এই ওয়েবসাইটে আর আপডেট হবে না। আমাদের নতুন সাইট Parstoday Bangla
সোমবার, 20 মে 2013 15:18

পাশ্চাত্যে পারিবারিক সংকট: (শেষ পর্ব)

পাশ্চাত্যে মাদক দ্রব্য ও মদের প্রতি তরুণ সমাজের ঝোঁক প্রবণতা ভয়াবহভাবে বাড়ছে।

আগের আসরগুলোতেও আমরা বলেছি, পাশ্চাত্যে ক্রমেই পরিবার প্রথার বিলোপ ঘটছে। এর ফলে সৃষ্টি হচ্ছে নানা সংকট। এসব সংকটের একটি প্রধান কারণ হচ্ছে বস্তুতান্ত্রিক চিন্তা তথা ধর্মহীনতা। মনে রাখতে হবে, সুস্থ সমাজ ও সভ্যতা নির্মাণে পরিবারের অবদানই সবচেয়ে বেশি। পরিবার এমন একটি প্রতিষ্ঠান,যাকে ভিত্তি করে মানুষের বংশ বিস্তার ঘটে। পরিবার থেকেই শিশুরা সামাজিক হয়ে ওঠে। ধর্মসহ সব ধরনের মৌলিক শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের ভিত্তিও গড়ে ওঠে এ প্রতিষ্ঠান থেকেই। কিন্তু দু:খজনকভাবে পাশ্চাত্যে মানুষ গড়ার এ প্রতিষ্ঠানটি আজ বিপর্যয়ের সম্মুখীন। পাশ্চাত্যের বেশিরভাগ পরিবার তাদের মৌলিকত্ব হারিয়েছে। বাবা অথবা মা নেই-এমন পরিবারের সংখ্যা বৃদ্ধি, বিয়ে বহির্ভূত সম্পর্কের জেরে অল্প বয়সী তরুণীদের গর্ভবতী হওয়া এবং সমকামিতার মতো সমস্যাগুলো পরিবার ও সমাজকে হুমকিগ্রস্ত করেছে। এর ফলে গোটা মানব জাতিই মারাত্মক বিপদের সম্মুখীন হয়েছে। এরপরও পাশ্চাত্যে সমকামিতাকে উস্কে দেয়া হচ্ছে।

 

সম্প্রতি ব্রিটেনেও ঘৃণ্য সমকামী বিয়েকে বৈধতা দেয়া হয়েছে। মার্কিন গবেষক ড. জেমস সি. ডবসন বলেছেন, ‘যারা সমকামিতাকে ছড়িয়ে দেয়ার জন্য কাজ করছে, তারা স্কুল-পড়ুয়া শিশু-কিশোরদের মন-মগজও ধোলাইয়ের চেষ্টা করছে। সরকারি স্কুলগুলো বিশেষকরে ক্যালিফোর্নিয়া ও ম্যাসাচুসেটসের স্কুলগুলোতে সমকামীদের প্রচারণা অনেক বেশি এবং তারা সেখানকার শিশু-কিশোরদেরকে সেদিকেই নিয়ে যাচ্ছে। প্রকাশ্যেই তারা ছাত্র-ছাত্রীদের এ শিক্ষা দিচ্ছে যে, সমকামিতা স্বাভাবিক ও সাদরে গ্রহণযোগ্য বরং প্রচলিত নৈতিকতাপূর্ণ সম্পর্ক কুসংস্কার ও বিদ্বেষে ভরা।’ পাশ্চাত্যে অফুরন্ত স্বাধীনতার শ্লোগান তুলে সমকামিতার মতো প্রকৃতি ও ধর্মবিরোধী ততপরতাকে বৈধতা দেয়া হলেও বাস্তবে নারীর প্রকৃত মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করা হচ্ছে না। নারীকে যৌন পণ্য হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে। সন্তান তথা ভবিষ্যত প্রজন্মকে নীতি-নৈতিকতা তথা সুশিক্ষিত করে গড়ে তোলার প্রধান ভিত্তি হলো পরিবার। আর পরিবারে এ দায়িত্ব পালনে মূল ভূমিকা রাখে নারী।

 

আল্লাহতায়ালা এ দায়িত্ব পালনের জন্য বিশেষ গুণাবলী দিয়ে নারীদের সৃষ্টি করেছেন। এ কারণেই নারীর কার্যক্রম পরিবার কেন্দ্রিক হলে সেই পরিবার সুখী ও সমৃদ্ধ হয়। এর পাশাপাশি নারী অন্যান্য কার্যক্রমেও অংশগ্রহণ করতে পারবে। কিন্তু পাশ্চাত্যে তখনি সমস্যা শুরু হয়েছে যখন থেকে পরিবার ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে নারীর জন্মগত বৈশিষ্ট্যকে অস্বীকার করা হচ্ছে। তথাকথিত নারী অধিকার প্রতিষ্ঠার নামে নারীর পোশাক-আশাক যখনি ছোটো করে ফেলা হচ্ছে,তখনি দেখা দিচ্ছে বিপর্যয়। মিনি স্কার্টসহ অশালীন পোশাক পরার কারণে ধর্ষণসহ নারী নির্যাতনের ঘটনা বেড়ে যাওয়ার কথা পাশ্চাত্যের চিন্তাবিদ ও রাজনীতিকরাও স্বীকার করতে শুরু করেছেন।

 

