এই ওয়েবসাইটে আর আপডেট হবে না। আমাদের নতুন সাইট Parstoday Bangla
রবিবার, 20 জানুয়ারী 2013 17:27

পাশ্চাত্যে পারিবারিক সংকট: (ফেমিনিজম-৪)

 ধর্ম বর্জনই নৈতিক অবক্ষয়ের কারণ

চতুর্থ শতাব্দির আগ পর্যন্ত পাশ্চাত্যের সর্বত্রই খ্রিষ্টান ধর্মের ব্যাপক প্রভাব ছিল। চতুর্থ শতকের পরও আরো অনেক দিন পর্যন্ত পাশ্চাত্যের মানুষ নীতি-নৈতিকতার ক্ষেত্রে ধর্মীয় নির্দেশনা মেনে চলার চেষ্টা করেছে।

 

কিন্তু পরবর্তীতে খ্রিষ্টান ধর্মপ্রচারকদের নানা স্ববিরোধী কর্মকাণ্ড, পৃথিবীর জীবনকে পরিপূর্ণ তুচ্ছ গণ্য করা, ধর্মের বিষয়ে বিকৃত তথ্য প্রচার এবং পরিপূর্ণ সামাজিক ও জীবন ব্যবস্থা উপস্থাপনে ব্যর্থতার কারণে ধর্মের প্রতি পাশ্চাত্যের মানুষের অনাস্থা বৃদ্ধি পায়। এর ফলে রেনেসা-যুগে এসে বুদ্ধিজীবীরা ধর্মহীন এক মতবাদ গড়ে তোলার চেষ্টা শুরু করেন। এর ফলে সেক্যুলারিজমের মতো বিভিন্ন মতবাদের সৃষ্টি হয়।

 

পাশ্চাত্যে নৈতিক অবক্ষয়ের একটি কারণ হলো, ধর্ম-বর্জন। এ কারণে পাশ্চাত্যে এখন লাগামহীন জীবন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত এবং সেখানে চলছে বেলাল্লাপনা। লাজ-লজ্জার যেনো কোনো বালাই নেই। অবাধ যৌনাচার পাশ্চাত্য সমাজকে কুরে কুরে খাচ্ছে। ইসলামী ইরানের বিশিষ্ট চিন্তাবিদ অধ্যাপক মোর্তজা মোতাহারি বলেছেন, যৌন সম্পর্কের ক্ষেত্রে অতীতের অবস্থান থেকে ১৮০ ডিগ্রি ঘুরে গেছে পাশ্চাত্য। পাশ্চাত্যের দেশগুলোতে ব্যক্তি স্বাধীনতার নামে লাগামহীন স্বাধীনতা দেয়া হয়েছে, যা পরিবারসহ গোটা সমাজের জন্যই মারাত্মক পরিণতি বয়ে আনছে। কিন্তু এই কথিত স্বাধীনতাই যে তাদের সমাজের ভিত্তিতে কঠিন কুঠারাঘাত করছে,তা খুব কম মানুষই উপলব্ধি করতে পারছে।

 

একটি উদাহরণ দিলেই পাশ্চাত্যে নৈতিক অধঃপতনের বিষয়টি আরো সুস্পষ্ট হবে। কিছু দিন আগে জার্মানির একটি শপিং সেন্টারের উদ্বোধন উপলক্ষে এ ঘোষণা দেয়া হয়েছিল যে, যেসব ক্রেতা পুরোপুরি নগ্ন অবস্থায় ওই শপিং সেন্টারে যেতে পারবে, তারা সেখান থেকে  ২৭০ ইউরো মূল্যের জিনিস ফ্রি সংগ্রহ করতে পারবে। অনেকেই এ ধরনের আচরণকে ব্যক্তি স্বাধীনতার অংশ বলে মনে করলেও বাস্তবতা হলো, কিছু বিকৃত মস্তিষ্কের মানুষ ব্যক্তি স্বাধীনতা'কে অপব্যবহার করে নীতি-নৈতিকতার ভিত্তিগুলোকে ধ্বংস করতে চাইছে। যাইহোক প্রাশ্চাত্যের সমাজ যে মারাত্মক নৈতিক সংকটের সম্মুখীন,তা ওই শপিং সেন্টারের পদক্ষেপ থেকেই স্পষ্ট। এ সব কারণেই পারিবারিক সংকট আরো তীব্রতর হচ্ছে এবং সামাজিক ক্ষয়ক্ষতি বাড়ছে।

