এই ওয়েবসাইটে আর আপডেট হবে না। আমাদের নতুন সাইট Parstoday Bangla
মঙ্গলবার, 01 জানুয়ারী 2013 15:06

পাশ্চাত্যে পারিবারিক সংকট: (ফেমিনিজম-৩)

পাশ্চাত্যে পারিবারিক সংকট: (ফেমিনিজম-৩)

পাশ্চাত্যের দেশগুলোতে ফেমিনিজম বা নারীবাদ ক্রমেই প্রভাব বিস্তার করছে। এ কারণে এ মতবাদ বা আন্দোলনের ধ্বংসাত্মক প্রভাবও ক্রমেই আরো সুস্পষ্ট হচ্ছে। আমরা এর আগেও বলেছি, সমাজের মূল ভিত্তি হচ্ছে পরিবার। সমাজ ও সভ্যতা গঠনে নারীর ভূমিকা অনস্বীকার্য। মা অথবা স্ত্রী হিসেবে নারী সব সময়ই সম্মানিত। বিশ্বনবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) মায়ের মর্যাদা সম্পর্কে বলেছেন, মায়ের পায়ের নিচে সন্তানের বেহেশত। আদিকাল থেকে সব সমাজেই মায়েরা অত্যন্ত সম্মানিত। কিন্তু ফেমিনিস্টরা নারীর সবচেয়ে মর্যাদাকর এ জায়গাতেও আঘাত করছে।  ফেমিনিস্টদের কেউ কেউ এ দাবি করছেন যে, স্ত্রী ও মা হিসেবে যেসব দায়িত্ব নারীকে পালন করতে হয়,তা পুরুষদের চাপিয়ে দেয়া বিষয় এবং এর মাধ্যমে নারীর সঙ্গে বৈষম্য করা হয়েছে।

 

ফ্রান্সের নারীবাদী আন্দোলনের নেতা 'ম্যারি ওলস্টোনক্রাফট' দাবি করেছেন, সমাজ মহিলাদেরকে ঘরে বন্দী করে রেখেছে এবং তাদের ওপর নানা সীমাবদ্ধতা আরোপ করে রেখেছে। এমনটি না হলে নারীরাও পুরুষদের মতো সব ক্ষেত্রে সমান তালে এগিয়ে যেতে পারতো বলে তিনি দাবি করেন। নারীবাদী এ নেতা নারীর সৃষ্টিগত বৈশিষ্ট্য, চাহিদা, স্বভাব, প্রকৃতি ও প্রবণতাকে পুরোপুরি এড়িয়ে গেছেন। ওলস্টোনক্রাফটের মতে, যেসব নারী গৃহস্থালি কাজ করেন, তারা স্বাধীন নয়। গৃহস্থালির কাজ স্বাধীনতার অন্তরায়-এ দাবি সত্যিই হাস্যকর। কারণ কোনো কাজই ছোটো করে দেখা উচিত নয়।

 

মানব জীবনে গৃহস্থালির কাজ কোনো অংশেই অগুরুত্বপূর্ণ নয়। সন্তান লালন-পালনের মতো মহত কাজটিও ঘরে বসে সম্পন্ন করেন নারীরা। এর পাশাপাশি নারী ঘরের বাইরেও অবলীলায় চাকুরি করতে পারেন। ইসলাম এ ক্ষেত্রে কোনো বিধিনিষেধ আরোপ করেনি। পরিবারে মায়ের স্নেহ, মমতা, শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমেই বিশ্ব ইতিহাসের বড় ব্যক্তিত্বরা মানব সভ্যতাকে এগিয়ে নিয়ে গেছেন। বিশ্বের বেশিরভাগ স্বনামধন্য মহান ব্যক্তিত্বই তাদের উন্নতি ও অগ্রগতির পেছনে মা অথবা স্ত্রীর ভূমিকার কথা স্বীকার করেছেন। আমেরিকার বিশিষ্ট চিকিতসক জেসিকা এন্ডার্সনও নারীদেরকে ঘরের বাইরে চাকুরি করতেই হবে-এমন ধারণা প্রত্যাখ্যান করে বলেছেন, পেশা বা চাকুরিই মানুষের জীবনের সব কিছু নয়।

 

