এই ওয়েবসাইটে আর আপডেট হবে না। আমাদের নতুন সাইট Parstoday Bangla
সোমবার, 15 এপ্রিল 2013 18:20

পাশ্চাত্যে পারিবারিক সংকট: (ফেমিনিজম-১২)

পাশ্চাত্যে পারিবারিক সংকট: (ফেমিনিজম-১২)

গোটা বিশ্বেই ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। পাশাপাশি পর্নোসহ অনৈতিক ওয়েব সাইটগুলোর সংখ্যা এখন অগণিত। অশ্লীল সাইটগুলো ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদেরকে প্রতি মুহুর্তে যৌন উস্কানি দিচ্ছে। এরইমধ্যে পর্নো সাইটগুলোর প্রতি আসক্তি তৈরি হচ্ছে সমাজের নানা বয়সের মানুষের। এর মধ্যে যেমন পুরুষ রয়েছে তেমনি আছে নারী। তবে তরুণ বয়সীদের মাঝই এ আসক্তি বেশি। দীর্ঘদিন ধরে এ ধরনের ধ্বংসাত্মক আসক্তি মানুষের মাঝে নানা ধরনের মনস্তাত্ত্বিক ও মানসিক রোগও সৃষ্টি করছে। এর ফলে পারিবারিক বিরোধ সৃষ্টি হচ্ছে এবং অনেকেই তার স্বামী বা স্ত্রীর প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে। আমেরিকার ফ্লোরিডা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞানী ড.ডেস্টিন স্টুয়ার্ট এ সম্পর্কে বলেছেন,'আমার কাছে এখন এমন অনেক রোগী আসছেন,যারা অশ্লীল সিনেমা ও ওয়েব সাইটের  প্রতি তার স্বামী বা স্ত্রীর ঝোক প্রবণতার কারণে নিজেরাই মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত হয়ে পড়েছেন।'

 

মনোচিকিতসকরা বলছেন,একজন ব্যক্তি যখন ঘন ঘন কোনো দৃশ্য দেখে,সে স্বাভাবিক ভাবেই তখন সেটার প্রতি আসক্ত হয়ে পড়ে এবং আরো বেশি অশ্লীল দৃশ্য দেখার পেছনে ছুটতে থাকে। এ ধরনের খারাপ প্রবণতা মানুষকে সুস্থ জীবন প্রণালী থেকে দূরে সরিয়ে দেয় এবং স্বামী বা স্ত্রীর সঙ্গে সম্পর্কে বিঘ্ন সৃষ্টি করে। যারা কর্মজীবী তারা তাদের অনেক কর্মঘন্টাও এভাবে ব্যয় করে মারাত্মক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। ইন্টারনেটের প্রতি আসক্তির কারণে অনেকে চাকুরি পর্যন্ত হারাচ্ছেন। দীর্ঘ সময় ধরে ইন্টারনেটের সামনে বসে থাকার কারণে নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন কেউ কেউ। ইন্টারনেটের প্রতি আসক্তির কারণে এসব ব্যক্তি পরিবারের বিষয়ে উদাসীন হয়ে পড়েন।

 

বিভিন্ন পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ইন্টারনেটের প্রতি অতি আসক্তির কারণে অনেক তালাকের ঘটনাও ঘটছে। টিভি বিজ্ঞাপনের মতো ইন্টারনেট ভিত্তিক বিজ্ঞাপনও পরিবার ব্যবস্থায় প্রভাব ফেলছে। এ ধরনের বিজ্ঞাপন সাধারণত পরিবারে ভুয়া চাহিদা সৃষ্টি করে। জরুরি পণ্যের জায়গায় স্থান করে নেয় বিলাসি পণ্য এবং বিলাসি পণ্যের চাহিদা ও ব্যবহার বেড়ে যায়। ভোগ সংস্কৃতি ছড়িয়ে দিতে নারীদেরকেও ব্যবহার করা হচ্ছে। এর ফলে, বাহ্যিক চাকচিক্য মানুষকে ব্যাপকভাবে আকৃষ্ট করে এবং মৌলিক পণ্য নয় এমন জিনিস কিনে অর্থ ব্যয়ের ঘটনা বাড়ছে ও বিলাসিতায় গা ভাসিয়ে দেয়ার প্রবণতাও ধ্বংসাত্মক পর্যায়ে চলে যাচ্ছে। টিভি বিজ্ঞাপনের মতো ইন্টারনেট ভিত্তিক বিজ্ঞাপনগুলোও সব সময় পুঁজিবাদকে টিকিয়ে রাখার লক্ষ্যে কাজ করছে। এ কারণে বিজ্ঞাপন চিত্রগুলোতে অশ্লীলতা ও ভোগ সংস্কৃতি ছড়িয়ে দেয়ার প্রবণতা বেশি লক্ষ্যণীয়।