 

এ পর্যন্ত অনেক চিন্তাবিদই নৈতিক অবক্ষয়ের কারণ বর্ণনা করেছেন। 'পাশ্চাত্য রোগাক্রান্ত' শীর্ষক বইয়ে ইরানি লেখক মাহমুদ হাকিমি পশ্চিমা সমাজে বিশেষকরে আমেরিকায় পতিতাবৃত্তি ও বেলাল্লাপনা সম্পর্কে বলেছেন, তিনটি বিষয় গোটা বিশ্বকে গ্রাস করছে। প্রথমত: নোংরামিপূর্ণ সাহিত্য, যা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। দ্বিতীয়ত: পর্নো সিনেমা এবং তৃতীয়ত: লজ্জাহীনতা। তিনটি বিষয়ের মূলেই রয়েছে যৌনতা। নিয়ন্ত্রণহীন যৌনাচারের কারণে এইডসের মতো নানা রোগের ব্যাপক বিস্তৃতি ঘটছে। ১৯৮০-এর দশকে যখন পত্রপত্রিকায় এইডস নিয়ে খবর প্রকাশিত হতে শুরু করে, তখন চিকিতসকরা বলেছিলেন, সমকামিতার কারণে এ রোগের সৃষ্টি হয়েছে। ধর্মের বিরুদ্ধাচরণ করে যারা সমকামিতায় লিপ্ত এবং যারা অনৈতিক যৌনাচার করছে, তাদের ওপর এক ধরনের ঐশী শাস্তি হিসেবেও অনেকে 'এইডস'কে গণ্য করে থাকেন।

 

১৯৮৫ সালে এইডসে আক্রান্ত হয়ে  আমেরিকার জনপ্রিয় অভিনেতা রক হুডসানের মৃত্যুর পর পাশ্চাত্যের মানুষ এ বিষয়ে আরো বেশি সচেতন হয়ে উঠে। বর্তমানে এইডস নানা মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লেও অনিয়ন্ত্রিত যৌনাচারই যে এ রোগ বিস্তারের প্রধান কারণ, তা সবাই স্বীকার করে। গত বিশ বছর ধরে এ রোগের বিষয়ে সতর্কতা ও হুঁশিয়ারি দেয়া হলেও এর বিস্তার অব্যাহত রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, পরিবারের প্রতি আস্থা, পারিবারিক মর্যাদার প্রতি শ্রদ্ধা, বেলাল্লাপনা থেকে দূরে থাকা এবং যৌনতার ক্ষেত্রে মানসিক বিকৃতি, এইডস নিয়ন্ত্রণের অন্যতম উপায়।

 

