এই ওয়েবসাইটে আর আপডেট হবে না। আমাদের নতুন সাইট Parstoday Bangla
শনিবার, 05 সেপ্টেম্বর 2015 16:16

হযরত লোকমান (আ.)

রংধনু আসরের শিশুকিশোর বন্ধুরা, তোমরা নিশ্চয়ই হযরত লোকমান (আ.) এর নাম শুনেছো। তিনি ছিলেন প্রাচীন যুগের একজন পণ্ডিত ও  জ্ঞানী ব্যক্তি। তিনি সারা জীবন মানুষকে মূল্যবান উপদেশ দিয়েছেন। তার সময়ে জ্ঞানগরিমা, বুদ্ধিশুদ্ধি, ভালো কথা ও সৎ কাজে তিনি ছিলেন সবার সেরা। আর এ কারণেই নবী না হবার পরও তার নাম পবিত্র কুরআনে উল্লেখ করা হয়েছে। আল্লাহতালা পবিত্র কুরআনে লোকমান হাকিমের কথা উল্লেখ করে বলেন যে , ' আমি লোকমানকে হেকমত তথা বুদ্ধি ও বিচক্ষণতা দিয়েছিলাম।'

 

হযরত লোকমান ছিলেন হাবশি সম্প্রদায়ের লোক। প্রথম জীবনে তিনি তৎকালীন শাম দেশের অধিবাসী এক ধনী ব্যক্তির অধীনে গোলামির জীবন শুরু করেন। তারপর তিনি গোলামির জীবন থেকে মুক্ত হয়ে আল্লাহতালার অপার অনুগ্রহে অফুরন্ত শিক্ষা-দীক্ষা এবং হেকমত শিক্ষা লাভ করেন। তাঁর জ্ঞান লাভের পেছনে তিনটি গুণ বিশেষ ভূমিকা রেখেছিল। এ সম্পর্কে একটি গল্প প্রচলিত আছে। গল্পটি এরকম- 

 

হযরত লোকমান যখন বকরি চরাতেন তখন একটি সমবয়সি বালকের সাথে তাঁর বন্ধুত্ব হয়। পরবর্তী জীবনে সেই বাল্যবন্ধুটি ঘটনাক্রমে লোকমানের একটি শিক্ষা মজলিসে উপস্থিত হয়ে দেখল যে, বহু মানুষ লোকমানকে ঘিরে বসে তাঁর কাছ থেকে এলেম ও হেকমত শিক্ষা করছে। অবাক হয়ে সেই বাল্যবন্ধু লোকমানকে লক্ষ্য করে বলল, 'তোমাকে দেখে বাল্যজীবনের কথা মনে পড়ছে। তুমি কি সেই লোক যার সাথে আমি মাঠে বকরি চরাতাম ?'

হযরত লোকমান লোকটির দিকে তাকিয়ে বললেন, 'হ্যাঁ বন্ধু তুমি ঠিকই ধরেছ আমি সেই লোক'।

বাল্যবন্ধু জিজ্ঞেস করল 'বন্ধু , তুমি এই মর্যাদা কিভাবে অর্জন করলে!' লোকমান জবাব দিলেন- তিনটি স্বভাবের মাধ্যমে। স্বভাব তিনটি হলো-

১. কোনদিনই কারও সঙ্গে মিথ্যা বলি নি

২. আমি কখনও কারো আমানতে খেয়ানত করি নি এবং

৩. কারও সাথে আমি কখনও বেহুদা কথায় সময় নষ্ট করি নি

 

বন্ধুরা, তোমরা নিশ্চয়ই জানো যে, হযরত লোকমান তার পুত্রকে উদ্দেশ্য করে বহু মূল্যবান উপদেশ দিয়েছেন। পবিত্র কুরআনের সূরা লোকমানে তা বর্ণনা করা হয়েছে। হযরত লোকমান হাকীম তাঁর পুত্র উদ্দেশ্য করে বলেছেন, "হে আমার পুত্র!  আল্লাহর সাথে তুমি কাউকে শরীক করো না; নিঃসন্দেহে আল্লাহর সাথে শরীক করা গুরুতর অপরাধ।" তিনি আরও বলতেন, “হে আমার পুত্র! সালাত কায়েম করো, আর সৎকাজের নির্দেশ দাও এবং অসৎকাজে নিষেধ কর। বিপদে-আপদে সবর করো। নিশ্চয়ই এটা সাহসিকতার কাজ।”

