর চেষ্টা চালাচ্ছে। প্রকৃত যে ইসলামের সঙ্গে আমাদের বন্ধন রয়েছে তা সমঝোতা বা শান্তি ও সহিষ্ণুতার ধর্ম।'


বিশটি দেশের প্রায় ৫০০ গবেষক, ধর্মীয় নেতা, সরকারি কর্মকর্তা ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধি 'ইসলাম শান্তির ধর্ম' শীর্ষক আন্তর্জাতিক সেমিনারে অংশ নিয়েছেন। তারা তিন দিনের এই সেমিনারে শান্তি, সমঝোতা ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান সম্পর্কে ইসলামের নানা শিক্ষা তুলে ধরেছেন।


সম্ভবত ইসলামের ইতিহাসের আর কোনো পর্যায়ে এত ব্যাপক মাত্রায় ও বিশ্বব্যাপী ইসলামের নামে চরমপন্থি ও নৃশংস তৎপরতার মাধ্যমে এই মহান ধর্মের চেহারাকে এতটা কলঙ্কিত করা হয়নি। মুসলমানরা চরম ঔপনিবেশিক শোষণের যুগেও কখনও মুসলিম কোনো দেশে বোকো-হারাম ও আইএসআইএল-এর মত এমন নৃশংস তৎপরতা চালায়নি।  


অন্যদিকে ইউরোপীয় উপনিবেশবাদীরা আফ্রিকা ও ল্যাটিন আমেরিকায় উপনিবেশ ও শোষণ-কার্যক্রম চালাতে গিয়ে আইএসআইএল এবং বোকো হারামের চেয়েও বেশি নৃশংস বা জঘন্য অপরাধ করেছে। তারা আফ্রিকার লাখ লাখ মানুষকে দাসে পরিণত করেছে এবং পূর্ব-এশিয়া, আফ্রিকা ও ল্যাটিন আমেরিকার লাখ লাখ মানুষকে হত্যা করেছে। পশ্চিমা সরকারগুলো মানব-দরদি বলে দাবি করা সত্ত্বেও এখনও গত কয়েক শতকের এইসব মহাঅপরাধের জন্য দুঃখ প্রকাশ করতে প্রস্তুত নয়। বরং ফ্রান্সের মত কোনো কোনো উপনিবেশকামী সরকার আলজেরিয়ার জনগণের ওপর ফরাসিদের গণহত্যা ও তাদের ওপর ঔপনিবেশিক শোষণের ঘটনাকে ফ্রান্সের জন্য গর্ব বলে উল্লেখ করেছে স্কুল-পাঠ্য বইয়ে। কিন্তু কেউই এশিয়া, আফ্রিকা ও ল্যাটিন আমেরিকায় পশ্চিমাদের এইসব নৃশংসতাকে খ্রিস্ট ধর্মের সঙ্গে যুক্ত করেনি। এ থেকেই বোঝা যায় ইসলামের শান্তিকামী ও ন্যায়বিচারকামী চেহারাকে ক্ষুণ্ণ করার জন্য আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবেই গড়ে তোলা হয়েছে তাকফিরি-ওয়াহাবি নানা গোষ্ঠী।


পাশ্চাত্যে ইসলাম-বিদ্বেষের নানা শেকড় গভীরভাবে প্রোথিত রয়েছে। ১১ সেপ্টেম্বরের হামলার ঘটনার আগেই ইসলাম-বিদ্বেষী নানা মহল ইসলাম সম্পর্কে আতঙ্ক তৈরির জন্য ব্যাপক তৎপরতা শুরু করে। আর ওই হামলার পর তারা এই তৎপরতা তীব্রতর করে। পাশ্চাত্যের বেশিরভাগ দেশেই মুসলমান বলতেই তারা সন্ত্রাসীদের বোঝাচ্ছে! এমনকি সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডাবলিও বুশ ও ইতালির প্রধানমন্ত্রী বার্লেসকুনি ওই হামলার পর পরই ক্রুসেডের যুদ্ধের কথা বলেছিলেন। পাশ্চাত্য এটা দেখাতে চেয়েছে যে ইসলাম ও মুসলমানরাই এ ঘটনার জন্য দায়ি। অথচ প্রতিটি মুসলিম দেশ ১১ সেপ্টেম্বরের সন্ত্রাসী হামলার নিন্দা জানিয়েছিল।


পাশ্চাত্য ইসলাম সম্পর্কে তাদের এইসব অবাস্তব ধারণা ও মিথ্যাচারকে বাস্তব রূপ দেয়ার জন্যই গড়ে তুলেছে আলকায়দা ও পরবর্তীতে আইএসআইএল এবং বোকোহারামসহ নানা তাকফিরি গোষ্ঠী। এইসব গোষ্ঠী যেসব নৃশংস ও লোমহর্ষক অপরাধ চালাচ্ছে তা দেখিয়ে পশ্চিমাদের বলা হচ্ছে যে, দেখো ইসলামের শিক্ষা মানুষকে কত নৃশংস ও অমানবিক করতে পারে!!


