এই ওয়েবসাইটে আর আপডেট হবে না। আমাদের নতুন সাইট Parstoday Bangla
মঙ্গলবার, 14 মে 2013 16:12

পাশ্চাত্যে পারিবারিক সংকট: (ফেমিনিজম-১৭)

 আমরা বলেছি, পাশ্চাত্যে মাদক দ্রব্য ও মদের প্রতি তরুণ সমাজের ঝোক প্রবণতা ভয়াবহভাবে বাড়ছে।

 

সুস্থ পরিবারই একটি সুস্থ সমাজ নির্মাণ করে। পরিবারেই শিশুদের আচার-আচরণের ভিত্তি গড়ে ওঠে। বাবা-মায়ের আচরণ দেখে শিশুরা তা অনুকরণ করে এবং সেই আচরণই তাদের অস্তিত্বের সঙ্গে মিশে যায়। শিশু বড় হয়ে হিংস্র হবে নাকি শান্ত প্রকৃতির হবে, তার অনেক খানিই নির্ভর করে পরিবারের অন্য সদস্যদের আচার-আচরণের ওপর। কিন্তু পাশ্চাত্যে পারিবারিক সংকট তীব্রতর হওয়ার কারণে সেখানকার পরিবারগুলোতে সহিংসতা বেড়ে যাচ্ছে। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যেও সহিংসতার ঘটনা ঘটছে। সহিংসতা বাড়ছে পরিবারের অন্য সদস্যদের মাঝেও। এ সংক্রান্ত বহু উদাহরণ রয়েছে। আমেরিকার উদাহরণই এ ক্ষেত্রে বেশি প্রযোজ্য। আমেরিকায় এখন হত্যা-ধর্ষনসহ অপরাধ অনেক বেড়ে গেছে। মার্কিন বিচার বিভাগের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১১ সালে আমেরিকায় সহিংসতা ১৮ শতাংশ বেড়েছে।

 

পরিবারে নারীর প্রতি সহিংসতার ঘটনাই বেশি ঘটে। ব্রিটেনে পরিচালিত এক জনমত জরিপের ফলাফলে দেখা গেছে, হাসপাতালগুলোর ইমার্জেন্সি বিভাগে যেসব নারী আসেন, তাদের এক-তৃতীয়াংশই পারিবারিক সহিংসতার শিকার। ব্রিটেনের শরণার্থী সহায়তা বিষয়ক সংস্থার পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, ব্রিটেনের প্রতি চার জন নারীর একজন বাড়ীতে মারধরের শিকার হন। বাড়ীতে নির্যাতনের শিকার ১০ জন নারীর মধ্যে অন্তত একজন মৃত্যু ঝুকিতে ভুগেন। এ সংস্থাটি ঘোষণা করেছে, ব্রিটেন ও ওয়েলসে গড়ে প্রতি সপ্তায় দুই জন করে নারী তার বর্তমান বা সাবেক স্বামীর হাতে নিহত হয়। লন্ডন পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, প্রতি মাসে নারীর বিরুদ্ধে পারিবারিক সহিংসতার বহু অভিযোগ তাদের কাছে আসে। এর মধ্যে নারীকে দৈহিক ও মানসিক নির্যাতন এবং ধর্ষণের মতো নানা ঘটনা ঘটছে। পাশ্চাত্যের বেশিরভাগ দেশেই নারীদের অবস্থা একই রকমের। অবশ্য কখনো কখনো নারীরাও পুরুষের ওপর নির্যাতন চালায়।

 

স্বামী ও স্ত্রীর মধ্যে ঝগড়া-বিবাদের কারণে গোটা পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অনেক নারী পরিবার থেকে পালিয়ে মারাত্মক বিপদের সম্মুখীন হচ্ছে এবং স্বামীর সঙ্গে বিচ্ছেদ ঘটছে। পারিবারিক সহিংসতা সন্তানদের মন-মানসিকতায় মারাত্মক ও ধ্বংসাত্মক প্রভাব ফেলে। শিশুরা নিজের পরিবার সম্পর্কে হতাশ হয়ে পড়ে এবং বাবা-মা’র কাছ থেকে দূরে সরে গিয়ে উচ্ছৃঙ্খল ও অপরাধী লোকদের কবলে পড়ে। মার্কিন সিনেটের বিচার বিভাগীয় কমিশনের সাবেক প্রধান জোসেফ বাইডেনের মতে, আমেরিকায় বর্তমানে সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো পরিবারিক সহিংসতা। প্রতিদিনই পাশ্চাত্যের গণমাধ্যমগুলোতে পরিবারে লোমহর্ষক সহিংসতা সম্পর্কে নানা খবর প্রকাশিত হচ্ছে। শুধু স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ঝগড়া-বিবাদই নয় সন্তানের প্রতি সহিংসতাও দিন দিন আশংকাজনকভাবে বাড়ছে।

