শিল্প ও সাহিত্য
রবিবার, 19 মে 2013 14:56

ইরানের গিলান শহর (৩)

আজকের আসরের শুরুতেই গিলানের হস্তশিল্প সামগ্রীর মধ্য থেকে মৃৎ শিল্প নিয়ে কথা বলার চেষ্টা করবো। ইংরেজিতে এই শিল্পকে পটারি বলে অভিহিত করা হয়। বেশিরভাগ গবেষক এবং পুরাতত্ত্ব বিশ্লেষকদের মতে এই পটারি বা মৃৎশিল্পের সূতিকাগার হলো ইরান। তার মানে হলো মৃৎশিল্পের প্রচলন ইরান থেকেই বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিস্তৃতি লাভ করেছে বলে তারা বিশ্বাস করেন। এই শিল্পটি মানব জাতির পক্ষে উৎপাদিত  সবচেয়ে প্রাচীন শিল্পের নিদর্শন। বলা হয়ে থাকে যে আনুমানিক দশ হাজার বছর আগে এই শিল্পটি গড়ে উঠেছে। হস্তশিল্পের বিভিন্ন শাখার মাঝে এই মৃৎশিল্পটির একটা বিশেষ মূল্য ও গুরুত্ব রয়েছে। জন শেইফলি নামের মার্কিন এক লেখক ‘ইরানের শিল্প পর্যালোচনা’ নামে একটি বই লেখেন। ঐ বইতে তিনি মৃৎশিল্পের অবস্থান বা মর্যাদাকে অন্যান্য হস্তশিল্পের ওপরে স্থান দিয়েছেন।

 

মার্কিন ইরান বিশেষজ্ঞ জি গ্লাক মৃৎশিল্প নিয়ে গবেষণা করার জন্যে ইরানের বিভিন্ন অঞ্চল সফর করেছেন। গিলানের মৃৎশিল্প নিয়ে পর্যালোচনা করতে গিয়ে তাঁর ‘ইরানী হস্তশিল্পের ভূবনে’ নামক গ্রন্থে লিখেছেনঃ

 

গিলানে, নারীরাই মৃৎশিল্পের সকল কাজ এমনকি নকশার কাজটিও করে। পুরুষরা বিভিন্ন তৈজস বা পাত্র তৈরি করার জন্যে কাদামাটির মশলা তৈরি করে দেয় আর নারীরা সেই কাদামাটি দিয়ে বিভিন্ন তৈজস বা শিল্প সামগ্রী তৈরি করার পর সেগুলোকে স্থানীয় বাজারে নিয়ে যাবার ব্যবস্থা করে। প্রাগৈতিহাসিক কালের গিলানের মৃৎশিল্পের নিদর্শনগুলো এতোই চমৎকার, অনন্য এবং চিত্তাকর্ষক যে, খুব কমই এগুলোর জুড়ি মিলেছে।এগুলোর গুণমান এতো উন্নত হবার কারণ হলো স্থানীয় মাটির উন্নত বৈশিষ্ট্য। এখানকার কাদামাটির একটা অনন্য বৈশিষ্ট্য হলো মাটি বেশ হালকা এবং কম তাপেই এগুলোকে পোড়ানো যায়।

 

গিলানের মৃৎ শিল্পের ক্ষেত্রে লক্ষ্যণীয় বিষয়টি হলো ব্যাপক বৈচিত্র্য। আজকাল গিলানে যেসব মৃৎ শিল্পের কাজ হয় সেগুলোকে দুটো শ্রেণীতে ভাগ করা যায়। প্রথম শ্রেণীতে পড়বে মানুষের দৈনন্দিন জীবনে প্রয়োজনীয় তৈজসপত্র, বাড়ির ছাদে ব্যবহারের জন্যে তৈরি টালি। দ্বিতীয় শ্রেণীর মৃৎ শিল্পের উদাহরণ হলো আলঙ্কারিক গুণ সম্পন্ন বিচিত্র শৈল্পিক জিনিসপত্র। এই শ্রেণীর মৃৎ শিল্পের জন্যে মেধা এবং সৃজনশীল প্রতিভার প্রয়োজন রয়েছে। গিলানের মৃৎশিল্পের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো এগুলোর চকচকে ভাবটা নেই। গিলানী মৃৎ শিল্পীরা সাধারণতত তাদের কাজে নিকেলের মতো চকচকে রং ব্যবহার করেন না। তাঁরা বরং নিজেদের কাজের মৌলিকতার ওপরই বেশি বেশি জোর দেন। তবে যেসব ক্ষেত্রে চকচকে রঙের ব্যবহার অবশ্যম্ভাবী, সেসব ক্ষেত্রে সবুজ রংটি ব্যবহার করা হয়। এর কারণ হলো গিলানের প্রকৃতির রঙের সাথে সামঞ্জস্য বজায় রাখা।