হযরত লোকমান হাকীম মানুষকে গর্ব-অহংকার করা, উচ্চস্বরে কথা বলা, পিতামাতাকে কষ্ট দেয়া, কুফরী করা, ভোগ-বিলাসে গা ভাসিয়ে দেয়া থেকে বিরত থাকার জন্যও উপদেশ দিয়েছেন। দেখতে কালো এ মানুষটি কৃতদাস থাকাকালে তাঁর মনিবকে অনেক পরামর্শ দিয়েছেন। এ সময় তাঁর জীবনে ঘটে যায় অনেক ঘটনা।

বন্ধুরা, রংধনু আসরে আমরা তাঁর ক্রীতদাস জীবনের একটি ঘটনা প্রচার করেছি। গল্পটি এখানে উপস্থাপন করা হল:

 

বহুদিন আগের কথা। হযরত লোকমান হাকিম তখন যুবক। একটি ঘটনায় তাকে বন্দী হিসেবে আটক করা হলো। পরে তাকে এক ধনী লোকের ক্রীতদাস হিসেবে বিক্রি করা হলো। সৌভাগ্যক্রমে লোকমানের মনিব ছিলেন একজন বুদ্ধিমান ও রুচিশীল মানুষ। অল্পদিনের মধ্যেই তিনি লোকমানের মধ্যে লুকিয়ে থাকা বুদ্ধি, বিবেক, জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও ঈমান দেখে মুগ্ধ হলেন। দেখতে দেখতে মালিক, লোকমান হাকীমকে নিজের সন্তানের মতো ভালোবাসতে লাগলেন। মনিব সবসময় চেষ্টা করতেন, লোকমানের মান-সম্মান যেকোনো অবস্থায় বজায় রাখতে। তিনি তখন খেতে বসতেন তখন লোকমানকে সাথে নিয়েই খেতেন।

 

হযরত লোকমান নিজে আগে খাবার খেতেন তারপর খাবারের বাকি অংশ খেতো তার মনিব এবং তারপর অন্যান্যরা। লোকমান যদি কোনো কারণে কোনো একটা খাবার না খেতেন তার মনিবও সেই খাবারে মুখ দিত না। একান্তই যদি নিরুপায় হয়ে খেতেই হতো তাহলে এমনভাবে খেতো যেন ইচ্ছে নেই কিংবা ক্ষুধা নেই।

 

ওই ধনী লোকটির জন্য একদিন কে যেন একটা তরমুজ পাঠিয়েছিল উপহার হিসেবে। লোকটি সঙ্গে সঙ্গে তার এক গোলামকে ডেকে বলল- “এক্ষুণি গিয়ে লোকমানকে ডেকে আনো। লোকমান এসে আগে তরমুজ খাবে তারপর আমি খাব।”

লোকমান আসার পর তার মনিব একটা ছুরি দিয়ে তরমুজটি কাটল। প্রথম টুকরোটি দিল লোকমানকে। লোকমান তরমুজের ওই টুকরোটি এমনভাবে খেতে শুরু করল যেন মধুর চেয়েও মিষ্টি ওই তরমুজ। বেশ মজা করে খেল। লোকমান খুব মজা করে খাচ্ছে দেখে লোকটা পরের টুকরোটিও তাকে খেতে দিল। কারণ সে সত্যিই লোকমানকে ভীষণ ভালোবাসে। লোকমান আবারও বেশ মজা করে তরমুজের টুকরোটি খেল। এভাবে পরপর সতের টুকরো তরমুজ লেখেন লোকমান। অবশেষে একটি মাত্র টুকরো বাকি ছিল, ওই টুকরোটি মনিব নিজে খাবে বলে সিদ্ধান্ত নিল। সে বলল: এই টুকরোটি আমি নিজে খাব, দেখব এবং জানব তরমুজ কী করে এতো মিষ্টি আর সুস্বাদু হয়। লোকমান কী মজা করেই না সতেরটি টুকরো খেয়েছে!

 

কিন্তু যখনই মনিব তরমুজের শেষ টুকরোটি মুখে দিল এবং খেল, তিতা স্বাদ আর অন্যরকম একটা উটকো ঝাঁঝে তার চেহারা বিকৃত হয়ে গেল। এতো বেশি ঝাঁঝ আর তিতা ছিল ওই তরমুজ যে মনিবের জিহ্বার পাশাপাশি গলাও তিতা হয়ে গেল। অতিরিক্ত তিতার কারণে লোকটি অজ্ঞান হয়ে পড়ার উপক্রম হলো। বেশ কিছু সময় পর কিছুটা স্বস্তি বোধ করল মনিব। এরপর লোকমানকে লক্ষ্য করে বললেন, হে বৎস! তোমার চেহারা দেখে মনে হচ্ছিল তরমুজটি খুবই সুস্বাদু। কিন্তু খেতে গিয়ে আমি বুঝলাম, ওটা ছিল ভয়ানক তিতা। এখন বল, কেন তুমি বিষয়টি গোপন রাখলে? কি দরকার ছিল এত তিতা তরমুজ খাওয়ার?

