এই ওয়েবসাইটে আর আপডেট হবে না। আমাদের নতুন সাইট Parstoday Bangla
রবিবার, 27 মার্চ 2016 18:56

গণহত্যা ও দুর্ভিক্ষের দায় নিয়ে সিরিয়ার পর ইয়েমেনেও ব্যর্থ সৌদি

গণহত্যা ও দুর্ভিক্ষের দায় নিয়ে সিরিয়ার পর ইয়েমেনেও ব্যর্থ সৌদি

মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে দরিদ্র দেশ ইয়েমেনে ২০১৫ সালের ২৬ মার্চ থেকে শুরু হওয়া সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের চলমান আগ্রাসনে অন্তত নয় হাজার ৪০০ ইয়েমেনি নিহত হয়েছে। আহত হয়েছে অন্তত ৩০ হাজার। জাতিসংঘের হিসেব অনুযায়ী নিহতদের অন্তত সাড়ে তিন হাজারই বেসামরিক নাগরিক। নিহত শিশু ও নারীর সংখ্যা ২ হাজারেরও বেশি বলে জানানো হয়েছে। এ ছাড়াও ২৫ লাখ ইয়েমেনি হয়েছে গৃহহারা ও শরণার্থী এবং প্রায় ২ কোটি ইয়েমেনি হয়েছে খাদ্যসহ নানা ধরনের জরুরি ত্রাণ সাহায্যের মুখাপেক্ষী।



বিশ্ব সমাজ বন্ধ করতে পারছে না দুর্বলের ওপর সবলের এই আগ্রাসন। হাসপাতাল, স্কুল ও মসজিদ কিছুই বাদ যাচ্ছে না ধ্বংসযজ্ঞ থেকে। 


ইয়েমেনে যাতে ত্রাণ সাহায্য যেতে না পারে সে জন্য দেশটিতে অবরোধ আরোপ করে রেখেছে সৌদি সরকার। অসহায় ইয়েমেনিদের নেই কোনো ভূগর্ভস্থ আশ্রয়-কেন্দ্র। বোমা হামলার সময় সেখানে বাজে না কোনো সাইরেন! সুপেয় বা পরিষ্কার পানির অভাবে ভুগছে ৫০ শতাংশ ইয়েমেনি। জাতিসংঘের হিসেব অনুযায়ী ইয়েমেনের ৮০ শতাংশ মানুষ তথা প্রায় দুই কোটি ইয়েমেনি এখন ত্রাণ সাহায্যের মুখাপেক্ষী। কারণ, সৌদি হামলায় ধ্বংস হয়ে গেছে দেশটির ক্ষেত-খামার ও উৎপাদন ব্যবস্থা। বাজারগুলোতে পণ্য সরবরাহ খুবই সীমিত। সাধারণ মানুষ সেইসব জরুরি পণ্য খুব চড়া দাম দিয়ে কেনার সামর্থ্য রাখে না।


আন্তর্জাতিক ত্রাণ সংস্থা অক্সফাম বলেছে, ইয়েমেনে সংঘাত চলতে থাকায় বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে বড় মানবীয় ত্রাণ-চাহিদা জরুরি হয়ে দেখা দিয়েছে। ইয়েমেনের এক কোটি ৪৪ লক্ষ মানুষ এখন ক্ষুধার্ত এবং খাদ্যের দাম ব্যাপক মাত্রায় বেড়ে যাওয়ায় তাদের বেশির ভাগই চড়া দাম দিয়ে খাদ্য কিনতে সক্ষম নয়। ইয়েমেনের ক্ষেত-খামার ও বাজারগুলো সৌদি হামলায় ধ্বংস হয়ে গেছে এবং অঘোষিত নিষেধাজ্ঞার ইয়েমেনে পণ্য আমদানি বন্ধ রয়েছে বলে সংস্থাটি জানিয়েছে। দীর্ঘ মেয়াদি জ্বালানী সংকটের কারণে ইয়েমেনে কৃষি উৎপাদনে ধস নেমেছে বলেও সংস্থাটি উল্লেখ করেছে। 

 

