এই ওয়েবসাইটে আর আপডেট হবে না। আমাদের নতুন সাইট Parstoday Bangla
বৃহস্পতিবার, 06 ডিসেম্বর 2012 16:39

পাশ্চাত্যে পারিবারিক সংকট: (ফেমিনিজম-১)

ফেমিনিজম হচ্ছে একটি আন্দোলন বা মতবাদ, যা পাশ্চাত্যে রেনেসা ও এনলাইটমেন্টের যুগের পর হিউম্যানিজম, লিবারেলিজম ও সেক্যুলারিজমের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং এ মতবাদে মূলত নারী অধিকার বাস্তবায়নের কথা বলা হয়েছে। ফেমিনিজম শব্দটির উতপত্তি ফরাসি শব্দ থেকে। নারী অধিকারের সমর্থনে ফেমিনিজম শব্দটি সর্বপ্রথম ব্যবহার করেন ১৯ শতকের ফরাসি সমাজতন্ত্রী চার্লস ফুয়েরার। এর আগে ফেমিনিজম শব্দটি চিকিতসা ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হতো এবং এর মাধ্যমে লিঙ্গগত সমস্যার বিষয়টি বুঝানো হতো। পুরুষের মাঝে নারীর বৈশিষ্ট্যের প্রভাব প্রকট হয়ে ওঠলে সাধারণভাবে সেটাকে ফেমিনিজম বলা হতো। কিন্তু পরবর্তীতে উনিশ শতকের প্রথম ভাগে তা নারীর অধিকার আদায়ের আন্দোলন হিসেবে পরিচিতি লাভ করে।

পাশ্চাত্যের ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, নারীদের অধিকার লংঘনের জবাবেই ফেমিনিজমের উৎপত্তি ঘটেছে। কারণ পাশ্চাত্যে নারীর ওপর নির্যাতন ও বৈষম্যের ইতিহাস অত্যন্ত করুণ। ইতিহাসের সব পর্যায়েই নারীর ওপর ব্যাপক নির্যাতন হয়েছে। সেখানে নারীকে পুরুষের পণ্য হিসেবে গণ্য করা হতো। অতীতে পাশ্চাত্যের অনেক বড় বড় ব্যক্তিত্বরাও নারীকে দ্বিতীয় শ্রেনীর মানুষ ও পাপের উতস বলে অভিহিত করেছেন। সে সময় পাশ্চাত্যের নারীরা সামাজিক ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশ নিতে পারতো না। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, প্রাচীন সভ্যতার দাবিদার গ্রিস ও রোমেও নারীদেরকে সম্মান ও মর্যাদা দেয়া হতো না। সে সময় নারীদেরকে পশুর মতো বেচা-কেনা করা হতো। তাদের আইনি অধিকার হরণ করা হয়েছিল।

মধ্য যুগে জার্মান দার্শনিক আর্থার শোপেনহাওয়ার ও খ্রিস্টান দার্শনিক সেন্ট অগাস্টিনের মতো পাশ্চাত্যের চিন্তাবিদরাও নারীদেরকে পশুর সমতুল্য হিসেবে ঘোষণা করে গেছেন। তাদের কেউ কেউ  আবার এটাও বিশ্বাস করতেন যে, পবিত্রতার দিক থেকে নারীকে পশুর সঙ্গেও তুলনা করা যায় না এবং তারা নারীদেরকে শয়তানের বংশধর বলে মনে করতেন। বিকৃত হয়ে যাওয়া ইহুদি ধর্মের দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ তালমুদে লেখা হয়েছে, 'পুরুষদেরকে প্রতি দিন আল্লাহর অনুগ্রহ সংক্রান্ত তিনটি দোয়া পড়তে হবে: এক-সেই খোদা মহিয়ান, যিনি আমাকে ইহুদি হিসেবে সৃষ্টি করেছেন, যিনি আমাকে নারী হিসেবে সৃষ্টি করেননি এবং যিনি আমাকে অজ্ঞ হিসেবে সৃষ্টি করেননি।' এখানেই স্পষ্ট তারা নারীদেরকে কতটা নিচু মনে করে।

খ্রিষ্টান ধর্ম বিকৃত হওয়ার পর সেখানেও নারীদেরকে দ্বিতীয় শ্রেণীর মানুষ হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে। খ্রিষ্টানরা মনে করে, বিশ্বের প্রথম পুরুষ অর্থাত আদম(আঃ)কে বেহেশতে প্রতারিত করেছিলেন হাওয়া(আ.)। এ ধর্মমতে, নারীরা পুরুষদেরকে শিক্ষা দেয়ার যোগ্যতা রাখে না। কিন্তু একজন নারী মা,স্ত্রী ও কন্যা হিসেবে কীভাবে মর্যাদাপ্রাপ্ত হবেন,ইসলাম তা বলে দিয়েছে। ইসলাম ধর্মে মায়ের মর্যাদা সর্বোচ্চ এবং কাউকেই এত অধিক মর্যাদা দেয়া হয়নি। 'মায়ের পায়ের নিচে সন্তানের বেহেশত' হাদিসের এই ঘোষণার মাধ্যমে নারীকে মর্যাদাবান করেছে ইসলাম। পবিত্র কোরানের সূরা লোকমানে আল্লাহতায়ালা মানুষকে তার পিতামাতার সাথে সদ্ব্যবহার করার নির্দেশ দিয়েছেন। এ কারণে  ইসলাম ধর্মের অনুসারী নারীদের জন্য ফেমিনিজম বা তথাকথিত নারী আন্দোলনের প্রয়োজন নেই বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

