এই ওয়েবসাইটে আর আপডেট হবে না। আমাদের নতুন সাইট Parstoday Bangla
শনিবার, 12 সেপ্টেম্বর 2015 15:15

রহস্যময় 'নাইন-এলিভেন' ও এর পরবর্তী মার্কিন নীতির ধ্বংসাত্মক প্রভাব

১১ সেপ্টেম্বর হচ্ছে এমন এক দিন যে দিনের কিছু ঘটনাকে অজুহাত বানিয়ে পাশ্চাত্য যা খুশি তা করতে পারে। এ হচ্ছে এমন এক দিন যেদিনে পাশ্চাত্য যে কোনো দেশে হামলা চালাতে পারে। এই দিনে ব্যর্থ হয়ে যায় পদার্থ বিদ্যা, রসায়ন বিদ্যা ও গণিতের সমস্ত সূত্র। এ দিন সংক্রান্ত মার্কিন সরকারের দাবিকে বিশ্বাস করলে বিশ্বাস করতে হবে গাঁজাখুরি যে কোনো গল্প! তাদের আষাঢ়ে গল্পটি হল: এই দিনে ১৯ জন আরব আফগানিস্তানের একটি গুহায় থেকে পরাজিত করেছিল বিশ্বের সবচেয়ে উন্নত সামরিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে! তাও আবার একই দিনে চার বার! এ দিনে নিউইয়র্কের তিনটি বিশাল ভবন ধ্বসে পড়েছিল তাসের ঘরের মত অবাধে! ভবনগুলোর লোহার নানা কাঠামো গলে গিয়েছিল কথিত বিমানের জ্বালানীর তাপে! দু'টি বিমান আঘাত হানে দু'টি ভবনে। ফলে ধ্বসে পড়ে তিনটি ভবন! রূপকথার গল্পের মতই সব ছিনতাইকারী এইসব হামলার সময় বিমানেই নাকি ছিল যদিও তাদের নাম ছিল না যাত্রীদের তালিকায়! আত্মঘাতী হামলায় জড়িত সেইসব ছিনতাইকারীদের অন্তত ৫ জন নাকি আজো বেঁচে আছে ভৌতিক প্রক্রিয়ায় এবং তাদের সাক্ষাতকারও নিয়েছে বিবিসি। বিশ্বের সবচেয়ে সুরক্ষিত স্থান হিসেবে বিবেচিত মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর বা পেন্টাগনে আঘাত হেনেছিল একটি বিমান; অথচ ওই বিমানের কোনো ভিডিও-চিত্র বা ছবি নেই! বিমানের কোনো ধ্বংসাবশেষও পাওয়া যায়নি! তাহলে হয়তো কোনো দানব বা দৈত্য বিমানটিকে খেয়ে ফেলেছে! ওই বিমানগুলো থেকে মোবাইলে ফোন করা সম্ভব হয়েছিল যা এক অবিশ্বাস্য প্রযুক্তিগত উন্নতি! আর এ বিষয়েও মার্কিন সরকার কোনো কথা বলছেন না যে বিশ্ব বাণিজ্য কেন্দ্রের মালিক সন্ত্রাসী হামলা ঘটার এক বছর আগেই কিভাবে সন্ত্রাসী হামলার ক্ষতিপূরণ বাবদ বীমার দ্বিগুণ অর্থ আদায় করেছিলেন? 

 

২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের রহস্যজনক ঘটনার ১৪ তম বার্ষিকী উদযাপন করেছে মার্কিন জনগণ। ওই রহস্যময় ঘটনার বার্ষিকী তারা এমন সময় উদযাপন করল যখন ইরাক, সিরিয়া, ইয়েমেন ও আফগানিস্তানের লাখ লাখ বেসামরিক ও নিরপরাধ মানুষকে ১১ সেপ্টেম্বর-উত্তর মার্কিন নীতির কারণে জীবন দিতে হয়েছে এবং এখনও দিতে হচ্ছে। নাইন-এলিভেনকে অজুহাত করে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডাবলিও বুশ বিশ্বব্যাপী সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে কথিত ক্রুসেড ঘোষণা করেছিলেন। কিন্তু বাস্তবে আজ মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর-আফ্রিকাসহ বিশ্বের এক বিশাল অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে মার্কিন-মদদপুষ্ট সন্ত্রাস। মার্কিন নীতির প্রতিক্রিয়ায় গড়ে উঠেছে বহু সন্ত্রাসী ও চরমপন্থি জঙ্গি গোষ্ঠী। ফলে গোটা বিশ্বের নিরাপত্তাই আজ বিপন্ন হয়েছে। ১১ সেপ্টেম্বরের ঘটনায় নিহত হয়েছিল ২ হাজার ৯৭৭ জন মার্কিন নাগরিক। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যে প্রায় প্রতি সপ্তায় মারা যাচ্ছে শতাধিক মুসলমান।