এদিকে জাতিসংঘ ইয়েমেনে ত্রাণ সহায়তা দিতে দাতা দেশগুলোর কাছে অর্থের আবেদন জানিয়েও কোনো সাড়া পায়নি। ইয়েমেনে সৌদি হামলায় হাজার হাজার বেসামরিক ইয়েমেনি নিহত হতে থাকায় সম্প্রতি সৌদি সরকারের ওপর অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে ব্রিটেন ও ইউরোপীয় জোটের ওপর চাপ জোরদার হয়েছে। গত ১৫ মার্চ ইয়েমেনের হাজ্জা প্রদেশে একটি জনাকীর্ণ বাজারের ওপর সৌদি বিমান হামলায় ১১৯ জন ইয়েমেনি নিহত হলে জাতিসংঘসহ বিশ্ব সমাজ সৌদি হামলার নিন্দা জানায়। ওই হামলায় নিহতদের অনেকেই ছিল ও নারী শিশু।

 

বর্বর-ওয়াহাবি মতবাদকেন্দ্রীক রাজতান্ত্রিক সৌদি সরকার গণতন্ত্রের দোহাই দিয়ে ইয়েমেনে আগ্রাসান শুরু করে। অথচ সৌদিতে নেই রাজনৈতিক দল, সংসদ ও বাক-স্বাধীনতার অস্তিত্ব! সৌদি সরকার ইয়েমেনে তার পছন্দের এক ব্যক্তি ও দেশটির সংসদের কাছে ক্ষমতা ত্যাগকারী জন-সমর্থনহীন সাবেক সরকার-প্রধান মানসুর হাদিকে ক্ষমতায় বসানোর জন্য গোটা ইয়েমেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছে!


সৌদি সরকারকে সর্বাত্মক সহায়তা দিচ্ছে মার্কিন সরকার, ব্রিটেন, ইহুদিবাদী ইসরাইলসহ সৌদি অর্থ-সহায়তার কাঙ্গাল কয়েকটি আরব সরকার।


সৌদি সরকার প্রতিবেশী ইয়েমেনকে মনে করে তার একটি উপনিবেশ। এই দেশটিতে কে ক্ষমতায় থাকবে বা থাকবে না তা ইয়েমেনি জনগণের ন্যায্য অধিকার হলেও রিয়াদ তাতে হস্তক্ষেপ করতে অভ্যস্ত। তাই এই দেশটির ওপর এর আগেও হামলা চালিয়েছে সৌদি সরকার। ইয়েমেনের তেল-সমৃদ্ধ দু’টি প্রদেশ প্রায় ৮০ বছর ধরে দখল করে রেখেছে সৌদি রাজতান্ত্রিক সরকার। ওই প্রদেশগুলো ৭০’র দশকে ইয়েমেনের কাছে ফেরত দেবে বলে কথা দিয়েছিল সৌদি সরকার। কিন্তু বলদর্পী সৌদি সরকার নিজের সেই ওয়াদা পদদলিত করেছে।


মধ্যপ্রাচ্যে স্বৈরশাসক বিরোধী আরব গণজাগরণে জোয়ারে তিউনিশিয়া, মিশর ও লিবিয়ায় পরিবর্তন আসার সময়ে ইয়েমেনের জনগণও দেশটিতে গণতান্ত্রিক এবং স্বাধীন সরকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলন জোরদার করে। ফলে ক্ষমতাচ্যুত হয় সালেহ সরকার এবং এরপর অদক্ষতা ও অযোগ্যতার প্রেক্ষাপটে ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হয় সৌদি রাজার ক্রীড়নক মানসুর হাদি সরকার।


এ অবস্থায় ইয়েমেনের জাইদি শিয়া সম্প্রদায় তথা হুথিদের নেতৃত্বাধীন আনসারুল্লাহ ম্যুভম্যান্ট দেশটির সবচেয়ে বড় দল ও শক্তি হিসেবে ইয়েমেনি সংসদের নানা রাজনৈতিক দলের বেশিরভাগেরই সমর্থন নিয়ে গঠন করে বিপ্লবী সরকার। এ সরকারের প্রতি সমর্থন রয়েছে দেশটির সশস্ত্র বাহিনীর। এই বিপ্লবী সরকার মার্কিন, ইসরাইলি ও সৌদি আধিপত্যবাদের ঘোর বিরোধী। তাই সৌদি সরকারের দৃষ্টিতে শিয়া হওয়া ও কথিত ইরানপন্থী হওয়াই জনপ্রিয় আনসারুল্লাহর বড় অপরাধ! অথচ ইয়েমেনের সাবেক প্রেসিডেন্ট আলী আবদুল্লাহ সালেহও ছিলেন জাইদি শিয়া। তার প্রায় ৩৩ বছরের শাসনও সৌদি সরকার মেনে নিয়েছিল। ইরানের সাবেক শাহ সরকারও ছিল শিয়া। কিন্তু তার সঙ্গে সহাবস্থানে থাকতে ও তাকে মাথায় তুলে রাখতে আরব রাজা-বাদশাহদের কখনও কোনো সমস্যা হয়নি!


