এই ওয়েবসাইটে আর আপডেট হবে না। আমাদের নতুন সাইট Parstoday Bangla
শনিবার, 05 সেপ্টেম্বর 2015 15:41

ইরাকের নানা সংকট: সমাধান কত দূর?

ইরাকের নানা সংকট: সমাধান কত দূর?

ইরাকে রাজনৈতিক ও নিরাপত্তার সংকটসহ নানা সংকটের জটিলতা ক্রমেই বাড়ছে। কাগজে-কলমে একটি অখণ্ড দেশ হওয়া সত্ত্বেও তেল-সমৃদ্ধ এই দেশটিকে এখন কার্যত শিয়া, সুন্নি ও কুর্দি জনগোষ্ঠী অধ্যুষিত তিন অঞ্চলে বিভক্ত করা হয়েছে। ২০১১ সালে পশ্চিম এশিয়া ও উত্তর আফ্রিকায় দেখা দেয় ইসলামী জাগরণ। ক্ষমতাচ্যুত হয় তিউনিশিয়া, লিবিয়া ও মিশরের স্বৈরশাসক।  

 

কিন্তু এই জাগরণের গতিপথকে বিচ্যুত করার চেষ্টা চালানো হয়েছে সাম্রাজ্যবাদী শক্তি ও তাদের স্থানীয় অনুচরদের মাধ্যমে। তারা সফল হয়েছে মিশরে এবং বিচ্যুতির এই প্রক্রিয়া আঘাত হেনেছে সিরিয়া ও ইরাকেও। ইয়েমেন ও বাহরাইনের জনগণকেও শাস্তি দেয়া হচ্ছে ইসলামী জাগরণে অংশ নেয়ার অপরাধে। ২০০৩ সালে ইরাকে মার্কিন হামলার পর থেকে দেশটিতে শুরু হয় সন্ত্রাসী নানা গোষ্ঠীর তৎপরতা। কিন্তু সিরিয়ায় বিদেশী শক্তিগুলোর হস্তক্ষেপ ও সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর প্রতি তাদের সর্বাত্মক সমর্থনের ফলে ইরাকেও হাজির হয় এইসব গোষ্ঠী এবং এমনকি দেশটির এক বিশাল অংশ দখল করে বসে সন্ত্রাসী ওয়াহাবি-তাকফিরি গোষ্ঠী আইএসআইএল বা দায়েশ। 

 

এ অবস্থায় ইরাক সরকারকে ব্যস্ত থাকতে হচ্ছে নিরাপত্তা নিয়ে এবং সামাজিক উন্নয়নের দিকে খুব একটা নজর দিতে পারছে না এই সরকার। ফলে বাগদাদ সরকারের বিরুদ্ধে বিষোদগারের সুযোগ পাচ্ছে বিরোধী দলগুলো। এভাবে দেশটিতে বাড়ছে রাজনৈতিক সংকট। সন্ত্রাসী গোষ্ঠী আইএসআইএল বা দায়েশ ২০১৪ সালের জুন মাসে দখল করে ইরাকের মসুলসহ এক বিশাল অঞ্চল। আবুবকর বাগদাদি চারটি কৌশল খাটিয়ে আলকায়দা ও নিষিদ্ধ বাথপার্টিসহ উগ্র গোষ্ঠীগুলোকে ঐক্যবদ্ধ করে। এ চারটি কৌশল হচ্ছে: ইরাকে আলকায়দার নেতাদের স্থানীয়করণ, সাবেক ইরাকি সেনাদের আকৃষ্ট করা, ইরাক ও বিশ্বের নানা অঞ্চল থেকে বিদেশী যুবকদেরকে নিজ সেনাদলে আকৃষ্ট করা এবং গণমাধ্যমের সর্বোচ্চ সহায়তা নিয়ে সন্ত্রাসী ও নৃশংস অভিযানের ব্যাপক বিস্তার। 


