এই ওয়েবসাইটে আর আপডেট হবে না। আমাদের নতুন সাইট Parstoday Bangla
রবিবার, 27 ডিসেম্বর 2015 15:40

বিশ্ব-ইসলামী ঐক্য: বর্তমান যুগের সবচেয়ে জরুরি দাবি

বিশ্ব-ইসলামী ঐক্য: বর্তমান যুগের সবচেয়ে জরুরি দাবি

মানব জাতি আদিতে ছিল এক জাতি ও এক আল্লাহর দাস। কিন্তু ইবলিস মানুষকে বিভ্রান্ত করতে সৃষ্টি করে নানা কল্পিত খোদা ও দেবতা এবং ভুয়া ধর্ম। ফলে মানুষের মধ্যে দেখা দেয় অনৈক্য। কুরআনের ভাষায় প্রত্যেক বিভ্রান্ত পথ ও মতের অনুসারীরা তাদের মতবাদ নিয়ে সন্তুষ্ট থাকে।

 

শয়তান প্রতিটি খোদায়ী ধর্মকে বিকৃত করার চেষ্টা করেছে। ইসলাম ধর্মও শয়তানের ষড়যন্ত্র আর শত্রুতা থেকে মুক্ত থাকেনি। 

 

মুসলমানরা যাতে ঐক্যবদ্ধ থাকতে না পারে সে জন্য ইসলামের জাত শত্রুরা গড়ে তোলে মুনাফিক শ্রেণী যাতে ইসলামের ওপর আঘাত হানা যায় ভেতর থেকেই। বিশ্বনবী (সা)’র ওফাতের পর এরা দিনকে দিন শক্তিশালী হতে থাকে। এদের হাতে নির্যাতিত হয় আলী(আ)সহ বিশ্বনবীর (সা) পবিত্র আহলে বাইত ও খাঁটি মুসলমানরা। রাজতন্ত্রকে দেয়া হয় বৈধতা এবং ইয়াজিদের মত কুলাঙ্গার আমিরুল মু’মিনিন হওয়ার দাবিদার হয়। বিলুপ্ত-প্রায় ইসলামকে রক্ষার জন্য এগিয়ে আসেন বিশ্বনবীর নাতি হযরত ইমাম হুসাইন (আ)। কিন্তু তাঁর শাহাদত ও কারবালা বিপ্লবের পরও ঐক্যবদ্ধ হতে পারেনি মুসলমানরা।

 

শয়তান দুর্বল ঈমানদার ও মুনাফিকদের দিয়ে মুসলমানদের মধ্যে নেতৃত্বের বিরোধ ছাড়াও চিন্তাগত নানা বিভেদ সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়। গড়ে ওঠে চরমপন্থী নানা গোষ্ঠী। এমনই এক মুসলিম গোষ্ঠী মনে করত মানুষ পুরোপুরি স্বাধীন। আল্লাহর কোনো নিয়ন্ত্রণই নেই। এরা ঝুঁকে পড়ে নাস্তিক্যবাদের দিকে। আবার আরেক দল মনে করত মানুষ যা করে সব আল্লাহরই নির্ধারিত। অর্থাৎ মানুষ পুতুলের মতই পুরোপুরি পরাধীন। ফলে ধর্মের নামে সব অপকর্মকে জায়েজ করার পথ খুলে যায়।

 

ন্যায়-বিচারের প্রতীক হযরত আলী (আ)’র বিরুদ্ধে কায়েমী স্বার্থবাদীদের জোট ছাড়াও গড়ে উঠেছিল বর্তমান যুগের তাকফিরি-ওয়াহাবিদের মত ধর্মান্ধ খারিজি গোষ্ঠী; যদিও এদের পেছনেও ছিল কায়েমী স্বার্থবাদীদের পরোক্ষ ইন্ধন বা উসকানি। হযরত আলী (আ)’র যথাসময়ে আলোচনার মাধ্যমে সুপথে ফিরিয়ে আনেন বেশিরভাগ খারেজিকে। আর যারা ফিতনা চালিয়ে যেতে থাকে তাদেরকে জিহাদের ময়দানে প্রায় পুরোপুরি বিধ্বস্ত করেন।

 