বেশিরভাগ মুসলিম মুসলিম দেশে দারিদ্র ও অসচেতনতা প্রকট থাকায় ওয়াহাবি-তাকফিরি সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলো এক শ্রেণীর সরলমনা যুবকদের আকৃষ্ট করতে সক্ষম হচ্ছে। এমনকি পাশ্চাত্যের এক শ্রেণীর যুবক-যুবতিও আকৃষ্ট হচ্ছে এইসব গোষ্ঠীর প্রতি। আর এইসব গোষ্ঠীর তৎপরতা পশ্চিমাদেরই স্বার্থ রক্ষা করছে। কারণ, এর মাধ্যমে একদিকে যেমন ইসলাম সম্পর্কে আতঙ্ক ছড়ানো যাচ্ছে, তেমনি এইসব গোষ্ঠীকে দিয়ে নানা রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থও হাসিল করতে পারছে পাশ্চাত্য। কিন্তু পাশ্চাত্যের মদদপুষ্ট এই দানব এখন তাদের জন্যই হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। পাশ্চাত্য যদি আফগানিস্তান, ইরাক ও সিরিয়ার মত দেশগুলোতে সেই প্রথম থেকেই আলকায়দা গোষ্ঠী গড়ে তোলার ক্ষেত্রে ভূমিকা না রাখত তাহলে বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলেও বোকো হারাম ও আশশাবাবের মত একই মতাদর্শে বিশ্বাসী সন্ত্রাসী গোষ্ঠী গড়ে উঠতো না। এইসব গোষ্ঠী এখন বহু দেশের স্বাধীনতা ও ভৌগলিক অখণ্ডতার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাকফিরি-ওয়াহাবি সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলো অসংযুক্ত নেটওয়ার্কের আওতায় পরস্পরকে সহায়তা করছে ও পরস্পরকে আদর্শ হিসেবে অনুসরণ করছে।


যাই হোক, আজ ইসলামের ন্যায়কামী, মানবতাবাদী ও শান্তিকামী শিক্ষার বিরুদ্ধে নানা ষড়যন্ত্র বানচালের জন্য মুসলিম চিন্তাবিদ ও আলেম সমাজকেই সর্বাগ্রে এগিয়ে আসতে হবে। তাকফিরি-ওয়াহাবিদের মোকাবেলার জন্য মুসলমান ও অমুসলমানদের মধ্যে ইসলামের প্রকৃত শিক্ষা তুলে ধরতে হবে। বিশেষ করে যুব সমাজের কাছে এটা তুলে ধরতে হবে যে আলকায়দা, আইএসআইএল ও বোকো হারাম যা করছে এসবের সঙ্গে ইসলামের দূরতম সম্পর্কও নেই। বরং ইসলাম এ ধরনের অযৌক্তিক, অসার ও ইসলাম-বিদ্বেষী ভিত্তিহীন চিন্তাধারাকে মোকাবেলার আহ্বান জানায়। সেনেগালের রাজধানী ডাকারে অনুষ্ঠিত 'ইসলাম শান্তির ধর্ম' শীর্ষক আন্তর্জাতিক সেমিনারের মত নানা আলোচনা সভা অনুষ্ঠানের মহতী উদ্যোগ নেয়া হলে এবং ইসলামের বিরুদ্ধে তাকফিরি-ওয়াহাবি ও পশ্চিমাদের ধ্বংসাত্মক ষড়যন্ত্র মোকাবেলার জন্য দীর্ঘমেয়াদি কৌশল প্রণয়ন করা হলে তা প্রকৃত ইসলামকে তুলে ধরার জন্য অত্যন্ত কার্যকর পদক্ষেপ হতে পারে। # 

 

রেডিও তেহরান

মন্তব্য লিখুন


Security code
রিফ্রেস দিন