ইরাকের রয়েছে মোট ১৮টি প্রদেশ। এর মধ্যে দেশটির দক্ষিণাঞ্চলে রয়েছে শিয়া মুসলমান অধ্যুষিত নয়টি প্রদেশ। এই নয়টি প্রদেশসহ দেশটির উত্তরাঞ্চলে অবস্থিত কুর্দি অধ্যুষিত তিনটি প্রদেশে শান্তি ও নিরাপত্তা বিরাজ করছে। তিন প্রদেশ বাগদাদ, দিয়ালা ও কিরকুকে মাঝেমধ্যেই দেখা দিচ্ছে নিরাপত্তাহীনতা। আর সালাহউদ্দিন, আল আনবার ও নেইনাভা ব্যাপক নিরাপত্তাহীনতার শিকার হয়েছে। আইএসআইএল-এর উপস্থিতি সবচেয়ে বেশি রয়েছে এই তিন প্রদেশেই।


কয়েক মাস আগে সালাহউদ্দিন প্রদেশ সামরিক দিক থেকে ইরাক সরকারের নিয়ন্ত্রণে চলে আসলেও দায়েশ বা আইএসআইএল সেখানে আত্মঘাতী বোমা-হামলাসহ নানা ধরনের চোরাগুপ্তা হামলা চালিয়ে পরাজয়ের ক্ষতি পুষিয়ে নেয়ার চেষ্টা করছে। ইরাকের সবচেয়ে বড় প্রদেশ হল আল-আনবার। দেশটির প্রায় এক-তৃতীয়াংশ অঞ্চল জুড়ে বিস্তৃত এই প্রদেশেই সবচেয়ে বেশি সক্রিয় রয়েছে দায়েশ। আনবার প্রদেশের কেন্দ্রীয় শহর আররামাদি এবং এর আশপাশের কিছু গ্রাম ও সিরিয়া-সংলগ্ন উত্তরাঞ্চল দখল করে রেখেছে দায়েশ। এ ছাড়াও নেইনাভা প্রদেশ ও তার কেন্দ্রীয় শহর মসুলও পুরোপুরি আইএসআইএল বা দায়েশের দখলে রয়েছে। 


ইরাকের কেন্দ্রীয় শক্তি ও রাজনৈতিক ঐক্যের গুরুত্ব ক্রমেই ম্লান হয়ে পড়ছে দেশটির শিয়া, সুন্নি ও কুর্দি জনগণের মধ্যে। বিশেষ করে কুর্দি ও সুন্নিরা সাম্প্রদায়িক চিন্তাকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। ২০০৩ সালের আগ পর্যন্ত ইরাকের শাসন-ক্ষমতা ছিল সুন্নিদের হাতে। তারা নতুন পরিস্থিতিকে তাদের জন্য ভালো মনে করছে না। বরং ২০০৩ সালের আগের অবস্থাই তারা ফিরে পেতে চায়। কুর্দিরা ২০০৩ সালে সাদ্দামের শোষণ ও জুলুমের নাগ-পাশ থেকে মুক্তি পায় এবং ২০০৫ সালে ইরাকি সংবিধানে কুর্দিস্তানের জন্য স্বায়ত্তশাসনকে স্বীকৃতি দেয়া হয়। 


ইরাকি কুর্দিস্তানের রয়েছে স্থানীয় সরকার ও সংসদ এবং নিজস্ব সশস্ত্র বাহিনী। এই সংসদ কুর্দিস্তানের নিজস্ব সংবিধানও অনুমোদন করেছে ২০০৯ সালে। কিন্তু এ বিষয়ে এখনও সেখানে দেয়া হয়নি গণভোট। ইরাকের কুর্দিস্তান পুরোপুরি স্বাধীন হতে চায়। তবে কুর্দিরা আপাতত এই পরিকল্পনাকে বাস্তবায়নের চেয়েও বেশি ব্যবহার করছে বাগদাদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক চাপের হাতিয়ার হিসেবে। বাগদাদের সঙ্গে ইরাকি কুর্দিস্তানের বিরোধ রয়েছে চারটি ক্ষেত্রে। এগুলো হল: তেলের খনি আবিষ্কার ও তেল রপ্তানি, বাজেট বরাদ্দ, পিশমার্গা বা কুর্দি সশস্ত্র বাহিনী এবং কিরকুকসহ নানা অঞ্চলের মালিকানাগত বিরোধ। কুর্দিস্তান পররাষ্ট্র নীতির ক্ষেত্রে এমন অনেক নীতি গ্রহণ করছে যা বাগদাদের পররাষ্ট্র নীতি ও সংবিধানের বিরোধী। যেমন, কুর্দিস্তানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ বারাজানি ক্ষমতাসীন হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত চার বার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সফর করেছেন।  