প্রশ্ন হল, খাঁটি ইসলামপন্থী এবং বিভ্রান্ত ও স্বার্থপর মুসলমানদের মধ্যে কি কোনো ঐক্য হতে পারে? কিংবা অযোগ্য মুসলিম নেতাদের সঙ্গে যোগ্য নেতাদের কি ঐক্য হতে পারে? এর উত্তরে বলতে হয়, ইসলামের মহান ইমামরা যখন দেখলেন যে শিশু ইসলামের অভিভাবক বা মা হওয়ার দাবি করছে এমন কেউ যে প্রকৃত মা বা অভিভাবক নয়। আর এ নিয়ে মামলা করতে গেলে মুসলিম জনতার রায় হবে দ্বিধা বিভক্ত এবং শিশু সন্তানকে কেটে দুই ভাগ করে দেয়া হবে। ফলে মৃত্যু ঘটবে ইসলাম নামক নবজাতক শিশুর। তাই মহান ইমামরা নেতৃত্ব নিয়ে মুসলিম উম্মাহকে দ্বিধা-বিভক্ত করতে চাননি। এ ছাড়াও বিজাতীয় বা কাফির শক্তিগুলো সব সময়ই এটা চেয়েছিল যে মুসলমানদের মধ্যে অনৈক্য দেখা দিলেই তারা আবারও আরব এবং ইসলামী ভূখণ্ডে হামলা চালিয়ে উদীয়মান ইসলামী শক্তি ও রাষ্ট্রকে চিরতরে বিলীন করে দেবে।

 

আব্বাসীয় শাসকদের যুগে গড়ে ওঠে ইসলামী ইজতিহাদি আইন-ভিত্তিক আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের চার মাজহাব। এই চার মাজহাবের ভেতরেও যুগে যুগে কৃত্রিম নানা গোলযোগ ও দাঙ্গা বাধানোর চেষ্টা করেছে কায়েমী স্বার্থবাদী মহল। এইসব মহল শিয়া-সুন্নি মতপার্থক্যকেও যুগে যুগে ব্যবহার করতে চেয়েছে নানা দুনিয়াবি বা বস্তুগত স্বার্থ হাসিলের মাধ্যম হিসেবে। 


দেখা গেছে যখনই মুসলমানরা মাজহাবি বিষয়ে জ্ঞানগত বিতর্কের বাইরে গিয়ে সংঘাতে জড়িত হয়েছে তখনই মুসলিম বিশ্বের বাইরের কুফুরি শক্তি তাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছে এবং বিধ্বস্ত করেছে ইসলামী সভ্যতাকে। ক্রুসেডার ও মঙ্গলদের হামলাই এর প্রমাণ। মূলত এই দুই হামলার কারণেই ধ্বংস হয় মুসলমানদের গবেষণাগার, বিশ্ববিদ্যালয় ও লাইব্রেরিগুলো। ফলে জ্ঞান-বিজ্ঞানে পিছিয়ে পড়া মুসলমানরা ইউরোপীয় উপনিবেশবাদীদের হাতে পরাজিত হওয়ার পর আর কখনও সভ্যতার চালকের আসন ফিরে পাননি। আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলা মুসলমানরা ইসলাম থেকে আরও দূরে সরে যেতে থাকে। তাদের শিক্ষিত শ্রেণীর মধ্যে পশ্চিমা মতাদর্শ এবং শিক্ষা-সংস্কৃতির প্রভাব বাড়তেই থাকে।

 

এ অবস্থায় সারা বিশ্বের মুসলমানদের ঐক্যবদ্ধ করার ও ইসলামী জাগরণ গড়ে তোলার চেষ্টা করেন সাইয়্যেদ জামাল উদ্দিন আফগানি, আবদুহ, কাওয়াকেবি ও ইকবালের মত উদারমনা ইসলামপন্থী সংস্কারকরা। অন্যদিকে সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটেনের মদদপুষ্ট ওয়াহাবিরা তুর্কি খেলাফতের পতন ঘটাতে সহায়তা করে।