নারীর মূল কাজ হলো, সন্তান ধারণ, জন্মদান ও প্রতিপালন। এর পাশাপাশি বাড়ীর বাইরে নারীর কাজ করার ক্ষেত্রে কোনো বাধা নেই।   কিন্তু পাশ্চাত্যের ভোগবাদী সংস্কৃতি বাড়ীর বাইরে চাকুরি করাকেই নারীর সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি হিসেবে গণ্য করছে। মা হিসেবে নারীর ভূমিকাকে তারা গুরুত্বহীন হিসেবে তুলে ধরছে। পবিত্র ইসলাম ধর্ম পরিবারে স্ত্রী অথবা  মা হিসেবে ভূমিকা পালন এবং সন্তান লালনপালনকে নারীর প্রধান পেশা হিসেবে গণ্য করলেও নারীকে ঘরের বাইরে কাজ করতে নিষেধ করেনি। নারী সমাজের নানা ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। তারা সাংসারিক বিষয়াদি দেখাশুনার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় নানা ক্ষেত্রে দক্ষতা ও যোগ্যতা অর্জন করতে পারে এবং জ্ঞান-বিজ্ঞান,সংস্কৃতি ও সামাজিক কমকাণ্ডে অংশ নিয়ে বড় সাফল্য পেতে পারে।

 

ইসলাম ধর্ম গৃহস্থালির কাজ ও দায়িত্ব পালনকে ঘরের বাইরের চাকুরির চেয়ে কোনো অংশেই কম গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করে না বরং তা নারীর মর্যাদা সমুন্নত রাখে। এক হাদিসে এসেছে, যেসব নারী সাংসারিক দায়িত্ব পালন করেন, আল্লাহর তাদের ওপর অনুগ্রহ করেন। ইসলামি সংস্কৃতিতে গৃহস্থালির কাজ পবিত্র হিসেবে গণ্য এবং ইসলামি শিক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। নারীরা সাধারণত সুক্ষ্মদর্শী এবং ব্যবস্থাপনা ক্ষেত্রেও তারা বেশ দক্ষ। এ ছাড়া, গৃহস্থালির কাজের সঙ্গে শিল্পের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। এটি এমন এক পেশা,যা গোটা সমাজের ভবিষ্যতের ওপর প্রভাব ফেলে এবং এই শিল্পের সঙ্গে মায়ের মমতার মিশ্রণ রয়েছে। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহিল উজমা খামেনেয়ি বলেছেন, ইসলাম বাস্তব অর্থেই নারীকে সম্মানিত করেছে। সামাজিক দায়িত্ব পালনসহ অন্যান্য কর্মতপরতাকে ইসলাম নারীর জন্য নিষিদ্ধ করেনি।

 

কিন্তু উগ্র ফেমিনিস্টরা পরিবার ও মায়ের ভূমিকা সম্পর্কে নেতিবাচক মনোভাব পোষণ করে। উগ্র ফেমিনিস্টদের একটি দল মা হিসেবে নারীর ভূমিকাকে সরাসরি অবজ্ঞা করছে। একে তারা নারীদের প্রতি বৈষম্য ও নির্যাতন বলে মনে করে। শুলামিথ ফায়ারস্টোন হচ্ছেন এক জন উগ্র ফেমিনিস্ট। তিনি এ সম্পর্কে বলেছেন, মানব সংস্কৃতি থেকে মাতৃত্বের বিষয়টি মুছে ফেলতে হবে।  তার মতে, ফিডার দিয়ে শিশুদেরকে দুধ খাওয়াতে হবে এবং ডে কেয়ার সেন্টারগুলোকে শিশু প্রতিপালনের দায়িত্ব দিতে হবে। এভাবে নারীরা তাদের মায়ের দায়িত্ব পালনের বোঝা থেকে মুক্তি পাবে। সুইডেন ও কানাডা সরকার গৃহস্থালির কাজ নিয়ে ব্যস্ত নারীদের রাষ্ট্রীয়ভাবে অবজ্ঞা করছে। যেসব পরিবারের নারীরা চাকুরি করেন না,সরকারিভাবে ওই সব পরিবারের ওপর বাড়তি কর আরোপ করেছে। এতে ওই পরিবারের পুরুষদের ওপর বাড়তি চাপ পড়ছে।

 