ইরাকে রাজনৈতিক ঐক্য না থাকায় ২০১০ সালে দেশটিতে সরকার গঠন নিয়ে সংকট দেখা দিয়েছিল এবং সরকার গঠন করতে সে বছর নয় মাস সময় লেগেছিল।
ইরাকে সাম্প্রদায়িক সংকীর্ণ চিন্তা জোরদার হওয়ায় সরকার হয়ে পড়েছে দুর্বল ও ভঙ্গুর। 


ইরাকের কেন্দ্রীয় সরকার এখন নিরাপত্তা এবং রাষ্ট্রের অখণ্ডতা রক্ষা নিয়েই ব্যস্ত। ফলে সামাজিক উন্নয়নের দিকে নজর দেয়ার সুযোগই পাচ্ছে না এই সরকার। ফলে নানা অঞ্চলে বিশেষ করে শিয়া মুসলমান অধ্যুষিত অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে গণ-অসন্তোষ। পানি ও বিদ্যুতের অভাবে ভুগছে এ অঞ্চলের জনগণ। আর তীব্র গরম আবহাওয়ার যন্ত্রণা তো আছেই। ২০০৩ সালে ইরাকে হামলার সময় মার্কিন সেনারা দেশটির অবকাঠামো ধ্বংস করে দেয়ায় এইসব সমস্যা দেখা দিয়েছে। কিন্তু ইরাক সরকারের বিরোধীরা এইসব সমস্যার জন্য বাগদাদের বর্তমান সরকারকেই দায়ী করছে এবং এর সঙ্গে যুক্ত করছে সাম্প্রদায়িকতার সম্পর্ক। ইরাকে মন্ত্রিত্বের পদগুলো ভাগাভাগি করা হয়েছে নানা দলের মধ্যে। তারা নিজ নিজ সমর্থকদের স্বার্থ রক্ষাকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়ায় প্রশাসনে ও অফিস বেড়ে গেছে দুর্নীতি। ইরাকের সশস্ত্র বাহিনীতেও রয়েছে ব্যাপক দুর্নীতি। অফিসাররা খাদ্য ও গোলা-বারুদের অর্থ আত্মসাৎ করছে। হাজার হাজার সেনা দায়েশ বা আইএসআইএল-এর সঙ্গে যুদ্ধের ময়দানে সশরীরে উপস্থিত হচ্ছে না।


এ অবস্থায় ইরাকের প্রধানমন্ত্রী হায়দার আলএবাদি গ্র্যান্ড আয়াতুল্লাহ সিস্তানির পরামর্শের আলোকে সংস্কারের প্যাকেজ প্রস্তাব তুলে ধরেছেন। তার এই প্রস্তাবে মন্ত্রীর সংখ্যা ৩৩ থেকে কমিয়ে ২২-এ এবং তিন উপপ্রধানমন্ত্রী ও তিন ভাইস প্রেসিডেন্টের পদ বিলুপ্তির কথা বলা হয়েছে। এ প্রস্তাব নিয়ে বিতর্ক চলছে। প্রস্তাবটির বিরোধীরা সংসদ বাতিলের দাবি করছেন। এ নিয়ে শিয়া মুসলমান অধ্যুষিত ইরাকি প্রদেশগুলোতে বিক্ষোভ মিছিল হয়েছে। আর এ পর্যায়ে শিয়াদের মধ্যেই বিরোধ দেখা দিয়েছে বলে তুলে ধরার চেষ্টা চলছে।