ভারতবর্ষ এবং ইরাকে শিয়া ও সুন্নিরা রুখে দাঁড়ায় ইংরেজ উপনিবেশবাদীদের বিরুদ্ধে। ইসলামী ঐক্যের জন্য কাজ করেন ইরাকের কয়েক জন প্রখ্যাত শিয়া আলেম, ইরানের আয়াতুল্লাহ বুরুজারদি ও মিশরের শেখ শালতুতসহ মুসলিম বিশ্বের আরও অনেক শিয়া ও সুন্নি আলেম। ইরাকের শিয়া আলেমদের সঙ্গে মিশরের সুন্নি আলেমদের গড়ে উঠে সখ্যতা ঠিক যেভাবে লেবাননেও গড়ে উঠেছিল শিয়া ও সুন্নি আলেমদের মধ্যে ঐক্য। বিশ্বের দেশে দেশে এরই ধারাবাহিকতায় গড়ে ওঠে নানা ইসলামী দল।

 

১৯৭৯ সালে ইরানে সফল হয় আয়াতুল্লাহ খোমেনীর নেতৃত্বে ইসলামী বিপ্লব। এ বিপ্লবকে ‘আমার হৃদয়ের স্পন্দন’ বলে অভিনন্দন জানান জামায়ােত ইসলামীর প্রতিষ্ঠাতা সাইয়েদ আবুল আ'লা মওদুদী। অন্যদিকে এ বিপ্লবকে অঙ্কুরেই বিনষ্ট করার জন্য সাম্রাজ্যবাদীরা আবারও বের করে শিয়া-সুন্নি বিভক্তির সর্বনাশা কার্ড। জোরদার করা হয় তাকফিরি-ওয়াহাবি সন্ত্রাস। কিন্তু এইসব বিভাজনের বিরুদ্ধে কথা বলে গেছেন বাংলাদেশের মাওলানা হাফিজজি হুজুরসহ মুসলিম বিশ্বের অনেক স্বনামধন্য আলেম।


মরহুম ইমাম খোমেনী বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সা) ও তাঁরই আহলে বাইতের সদস্য ইমাম জাফর সাদিকের (আ) পবিত্র জন্ম-বার্ষিকী উপলক্ষে ১২ থেকে ১৭ রবিউল আউয়ালকে ইসলামী ঐক্য সপ্তাহ বলে ঘোষণা করেন। তিনি বলেছেন, যারা শিয়া ও সুন্নিদের মধ্যে সংঘাত সৃষ্টি করতে চায় তারা শিয়াও নয়, সুন্নিও নয়, বরং তারা সাম্রাজ্যবাদের দালাল। মুসলমানদের প্রথম কিবলাকে মুক্ত করার জন্য ইমাম খোমেনীর ডাকে পালিত হতে থাকে বিশ্ব কুদস দিবস যা ইসলামী ঐক্যের আরেকটি বড় প্লাটফর্ম। পবিত্র হজ্ব ইসলামী ঐক্যের বড় সোপান। অথচ এই মহাসম্মেলনকে যথাযথভাবে পালন করতে ও কাজে লাগাতে দিচ্ছে না সাম্রাজ্যবাদীরা। 

 

কুরআন বলেছে, মুসলমানদের সঙ্গে শত্রুতায় সবচেয়ে কঠোর হচ্ছে ইহুদিরা। অথচ ইহুদিদের মধ্যে সবচেয়ে নিকৃষ্ট শ্রেণীটির নেতৃত্বাধীন ইহুদিবাদী ইসরাইলের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তুলেছে এক শ্রেণীর কথিত মুসলিম সরকার। ইসলাম-বিদ্বেষী খ্রিস্টান ও কাফিরদের সঙ্গে বন্ধুত্ব করতেও মহান আল্লাহ কুরআনে নিষেধ করেছেন। অথচ মার্কিন সরকারসহ ইসলাম-বিদ্বেষী পশ্চিমা সরকারগুলোর গোলামী করে যাচ্ছে বেশিরভাগ মুসলিম সরকার।


মার্কিন সরকার ও ইহুদিবাদী ইসরাইলসহ ইসলামের বর্তমান প্রধান শত্রুরা মুসলমানদের মধ্যে গোত্রীয়, জাতিগত ও মাজহাবি সংঘাত উস্কে দিয়ে মুসলিম রাষ্ট্রগুলোকে খণ্ড-বিখণ্ড করতে চায় এবং শোষণ করতে চায় মুসলিম জাহানের সম্পদ। তাই মুসলমানদেরকে ফিরে যেতে হবে কুরআনের এ বাণীর দিকে: ‘তোমরা সবাই আল্লাহর রজ্জুকে শক্ত করে ধর ও পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ো না। (৩:১০৩)’ 