 

বর্তমানে গিলানের প্রায় বেশিরভাগ এলাকাতেই মৃৎ শিল্পের চর্চা হচ্ছে। বিশেষ করে আসা’লেম, লাহিজান, রুদসার, লাংরুদ, রাশ্‌ত, তলেশ, সৌমে সারা’, অস্তরা’ এবং সিয়াহকাল এলাকায় এই শিল্পটির চর্চা ব্যাপকভাবে চলে আসছে। আসালেমে কাদামাটির উন্নত বৈশিষ্ট্যের কারণে এখানকার মৃৎ শিল্প সামগ্রীর বেশ নামডাক রয়েছে। এই এলাকার মৃৎ শিল্পের ইতিহাস বেশ প্রাচীন এবং সমৃদ্ধ। বলা যেতে পারে এই ইতিহাস কয়েক হাজার বছরের প্রাচীন।

 

গিলান প্রদেশে জঙ্গল থাকায় এবং জঙ্গলে প্রচুর গাছ গাছালি থাকার কারণে এখানে বহু কাঠ উৎপন্ন হয়। আর কাঠের পর্যাপ্ততার কারণে এই প্রদেশে সুন্দর সুন্দর জিনিসের পরিমাণও চোখে পড়ার মতো। বিশেষ করে কাঠের ওপর নকশা করার মতো সূক্ষ্ম শিল্পের প্রচলন এখানে ব্যাপকভাবে দেখতে পাওয়া যায়। কাঠ খোদাই করেও বিভিন্ন জিনিসপত্র তৈরি করা হয়। যেমন ফুলদানি, কান্দন অর্থাৎ চারকোণা জমাট চিনির টুকরো যা চায়ের সাথে চিনির পরিবর্তে খাওয়া হয়-সেগুলো রাখার পাত্র, চকোলেট রাখার পাত্র, শুকনো ফল, বাদাম বা শস্যদানা জাতীয় খাদ্য, বুট, চানাচুর, ভাজা খাদ্য সামগ্রী ইত্যাদি রাখার পাত্র এবং খাবারের পাত্র, সিগারেট অ্যাশ্ট্রে, নলচে, নল এবং এ জাতীয় আরো বহু জিনিসপত্র এখানে তৈরি হয়। এগুলো তৈরি করতে ছোটো বড়ো অনেক সরঞ্জামের প্রয়োজন পড়ে। একজন কাঠমিস্ত্রিীর যতোগুলো যন্ত্রের দরকার একজন কাঠ শিল্পীরও ততোগুলো সরঞ্জাম দরকার পড়ে। রাশত শহরে এই কাঠনির্মিত শিল্পের চর্চা বেশি হয়ে থাকে।

 

