এই ওয়েবসাইটে আর আপডেট হবে না। আমাদের নতুন সাইট Parstoday Bangla
মঙ্গলবার, 18 ডিসেম্বর 2012 13:31

পাশ্চাত্যে পারিবারিক সংকট: (ফেমিনিজম-২)

পাশ্চাত্যে পারিবারিক সংকট: (ফেমিনিজম-২)

পরিবার ব্যবস্থায় ফেমিনিজমের ধ্বংসাত্মক প্রভাবগুলোর একটি হচ্ছে, নারী ও পুরুষের মধ্যে ঝগড়া-বিবাদ বৃদ্ধি। ফেমিনিস্টরা মনে করেন, পুরুষ হচ্ছে নারীর আপোষহীন শত্রু। কাজেই পুরুষের আধিপত্য থেকে মুক্তির জন্য নারীকে পুরুষের কাছ থেকে দূরে থাকতে হবে। নারীবাদীদের মতে, পরিবার ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে পুরুষদের স্বার্থ রক্ষার জন্যে এবং স্বাধীন জীবন যাপনের জন্য পরিবার ব্যবস্থা বর্জন করা জরুরি। উগ্র ফেমিনিস্টরা মনে করে, সব নারীর স্বার্থ অভিন্ন এবং তারা সবাই পুরুষদের নির্যাতনের শিকার। এ কারণে নারী ও পুরুষের সম্পর্ক সদা সংঘাতময়। কোনো কোনো উগ্র নারীবাদী এ দাবিও তুলেছেন যে, নারীদের জন্য আলাদা একটি সমাজ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে অথবা তাদের স্বতন্ত্র দ্বীপাঞ্চল বরাদ্দ দিতে হবে। ফেমিনিজমের দর্শনটাই এমন যে, নারী ও পুরুষ একে অপরের পরিপূরক নয় বরং পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী ও শত্রু। তাদের এ দৃষ্টিভঙ্গীর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে গোটা সমাজে।

 

কিন্তু পবিত্র ইসলাম ধর্মের দৃষ্টিতে, নারী ও পুরুষ হচ্ছে পরস্পরের পরিপূরক ও সহযোগী। পুরুষ হচ্ছে পরিবারের তত্ত্বাবধায়ক এবং পরিবারের সদস্যদের ব্যয়নির্বাহী। অন্যদিকে, নারী হচ্ছে পরিবারে ভালোবাসা ও দয়া-মায়ার পরিবেশ নিশ্চিত করার জন্য দায়িত্বশীল। পরিবারকে সঠিক পথে পরিচালিত করার ক্ষেত্রে নারীর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। কোরানের ঘোষণা অনুযায়ী, নারী ও পুরুষ হচ্ছে পরস্পরের পোশাকস্বরূপ। তারা একে অপরের দোষ-ত্রুটি নিয়ে বাড়াবাড়ি করার পরিবর্তে সেগুলোকে অন্যের কাছ থেকে আড়াল করে রাখে। নারী ও পুরুষের পারস্পরিক সহযোগিতার মধ্যদিয়েই গড়ে উঠে শান্তির নীড় তথা পরিবার। ইসলাম ধর্মে নারীকে ব্যাপক মর্যাদা দেয়া হয়েছে। এ ধর্মে মায়ের মর্যাদা সর্বোচ্চ এবং কাউকেই এত অধিক মর্যাদা দেয়া হয়নি। 'মায়ের পায়ের নিচে সন্তানের বেহেশত' হাদিসের এই ঘোষণার মাধ্যমে নারীকে মর্যাদাবান করেছে ইসলাম।

 

ইসলাম ধর্মের শিক্ষার ভিত্তিতে একজন মুসলিম স্বামী তার স্ত্রীকে জীবন চলার পথে ভালেবাসা, কল্যাণ, প্রশান্তি, সৌন্দর্য ও পবিত্রতার মাধ্যম বলে মনে করে। পাশাপাশি স্ত্রী তার স্বামীকে আস্থা-বিশ্বাস, বন্ধুত্ব ও আন্তরিকতার প্রতীক বলে গণ্য করে। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহিল উজমা খামেনেয়ি নারী ও পুরুষের অধিকার সম্পর্কে বলেছেন, ইসলাম ধর্মে নারী বা পুরুষের অধিকারকে উপেক্ষা করা হয়নি। বরং উভয়ের প্রকৃতিগত বৈশিষ্ট্যকে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। উভয়ের পাল্লাই সমান সমান। গুরুত্বের দিক থেকে যদি প্রাত্যহিক জীবনে নারীর কোমলতা, সৌন্দর্য, শৃঙ্খলাবোধ ও প্রশান্তি দেয়ার ক্ষমতাকে এক পাল্লায় তোলা হয়; আর অন্য পাল্লায় পুরুষের পরিচালনা ও উতপাদন ক্ষমতা এবং নারীর জন্য আস্থা ও নির্ভরতার কেন্দ্রস্থল হওয়ার যোগ্যতাকে তোলা হয়, তাহলে দেখা যায় উভয় পাল্লা সমান সমান। কোনোটিই অপরটির চেয়ে কম-বেশি নয়।

 

