এই ওয়েবসাইটে আর আপডেট হবে না। আমাদের নতুন সাইট Parstoday Bangla
সোমবার, 22 এপ্রিল 2013 19:15

পাশ্চাত্যে পারিবারিক সংকট: (ফেমিনিজম-১৩)

গত কয়েকটি আলোচনায় আমরা পাশ্চাত্যের পরিবার ব্যবস্থার ভিত্তি নড়বড়ে করার ক্ষেত্রে কার্টুন ছায়াছবি,মোবাইল ফোন এবং হিংস্রতা-উদ্দীপক উগ্র পশ্চিমা সঙ্গীতের ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে কথা বলেছি। আজ আমরা পশ্চিমা সমাজে ও পরিবারে কিছু কিছু খেলনার ও অনৈতিক শিক্ষা-ব্যবস্থার মারাত্মক ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে কথা বলব। 

 

ব্যক্তির নানা ধরনের কল্পনা ও কাল্পনিক আদর্শ মানুষের জীবনকে প্রভাবিত করে। পশ্চিমা সমাজ পুঁজিবাদী বা ধনতান্ত্রিক। শিল্প ও সংস্কৃতি এবং এমনকি খেলনাও এই সমাজে যথাসম্ভব বেশি বেশি মুনাফা অর্জনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

 

খেলনা বা পুতুল শিশুদের ব্যক্তিত্ব গঠনে প্রভাব রাখে। বিশেষ করে কন্যা শিশুরা পুতুলের মাধ্যমে অনেক কিছু শেখে। কন্যা শিশুরা আগামী দিনের নারী। কোনো জাতির বিচ্যুতি অনেকাংশেই নির্ভর করে কন্যা ও নারীদের ওপর।

 

আজকাল ‘বারবি’ নামের বিশেষ পুতুল দুনিয়া জুড়ে খ্যাতি অর্জন করেছে। মাটিল নামের একটি কোম্পানি প্রায় ৫০ বছর আগে ১৯৫৯ সালে এই পুতুল তৈরি করেছিল। জার্মানির পথে-ঘাটে চলা এক ভবঘুরে নারীর মডেলে তৈরি করা হয়েছে এই পুতুল। দুই বছর পর ‘কেন্’ নামের আরেকটি পুতুল বাজারে ছাড়া হয়। এই পুতুলটিকে বারবির পুরুষ বন্ধু হিসেবে দেখানো হয়েছে। কন্যা শিশুরা যাতে শৈশবেই বিপরীত লিঙ্গের মানুষের সঙ্গে লাগামহীন সম্পর্ক গড়ে তোলার শিক্ষা পায় সে লক্ষ্যেই এইসব পুতুল বাজারে ছাড়া হয়।

 

বারবি পুতুলের মাধ্যমে এটা শেখানো হয় যে প্রত্যেক পশ্চিমা কন্যার এক পুরুষ বন্ধু দরকার এবং তাদের শেখানো হয় যে কিভাবে আনন্দ-ভ্রমণের সময়, কর্মস্থলে ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কিংবা অবসর সময়ে পুরুষ বন্ধুর সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে তোলা যায় ও তার সঙ্গে কোন্ ধরনের আচরণ করা উচিত।

 

বর্তমানে বারবি ও কেনের নামে প্রতি বছরই গ্রীষ্ম ও শীতকালে ফ্যাশন-শো এবং পোষাকের প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়। আর এই জাতীয় পোষাক অত্যন্ত চড়া দামে পশ্চিমা পরিবারগুলোতে বিক্রি করা হয়ে থাকে। এভাবে এই পুতুলগুলো পশ্চিমা সমাজে সৌন্দর্য ও কদর্যতা সনাক্ত করার মানদণ্ডে পরিণত হয়েছে। এইসব মডেলের আলোকে পাশ্চাত্যে এটা দেখানো হয় যে চিকন থাকাটাই হল সুন্দর শারীরিক গঠন এবং মোটা হওয়াটা বিশ্রী ব্যাপার। তাই পশ্চিমা যুবতী ও নারীরা পুরুষ বা স্বামীদের কাছে প্রিয় হওয়ার জন্য এই বারবির মতই স্লিম বা চিকন হওয়ার  প্রাণান্তকর চেষ্টা করেন। এ ব্যাপারে ব্যাপক প্রচারণার প্রভাবে পশ্চিমা নারী ও মেয়েরা ডায়েট কন্ট্রোল করছেন বা সীমিত খাদ্য খাচ্ছেন এবং অনেক অর্থ খরচ করে নানা ধরনের সার্জারি বা অস্ত্রোপচার করছেন।