 

এর কারণ হলো বিশ্বের গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ করে পুঁজিপতিরা। পশ্চিমা গবেষক রিটার ফিলিপস তার গবেষণা প্রতিবেদনে লিখেছেন, মাত্র ১১৮ জন ব্যক্তি ঘুরেফিরে বিশ্বের বৃহত দশটি কোম্পানির পরিচালনা বোর্ডে  রয়েছেন এবং তারা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের ২৮৮টি কোম্পানির মালিক। গণমাধ্যম কোম্পানি এনবিসি ও ওয়াশিংটন পোস্টের পরিচালনা বোর্ডে যারা রয়েছেন, তারাই কোকাকোলা কোম্পানির পরিচালক। এ ছাড়া, নিউজ ট্রিবিউন ও নিউ ইয়র্ক টাইমস কোম্পানির সঙ্গে রয়েছে পেপসির সম্পর্ক। এসব কোম্পানিই আবার সাইবার জগতের অনেক কিছু নিয়ন্ত্রণ করে।ইন্টারনেটের মাধ্যমে ভোগ সংস্কৃতি ছড়িয়ে দিতে পারলে পুঁজিবাদ টিকিয়ে রাখা সম্ভব হবে বলে পাশ্চাত্য মনে করছে।

 

ইন্টারনেটে দীর্ঘ সময় বসে চ্যাট বা গল্প করারও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে পরিবার কাঠামোয়। ইন্টারনেটে চ্যাট করতে করতে অনৈতিক সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ার ঘটনা এখন অহরহই ঘটছে। এক শ্রেণীর ব্যক্তি ফেইসবুকসহ বিভিন্ন মাধ্যম ব্যবহার করে অনৈতিক বাক্য ও তথ্য বিনিময় করছে এবং যৌন অনাচার ছড়িয়ে দিচ্ছে। এর ফলে পারিবারের ভিত্তি দুর্বল হচ্ছে এবং নৈতিকতা লোপ পাচ্ছে। যুবক-যুবতীরাই এ ধরনের সমস্যায় বেশি পড়ছে।অনেকেই আবার এসব মাধ্যমকে নিজের জীবন সঙ্গী খুজে বের করার কাজে ব্যবহার করে। কিন্তু তারা এটা ভুলে যায় যে, সাইবার জগতে পরিচয় আত্মগোপনের সুযোগ সবচেয়ে বেশি। এ কারণে প্রতারিত হওয়ার আশংকাও বেশি। চ্যাটের ক্ষেত্রে ওয়েবক্যামেরা বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে। অনুভূতি প্রকাশ অনেক বেশি সহজতর হয়ে গেছে। কিন্তু ঝামেলাও বাড়ছে একই গতিতে।

 