তাৎপর্যপূর্ণ পরিহাস হল সৌদি আরব সম্প্রতি জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিটির প্রধান হয়েছে! পয়সার জোরে কি সব পাপই মোচন করা যায়? এ বছরের শুরুতেই সৌদি সরকার শেখ নিমরসহ ৪৭ ব্যক্তির মাথা দেহ থেকে কেটে বিচ্ছিন্ন করার মাধ্যমে মৃত্যুদণ্ড দিয়ে ইংরেজি নব-বর্ষের উৎসব পালন করেছে! এ নিয়ে ইউরোপ ও পাশ্চাত্যে প্রতিবাদ ও নিন্দা-সমালোচনা দেখা গেলেও একই সৌদি সরকারের মাধ্যমে ইয়েমেনের প্রায় ৮ হাজার মানুষের মস্তক বিচ্ছিন্ন করা সত্ত্বেও এ নিয়ে বিশ্বের বড় বড় মিডিয়াগুলো প্রায় নীরব! মানবাধিকার সংস্থাগুলোর তৎপরতা কেবল মৌখিক নিন্দা ও প্রতিবাদের মধ্যেই সীমিত। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ এ পর্যন্ত ইয়েমেনে সৌদি হামলার নিন্দা জানাতে ব্যর্থ হয়েছে।


বর্বর সৌদি সরকারের কাছে গত ৫ বছরে অন্তত দশ বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র বিক্রি করেছে ব্রিটেন। মার্কিন সরকার নিষিদ্ধ গুচ্ছ বোমাসহ অস্ত্র দিয়েছে আরও বেশি মূল্যের। সৌদিকে অস্ত্র দিচ্ছে ফ্রান্স ও জার্মানি। সৌদির চলতি বাজেটে উন্নয়ন খাতে ১০০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি অর্থের ঘাটতি দেখা দিয়েছে। অথচ অস্ত্র কিনতে অর্থের অভাব হয় না সৌদির! তেলের দর কমে যাওয়ায় সৌদি বাজেটে ঘাটতি দেখা দিয়েছে! ইরান ও রাশিয়ার তেলের আয়ে ধস নামানোর জন্য সৌদি সরকার নিজেই তেল উৎপাদন বিপুল মাত্রায় বাড়িয়ে এই জ্বালানী পণ্যের দাম প্রায় পানির পর্যায়ে নামিয়ে আনতে চেয়েছে। আর এখন এরই কুফল ভোগ করছে খোদ সৌদি সরকার ও তার অর্থনীতি!


মার্কিন ব্যাংকে সৌদি রাজ-পরিবারের যত অর্থ গচ্ছিত আছে তা চাইতে গেলে সৌদি সরকারকে সন্ত্রাসী আখ্যা দিয়ে মার্কিন সরকার হয়তো কখনও সে অর্থ ফেরত দেবে না, যেমনটা ফেরত পায়নি ইরানের ক্ষমতাচ্যুত শাহ। মার্কিন সরকারের তথ্য অনুযায়ী নাইন এলিভেনের কথিত ১৫ জন হামলাকারীর মধ্যে ১৩ জনই ছিল সৌদি!
যতদিন সৌদির অর্থ ও তেল আছে ততদিন মার্কিন সরকার, ব্রিটেন, জার্মানি ও ফ্রান্সের মত শোষক সরকারগুলো সৌদিকে চুষতেই থাকবে। আর এ সময়ে সৌদি রাজ-সরকার যত অপরাধই করুক বা যত গণহত্যাই চালাক না কেন তা ইঙ্গ-মার্কিন ও ইসরাইলি স্বার্থেরই অনুকূল হওয়ায় তারা সৌদি সরকারকে কখনও মানবাধিকার লঙ্ঘনের দায়ে অভিযুক্ত করবে না।