 

পাশ্চাত্যের পুরুষরাও মনে করেন তাদের স্ত্রীরও উচিত বারবির মত চিকন হওয়া। আর এমনটি না হলে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক শীতল হয়ে পড়ে এবং তা তালাকেও গড়ায়।

 

কয়েক বছর আগে শিশুদের জগতেও বারবি পুতুলের নতুন প্রজন্ম এসেছে। ২০০১ সালে এইসব পুতুলের জন্ম দেয়া হয় এবং সেগুলো বাহ্যিকভাবে দেখতে বেশ আকর্ষণীয়। বরং অতীতের বারবির চেয়ে এই বারবিকে বেশি প্রলুব্ধকারী করার চেষ্টা করা হয়েছে। যেমন, এর পোশাক আগের বারবির চেয়েও অনেক বেশি অশালীন। এগুলোর পরনে রয়েছে মিনি স্কার্ট এবং পায়ে রয়েছে পাতলা ফিনফিনে মোজা। আর মুখে রয়েছে অত্যন্ত ঘন প্রসাধনী প্রলেপ।

 

এভাবে একটি পুতুলের মাধ্যমে পশ্চিমা সংস্কৃতিতে ও বিশ্বের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ঘটেছে পরিবর্তন। প্রতিটি পরিবারের নানা আচরণ ও চিন্তাধারায় পড়েছে এর প্রভাব। এভাবে খেলনাও ব্যাটম্যান, স্পাইডারম্যান, শ্রিক ও এ ধরনের ছায়াছবির মত শিশুদেরকে নিয়ে যাচ্ছে কল্পনা ও সহিংসতার জগতে। এ ধরনের খেলনা যে শুধু বালক বা পুরুষদের মধ্যেই সহিংসতাকে বদ্ধমূল করছে তা নয়, শিশুদেরকেও হত্যাকাণ্ড, অপহরণ ও চুরির মত জঘন্য সামাজিক অপরাধের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছে। এ ছাড়াও এসব খেলনা শিশুর সামাজিক সম্পর্ক ও অভিযোজন বা সমাজের সঙ্গে তার মানিয়ে নেয়ার প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করছে।  এভাবে শিশু ও তরুণ-তরুণীদের ভবিষ্যত ব্যক্তিত্ব গড়ে উঠছে নানা ধরনের খেলনার প্রভাবে।

 

শিশুদের জীবনের সবচেয়ে আনন্দের মুহূর্ত হল খেলা। তাই তাদের  জন্য উপযুক্ত ও কল্যাণকর খেলনা বাছাই করা জরুরি। গবেষণায় দেখা গেছে, শৈশবের খেলনা ও বিনোদন মানুষের ব্যক্তিত্বকে বিশেষভাবে গড়ে তোলে। খেলনাগুলো এমন হওয়া উচিত যাতে সেগুলো বিনোদনের পাশাপাশি শিশুর কৌতূহলী মনের খোরাক যোগায় ও তাকে নানা ধরনের সৃষ্টিশীল বা গঠনমূলক কাজে ব্যস্ত রাখে। ফলে এ ধরনের ভাল খেলনা শিশুর প্রতিভা বিকাশে সহায়ক হয়। প্রশিক্ষণ ও শিক্ষণ বিষয়ক বিশেষজ্ঞদের মতে ভাল খেলনার বৈশিষ্ট্য হল তা শিশুকে নিজ সমাজ-সংস্কৃতি ও বাস্তবতার কাছে নিয়ে যাবে এবং শিশুর জীবন যাপনের স্বাভাবিক পরিবেশ ও সমাজের ইতিবাচক মূল্যবোধগুলোর সঙ্গে মানানসই হবে।

 

শিশুরা সাধারণত চার বছর বয়সের আগে ভাল ও খারাপ খেলনা সম্পর্কে বিন্দুমাত্র ধারণাও রাখে না। তাই এ সময় তাদের জন্য ভাল খেলনা বাছাই করা বাবা-মায়েরই দায়িত্ব। এ সময়কার খেলনাগুলোই চার বছর বয়সের পর থেকে যৌবন পর্যন্ত পরবর্তী খেলনা বাছাইয়ের ক্ষেত্রে তার রুচি ও পছন্দের ওপর প্রভাব ফেলে। কিন্তু বারবির মত খেলনা শিশুকে কোনো সুশিক্ষা দেয় না, বরং জীবনের প্রথম থেকেই তাকে অনুপযুক্ত আদর্শ ও অশ্লীলতার মুখোমুখি করে।

