এই ওয়েবসাইটে আর আপডেট হবে না। আমাদের নতুন সাইট Parstoday Bangla
সোমবার, 04 ফেব্রুয়ারী 2013 17:08

পাশ্চাত্যে পারিবারিক সংকট: (ফেমিনিজম-৬)

পাশ্চাত্যে পারিবারিক সংকট: (ফেমিনিজম-৬)

সমাজের সুস্থতা, গতিময়তা ও ভারসাম্যতার মূল ভিত্তি হচ্ছে-পরিবার। এই পরিবারই আজ নানা দিক থেকে আক্রমণের শিকার। সমাজের আদর্শিক পরিবর্তনে রেডিও-টিভিসহ গণমাধ্যেমর বড় ধরনের ভূমিকা রয়েছে। গণমাধ্যম-প্রযুক্তির উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে এ ক্ষেত্রে পরিবর্তনের গতি বেড়েছে। গণমাধ্যম সমাজকে সঠিক দিকনির্দেশনা দিয়ে গোটা বিশ্বে শান্তি ও নিরাপত্তা জোরদার করবে বলে প্রত্যাশা করা হলেও বাস্তবে এর বিপরীত ঘটনাই ঘটছে। এর প্রধান কারণ হলো, বিশ্বে এখন চলছে পুঁজিবাদের আধিপত্য এবং বিশ্বের প্রধান গণমাধ্যমগুলোও তারাই নিয়ন্ত্রণ করছে। গণমাধ্যমের অসৎ ভূমিকার কারণে পরিবার ব্যবস্থায় ধস নামতে শুরু করেছে। বেড়ে গেছে তালাকের ঘটনা। এ কারণে অভিভাবকহীন সন্তানের সংখ্যাও দিনদিন বাড়ছে। বাবা অথবা মা না থাকার কারণে সন্তান পরিপূর্ণ ও সঠিক শিক্ষা থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে।

 

লন্ডন থেকে প্রকাশিত সাময়িকী ইকোনমিস্টের এক প্রতিবেদনে এ কথা স্বীকার করা হয়েছে যে, বিশ্বে একক সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা চালাচ্ছে পাশ্চাত্য এবং এ উদ্দেশ্য হাসিলের একটি উপায় হলো- পরিবারের নৈতিক সীমানাগুলো মুছে ফেলা। ইরানের গবেষক ড. শায়িঈ সার্বেস্তানি এ বিষয়ে গবেষণা চালিয়েছেন। তিনি আমেরিকা, ফ্রান্স ও ব্রিটেনের বিভিন্ন রেডিও অনুষ্ঠান পর্যালোচনা করে এ সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন যে, এসব রেডিওএর ওয়ার্ল্ড সার্ভিসের অনুষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে বিভিন্ন দেশের পারিবারিক মূল্যবোধগুলোকে দুর্বল করার চেষ্টা চলছে। ধর্মীয় মূল্যবোধ ধ্বংস করার জন্য পরিবারকে টার্গেট করা হয়। অশ্লীল সিনেমা ছড়িয়ে দেয়ার মাধ্যমেও পরিবারিক শান্তি ও নিরাপত্তা বিনষ্ট করার চেষ্টা করা হচ্ছে। অশ্লীল সিনেমাগুলো স্বামী ও স্ত্রীর সম্পর্কে  ফাটল ধরাচ্ছে। এসব সিনেমার মাধ্যমে নারী ও পুরুষের মধ্যে বিয়ে-বহির্ভূত সম্পর্ককে স্বাভাবিক হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে। উস্কে দেয়া হচ্ছে অবৈধ যৌন সম্পর্ককে।

 