ইসলামের দৃষ্টিতে, মা হিসেবে নারীর যে ভূমিকা তা মানব সভ্যতা টিকিয়ে রাখার ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। নারীর মা হওয়ার ক্ষমতা সামাজিক ততপরতায় কোনো বাধা সৃষ্টিতো করেই না বরং এটা তার মহান এক যোগ্যতা। নারীই সুসন্তান জন্ম দিয়ে সমাজ ও সভ্যতাকে টিকিয়ে রেখেছে। আসলে নারীরা জন্মগতভাবেই সন্তান জন্মদান ও লালন-পালনকে উপভোগ করে। শত কষ্ট হলেও কোনো মা তার শিশু-সন্তানকে ত্যাগ করে না। সন্তান লালন-পালন যেমন কষ্টের তেমনি আনন্দেরও। সন্তানের মা হওয়ার আগ পর্যন্ত অনেকেই এ বাস্তবতা উপলব্ধি করতে পারে না। সব মিলিয়ে সন্তান লালন-পালনের ক্ষেত্রে মায়ের বিকল্প নেই। কেউ-ই মায়ের স্থান পুরণ করতে পারে না।

 

ফেমিনিজমের আরেকটি নেতিবাচক প্রভাব হলো, বিয়ে বহির্ভূত যৌনাচার। উগ্র ফেমিনিস্টরা বিয়ের বন্ধনে আবদ্ধ হওয়াকে নারীর বন্দীত্ববরণ বলে মনে করে। এ কারণে উগ্রবাদীরা যার সঙ্গে যখন খুশি যৌন সম্পর্ক গড়ে তোলাকে উতসাহিত করে। তাদের এ নীতি মার্কিন সমাজের বহু নারীর দাম্পত্য জীবনকে ধ্বংস করছে বলে মনে করেন মার্কিন বিশেষজ্ঞরা। আমেরিকার বিশিষ্ট গবেষক ড. হেনরি ম্যাকো পাশ্চাত্যের নারী ও পরিবারের ওপর ফেমিনিজমের প্রভাব সম্পর্কে বলেছেন, আমেরিকার বিশ্বসুন্দরীরা মঞ্চে দাড়িয়ে সারা বিশ্বের মানুষের সামনে নিজেকে অর্ধনগ্ন অবস্থায় তুলে ধরে। সে বলতে চায়, সে একজন ফেমিনিস্ট এবং সে কারো সম্পদ নয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো, সে একক ব্যক্তির সম্পদ না হলেও সে আসলে সবার ভোগ্যপণ্য। সে সবচেয়ে বেশি অর্থ পরিশোধকারীর কাছে নিজেকে বিক্রি করে। সে নিজেকে নিলামে তোলে।

 

এ বিশেষজ্ঞ আরো বলেছেন, আমেরিকায় একজন নারীকে মূল্যায়ন করা হয় তার যৌন আকর্ষণের ভিত্তিতে। এর অর্থ হলো, যৌনতাই তাদের একমাত্র যোগ্যতা।  জীবনসঙ্গী ও মা হওয়ার জন্য তারা যোগ্য নয়।

 

পাশ্চাত্যে ফেমিনিজমের প্রভাব বিস্তার লাভের কারণে বিয়ের প্রতি নারীদের আগ্রহ কমে যাচ্ছে এবং গর্ভপাত ও সমকামিতার মতো অন্যায় ততপরতা বেড়ে যাচ্ছে। ইউরোপ ও আমেরিকায় রাষ্ট্রীয়ভাবে নারীর সঙ্গে নারীর এবং পুরুষের সঙ্গে পুরুষের যৌনাচার তথা সমকামিতাকে স্বীকৃতি দেয়া হচ্ছে,যা গোটা মানব সভ্যতার জন্য হুমকি হিসেবে সামনে এসেছে। এ অবস্থায় পাশ্চাত্য হিউম্যানিজম, লিবারেলিজম, সেক্যুলারিজম ও ফেমিনিজমের মতো ধ্বংসাত্মক মতবাদ থেকে সরে না আসলে পরিবার ও সমাজ ব্যবস্থা আরো বেশি ধ্বংসের মুখোমুখি হবে বলে বিশেষজ্ঞরা আশংকা প্রকাশ করেছেন।#

মন্তব্য লিখুন


Security code
রিফ্রেস দিন