(২) 

১৪৯০ চন্দ্র বছর আগে তথা হিজরতের ৫৩ বছর আগে ১২ ই রবিউল আউয়াল বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.) জন্মগ্রহণ করেন বলে প্রসিদ্ধ কিছু বর্ণনা রয়েছে।


অবশ্য বিশ্বনবী (সা.)’র পবিত্র আহলে বাইতের বর্ণনা অনুযায়ী রাসূল (সা.)’র জন্মদিন ১৭ই রবিউল আউয়াল। ৫ দিনের এই ব্যবধানের মধ্যে সেতু-বন্ধন হিসেবে ইরানের ইসলামী বিপ্লবের রূপকার মরহুম ইমাম খোমেনী (র.) এই দিনগুলোর মধ্যে (১২-১৭ রবিউল আউয়াল) ইসলামী ঐক্য সপ্তাহ পালনের প্রথা চালু করেছেন। 


বিশ্বনবী (সা.) মুসলমানদেরকে সব সময় ঐক্যবদ্ধ থাকতে বলেছেন। পবিত্র কুরআনেও বলা হয়েছে: ‘তোমরা সবাই আল্লাহর রশিকে শক্ত করে ধর ও পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ো না। আর তোমরা সে নেয়ামতের কথা স্মরণ কর, যা আল্লাহ তোমাদেরকে দান করেছেন। তোমরা পরস্পর শত্রু ছিলে। এরপর আল্লাহ তোমাদের মনে সম্প্রীতি দান করেছেন। ফলে, এখন তোমরা তাঁর অনুগ্রহের কারণে পরস্পর ভাই ভাই হয়েছ। তোমরা এক অগ্নিকুণ্ডের পাড়ে অবস্থান করছিলে। এরপর তা থেকে তিনি তোমাদেরকে মুক্তি দিয়েছেন।’ (৩: ১০৩)


সুরা আনফালের ৪৬ নম্বর আয়াতেও মহান আল্লাহ বলেছেন: ‘আর আল্লাহ তা’আলার নির্দেশ মান্য কর এবং তাঁর রসূলের। তাছাড়া তোমরা পরস্পর বিবাদ করো না। যদি তা কর, তবে তোমরা নিষ্ক্রিয় বা নিস্তেজ হয়ে পড়বে এবং তোমাদের প্রভাব চলে যাবে।’


বংশ-গরিমা বা অভিজাত পরিবারের জন্ম নেয়ার অহংকার মানুষের মধ্যে বিচ্ছিন্নতা আনে। ইসলামের মহানবী (সা) এর বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে গেছেন। তিনি বলেছেন, শ্রেষ্ঠত্বের একমাত্র মাপকাঠি হল তাকওয়া ও খোদাভীতি। তিনি আরও বলেছেন, যার মধ্যে বংশ-গরিমা থাকবে তাকে কিয়ামতের দিন জাহিলি যুগের আরবদের সঙ্গে ওঠাবেন। বিশ্বনবী (সা) এক সময়কার কৃষ্ণাঙ্গ ক্রীতদাস হযরত বেলালকে (রা) দিয়েছিলেন প্রথম মুয়াজ্জিন হওয়ার মহা-মর্যাদা। সালমান ফার্সি ইরানি হওয়া সত্ত্বেও মহানবী তাঁকে নিজের পরিবারের অন্তর্ভুক্ত বলে সম্মান জানিয়েছিলেন এবং সাবেক দাস পরিবারের সন্তান জায়েদকে করেছিলেন সেনাপতি।

 