সম্প্রতি যুক্তরাজ্যের বেশ কিছু স্কুলে মেয়েদের মিনি স্কার্ট পরা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। বলা হয়েছে, হাঁটুর ওপর স্কার্ট পরা মেয়েদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। এ কারণে তারা যৌন হয়রানির শিকার হচ্ছে। যুক্তরাজ্যের সংসদ সদস্য রিচার্ড গ্রাহাম বলেছেন, মিনি স্কার্ট ও হাইহিল জুতা পরা নারীদের ধর্ষণের শিকার হওয়ার ঝুঁকি অনেক বেশি। একই কারণে সোয়াজিল্যান্ডেও মিনি স্কার্ট নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এ সব থেকে প্রমাণিত হয়, ইসলাম ধর্ম মেয়েদেরকে হিজাব বা ইসলামী শালীন পোশাক পরার যে নির্দেশ দিয়েছে, তা নারী তথা মানব জাতির জন্য কল্যাণকর। ইসলাম ধর্মে নারীকে সর্বোচ্চ মর্যাদা দেয়া হয়েছে। নারীর সম্মান ও মর্যাদা রক্ষার্থেই নানা নির্দেশনা এসেছে।

 

ইসলামের অধিকার আইনে পরিবারের ভরণ-পোষণ বা অর্থনৈতিক সমস্যা সমাধানের দায়িত্ব ন্যস্ত রয়েছে পুরুষের ওপর। নারী যেহেতু পরিবারের এই গুরুত্বপূর্ণ ঝামেলা থেকে দায়িত্বমুক্ত, সেজন্যে সাংসারিক ঘরকন্না এবং সন্তান-সন্ততিকে লালন-পালন করা,তাদের শিক্ষা-প্রশিক্ষণের দায়িত্ব ইত্যাদি বর্তায় নারীর ওপর। এভাবে নারী ও পুরুষের দায়িত্ব ভাগ করে দেয়া হয়েছে। তবে নারীকে ঘরের কাজে সাহায্য করতে উতসাহিত করা হয়েছে। রাসূল (সা.) স্ত্রীকে সহযোগিতাকারী স্বামীকে শহীদ ও খাঁটি সত্যবাদীর সঙ্গে তুলনা করেছেন। কিন্তু পাশ্চাত্যের পরিবার ব্যবস্থায় নারীর অবস্থান ভিন্ন। নারীরা সন্তান লালন-লালন ও পরিবার ব্যবস্থাপনাকে নিজের দায়িত্ব বলে মনে করে না।  ধর্ম ও আধ্যাত্মিকতা বাদ দিয়ে কেবলমাত্র বৈষয়িক স্বার্থকে গুরুত্ব দেয়ার কারণে নারী ও পুরুষ নিজেদের স্বকীয়তা হারাতে বসেছে।

 

পাশ্চাত্যে পরিবারের সদস্যদের অধিকারের কথা জোরেসুরে বলা হলেও পারস্পরিক দায়িত্ববোধের বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে না। এ কারণে পরিবারের প্রত্যেক সদস্য নিজের অধিকার আদায়ে সোচ্চার হলেও নিজের দায়িত্ব পালনে আগ্রহী নয়। পরিবারের প্রতিটি সদস্যেরই একে অপরের প্রতি দায়িত্ব রয়েছে। বাবা-মার প্রতি যেমন সন্তানের দায়িত্ব রয়েছে, ঠিক তেমনি সন্তানের প্রতিও রয়েছে বাবা-মা’র দায়িত্ব। ইমাম জয়নুল আবেদিন (আ.) সন্তানের প্রতি বাবা-মা’র অধিকার এবং বাবা-মা’র প্রতি সন্তানের অধিকার সম্পর্কে সুস্পষ্ট বক্তব্য রেখেছেন। যে কোনো সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার পেছনে বাবা-মা যে অবর্ণনীয় কষ্ট সহ্য করেন,তা তুলে ধরেছেন তিনি। সন্তানের ব্যাপারেও বাবা-মা’র ব্যাপক দায়িত্ব রয়েছে। ইমাম জয়নুল আবেদিন (আ.) এ সম্পর্কে বলেছেন, সন্তানের কাছে আল্লাহকে পরিচিত করানো, আল্লাহর মহিমা তুলে ধরা এবং আল্লাহর ইবাদত-বন্দেগিতে সন্তানকে উতসাহিত করা বাবা-মা’র দায়িত্বের অংশ।

 

ইসলাম ধর্মে পরিবার হচ্ছে মানুষ গড়ার এক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র।  ইসলাম বোঝাতে চায় যে, পরিবার হলো একটা মানবিক এবং প্রাকৃতিক সম্পর্ক নির্ভর,এটা কিছুতেই চুক্তি ভিত্তিক সম্পর্ক নয়। পরিবার হচ্ছে- প্রেম, ভালোবাসা,একতা এবং আন্তরিকতার লালন-কেন্দ্র। আর পরিবারে থেকেই এসব ইতিবাচক বিষয় গোটা সমাজে ছড়িয়ে পড়ে।পাশ্চাত্যের চিন্তাবিদরাও পরিবারের গুরুত্ব সম্পর্কে কথা বলেছেন। মার্কিন লেখক উইলিয়াম রাসবেরি এ সম্পর্কে বলেছেন, বর্তমান সংকট থেকে মুক্তি পেতে আমেরিকাকে আবারো পরিবার ব্যবস্থার দিকে ফিরে যেতে হবে। শুধু আমেরিকা নয় পাশ্চাত্যের সব দেশেরই উচিত, পরিবার ব্যবস্থার প্রতি শ্রদ্ধা জানানো। অন্যথায় সমকামিতার মতো ব্যাধিগুলো সর্বগ্রাসী পরিণতি ডেকে আনতে পারে। #

 রেডিও তেহরান/এএস/এসআই/২০

মন্তব্য লিখুন


Security code
রিফ্রেস দিন