পাশ্চাত্যের বেশিরভাগ গবেষক ও চিন্তাবিদ, নৈতিক অব্ক্ষয়কে পরিবার ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার কারণ বলে মনে করেন। তাদের মতে, অশ্লীল সিনেমা সমাজে অনৈতিক অবক্ষয় ঘটাচ্ছে। এ ক্ষেত্রে হলিউডে নির্মিত সিনেমার প্রভাব সবচেয়ে ধ্বংসাত্মক। আমেরিকার বিশিষ্ট সাংবাদিক ও লেখক সুজান ফালুদি মনে করেন, সমকামিতা, গর্ভপাত, আত্মহত্যা এবং পথনারীদের সংখ্যা বাড়ার পেছনেও হলিউডের সিনেমার ভূমিকা রয়েছে।  টুডে, ধ্বংসাত্মক আকর্ষণ, আত্মসমর্পণ, ফ্যামিলি ম্যান  ও সেলি ফিল্ডের মতো বিভিন্ন সিনেমা এবং প্রাইম টাইম ও থার্টি সামথিং'র মতো নানা টিভি সিরিয়াল, সমাজে নীতি-নৈতিকতাহীন জীবন ব্যবস্থাকে উস্কে দিচ্ছে। টিভি সিরিয়াল 'টুডে' সম্প্রচারের পর ঘরছাড়া নারীদের সংখ্যা অনেক বেড়ে গেছে বলে তিনি মনে করেন।

 

মার্কিন লেখক হেনরি ম্যাকাও মনে করেন, হলিউডের সিনেমাগুলো মার্কিন সমাজে চিরাচরিত বিয়ে ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনছে এবং  সমকামিতার প্রতি আগ্রহ বাড়িয়ে দিচ্ছে। পর্নো ছবিগুলো এক সঙ্গীকে নিয়ে সন্তুষ্ট থাকার চিন্তা-চেতনায় পরিবর্তন আনছে।  মার্কিন অধ্যাপক ক্রিস হেজেয এ  প্রসঙ্গে লিখেছেন, প্রতি বছর আমেরিকায় ১৩ হাজার পর্নো ছবি নির্মিত হচ্ছে। পর্নো সিনেমা-শিল্পকে নিয়ন্ত্রণ ও পর্যবেক্ষণের জন্য কোনো ধরনের নিয়ন্ত্রক সংস্থা নেই। উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেছেন, জেনারেল মোটর্সের মালিকাধীন ডাইরেক্ট টিভির মাধ্যমে প্রতি মাসে ৪ কোটি পর্নো-দৃশ্য মার্কিনীদের কাছে প্রদর্শন করা হচ্ছে।  পাশ্চাত্যের অশ্লীল সিনেমা ও নাটক বৈধ যৌন সম্পর্ককে অনুৎসাহিত করার পরিবর্তে উৎসাহিত করে। এ কারণে পাশ্চাত্যে বৈধ সম্পর্ক স্থাপন তথা বিয়ের প্রতি আগ্রহ কমে যাচ্ছে। পরিবার ব্যবস্থার প্রতি ভীতি ছড়িয়ে দেয়া হচ্ছে নানা কৌশলে।

 

পাশ্চাত্যের গবেষক রবার্ট জনসন অশ্লীল ছবির আরো একটি ধ্বংসাত্মক প্রভাবের কথা তুলে ধরেছেন। তিনি লিখেছেন, পর্নো সিনেমায় পুরুষদেরকে নারীদের প্রতি আগ্রাসী হিসেবে তুলে ধরা হয়। এটা দেখানো হয় যে, পুরুষ হচ্ছে নারীর প্রতি প্রচণ্ড আধিপত্যকামী এবং নির্যাতনকারী। এ ধরনের ছবি দেখে নারীদের মনে এমন ধারণার জন্ম হয় যে, পুরুষরা যৌন ক্ষেত্রেও প্রচণ্ড স্বার্থপর, যা নারীদেরকে পুরুষদের ব্যাপারে ভীত-সন্ত্রস্ত করে তুলে। এর ফলে স্বামী ও স্ত্রীর মধ্যেও আস্থা কমে যায়। '

 