পাশ্চাত্যে পারিবারিক ভিত্তি দুর্বল হওয়ার একটি প্রধান কারণ হচ্ছে, সমকামিতা। এক জন নারী ও একজন পুরুষের মধ্যে বিয়ে বন্ধনের মধ্যদিয়ে একটি পরিবারের সূচনা হয় এবং এ পরিবারই সন্তান জন্মদান ও সুস্থ প্রজন্ম গড়ে তোলার উপযুক্ত ক্ষেত্র। এ অবস্থায় বিয়ের স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন গোটা মানব সভ্যতার জন্য মারাত্মক অশনি সংকেত। নারী ও পুরুষের মধ্যে বিয়ে সম্পন্ন হবে,এটাই প্রকৃতির নিয়ম। মানুষের শরীরের গঠন থেকেও এটা স্পষ্ট যে, বিপরীত লিঙ্গের মধ্যেই যৌন সম্পর্ক স্থাপন করতে হবে। অন্যথায় তা মারাত্মক ক্ষতির কারণ হয়ে দাড়াতে পারে। জীব বিজ্ঞানও নারী ও পুরুষের মধ্যে যৌন সম্পর্ককেই সমর্থন করে। কোনো সুস্থ মস্তিষ্কের মানুষই সমকামিতাকে সমর্থন করে না। বৈজ্ঞানিকভাবেও তা সমর্থনযোগ্য নয়। এছাড়া, শারিরীক ও মানসিক কারণে স্বামী ও স্ত্রীর মধ্যে ভালোবাসার যে সম্পর্ক গড়ে উঠে,তা সমকামীদের মধ্যে কখনোই গড়ে উঠে না। স্বামী ও স্ত্রী অর্থাত বিপরীত লিঙ্গের মিলনেই কেবল সন্তান জন্ম লাভ করে। পুরুষের শুক্রাণু এবং নারীর ডিম্বাণু না হলে সন্তানের অস্তিত্ব গঠন সম্ভব নয়।

 

বর্তমানে পাশ্চাত্যে ঐশী বিধানকে ত্যাগ করার কারণে পরিবার কাঠামো মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে। নীতি-নৈতিকতাকে এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতা আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ঘোষণা ও চুক্তিপত্রেও সুস্পষ্ট। পাশ্চাত্যের প্রভাবে অনুমোদিত বেশিরভাগ আন্তর্জাতিক চুক্তিগুলো দুনিয়াপ্রীতি ও আনন্দ উপভোগের ভিত্তিতে তৈরি করা হয়েছে। এ ছাড়া, নারীর প্রতি বৈষম্য মোকাবেলা বিষয়ক কনভেনশনে পতিতাবৃত্তিকে একটি পেশা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে। নারীর প্রতি বৈষম্য বিরোধী কমিটি অবৈধ যৌন কর্মের কারণে কাউকে শাস্তি না দিতে চীনের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। এর ফলে ওই সব দেশে ঘরে স্ত্রীকে রেখে পতিতালয়ে যাতায়াত একটি স্বাভাবিক বিষয়ে পরিণত হয়েছে। পাশ্চাত্যের শীর্ষস্থানীয় নেতারাও অহরহই এ ধরনের কাজ করে যাচ্ছেন।

 

কোনো পরিবারের ভিত্তি তখনি ভেঙে পড়ে যখন নারী ও পুরুষ একে অপরের বিষয়ে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে এবং যার-তার সঙ্গে যৌন সম্পর্ক গড়ে তোলে। পাশ্চাত্যে যে অবস্থা তাতে  স্বামী ও স্ত্রী কোনো ক্ষেত্রেই একে অপরের ওপর পরিপূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস স্থাপন করতে পারে না। যৌন সম্পর্কের ক্ষেত্রেও তারা পরস্পরের প্রতি সন্দিহান হয়ে পড়ে। কারণ কে-কার সঙ্গে যৌন সম্পর্কের মাধ্যমে ভয়াবহ রোগের বহনকারীতে পরিণত হয়েছে, তা দুই জনের কেউই জানে না। দুনিয়াপ্রীতি ও ভোগ-বিলাসকেই জীবনের একমাত্র লক্ষ্য-উদ্দেশ্য হিসেবে গণ্য করার কারণে এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। এর ফলে স্বামী ও স্ত্রীর মধ্যে অকৃত্রিম সম্পর্কের স্বাদ থেকে তারা বঞ্চিত হচ্ছে। নীতি-নৈতিকতা ও আধ্যাত্মিকতা থেকে দূরে সরে যাওয়ার কারণে এখন পরিবার গঠনের গুরুত্বই তারা ভুলতে বসেছে।পাশ্চাত্যের শিল্প ও শিক্ষা ক্ষেত্রেও এর প্রভাব পড়ছে।#

পাশ্চাত্যে পারিবারিক সংকট (১১)#

মন্তব্য লিখুন


Security code
রিফ্রেস দিন