মার্কিন সরকার অতীতেও একাধিকবার নিজেকে কল্পিত শত্রুর কৃত্রিম হামলার বা সাজানো হামলার শিকার করে ভিন দেশে হামলা চালিয়েছে। নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠার নামে মার্কিন সরকার যত খুশি নিজের নিরাপত্তা জোরদার করুক তাতে কিছু আসে যায় না অন্য দেশের। কিন্তু ১১ সেপ্টেম্বরের ঘটনার পর থেকে মার্কিন সরকারের নানা নীতির কারণে সারা বিশ্বে ও বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের কোটি কোটি মানুষের জীবন ও সম্পদ হয়েছে বিপন্ন। রহস্যজনক ওই ঘটনার পর থেকে মার্কিন ও পশ্চিমা গণমাধ্যমগুলো ইসলাম এবং মুসলমানদেরকে সন্ত্রাসবাদ ও সহিংসতার সমার্থক হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছে। ফলে পাশ্চাত্যের বেশিরভাগ মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ছে শান্তির ধর্ম ইসলাম সম্পর্কে নানা আতঙ্ক ও ভুল ধারণা। অথচ বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.) এত বেশি দয়ালু ও মানবপ্রেমিক ছিলেন যে তাঁর তৎকালীন চরম শত্রুরাও তা উল্লেখ করতে দ্বিধা বোধ করেনি।

 

আসলে আফগানিস্তান ও ইরাকে হামলা চালানোর পরিবেশ সৃষ্টির জন্যই ইসলাম ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে হিংস্রতার অপবাদ প্রচারের ব্যবস্থা করেছিল নাইন-এলিভেনের ঘটনা-পরবর্তী আবেগের অপব্যবহারকারী মার্কিন সরকার। তাই ১১ সেপ্টেম্বরের ঘটনার ব্যাপারে মার্কিন সরকারি ভাষ্যকে খুব কম বিশেষজ্ঞই বিশ্বাস করছেন। বরং তাদের ধারনা ইরাক ও আফগানিস্তানে মার্কিন হামলা ছিল একটি সুপরিকল্পিত হামলা এবং নাইন এলিভেনের ঘটনার বহু আগেই এইসব হামলার চক্রান্ত পাকাপোক্ত করা হয়েছিল। নানা সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন নয়-১১'র ঘটনায় মার্কিন নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সংস্থার ভূমিকা রয়েছে। এমনকি মার্কিন সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী আলকায়দাকেও যদি ওই হামলার ঘটক বলে ধরা হয় তাহলেও মার্কিন নেতৃবৃন্দ তার দায় এড়াতে পারেন না। কারণ, আলকায়দাকে জন্ম দেয়া ও শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে মার্কিন এবং পাক গোয়েন্দা সংস্থার ভূমিকার কথাও সবাই জানেন। একই কথা পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের তালেবানের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। ন্যায়বিচারপন্থী ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপোষহীন ইরানের ইসলামী বিপ্লব বিশ্বের মজলুম জাতিগুলোর জন্য যেন আদর্শ না হয়ে ওঠে সে জন্য এ ধরনের চরমপন্থি গোষ্ঠী গড়ে তোলা সাম্রাজ্যবাদী পাশ্চাত্যের জন্য অপরিহার্য হয়ে পড়েছিল। ইসলামের শান্তিকামী চেহারা ঢাকা দেয়াও ছিল এর অন্যতম উদ্দেশ্য। পাকিস্তান ছাড়াও সাম্রাজ্যবাদী মার্কিন সরকার ও ব্রিটেনের এইসব সুদূরপ্রসারী প্রকল্পে সহায়তা দিয়েছে সৌদি আরবসহ কয়েকটি আরব রাজতান্ত্রিক সরকার।

 

এটা বিশ্বাস করা যায় না যে ইরাকের সাদ্দাম রাতারাতি মার্কিন সরকারের শত্রুতে পরিণত হয়েছিল। কারণ, ইরানের বিরুদ্ধে ৮ বছরের যুদ্ধে সাদ্দামকে সর্বাত্মক সহায়তা যুগিয়েছিল মার্কিন সরকার ও তার পশ্চিমা এবং আরব মিত্ররা। এমনকি কুয়েত দখল করার পর সাদ্দামের বাহিনীকে কুয়েত থেকে বিতাড়িত করার পরও দক্ষিণ ইরাকের জনগণ যখন সাদ্দামের বিরুদ্ধে গণজাগরণ গড়ে তুলেছিল তখন সেই বিপ্লবকে বানচাল করতে সাদ্দামকে সর্বাত্মক সহায়তা দিয়েছিল মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোট।