 

ইরাকের বর্তমান পরিস্থিতি দেশটির নিরাপত্তা ও বিচ্ছিন্নতার সংকটসহ নানা সংকট জোরদার করতে পারে। মার্কিন সরকার এখন প্রকাশ্যেই ইরাককে তিন টুকরো করার কথা বলছে। কিন্তু শিয়া-সুন্নি ও কুর্দি সম্প্রদায়ের জন্য ইরাককে তিন ভাগ করলেও কি দেশটির সংকটগুলোর সমাধান হবে? ইরাকের বিভিন্ন অঞ্চলে শিয়া, কুর্দি ও সুন্নি জনসংখ্যা মিশ্রিত হয়ে আছে। যেমন, কোনো কোনো প্রদেশের জনসংখ্যার ৬০ শতাংশ শিয়া ও বাকিরা সুন্নি কিংবা কোথাও ঠিক তার উল্টো। বিভিন্ন প্রদেশের সীমানা নিয়েও রয়েছে বিরোধ। আর দেশটিকে ভাগ করতে গেলে নানা সম্পদ ও পানির উৎসকে ভাগ করা নিয়েও দেখা দেবে বিরোধ। এ ছাড়াও সুন্নি অধ্যুষিত আল-আনবার, নেইনাভা ও সালাহউদ্দিন প্রদেশের শাসনভার নিয়ে সুন্নি নেতাদের মধ্যেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা রয়েছে যা সুন্নিদের মধ্যেই যুদ্ধ বাধিয়ে দিতে পারে। 


ইরাকের চলমান সংকটের কারণে গত এক বছরে দেশটির ভেতরেই শরণার্থী হয়েছে ২৯ লাখ ইরাকি। জাতিসংঘের রিপোর্ট অনুযায়ী ২০১৪ সালের জানুয়ারি থেকে চলতি বছরের এপ্রিল মাস পর্যন্ত ৪৪ হাজার ব্যক্তি ক্ষতিগ্রস্ত ও ১৫ হাজার নিহত হয়েছে।


ইরাকের সাম্প্রতিক সংকটের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৩২ লাখ শিশু। শিশু শরণার্থীদের প্রায় ৭০ শতাংশ পুরো একটি শিক্ষা বছর থেকে বঞ্চিত হয়েছে। প্রায় ৮৮ লাখ ইরাকির জন্য ত্রাণ-সহায়তা দরকার। আর ৪৪ লাখ ইরাকির জন্য খাবার দরকার। ইরাকের সংকটগুলো খুব শিগগিরই সমাধান হবে বলে আশা করা যায় না। আইএসআইএল বা দায়েশ দুর্বল হয়ে পড়লেও তাদের হুমকি পুরোপুরি দূর করতে কয়েক বছর সময় লেগে যাবে। ইরাকে সাম্প্রদায়িক বিভেদ আসলে ব্রিটিশ উপনিবেশবাদেরই উত্তরাধিকার যা দয়েশ দমনের সংগ্রামে বাধা সৃষ্টি করেছে। ইরাকের প্রধানমন্ত্রী হায়দার আলএবাদির সংস্কার প্রস্তাবে কেন্দ্রীয় ক্ষমতার সাম্প্রদায়িক কাঠামো ভেঙ্গে দেয়ার এবং নানা পদ সাম্প্রদায়িক কোটার ভিত্তিতে বরাদ্দ করার কথা এসেছে। কিন্তু এই প্রস্তাব যখন তোলা হল তখন প্রভাবশালী অনেক নেতা ও দল সামাজিক উন্নয়নের দাবিতে জনগণকে মাঠে নামিয়ে এই প্রস্তাব বানচালের চেষ্টা করছেন। এই অবস্থা দেশটির নিরাপত্তা ও ভবিষ্যতের জন্য খুবই বিপজ্জনক। # 

 

 রেডিও তেহরান/এএইচ

মন্তব্য লিখুন


Security code
রিফ্রেস দিন