পশমি বস্ত্র তৈরি এই গিলান এলাকার অপর একটি প্রধান হস্তশিল্প। এটি গিলানের প্রাচীনতম হস্তশিল্পগুলোর একটি। প্রাচীন যুগ থেকেই এই শিল্পটি গিলানে প্রচলিত ছিল এবং এখনো একইভাবে প্রচলিত আছে। পশম দিয়ে একটা নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ায় বিভিন্ন জিনিসপত্র তৈরি করা হয়। যেমন মাদুর, গালিচা, পোশাক, হ্যাট ইত্যাদি। গিলানে এইসব পশমি শিল্প অন্যান্য এলাকার তুলনায় বেশি ব্যবহার করা হয়। পশমি শিল্পের প্রতি গিলানের জনগণের এতো বেশি আগ্রহের কারণ হলোঃ এই পশমি সামগ্রি আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রণে খুবই উপযোগী। কেননা এর মূল উপাদানটাই হলো পশম। গ্রামবাসীরা, বন জঙ্গলের অধিবাসীরা এবং যারা পশুপালন করে তারাও শীত এবং বৃষ্টি থেকে বাঁচার জন্যে গায়ের ওপর জড়ানোর উপযোগী এক ধরনের পোশাক তৈরি করে এই পশম দিয়ে। যেহেতু ঘাড়ের ওপরেই পশমি ঐ লেবাসটি পরা হয়, সেজন্যে গিলানের বেশিরভাগ এলাকায় এটি ‘দুশি’ নামেই পরিচিত। ফার্সি দুশ মানে ঘাড়। ঘাড়ের ওপর পরার কারণে পশমি এই পোশাকটির এমন নাম।

 

পশমি হস্তশিল্প ছাড়াও গিলানের আরো কটি বিখ্যাত শিল্পের মধ্যে রয়েছে হাতে বোণা রেশমি বিভিন্ন সামগ্রী এবং সূতার তৈরি বিভিন্ন সামগ্রী। গিলানের রেশমি সূতোয় বোণা সামগ্রী রং এবং বুণনের দিক থেকে বিস্ময়কর সুন্দর। কাপড়ের ওপরে নকশা তৈরির কাজের বেলাতেও গিলানের অবস্থান অনেক উর্ধ্বে। বিশেষ করে এখানকার রাশত উপশহরটিতে এই শিল্পের ব্যাপক প্রচলন ছিল। তবে ইদানিং অবশ্য ততোটা জাকজমক আর নেই। গিলানের এইসব হস্তশিল্প সামগ্রী গিলানের বিভিন্ন বাজারে খুব সহজেই দেখা যাবে। দেখার সুযোগ থাকলে ভুল করবেন না।#

 

রংধনু আসরের শিশু-কিশোর বন্ধুরা, কেমন আছো তোমরা? আশা করি যে যেখানে আছো ভাল ও সুস্থ আছো। আর ভাল তো থাকারই কথা। কারণ তোমাদের মধ্যে অনেকেই এবারের এসএসসি, দাখিল কিংবা সমমানের পরীক্ষায় কৃতিত্বের সঙ্গে পাস করেছো। তাছাড়া এবারই প্রথম মাধ্যমিক ও সমমানের পরীক্ষায় অতীতের রেকর্ড ভঙ্গ করে ৮৯ দশমিক ০৩ শতাংশ শিক্ষার্থী পাস করেছে। এদের মধ্যে ৯১ হাজার ২২৬ জন জিপিএ-৫ বা এ প্লাস পেয়েছে। এবার শতভাগ পাস করা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা যেমন বেড়েছে, তেমনি কমেছে শতভাগ ফেল করা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যাও।   

 

আমরা লক্ষ্য করেছি যে, ভাল রেজাল্টের কারণে তোমাদের পরিবার, স্কুল  ও মাদ্রাসায় বয়ে গেছে। দেশের চলমান রাজনৈতিক সংকটের মধ্যেও শিক্ষার্থীদের নিষ্পাপ ও নির্মল হাসিতে ভরে ওঠেছে স্কুল, মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। বসে থাকেননি শিক্ষক-অভিভাবকরাও, তারাও তাল মেলান শিক্ষার্থীদের আনন্দ উদযাপনে। সর্বত্র দেখা গেছে মিষ্টি বিতরণ আর শুভেচ্ছা বিনিময়ের ধুম।

 

বন্ধুরা, তোমাদের এ সাফল্যে আমরাও আনন্দিত। তবে এত দূর থেকে তোমাদের জন্য তো মিষ্টি পাঠাতে পারব না, তাই আমরা তোমাদের জানাতে চাই কুমিল্লার রসমালাই, বগুড়ার দই, টাঙ্গাইলের পোড়াবাড়ির চমচম,  নাটোরের কাচাগোল্লা,নওগাঁর প্যারা সন্দেশ, মুক্তাগাছার মণ্ডা, মাদারীপুরের গুড়, কিশোরগঞ্জ-নেত্রকোণার বালিশ মিষ্টি, কুমিল্লার রসমালাই, যশোরের জামতলার মিষ্টি, সাতক্ষীরার সন্দেশ, রাজশাহীর তিলের খাজা ও শেরপুরের ছানার পায়েসের শুভেচ্ছা।