আজ মধ্যপ্রাচ্যের তাকফিরি-ওয়াহাবি সন্ত্রাসী গোষ্ঠী আইএসআইএল বা দায়েশ, আননুসরা, এবং আফ্রিকার বোকো হারামসহ আরও কয়েকটি সমমনা তাকফিরি গোষ্ঠীর নারকীয় তাণ্ডব ও দুনিয়া-কাঁপানো নৃশংসতা নয়-এগারো পরবর্তী মার্কিন নীতিরই ধারাবাহিক প্রক্রিয়ার ফসল। মার্কিন জনগণ আজ সন্ত্রাসী হামলা হতে নিরাপদ হলেও আফগানিস্তানে সন্ত্রাসকে জিইয়ে রাখা হয়েছে গত প্রায় ৩৬ বছর ধরে। ইরাকের অবস্থা আফগানিস্তানের চেয়েও ভয়াবহ ও শোচনীয় হয়ে পড়েছে। সাবেক বাথিস্টদের নেতৃত্বাধীন রক্তপিপাসু দায়েশ এখন দেশটির এক-তৃতীয়াংশ অঞ্চলে কায়েম করেছে ত্রাসের রাজত্ব। এই গোষ্ঠীর স্বঘোষিত খলিফা আবুবকর বাগদাদিকে ইরাকের কারাগার থেকে মুক্ত করেছে মার্কিন সেনারা। আর তাকে নানা বিষয়ে প্রশিক্ষণ দিয়েছে ইসরাইল। মার্কিন সরকার আলকায়দাকে দমন করার কথা বললেও এই গোষ্ঠীর নতুন রূপ তথা আইএসআইএল-কে গড়ে তুলেছে নিজ হাতেই। গত এক বছর ধরে মার্কিন সরকার ইরাক ও সিরিয়ায় এই নতুন আলকায়দার বিরুদ্ধে তথাকথিত আন্তর্জাতিক যুদ্ধ ও বিশেষ করে অকার্যকর বিমান হামলা চালিয়ে যাচ্ছে! কিন্তু এতে দায়েশ বা আইএসআইএল সুড়সুড়ি ছাড়া অন্য কিছুই অনুভব করছে না।


মধ্যপ্রাচ্যে কথিত আরব বসন্তের নামে মার্কিন সরকার ও তার মিত্ররা সিরিয়ার আসাদ সরকারকে উৎখাতের জন্য ব্যবহার করছে তাকফিরি-ওয়াহাবি গোষ্ঠীগুলোকে। সিরিয়াকে ইসরাইল-বিরোধী প্রতিরোধের অক্ষ থেকে বের করাই এর উদ্দেশ্য। সিরিয়ায় সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর নানা অভিযানে ও সরকারি বাহিনীর সঙ্গে সংঘাতের ফলে গত চার বছরে নিহত হয়েছে প্রায় আড়াই লাখ মানুষ এবং শরণার্থী হয়েছে এক কোটি দশ লাখ সিরিয়। এ ছাড়াও দেশটির অবকাঠামোর এক বিরাট অংশই ধ্বংস হয়ে গেছে। তাকফিরি-ওয়াহাবিরা ধ্বংস করেছে দেশটির নানা ঐতিহাসিক স্থাপনা। বিশ্বের প্রায় ১০০ দেশ থেকে আসা সন্ত্রাসীদের চারণভূমিতে পরিণত হয়েছে ইরাক ও সিরিয়া। আর এইসব কিছুর জন্যই দায়ী মার্কিন সরকার ও তার মিত্রদের সন্ত্রাস-বান্ধব নীতি। পাশ্চাত্য তার নড়বড়ে অর্থনীতিকেও ঝালাই করে নিচ্ছে এইসব সন্ত্রাসীদের দখলে থাকা তেল-গ্যাস ক্ষেত্র ব্যবহার করে ও অস্ত্র ব্যবসা চাঙ্গা করে। আর এইসব পদক্ষেপের কারণে সামনের বছরগুলোতেও হয়তো জীবন দিতে হবে লাখ লাখ নিরপরাধ মানুষকে। আবার দেখা যাবে ধ্বংস হয়ে যাওয়া দেশগুলোর পুনর্গঠনের নামে সেইসব দেশের সম্পদ শোষণের জন্য পুনর্গঠনের কাজগুলোও হাতিয়ে নিচ্ছে মার্কিন ও পশ্চিমা নানা কোম্পানি। # 

 

রেডিও তেহরান

 

 

 

 

 

মন্তব্য লিখুন


Security code
রিফ্রেস দিন