বিশ্বনবীর (সা) রেখে যাওয়া প্রকৃত শিক্ষা অনুযায়ী ঐক্যবদ্ধ থাকা মুসলমানদের জন্য ফরজ। নবী-রাসূলরা সবাই এসেছেন মানব জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করতে বিচ্ছিন্ন করতে নয়। অনেকেই নবী-রাসুলদের এবং বিশেষ করে মহানবীর শিক্ষা সম্পর্কে অসচেতন বলেই অনৈক্যের পথে চলছেন। আবার অনেকে বিশ্বনবী (সা)’র রেখে-যাওয়া প্রকৃত শিক্ষা ও দিক-নির্দেশনাগুলো সম্পর্কে অবহিত হওয়ার পরও ব্যক্তি স্বার্থের কারণে ফিতনা আর অনৈক্য সৃষ্টি করেছে। এদের সম্পর্কেই পবিত্র কুরআনের সুরা আলে ইমরানের ১০৫ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে:  ‘আর তাদের মত হয়ো না, যারা বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে এবং স্পষ্ট দলিল বা নিদর্শনগুলো আসার পরও অনৈক্য ও বিরোধিতা করতে শুরু করেছে-তাদের জন্যে রয়েছে ভয়ঙ্কর আজাব।’ 

 

ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে অনৈক্য মুসলমানদের অধঃপতনের অন্যতম বড় কারণ। মুসলমানরা যদি আজো ইসলাম ও কুরআনের আসল শিক্ষার পথে ফিরে গিয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে প্রচেষ্টা চালায় তাহলে তারা সব অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা থেকে মুক্ত হয়ে আবারো সব দিকে কর্তৃত্বশালী হতে পারবে এবং গোটা মানবতাই পাবে প্রত্যাশিত সার্বিক মুক্তি ও অপার কল্যাণ। 

 

এটা খুবই দুর্ভাগ্যজনক যে মুসলমানরা এক আল্লাহ, এক বিশ্বনবী (সা.), অভিন্ন কুরআন ও ইসলামের মূল নীতিগুলো মেনে নেয়া সত্ত্বেও সাম্রাজ্যবাদীদের নানা ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে পরস্পরের মধ্যে সীসা ঢালা প্রাচীরের মত ঐক্য গড়ে তুলতে পারছে না। অথচ মুসলমানদের বিরুদ্ধে খ্রিস্টান, ইহুদি ও অন্য অমুসলিমদের সুদৃঢ় ঐক্য লক্ষণীয়।

 

মুসলমানরা ইচ্ছা করলে নানা মত ও রুচির অধিকারী হয়েও অন্তত কাফিরদের মুকাবিলায় এবং অভিন্ন স্বার্থগুলোর ক্ষেত্রে ঐক্যবদ্ধ থাকতে পারে। আমরা দেখি যে দেশে দেশে নানা মত ও আদর্শের বহু দল থাকা সত্ত্বেও তারা নিজ দেশের রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতা আর স্বার্থের ব্যাপারে ঐক্যবদ্ধ থাকেন। তেমনি মুসলমানরা অভিন্ন স্বার্থের ব্যাপারে ঐক্যবদ্ধ থাকতে পারেন। মূলত এ উদ্দেশ্যে ইসলামী সহযোগিতা সংস্থা বা ওআইসি গড়ে তোলা হয়েছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে দেশে দেশে পাশ্চাত্যের উপনিবেশবাদী শক্তিগুলোর সেবাদাসরা ক্ষমতাসীন হওয়ায় সুদৃঢ় ইসলামী ঐক্য গড়ে তুলতে দিচ্ছে না তারা। বরং তারা শিয়া-সুন্নি মতপার্থক্যকে সংঘাতে পরিণত করে তা থেকে রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের চেষ্টা করছে। ওয়াহাবিবাদ ও সালাফিবাদকে তারা ব্যবহার করছে এই অশুভ লক্ষ্যের হাতিয়ার হিসেবে।

 