 

লোকমান এবার মুখ খুললেন। বললেন: “তরমুজটা যে তিতা ছিল এতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু এ কয়েক বছর আপনার হাতে আমি অনেক মজার মজার খাবার খেয়েছি। তাই কোনোভাবেই আমি আপনাকে বুঝতে দিতে চাইনি যে, তরমুজটি ভীষণ তিতা ছিল। আপনি আমাকে অনেক সম্মান দিয়েছেন, তাই আমার মন চায়নি একটা মাত্র তরমুজের তিক্ততা নিয়ে আপত্তি করে আপনার অমর্যাদা করি। আপনি আমাকে ভালোবেসে যে মিষ্টি খাইয়েছেন, আমাকে দয়া করে যে পরিমাণ অনুগ্রহ দেখিয়েছেন, তার তুলনা সামান্য এই তরমুজের তিতা কিছুই না।“

একটু থেমে লোকমান আবার বললেন, “আমি মানুষকে সবসময় উপদেশ দিয়ে এসেছি তারা যেন অন্যদের ভালো কাজ ও আচরণের মর্যাদা দেয়, তারা যেন নিমক-হালাল না হয়। সেই আমিই আজ কি করে নিজের দেয়া উপদেশ ভুলে গিয়ে নিমক-হারামী করতে পারি?

মনিবের উদ্দেশ্যে হযরত লোকমান এবার বললেন, “আহা! কতই না ভালো হতো যদি তরমুজটার শেষ টুকরাও আমাকে দিতেন এবং আমার প্রতি আপনার মমতা ও স্নেহ নিয়ে তৃপ্ত ও আনন্দিত থাকতেন; যেমনি করে আমি আপনার মহত্ব ও উত্তম আচরণের কারণে আপনার নিকট চির ঋণী হয়ে আছি।”

 

বন্ধুরা,  দেখলে তো হযরত লোকমান কিভাবে তার মনিবের প্রতি কৃতজ্ঞতার নজির স্থাপন করলেন?  আমাদেরও উচিত আমাদের অভিভাবক ও পিতামাতার প্রতি কৃতজ্ঞ হওয়া।  তবে  সবচেয়ে বেশী কৃতজ্ঞ হওয়া উচিত মহান আল্লাহর প্রতি যিনি আমাদেরকে জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও বুদ্ধি-বিবেক দিয়ে সৃষ্টি করেছেন। আর মহান আল্লাহর নির্দেশও কিন্তু এরকমই। তিনি সূরা লোকমানের ১২ নম্বর আয়াতে বলেছেন, “আমি লোকমানকে প্রজ্ঞা প্রদান করেছি এই মর্মে যে, আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞ হও।  যে কৃতজ্ঞ হয়, সে তো কেবল নিজের কল্যাণের জন্যই কৃতজ্ঞ হয়। আর যে অকৃতজ্ঞ হয়, সেক্ষেত্রে আল্লাহ প্রকৃতপক্ষেই অমুখাপেক্ষী ও  প্রশংসিত।"

 

বন্ধুরা! এ গল্প থেকে শিক্ষা নিয়ে আমাদের সৃষ্টিকর্তা মহান আল্লাহকে ভালোবাসতে হবে। তাহলে আল্লাহও আমাদের ভালোবাসবেন। জীবনে চলার পথে বহু রকমের কষ্ট ও আমাদের বাধা   সামনে আসতে পারে। সেইসব কষ্ট আর বাধা উত্তীর্ণ হতে হবে আল্লাহকে ভালোবেসে। আল্লাহর প্রতি কোনোরকম আক্ষেপ আর ক্ষোভ না দেখিয়ে হযরত লোকমানের মতো কঠিন তিতা তরমুজ অর্থাৎ   কষ্টগুলোকে হাসতে হাসতে মজা করতে করতে বরণ করে নিতে হবে। কেমন! #

 

রেডিও তেহরান/এআর/৫

মাধ্যম

মন্তব্য লিখুন


Security code
রিফ্রেস দিন