 

কিছু দিন আগে একজন মার্কিন নাগরিক তার ৫, ৮ ও ১১ বছরের তিন শিশুকন্যাকে ঘাড়ে ছুরিকাঘাত করে হত্যা করেছে। নর্থ ড্যাকোটা অঙ্গরাজ্যের অধিবাসী ওই মার্কিন নাগরিক তার সাবেক স্ত্রীর বাসায় গিয়ে শিশুদের হত্যা করে। হত্যার পর সে নিজেই তার সাবেক স্ত্রী অর্থাত শিশুদের মায়ের কাছে ফোন করে হত্যাকাণ্ডের খবর দেয়। সে এক মর্মান্তিক ঘটনা। তবে সবচেয়ে বিস্ময়ের বিষয় হলো, শিশুদের প্রতি মায়েদের সহিংসতাও বহু গুণ বেড়ে গেছে। মা তার শিশুকে হত্যা করছে। সন্তানের প্রতি মায়ের অকৃত্রিম ভালোবাসা হচ্ছে আল্লাহর শ্রেষ্ঠ নেয়ামত। এটি হচ্ছে নারীর প্রধান বৈশিষ্ট্য। কিন্তু একজন নারীর মমতাবোধ যখন আর থাকে না, তখন সে হিংস্র অপরাধীতে পরিণত হয়। এক গবেষণায় দেখা গেছে, পাশ্চাত্যের দেশগুলোতে সন্তানের প্রতি সহিংসতার ৬১ শতাংশ ঘটনা ঘটছে মায়েদের মাধ্যমে।

 

আলোচনার এ পর্যায়ে আমরা ব্রিটেনের লিরপুল শহরের একটি পাশবিক ঘটনার দিকে নজর দিচ্ছি। কিছু দিন আগে লিরপুল শহরের ২৩ বছর বয়সী এক মা তার চার বছর বয়সী নিষ্পাপ শিশুকে ঠাণ্ডা পানিতে ডুবিয়ে হত্যা করেছে। প্রকৃতিগতভাবেই মা হচ্ছেন ভালোবাসা ও মায়া-মমতার আধার। এ কারণে মায়ের হাতে শিশুর এ করুণ মৃত্যু সবাইকে বিস্মিত করেছে। শিশুরা তার পরিবার, গণমাধ্যম এবং সমাজ থেকে আচার-ব্যবহার শেখে। সহিংসতাও শেখে সেখান থেকেই। কিছু দিন আগে ফ্রান্সের একটি নির্মম ঘটনা গোটা বিশ্বকে নাড়া দেয়। এক ফরাসি তরুণ তার পরিবারের সব সদস্যকে নিজ হাতে হত্যা করেছে। বাড়ী থেকে পালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়ার পর রাতে সে তার বাবার বুকে, মায়ের মাথায় এবং ঘুমন্ত দুই ভাইয়ের দেহে গুলি চালিয়ে তাদেরকে হত্যা করে।

 

 এ ধরণের ঘটনা বৃদ্ধির ফলে এটা নির্দ্বিধায় বলা যায় যে, পাশ্চাত্যে পারিবারিক সংকট এখন এতটাই প্রকট যে, সন্তানেরা এখন আর সঠিক শিক্ষা পায় না। বাবা-মায়েরা এখন আর সন্তানদেরকে সহিংসতা থেকে দূরে রাখার শিক্ষা খুব একটা দেয় না। নিজেরা লাগামহীন জীবনযাপন করার কারণে অনেক ক্ষেত্রে উপদেশ বাণীতেও কোনো কাজ হয় না। তবে সহিংসতার ক্ষেত্রে শুধু মাবা-মা’ই দায়ী নয়, গণমাধ্যমও নিরবচ্ছিন্নভাবে সহিংসতা উস্কে দিচ্ছে। প্রচারিত হচ্ছে সহিংসতা উস্কে দেয়ার নানা উপকরণ। এ ধরনের প্রচারণা থেকে শিশু-কিশোররাই সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত হচ্ছে।