সালাফি ও ওয়াহাবিরা ইসলামের খাঁটি মতাদর্শ বাস্তবায়নের নামে হত্যা করছে সাধারণ এবং নিরপরাধ মুসলিম নারী-পুরুষ ও শিশুদেরকে। তারা ইহুদিবাদী ইসরাইলসহ ইসলামের প্রধান শত্রুদের সঙ্গে ঐক্যবদ্ধ হয়ে মুসলমানদের এবং বিশেষ করে ইসলামী ইরান ও হিজবুল্লাহর মত বিপ্লবী, সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী ও ইহুদিবাদ বিরোধী শক্তিগুলোর ক্ষতি সাধনের চেষ্টা করছে। ইসলামী সংস্কৃতিকে ধ্বংসের জন্য তারা বোমা মেরে গুড়িয়ে দিচ্ছে ইসলামের মহান ব্যক্তিত্বদের পবিত্র মাজার ও নানা স্মৃতি-চিহ্ন। আর সাম্রাজ্যবাদীরাও তাদের সহায়তা করছে যাতে অমুসলিম বিশ্বের মানুষ প্রকৃত ইসলাম থেকে দূরে থাকার পাশাপাশি এইসব বর্বর ও হিংস্র প্রকৃতির লোকদেরই ইসলামের ধারক-বাহক মনে করে ইসলাম সম্পর্কে বীতশ্রদ্ধ থাকে।

 

কথিত খাঁটি ইসলাম প্রচারের নামে সক্রিয় খারিজি এবং ওয়াহাবিদের মত বিভ্রান্ত গোষ্ঠীগুলো সব সময় অন্যদের ওপর জোর করে তাদের মত চাপিয়ে দিতে চেয়েছে। যারাই এক্ষেত্রে বিরোধিতা করতে চেয়েছে তাদের ওপর গণহত্যা চাপিয়ে দিয়ে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছে নানা অঞ্চলে এবং আজো একইভাবে সেই রাজত্ব বিস্তারের পাঁয়তারা করছে।


অথচ বিশ্বনবী (সা.) ছিলেন অন্যদের মতামতের ব্যাপারে সহনশীল। তিনি ছিলেন যুক্তি, মত-বিনিময় বা সংলাপের আদর্শ। পবিত্র কুরআন বলেছে, মুসলমানরা পরস্পরের ভাই। ইসলাম দু-জন মুসলমানের মধ্যে বিরোধ মিটিয়ে দেয়া এবং তাদের মধ্যে বন্ধুত্ব জোরদারকে ব্যাপক গুরুত্ব দিয়েছে। মহানবী (সা.) তাঁর সহনশীলতা, উদারতা ও ক্ষমাশীলতার মাধ্যমে বহু গোত্র এবং বিবদমান মুসলমানদের মধ্যে শান্তি ও ঐক্য প্রতিষ্ঠা করেছেন। তিনি ফেতনা-বাজদের কঠোর হাতে দমন করার শিক্ষাও দিয়ে গেছেন। 

 

 

বিশ্বনবী (সা.)'র এই আদর্শ অনুসারেই ইরানের ইসলামী বিপ্লবের রূপকার মরহুম ইমাম খোমেনী (র.) শিয়া ও সুন্নি মাজহাব সমর্থনের নামে এই উভয় মাজহাবের ফেতনা-বাজদের বয়কট করার উপদেশ দিয়ে গেছেন।


পবিত্র কুরআন বলেছে, মুহাম্মাদের প্রকৃত সঙ্গী বা অনুসারীরা পরস্পরের প্রতি দয়ার্দ্র এবং কাফিরদের প্রতি কঠোর। 


ইমাম খোমেনী (র.) বলেছেন, বিশ্বের মুসলমানরা যদি এক হয়ে এক বালতি করে পানি ঢালেন তাহলে ইসরাইল ভেসে নিশ্চিহ্ন হবে। অথচ দুঃখজনকভাবে কোনো কোনো মুসলিম নামধারী সরকার ইসরাইলের সঙ্গে গোপনে হাত মিলিয়ে ইরানসহ ইসলামী শক্তিগুলোর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে।

 

মুসলমানদের মধ্যে যারা ছিল মুনাফিক বা বর্ণচোরা তাদের সঙ্গেও বাহ্যিক সম্প্রীতির সম্পর্ক রক্ষা করেছেন বিশ্বনবী (সা.)। অবশ্য এই মুনাফিকদের ষড়যন্ত্র ফাঁস হওয়ার পর তিনি তাদের কঠোর শাস্তি দিতেন। বিশ্বনবী (সা.) হিজরতের পর মদীনার আনসার ও মক্কা থেকে আসা মুহাজিরদেরকে ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ করেছিলেন। #

 

রেডিও তেহরান/এএইচ

 

 

 

মন্তব্য লিখুন


Security code
রিফ্রেস দিন