আসলে পাশ্চাত্যে নারীর ওপর দীর্ঘ দিনের জুলুম ও বৈষম্যের কারণে ফেমিনিজমের উতপত্তি ঘটেছে। সেক্যুলারিজম, হিউম্যানিজম ও লিবারেলিজম ছাড়াও পুঁজিবাদের নেতিবাচক প্রভাবে সেখানকার নারীরা বিক্ষুব্ধ হয়ে ফেমিনিজমের ব্যানারে আন্দোলন শুরু করেছিল। নারী অধিকার আদায় সংক্রান্ত আন্দোলন ফেমিনিজম প্রথমে ফ্রান্সে এবং পরবর্তীতে আমেরিকায় শুরু হয়। এরপর পাশ্চাত্যের অন্যান্য দেশেও তা ছড়িয়ে পড়ে। কারণ পাশ্চাত্যে আইন-আদালত, রাজনীতি ও অর্থনীতিতে নারীদের প্রতি বৈষম্য ছিল সুস্পস্ট। পাশ্চাত্যের নারীরা ভোটাধিকারের দাবিতে উনিশ শতকের প্রথমার্ধে আন্দোলন শুরু করে। প্রবল আন্দোলনের মুখে কয়েকটি দেশে নারীদের ভোটাধিকারকে স্বীকৃতি দেয়া হয়। ব্রিটেন ১৯১৮ সালে পাশ্চাত্যের প্রথম দেশ হিসেবে নারীদের ভোটাধিকার মেনে নেয়। এরপর ১৯২০ সালে আমেরিকার নারীরা ভোটাধিকার পায়।

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহিল উজমা খামেনেয়ি, পাশ্চাত্যে নারীদের ভোটাধিকার প্রাপ্তি প্রসঙ্গে বলেছেন, বিংশ শতাব্দির দ্বিতীয় দশক পর্যন্ত ইউরোপের কোথাও কোনো নারীর ভোটাধিকার ছিল না। ইউরোপের যেসব দেশে গণতন্ত্র ছিল সেখানকার নেতারাও ১৯১৬ অথবা ১৯১৮ সালের পর থেকে ধীরে ধীরে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে শুরু করে যে,নারীদেরকে পুঁজির অধিকার উচিত এবং মতামত প্রকাশের অধিকার দেয়া যেতে পারে। পুরুষের মতো নারীকেও সামাজিক অধিকার দেয়ার বিষয়টি তাদের মাথায় আসে। কাজেই পাশ্চাত্য অনেক দেরিতে ঘুম থেকে জেগেছে এবং বিষয়টি উপলব্ধি করতে পেরেছে।

এর আগেই বলেছি, ফেমিনিজমের প্রথম দিককার উদ্দেশ্য নারীর মানবিক অধিকার আদায়। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীতে এসে ফেমিনিজম  নতুন মোড় নেয়, যেখানে নারীর যৌন আবেদন উঠে এসেছে মূখ্য বিষয় হিসেবে। এই নতুন আন্দোলনের নাম দেয়া হয়েছে থার্ড ওয়েভ ফেমিনিজম বা তৃতীয় মাত্রার নারীবাদিতা। এই তৃতীয় মাত্রায় নারী তার শারীরিক আবেদনের প্রকাশকে তার স্বাধীনতা হিসেবে তুলে করছে। তৃতীয় মাত্রার নারীবাদীরা তাদের শারীরিক প্রদর্শনীর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন। এ ধারায় নারীরা নিজেকে করে তুলছেন আকর্ষণীয়,যৌন-আবেদনময়ী এবং লাস্যময়ী। তবে নব্বইয়ের দশকের সেকেন্ড ওয়েভ ফেমিনিজম বা দ্বিতীয় মাত্রার নারীবাদীরা চলমান অবস্থার বিরোধিতা করছেন। তাদের মতে, নারীর শারীরিক  প্রদর্শনী নারীর নারীত্বের অবমাননা। এর ফলে নারী উল্টো পুরুষের প্রলোভনের শিকারে পরিণত করছে নিজেকে। নিজেকে নামিয়ে আনছে যে কোনো ভোগ্য পণ্যের কাতারে। শারীরিক আবেদনকে পুঁজি করে নিজের অবস্থান দৃঢ় করার এই মানসিকতা নারীর জন্যই বুমেরাং হয়ে দাঁড়াচ্ছে। এর বোঝা টানতে হচ্ছে নারীকেই।

এ অবস্থায় এ প্রশ্ন উঠতেই পারে, শুধু পণ্য আর আকর্ষণীয় হয়ে ওঠাই যদি থার্ড ওয়েভ ফেমিনিজম এর মূলকথা হয়ে থাকে, তাহলে পরিবারপ্রথা আর সামাজিক মূল্যবোধকে অতিক্রম করে তা একজন নারীকে কতদূর এগিয়ে নিয়ে যাবে? কাজেই ফেমিনিজমের পরিণতি শুভ হয়নি বরং নারীর জন্য আরো অকল্যান বয়ে এনেছে। ফেমিনিজম হয়ে উঠেছে পরিবার প্রথা ধ্বংসের হাতিয়ার।

মন্তব্য লিখুন


Security code
রিফ্রেস দিন