 

বন্ধুরা, এসএসসি, দাখিল ও সমমানের পরীক্ষায় যারা জিপিএ-ফাইভ বা এ-প্লাস পেয়েছে তাদের মধ্য থেকে চারজন বন্ধুকে নিয়ে আমরা আজকের আসর সাজিয়েছি।  এ অনুষ্ঠানে আমরা তাদের সাফল্যের কারণ, পড়াশুনার পদ্ধতি, ভবিষ্যত পরিকল্পসহ বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলব। আশা করি এ অনুষ্ঠান তোমাদের পড়াশোনার আগ্রহকে আরো বাড়িয়ে দেবে।

 

অনুষ্ঠানটি শোনার জন্য এখানে ক্লিক কর

বৃহস্পতিবার, 16 মে 2013 16:14

ইরানের গিলান শহর (২)

আমরা ইরানের উত্তরাঞ্চলীয় প্রদেশ শোমলে’র গিলান সফরে গিয়েছিলাম। সেখানকার ভৌগোলিক অবস্থান, অনাবিল প্রাকৃতিক দৃশ্যাবলি এবং ঐতিহাসিক বিভিন্ন নিদর্শনের সাথে পরিচিত হবার চেষ্টা করেছি। আজকের পাঠে আমরা গিলান প্রদেশের সাথে আরো বেশি পরিচিত হবার চেষ্টা করবো ইনশাআল্লাহ।

 

গিলান নামটি এসেছে ‘গিল’ থেকে। অবশ্য গিলান প্রদেশের নামকরণ নিয়ে যথেষ্ট মতপার্থক্য রয়েছে। কোনো কোনো গবেষকের মতে এই এলাকায় ‘গেলায়ি’ নামের একটি গোত্রের বসবাস ছিল। কেউ কেউ আবার এই গিলায়ি’কে বলছেন ‘গেল্‌’ গোত্র। তো গিলায়ি কিংবা গেল্‌ যা-ই হোক না কেন এই গোত্রের নামের সাথে মিল রেখেই এলাকাটির নাম হয়ে গেছে গিলান। ফার্সি ভাষায় ‘গেল্‌’ এর বহুবচন হলো গেলান। আর সময়ের বিবর্তনে এই গেলান’এরই পরিবর্তিত নাম হয়ে গেছে গিলান। গবেষকদের মধ্যে যাঁরা মনে করেন ‘গেল্‌’ শব্দ থেকে গিলান নামকরণ করা হয়েছে, তাঁদের ভাষ্য হলো এই এলাকাটি ছিল সাধারণত জলাভূমি বা কর্দমাক্ত। রাশিয়ান বিশিষ্ট চিন্তাবিদ ‘আলেক্সান্দার খোদেস্কু’ নিজেও এই মতের পক্ষে। তিনি তাঁর ‘গিলান ভূমি’ নামক গ্রন্থে লিখেছেনঃ এই প্রদেশের নাম –যাকে এই এলাকার লোকজন কখনো কখনো ‘গিল্‌’, কখনোবা গিলান আবার অনেক সময় গিলানাত নামে অভিহিত করে থাকে-সেই এলাকাটি মূলত জলাভূমি। গেল্‌ শব্দটেই মূলত এই এলাকার স্থানীয় জনগণের নিজস্ব উচ্চারণে ‘গেল্‌’ হয়ে গেছে। আর গিলান কিংবা গিলানাত দুটো শব্দই এই নামটির বহুবচন। আসলে বাস্তবেও কাস্পিয়ান সাগর তীরবর্তী এই ভূখণ্ডটি ইরানের উত্তরাঞ্চলের অন্যান্য এলাকার তুলনায় খানিকটা নীচু।

 