সাইবার বা ইন্টারনেট জগতে অনেক সময়ই খারাপ প্রকৃতির বন্ধুদের দেখা মেলে। বন্ধু বনে যায় অনেক হ্যাকারও। এমন ঘটনাও ঘটছে যে,চ্যাটরুম থেকে ‘লগ-আউট’ করে যাওয়ার পরেও কম্পিউটারের ওয়েবক্যাম চালু থাকছে। ইন্টারনেট ব্যবহারকারী ব্যক্তি বিষয়টি বুঝতে না পারায় ওয়েবক্যামেরার মাধ্যমে অতি গোপণীয় দৃশ্য অন্যের হাতে চলে যাচ্ছে নিয়মিত। ওয়েবক্যামে চ্যাট করা ছাড়াও সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং সাইট বা ই-মেল আইডি ব্যবহারের ক্ষেত্রে ‘অসাবধানতা’র মাসুল দিতে হয় অনেক সময়। অনেক হ্যাকার নানা কৌশলে পাসওয়ার্ড খুঁজে বের করে নিয়ে গোপন তথ্য হাতিয়ে নিচ্ছে। অ্যাকাউন্টের সাইবার-দেওয়ালে পরপর অশ্লীল ছবি ‘পোস্ট’ করছে।  ইমেইল বা ফেইসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে পরিচিতদের কাছে কুরুচিকর বার্তা ছড়িয়ে পড়তেও দেখা যায়। এর ফলে নানা ধরনের জটিল সমস্যায় পড়তে হয়।

 

অনেকের ব্যক্তিগত জীবনের খুঁটিনাটি জেনে তাদের গোটা পরিবারকেই সামাজিক ভাবে অপদস্থ করার ঘটনাও ঘটছে। এর ফলে অনেক ক্ষেত্রে পারিবারিক শান্তি বিনষ্ট হয়। অনেক সময় মোবাইল নম্বর জেনে নিয়ে তার অজান্তেই কুরুচিকর বিজ্ঞাপন ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। এছাড়া, যারা ইন্টারনেটের মাধ্যমে জীবনসঙ্গী খুঁজে নেয়ার চেষ্টা করেন,তাদের সে আশাও বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই পূর্ণ হয় না।  ইন্টারনেটের মাধ্যমে যে সম্পর্ক গড়ে ওঠে,তা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বিয়ে পর্যন্ত গড়ায় না। এ ক্ষেত্রে মেয়েরাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। প্রেম বিয়ে পর্যন্ত না গড়ানোয় তরুণ বয়সীরা অত্যন্ত মনোকষ্টে ভুগতে থাকে এবং চূড়ান্তভাবে বিয়ে করা বা পরিবার গঠনের আগ্রহ হারিয়ে ফেলে।

 

নৈতিক ক্ষেত্রে সাইবার জগতের যে প্রভাবটা সবাইকে উদ্বিগ্ন করে তুলছে,তাহলো-বিয়ে বহির্ভূত যৌন সম্পর্ক বৃদ্ধি।মার্কিন গবেষক পেট্রিসিয়া ওয়েলশ তার গবেষণায় দেখিয়েছেন, আমেরিকায় অশ্লীল ম্যাগাজিন বিক্রি এবং পর্নো সাইট ব্যবহারের হারের সঙ্গে ধর্ষণের হারের সম্পর্ক রয়েছে।পাশ্চাত্যে বিয়ে বহির্ভূত যৌন সম্পর্ক এতটাই স্বাভাবিক বিষয়ে পরিণত হচ্ছে যে,স্বামী বা স্ত্রী উভয়ই অবৈধ যৌন সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ছে।এর ফলে পরিবার প্রথা তাদের কাছে অর্থপূর্ণ ও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে হচ্ছে না।

 

অশ্লীল সাইটের সংখ্যা এতটাই বাড়ছে যে,অল্প বয়সীরাও এ ধরনের সাইটে ঢুকছে এবং প্রাপ্ত বয়সী হওয়ার আগেই যৌনতা বিষয়ে আগ্রহী হয়ে উঠছে।অনেক দেশই পর্নো সাইটগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার জন্য আইন করেছে।সম্প্রতি চীন বেশ কিছু পর্নো সাইট বন্ধ করে দিয়েছে।এ অবস্থায় সাইবার জগতের ওপর রাষ্ট্রীয় ও পারিবারিক নিয়ন্ত্রণ জরুরি হয়ে পড়েছে।এ ক্ষেত্রে সার্বজনীন সচেতনতার বিকল্প নেই। রাষ্ট্র থেকে পরিবারের অভিভাবকদের সবাইকে ততপর হতে হবে।#

 

মন্তব্য লিখুন


Security code
রিফ্রেস দিন