প্রচারণার ক্ষেত্রে স্যাটেলাইট এখন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। স্যাটেলাইট প্রযুক্তির মাধ্যমে বিশ্বের সবচেয়ে দূরবর্তী স্থানের বিশাল জনগোষ্ঠীর কাছে শব্দ ও ছবি পৌঁছে দেয়া সম্ভব হচ্ছে। স্যাটেলাইটের মাধ্যমে নানা ইতিবাচক ততপরতাও চলছে। কিন্তু এ মাধ্যমটি এখন অশ্লীলতা ছড়িয়ে দেয়ার ক্ষেত্রেও বড় ভূমিকা রাখছে। আমেরিকার বিশ্ববিদ্যালয়-শিক্ষক মিসেস শ্যারন এম কাই এ সম্পর্কে বলেছেন, লিবারেল সংস্কৃতি ছড়িয়ে দেয়ার অংশ হিসেবে স্যাটেলাইটের মাধ্যমে পারিবারিক ও নৈতিক মূল্যবোধ পরিপন্থী সিনেমা সম্প্রচার করা হচ্ছে।  কারণ পাশ্চাত্যের পুঁজিবাদী ব্যবস্থার একটি লক্ষ্য হলো, পারিবারিক মূল্যবোধ ধ্বংস করা। এ কারণে স্যাটেলাইটের মাধ্যমে ধর্মবিরোধী সংস্কৃতি চাপিয়ে দেয়া হচ্ছে।

 

ইরানের বিশিষ্ট চিন্তাবিদ অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ সাদেক হুমায়ুন স্যাটেলাইট চ্যানেলগুলোর মাধ্যমে সম্প্রচারিত বিভিন্ন সিনেমা সম্পর্কে বলেছেন, হলিউডের সিনেমাগুলোতে পাশ্চাত্যের পারিবারিক আদর্শ ফুটিয়ে তোলা হয়। তাদের উদ্দেশ্য হচ্ছে, পাশ্চাত্যের সংস্কৃতি চাপিয়ে দেয়া এবং নারী ও পুরুষের মধ্যকার লজ্জা ও সংবেদনশীলতা ধ্বংস করা। তারা পরিবার কাঠামোর বাইরে অনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তোলাকে উতসাহিত করে। এসব সিনেমা স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটাচ্ছে এবং পরিবার ব্যবস্থায় ধস নামাচ্ছে।

 

কিন্তু ইসলাম ধর্ম পরিবার ব্যবস্থা শক্তিশালী রাখার ওপর গুরুত্ব দেয়। স্বামী ও স্ত্রীর মধ্যে আবেগপূর্ণ ও যৌন সম্পর্ককে ঘরের ভেতরে সীমাবদ্ধ রাখতেও নির্দেশ দিয়েছে ইসলাম ধর্ম। আসলে সুস্থ সমাজের ভিত্তি হচ্ছে সুস্থ পরিবার। এ কারণে ইসলাম ধর্ম, সুস্থ ও দায়িত্বশীল পরিবার ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেয়। ইসলাম ধর্ম পরিবারের সব সদস্যকে তার নিজ নিজ দায়িত্ব সুচারুভাবে পালন করার নির্দেশ দেয়। ধর্ম বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, পরিবারের সদস্যদের মধ্যে ভালোবাসাপূর্ণ সুসস্পর্ক গড়ে তোলা সম্ভব হলে মিডিয়া-আগ্রাসন মোকাবেলা করা সহজ হয়। এ জন্য পরিবারের সদস্যদের মধ্যে মতবিনিময় ও আলোচনা জরুরি। পাশাপাশি একে অপরকে ছাড় দেয়ার মনোভাব থাকতে হবে।  অভিভাবকদের পক্ষ থেকে নিজস্ব সংস্কৃতি ও মূল্যবোধ রক্ষায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।

 

অশ্লীলতা সমাজের জন্য মারাত্বক বিপদ ডেকে আনে এবং যারা অশ্লীলতা ছড়িয়ে দেয়,তাদের জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে কঠিন শাস্তি অপেক্ষা করছে। পবিত্র কুরানের সূরা নূরের ১৯ নম্বর আয়াতে এ সম্পর্কে বলা হয়েছে, " যারা মুমিনদের মধ্যে অশ্লীলতার প্রসার [দেখতে] ভালোবাসে ,তাদের জন্য দুনিয়া ও আখিরাতে আছে মর্মন্তুদ শাস্তি।"#

 

পাশ্চাত্যে পারিবারিক সংকট (১৪)

মন্তব্য লিখুন


Security code
রিফ্রেস দিন