‘আলেক্সান্দার খোদেস্কু’ আরো বলেছেনঃ অসংখ্য বহতা নদীর জল এসে এই এলাকাটিকে ভিজিয়ে তৃপ্ত করে দিয়ে যায়, পূর্ণ করে দিয়ে যায় পুরো পরিবেশটাকে। কাস্পিয়ানের তীরবর্তী পর্বতগুলো থেকে নদীগুলো জন্ম লাভ করেছে। যেহেতু  কাস্পিয়ানের পাশ্ববর্তী গিলান একটি সমতলভূমি, অন্তত ঢালু এলাকা খুব কম সেহেতু নদীর পানি হুট করেই বয়ে যেতে পারে না। আর সেজন্যেই এলাকাটির তৃষ্ণা মিটিয়ে দিয়ে যেতে পারে এইসব নদীর জল।’

 

ইরানের সবুজ শ্যামল প্রকৃতির প্রদেশ গিলান ইতিহাসের কাল পরিক্রমায় সাহসী, বীরত্বপূর্ণ ও নির্ভীক হৃদয়ের মানুষের এলাকা ছিল। পর্বতগুলোর পাদদেশ থেকে শুরু করে সেই বৃক্ষ সুশোভিত সু উচ্চ পর্বতচূড়া পর্যন্ত অঞ্চল, জল টৈটুম্বুর নদীমালা ইত্যাদি পরিবেষ্টিত চমৎকার ভূখণ্ড এই গিলানে বসবাস করেছেন অকুতোভয় বীর সংগ্রামীরা। স্বাভাবিকভাবেই বোঝা যায় যে এই এলাকার লোকজন ছিল যুদ্ধ বা সংগ্রামের ক্ষেত্রে ব্যাপক অভিজ্ঞ ও বিস্ময়কর কৌশলী। তারা বৃক্ষময় এইসব জঙ্গলে কিংবা পার্বত্য উঁচু নীচু পরিবেশের মাঝে আশ্রয় নিয়ে নিশ্চিন্তে, স্বাধীনভাবে বসবাস করতেন। গিলান ভূখণ্ড সম্পর্কে যে বা যাঁরাই গবেষণা করেছেন তারাই একথা অকপটে বলে গেছেন যে, সেই প্রাচীন যুগের ইতিহাসবিদ বা গবেষক থেকে শুরু করে ইসলামী যুগ এবং ইসলাম পরবর্তী বিভিন্ন যুগের গবেষক একেবার আধুনিক পর্যন্ত সবাই একথা স্বীকার করেছেন যে, গিলানীরা খুব সাহসী ও অকুতোভয় বীরের জাতি। তারা ছিল খুবই স্বাধীনচেতা মনোভাবের অধিকারী। সেজন্যেই তারা কখনোই বিদেশীদের কাছে মাথানত করতে রাজি হয় নি। এ রকমই বীরত্বপূর্ণ কিছু সংগ্রামী ঘটনার প্রতি আমরা সংক্ষিপ্ত নজর বুলানোর চেষ্টা করবো।

 

ইরানের অপরাপর প্রদেশগুলোর মতো গিলান প্রদেশটিও বিভিন্ন রকম এলাকায় বিভক্ত। যেমনঃ শহর উপশহর, বিভিন্ন বিভাগ, গ্রাম এবং পল্লী ইত্যাদি।  এখানকার এলাকাগুলোর একটা বৈশিষ্ট্য হলো ভাষাগত দিক থেকে এই এলাকাগুলো বা গোত্রগুলোর মাঝে পার্থক্য রয়েছে। রয়েছে এই চার অঞ্চলের স্থানীয় ও গোত্রীয় পৃথক পৃথক ইতিহাসও। গিলানের অর্থনীতি দাঁড়িয়ে আছে কৃষিকাজ, পশুপালন, মাছ শিকার এবং মধুর চাষ। এর বাইরেও রেশমের চাষ এখানকার অর্থকরী একটি পেশা।  গিলানে যেসব কৃষিপণ্য বেশি বেশি উৎপন্ন হয় সেগুলো হলো ধান এবং চা। লাহিজান এবং রুদসারসহ গিলানের বিভিন্ন শহরে এগুলোর চাষ হয়। আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থকরী ফসল এখানে রয়েছে, সেটা হলো যেইতুন বা অলিভ। রুদবার উপশহরে এর ফলন ব্যাপক পরিমাণে হয়ে থাকে। মাছ শিকারের জন্যে গিলানের তিনটি এলাকা বেশ প্রসিদ্ধি লাভ করেছে। একটি হলো বন্দর অস্তরা’, অপরটি হলো বান্দর কিয়শাহর এবং তৃতীয়টি হলো বন্দর আনযালি। আর মধু চাষের জন্যে গিলানের আশকেবার উঁচু এবং আশকেবার নিচু, আম্মরলু, দেইলামন এবং তালেশ-এই কটি এলাকা বেশ নামকরা।