বর্তমান যুগেও বহু প্রখ্যাত চিন্তাবিদ নারী ও পুরুষের মধ্যে দৈহিক ও আত্মিক পার্থক্যকে স্বাভাবিক বলে মনে করেন এবং তাদের মতে, নারী ও পুরুষের মধ্যকার প্রকৃতিগত পার্থক্য সুখি ও সমৃদ্ধ পারিবারিক জীবনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমেরিকার ভার্জিনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও গবেষক স্টিফেন রোড্‌জ গবেষণার মাধ্যমে ফেমিনিজমের ৪০ বছরের বিচ্যুতিগুলো প্রমাণ সহকারে তুলে ধরেছেন। তিনি 'টেকিং সেক্স ডিফারেন্সেস সিরিয়াসলি' শীর্ষক বইয়ে লিখেছেন, একজন স্বামী বা  বাবা হিসেবে পরিবারের সুস্থতা বিধান ও সন্তান প্রতিপালনের ক্ষেত্রে পুরুষের অঙ্গীকার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি নারীর সক্ষমতা আরো সুক্ষ্ম। নারীর যে শক্তি, তা দক্ষতার সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করে, পারিবারিক বন্ধন সুদৃঢ় করে এবং সন্তান জন্ম দান ও লালন-পালনের মাধ্যমে সমাজ প্রতিষ্ঠা করে।

 

ফেমিনিজমের অন্য যে বিষয়টি পারিবারিক ব্যবস্থায় বড় আঘাত হেনেছে, তাহলো-বিয়ে ও পরিবার প্রথার বিরুদ্ধাচরণ। নারীবাদীরা বিয়ে, সন্তান ধারণ এবং সন্তান লালন-পালনকে অপমান বলে মনে করে, কারণ তাদের দৃষ্টিতে পরিবারের ভিত্তি গড়ে উঠেছে পুরুষের আধিপত্যের মধ্যদিয়ে। তারা পরিবারে দায়িত্ব পালনকে স্বাধীনতার পরিপন্থী বলে মনে করে। পরিবার ব্যবস্থা সামাজিক জীবনের এবং সঠিক মানুষ গড়ে তোলার ভিত্তি হলেও ফ্রান্সের নারীবাদী লেখক মিস সিমন দুবেভার এই প্রথার সমালোচনা করেছেন। তিনি বিয়েকে নারীর দুঃখ-কষ্টের উৎস হিসেবে আখ্যায়িত করে লিখেছেন, ফেমিনিজমের মৌলিক বিষয়গুলোর একটি হচ্ছে, সন্তান ধারণ তথা পারিবারিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়া। এ কারণে ফেমিনিজমের বিস্তৃতির সঙ্গে সঙ্গে পাশ্চাত্যে তালাকের পরিমাণ বেড়ে গেছে এবং বৈধ সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার প্রতি আগ্রহ কমে গেছে।

 

পাশ্চাত্যের দেশগুলোতে বিয়ে বহির্ভূত যৌন সম্পর্কের মধ্যদিয়ে জন্ম নেয়া শিশুর সংখ্যা অনেক বেড়েছে। বর্তমানে পাশ্চাত্যে শিশুদের প্রায় অর্ধেকই একজন অভিভাবক অর্থাত বাবা অথবা মায়ের সঙ্গে জীবন যাপন করছে। এমন অনেক শিশুই জন্মের পর কোনো দিনই তার বাবাকে দেখতে পায়নি। ফলে তাদের বাবা কে, সেটা তারা জানে না।

অবাধ যৌনাচারের কারণে অনেক নারীও জানেন না যে, তার সন্তানের প্রকৃত বাবা কে? পরিবার ব্যবস্থার বিরুদ্ধে নানা অপপ্রচারের কারণে বিয়ে ও পরিবার গঠনের স্বাদ পাওয়ার আগেই পাশ্চাত্যের তরুণীরা তা থেকে পিছিয়ে আসছে। মার্কিন লেখক ও সাংবাদিক জেনিস শ ক্রাউস এ সম্পর্কে লিখেছেন, আমেরিকায় উপযুক্ত বয়স পার হওয়ার পরও যারা বিয়ের পিড়িতে বসছেন না, তাদের সংখ্যা অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে এখন বেশি।

 

ফেমিনিজমের সমর্থকরা পুরুষকে আধিপত্যবাদী হিসেবে গণ্য করার কারণে সমকামিতার দিকে ঝুকে পড়ছে এবং নারীর সঙ্গে নারীর যৌন সম্পর্ককে উস্কে দিচ্ছে। একই লক্ষ্যে তারা পুরুষের সঙ্গে পুরুষের যৌন সম্পর্ককেও উতসাহিত করছে। পরিবারে নারীর বিরুদ্ধে সহিংস আচরণের ঘটনা একেবারেই ঘটে না, এমন কথা আমরা বলছি না। কিন্তু তাই বলে এ অজুহাতে সমাজ কাঠামো থেকে পরিবার ব্যবস্থাকেই উপড়ে ফেলতে হবে, এ কথা কোনো বিবেকবান মানুষ মেনে নিতে পারে না। ইসলাম ধর্ম নারীর প্রতি সহিংসতাকে সমর্থন করে না। কাজেই ইসলাম ধর্মের আলোকে পরিবারের সদস্যরা একে অপরের সঙ্গে ভালো ও যুক্তিপূর্ণ আচরণ করলে পরিবার ব্যবস্থা নিশ্চিতভাবেই গোটা মানব জাতির জন্য আশির্বাদ হয়ে টিকে থাকবে। যারা পরিবার ব্যবস্থাকে অভিশাপ হিসেবে তুলে ধরছে তারা আসলে মানব জাতিরই ধ্বংস চাইছে, এটা সবাইকে বুঝতে হবে।

মন্তব্য লিখুন


Security code
রিফ্রেস দিন