 

বর্তমানে পাশ্চাত্যের দেশগুলোতে অস্ত্রের অবাধ ব্যবহার হচ্ছে। স্কুল পড়ুয়া ছাত্রদের হাতে হাতে এখন আগ্নেয়াস্ত্র। সামান্য ঝগড়া থেকে আবেগাপ্লুত হয়ে গুলি চালিয়ে সহপাঠী ও শিক্ষকদের হত্যা করছে শিশু-কিশোররা।

 

আমেরিকার নিরাপত্তা বিষয়ক বিশ্লেষক চার্লস শুব্রিজ সেদেশের শহরগুলোতে আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার বৃদ্ধি প্রসঙ্গে বলেছেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অনেক শহরেই আগ্নেয়াস্ত্রের মাধ্যমে অপরাধের ঘটনা বেড়ে গেছে। এর একটি বড় কারণ হলো, আমেরিকায় আগ্নেয়াস্ত্রের অবাধ ব্যবহার। সেখানে অস্ত্র বহনের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের বাধা নেই। যে কেউ অস্ত্র সঙ্গে রাখতে পারে। ধর্ম, নীতি-নৈতিকতা ও আধ্যাত্মিকতা থেকে দূরে সরে যাওয়ার কারণেই এ ধরনের অবস্থা সৃষ্টি হচ্ছে। ভালোবাসা ও ত্যাগই স্বামী ও স্ত্রীর মধ্যে বন্ধন সুদৃঢ় করে। পাশ্চাত্যের অনেক বিশেষজ্ঞও মনে করেন, ‘ধর্ম ও আধ্যাত্মিকতা থেকে দূরে সরে যাওয়ার কারণেই পারিবারিক সহিংসতা বেড়ে যাচ্ছে। ঘটছে হত্যাকাণ্ড।

 

আমেরিকার বিখ্যাত লেখক টমাস মুর এ সম্পর্কে বলেছেন, ‘আমরা বহু বছর আগেই ধর্মকে হাতছাড়া করেছি। ধর্মহীন জীবন বাস্তবিক অর্থেই ময়লা ও দুর্গন্ধযুক্ত জীবনে পরিণত হয়। ধর্মহীনতার কারণে আমরা বিপথে চলে গেছি। আমরা ফেরেশতাদের কোল থেকে জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হয়েছি, যেখানে আমরা শুধুই ভালোবাসা ও মমত্ববোধের অনুপস্থিতি ও মূর্খতার প্রবনতা বেড়ে যেতে দেখছি।’

পবিত্র ইসলাম ধর্ম স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ভালোবাসা, আন্তরিকতা ও কল্যাণকামীতাকে সহিংসতামুক্ত পরিবার গড়ে তোলার মূল চাবি বলে মনে করে। এর মাধ্যমেই গোটা পরিবারে শান্তি নিশ্চিত করা সম্ভব। পরস্পরের প্রতি সহানুভূতির মাধ্যমে অনেক সমস্যারই সমাধান সম্ভব। পবিত্র কুরআনেও সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য পরস্পরের প্রতি প্রদর্শনের সংস্কৃতি জোরদারের কথা বলা হয়েছে।

 

পবিত্র কুরআনের সূরা শূরায় আল্লাহতায়ালা বলেছেন, যারা ক্রোধান্বিত অবস্থাতেও ক্ষমা করে, তাদের জন্য পুরষ্কার রয়েছে।

 

দায়িত্বশীল বাবা-মায়েরা তার সন্তানদেরকে রাগ বা ক্রোধ নিয়ন্ত্রণের শিক্ষা দেয় এবং ক্ষমা করার উপদেশ দেয়। ক্ষমা, দয়াশীলতা ও সাহসিকতার মাধ্যমে ক্ষোভ-বিদ্বেষ, মনস্তাত্ত্বিক সমস্যা ও সন্দেহপ্রবণতার মতো নানা সমস্যার সমাধান করা সম্ভব। আর এভাবে পারিবারিক সংকট প্রশমন করা সম্ভব।#

মন্তব্য লিখুন


Security code
রিফ্রেস দিন