 

পশুপালন হয়ে থাকে পাহাড়ের পাদদেশীয় এলাকায়। গম, যব, চিনা বাদাম, তামাক এবং হেযেল্‌নাট -যাকে ফার্সিতে ফানদোক বলা হয়, এগুলো বাদাম জাতীয় তবে তেলবহুল একধরনের শস্যদানা-এইসব পণ্যও খুব বেশি উৎপাদিত হয় প্রায় সমগ্র গিলানজুড়ে। ক্যাভিয়ার আরেকটি মূল্যবান খাদ্যবস্তু যা প্রচুর পরিমাণে এখানে পাওয়া যায়। ক্যাভিয়ার হলো মাছের ডিম। দেখতে শাগুদানার মতো তবে কালো রঙের। মাছ শিকারীদের মাধ্যমেই এই মূল্যবান পণ্যটি পাওয়া যায়। ক্যাভিয়ারের বেশিরভাগই রপ্তানী করা হয় ইরানের বাইরে। ইরানের রপ্তানীযোগ্য পণ্যের মধ্যে ক্যাভিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ পণ্য হিসেবে স্বীকৃত। গিলানের গ্রামীণ বা উপজাতীয় সমাজে এইসব বিচিত্র পেশার পাশাপাশি আরো একটি পেশার প্রচলন রয়েছে। সেটা হলো হস্তশিল্প। আবহাওয়াগত বৈশিষ্ট্যের কারণেও এখানে স্বাভাবিকভাবেই এইসব হস্তশিল্পের প্রচলন গড়ে উঠেছে।

 

গিলানের ধান চাষীরা প্রতি বছরই মাত্র পাঁচ মাস কৃষিকাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকে। ধান বোণা থেকে ধান কাটা পর্যন্ত সময়টুকুতেই তারা একাজে ব্যস্ত থাকে। বাকি লম্বা সময় ধরে কৃষিজীবীগণ তাদের আর্থিক যোগানের জন্যে হস্তশিল্প সামগ্রী বোণা বা তৈরির কাজে সময় দেন। এখানে একটা কথা উল্লেখ করার মতো, তা হলো প্রাচীনকালে গিলানে এমন কিছু শিল্পের প্রচলন ছিল যেগুলোর ততোটা কদর বা প্রচলন এখন আর নেই। যেমন খোদাই শিল্প, কাঁচ শিল্প এবং ধাতব শিল্প। বিভিন্ন গবেষণায় এগুলোর সমৃদ্ধ ঐতিহ্যের কথা প্রমাণিত হয়েছে।প্রফেসর গ্রিসম্যানের লেখাতেও তার প্রমাণ পাওয়া যায়।

 

বিভিন্ন তৈজস এবং মাদুর তৈরির ক্ষেত্রেও গিলানের ঐতিহ্য বেশ সমৃদ্ধ বলে বিভিন্ন জনের লেখায় উঠে এসেছে। গবেষকদের অনেকর মতেই পাথর খোদাই শিল্পের পরই যে শিল্পটির সাথে মানব সমাজের পরিচিতি ঘটেছে তা হলো এই তৈজস আর মাদুর তৈরি শিল্প। এই মাদুর বোণার সূত্র ধরেই জন্ম নিয়েছে কাপড় বোণা, গেলিম বোণা ইত্যাদির মতো বুনন শিল্প।#