 

পাশ্চাত্যে পরিবার ব্যবস্থায় ধস নামার আরেকটি বড় কারণ হল অনুপযোগী শিক্ষা ব্যবস্থা। পশ্চিমা চিন্তাবিদদের কেউ কেউ এ নিয়ে গভীর উতকণ্ঠা প্রকাশ করছেন। কানাডার বিশিষ্ট লেখক উইলিয়াম গার্ডনার এ প্রসঙ্গে লিখেছেন: উগ্র শিক্ষা ব্যবস্থার আগ্রাসন পরিবারে নৈরাজ্য সৃষ্টি করছে এবং সমাজের নানা ক্ষতি করছে বলে আমি আশঙ্কা করছি। পাশ্চাত্যের পুঁজিবাদী শিক্ষা-ব্যবস্থা শিশু ও তরুণ-তরুণীদেরকে বয়স্ক হওয়ার অজুহাতে বাবা-মায়ের সঙ্গে দ্বন্দ্বে নামার শিক্ষা দেয়। এ ছাড়াও এ শিক্ষা ব্যবস্থায় অত্যন্ত অশালীনভাবে যৌন শিক্ষা দেয়া হয়। এ ছাড়াও যৌনতা বিষয়ক এমন সব উত্তেজক শব্দ এই শিক্ষায় তুলে ধরা হয় যে এর ফলে তরুণ-তরুণীরা অবৈধ যৌন সম্পর্ক প্রতিষ্ঠায় উতসাহী হয়ে ওঠে এবং তাদের লজ্জাও কমে যায়। এ ছাড়াও পাশ্চাত্যে সব ধরনের শিক্ষায় শিক্ষার্থীকে এটা বোঝানো হয় যে, ব্যক্তিগত বিষয়ে কেবল নিজেকেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে এবং এ ব্যাপারে বাবা-মা ও অভিভাবকদের কল্যাণকামী উপদেশকে পুরোপুরি অগ্রাহ্য করতে হবে।

 

কানাডার অন্টারিও প্রদেশের একজন মন্ত্রী টরেন্টোর হাইস্কুল শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে বলেছেন: তোমাদেরই উচিত বাবা-মাকে শেখানো। কারণ, তারা সিদ্ধান্ত নেন এবং তারা সিদ্ধান্ত নেয়ার সময় ভুল সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। উইলিয়াম গার্ডনারের মতে এই বক্তব্য থেকেই সরকারের সঙ্গে পরিবারের যুদ্ধের বিষয়টি সুস্পষ্ট।

 

পাশ্চাত্যে অনেক বাবা-মা  তাদের সন্তানদের সঙ্গে বিচ্ছিন্নতা ও দ্বন্দ্বের জন্য শিক্ষা ব্যবস্থার সমালোচনা করছেন। মার্কিন বাবা-মায়েদের অনেকেই শিক্ষার্থীদের পারিবারিক বিষয়ে হস্তক্ষেপের জন্য শিক্ষকদের বিরুদ্ধে অনেক মামলাও দায়ের করেছেন। অন্যদিকে মার্কিন শিক্ষার্থীদের সমিতি বলছে, শিক্ষকরা যা খুশি তাই ছাত্রদের শেখানোর অধিকার রাখেন এবং স্কুলগুলো এ ব্যাপারে পরিবারের কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য নয়।

 

পশ্চিমা শিক্ষা ব্যবস্থা মনে করে শিশুরা আগামী দিনের নাগরিক হিসেবে সরকারের সম্পদ, পরিবারের সম্পদ নয়, তাই শিশুদের কাছে বাবা-মায়ের মূল্যবোধের বিস্তার ঠেকাতে হবে। এভাবে পাশ্চাত্যে পরিবার-ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ছে অশিক্ষা ও অপসংস্কৃতির আঘাতে। তাই অনেক বাবা-মা সন্তানকে স্কুলে না পাঠিয়ে নিজের তত্ত্বাবধানেই শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ দিতে আগ্রহী যাতে সন্তানরা ভবিষ্যতে বিচ্যুত ও বিপথগামী না হয়।#

মন্তব্য লিখুন


Security code
রিফ্রেস দিন