আমরা অনেকেই হয়তো ভাবছি-হায় ইয়েমেন! হায় তার দারিদ্র! ইরান ও তার কয়েকটি মিত্র-সরকার ছাড়া বিশ্বের বেশিরভাগ সরকারই সৌদি অর্থের প্রভাবে এবং শ্রমিক-স্বার্থ বা অস্ত্র-বিক্রির স্বার্থ বজায় রাখতে ইয়েমেনে সৌদি গণহত্যার বিরুদ্ধে তেমন কোনো কঠোর প্রতিক্রিয়া বা প্রতিবাদ দেখাচ্ছে না। কিন্তু অর্থের কাছে বিবেকের এই দাসত্বই কি বেশি লজ্জাজনক নয়? স্বাধীনচেতা ইয়েমেনিরা দরিদ্র হলেও অর্থের দাস নয়। তারা জীবন দেবে তবু সম্মান ও স্বাধীনতাকে বিসর্জন দেবে না। এক বছর ধরে সৌদি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে ইয়েমেনের বিপ্লবী জনগণ। এক্ষেত্রে শিয়া ও সুন্নি সবাই একই কাতারে রয়েছে। তবে ইয়েমেনের মরু-অঞ্চল ও কম জনসংখ্যা অধ্যুষিত দক্ষিণাঞ্চলে সৌদি মদদপুষ্ট আল-কায়দা ও দায়েশের সন্ত্রাসীরা তাদের অবস্থান জোরদার করছে।


ইয়েমেনিদের পাল্টা হামলায় ধ্বংস হয়েছে বহু আগ্রাসী বিমান, ড্রোন ও হেলিকপ্টার এবং সৌদি যুদ্ধ-জাহাজ। বেশ কয়েকজন জেনারেলসহ অন্তত সাড়ে তিন হাজার সৌদি সেনাও নিহত হয়েছে ইয়েমেনিদের পাল্টা হামলায়। তাই এটা স্পষ্ট ইয়েমেনে সৌদি আগ্রাসন এ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়েছে। ইয়েমেনের চোরাবালি থেকে মুক্ত হতে হলে হুথিদের সঙ্গে আপোষ করতেই হবে সৌদি সরকারকে।


সৌদি সরকার ইয়েমেনে যুদ্ধ-অপরাধে জড়িত বলেও মানবাধিকার সংস্থাগুলোর পক্ষ থেকে অভিযোগ ও আশঙ্কা ব্যক্ত করা হচ্ছে।

 

এই প্রেক্ষাপটে সৌদি সরকার আগামী ১৮ এপ্রিল ইয়েমেনের হুথিদের সঙ্গে আবারও আলোচনায় বসবে বলে জানিয়েছে। এ থেকে বোঝা যায় সৌদি সরকার এটা বুঝতে পেরেছে যে, ইয়েমেনে গায়ের জোরে কিছু করা যাবে না, বরং রাজনৈতিক সমঝোতা প্রয়োজন।

 

ওদিকে সম্প্রতি ইরানের একজন শীর্ষস্থানীয় সেনা কর্মকর্তাও প্রকাশ্যে ঘোষণা করেছেন যে, তেহরান ইয়েমেনের জনগণকে সহায়তার অংশ হিসেবে সেখানে সামরিক উপদেষ্টা পাঠাতে পারে যেমনটি দেশটির সামরিক উপদেষ্টারা সহায়তা দিচ্ছে সিরিয়ার আসাদ সরকারকে। 

 

ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর ডেপুটি চিফ অফ স্টাফ ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মাসুদ জাজায়েরি এ ঘোষণা দিয়ে বলেছেন, ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান তার সাধ্য অনুযায়ী ইয়েমেনের জনগণকে যে কোনোভাবে সহায়তা দেয়ার বিষয়টিকে তার দায়িত্ব বলে অনুভব করছে। 

 

জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় সাময়িক যুদ্ধ-বিরতির মধ্যে সৌদি সরকার ও ইয়েমেনের বিপ্লবী সরকারের সঙ্গে কয়েক দফা আলোচনা এ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়েছে। ফলে যুদ্ধ ক্রমেই দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে।

 

 

এদিকে ব্রিটেনের দৈনিক গার্ডিয়ান এক প্রতিবেদনে লিখেছে, ইয়েমেনে এক বছর ধরে হামলা চালিয়েও সৌদি সরকার তার প্রধান লক্ষ্য তথা ক্ষমতাচ্যুত মানসুর হাদিকে ইয়েমেনে পুনরায় ক্ষমতাসীন করতে ব্যর্থ হয়েছে। দৈনিকটি লিখেছে, সৌদি সরকার মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের ক্রমবর্ধমান প্রভাব ঠেকানোর যে আশা করেছিল তাও ব্যর্থ হয়েছে। ইয়েমেনে সৌদি হামলা চলতে থাকায় আল-কায়দা ও আইএসআইএল বা দায়েশ লাভবান হচ্ছে বলেও দৈনিকটি মন্তব্য করেছে।  #

 

রেডিও তেহরান /আমির হোসেন

 

 

 

মন্তব্য লিখুন


Security code
রিফ্রেস দিন