এই ওয়েবসাইটে আর আপডেট হবে না। আমাদের নতুন সাইট Parstoday Bangla
শনিবার, 05 ডিসেম্বর 2015 18:26

ইসলামের দৃষ্টিতে যুদ্ধ ও মানবতা

রংধনু আসরের শিশু-কিশোর বন্ধুরা, কেমন আছো তোমরা? কি বললে, ভালো নেই! কিন্তু কেন ভালো নেই- তাতো বললে না? অবশ্য তোমরা না বললেও আমরা ঠিকই বুঝতে পারছি যে, ফিলিস্তিন, ইরাক, সিরিয়া, ইয়েমেনসহ বিভিন্ন দেশে আমেরিকা-ইসরাইল, সৌদি আরব এবং তাদের তৈরি করা বিভিন্ন সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর নৃশংস হামলার কারণে তোমাদের মন ভালো নেই। শুধু তোমরা নও, বিশ্বের প্রতিটি শান্তিকামী মানুষই এসব বর্বরোচিত হামলা দেখে মর্মাহত। সবচেয়ে দুঃখজনক খবর হচ্ছে, গত কয়েক বছর ধরে তাকফিরি সন্ত্রাসী গোষ্ঠী আইএসআইএস বা দায়েশ ইসলামের নামে মানুষ হত্যা করছে! নীরিহ মানুষদের আগুনে পুড়িয়ে, পানিতে চুবিয়ে, মাথায় বোমা মেরে কিংবা গাড়ির সঙ্গে বেধে অত্যন্ত নৃশংস কায়দায় হত্যা করে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে এই গোষ্ঠীটি। তারা কাবাঘরে হামলার হুমকি দিয়েছে, গাজা দখলের ঘোষণা দিয়েছে এমনকি  মসজিদ, মাজারে মাঝেমধ্যেই হামলা চালিয়ে মানুষ হত্যা করছে।

 

এই সন্ত্রাসীরা সিরিয়ায় দুজন সাহাবীর লাশ কবর থেকে তুলে চুরি করেছে। তারা নিহত একজন সিরিয় সেনার কলিজা চিবিয়ে খাওয়ার পর তার ভিডিও প্রচার করেছে। এ ঘটনার কথা তুলে ধরে নও-মুসলিম ডক্টর জন অ্যান্ড্রু মরো আইএসআইএলকে উদ্দেশ করে বলেছেন, 'আবু সুফিয়ানের স্ত্রী হিন্দা ঠিক এই কাজটিই করেছিল। তোমরা সাহাবী ও নবী (সা.)'র অনুসরণ করছো না। বরং তোমরা অনুসরণ করছো মুশিরকদের বা বহু খোদায় বিশ্বাসীদের।'

 

বন্ধুরা, তোমরা জানো যে,  ইসলাম হচ্ছে শান্তির ধর্ম। অথচ ইসলামকে বিতর্কিত করার জন্য দায়েশ নেতা বাগদাদি বলেছেন, ‘ইসলাম কখনও শান্তির ধর্ম ছিল না, ইসলাম হচ্ছে যুদ্ধের ধর্ম।’

 

আমেরিকা-ইসরাইলের সৃষ্ট দায়েশ প্রধান আবু বকর আল বাগদাদির এমন বক্তব্যে আমরা অবাক হইনি। কারণ সে একজন ইহুদি। তার প্রকৃত নাম ইলিয়ট শিমন। তিনি একজন ইহুদি হওয়ার পরও পশ্চিমা মিডিয়াগুলো তাকে সুন্নি নেতা বলে চালিয়ে দিচ্ছে। তাকে অস্ত্র ও অর্থ দিয়ে সহযোগিতা করছে আমেরিকা, ইসরাইল, ফ্রান্স, ব্রিটেন, সৌদি আরবসহ কয়েকটি দেশ।  

 

ইরাকের একজন বিশিষ্ট সুন্নি আলেম শেখ আহমদ আল কুবাইসি বাগদাদি সম্পর্কে বলেছেন, ওয়াহাবি ফের্কার প্রতিষ্ঠাতা আবদুল ওয়াহাব নজদির মতোই আইএসআইএল-এর নেতা কথিত খলিফা আবুবকর বাগদাদি ইহুদিদেরই প্রতিপালিত এমনকি সে ইয়াজিদের চেয়েও নিকৃষ্ট।

 

জামায়াতে ইসলামী হিন্দের আমির মাওলানা সৈয়দ জালালউদ্দীন উমরি বলেছেন, ইসলাম ধর্মের সঙ্গে আইএসআইএলের কোনো সম্পর্ক নেই এবং এসব প্রশিক্ষিত সন্ত্রাসী ইসলামভীতি ছড়িয়ে দেয়ার চেষ্টা করছে।

 

অন্যদিকে, তেহরানের জুমআর ইমানের খতিব আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ আহমেদ খাতামি বলেছেন, ইসলামের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য দায়েশ এবং অন্যান্য তাকফিরি গোষ্ঠীকে সৃষ্টি করা হয়েছে।

 

আর ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহিল উজমা খামেনেয়ী বলেছেন, ‘তাকফিরি সন্ত্রাসীগোষ্ঠী এবং তাদের পৃষ্ঠপোষক সরকারগুলো ইসলামের ছদ্মবেশ ধারণ করে আমেরিকা, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং ইহুদিবাদী ইসরাইলের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।‘

 

বন্ধুরা, তোমরা যদি পবিত্র কুরআনের শিক্ষাগুলোর দিকে একটু নজর দাও তাহলে দেখতে পাবে যে, মানুষের মাঝে ভ্রাতৃত্ব এবং শান্তি প্রতিষ্ঠাই ইসলামের লক্ষ্য, আইএসআইএল যা করছে তা ইসলামের শিক্ষা বিরোধী। পবিত্র কুরআনের সূরা বাকারার ২০৮ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছেঃ “হে ঈমানদারগণ! তোমরা পরিপূর্ণভাবে শান্তি ও ভ্রাতৃত্বের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাও এবং শয়তানের পদাংক অনুসরণ করো না। নিশ্চয়ই সে তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু ।”  

 

এই আয়াতটির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে- যারা এই শান্তি ও সমঝোতার পথ ছেড়ে দিয়ে যুদ্ধ ও সংঘাতের পথ বেছে নিয়ে আগুনের লেলিহান শিখা জ্বালিয়ে দেয়, তারা শয়তানের অনুসারী। তার মানে হলো সমঝোতা ও শান্তি হচ্ছে দয়াময় আল্লাহর কাজ আর সমাজে যুদ্ধ ও সংঘাতের আগুন জ্বালিয়ে দেয়া বর্বর শয়তানের কাজ।

 

ইহুদি-খ্রিস্টানরা যেহেতু ইসলামের শক্তিশালী ও উন্নত সংস্কৃতিকে যুক্তি দিয়ে মোকাবেলা করতে সক্ষম নয় সেহেতু তারা ইসলামের নামে সন্ত্রাসীগোষ্ঠী গঠন করে মানুষের মধ্যে ভীতি সৃষ্টি করছে। যারা ইসলামের ব্যাপারে আগ্রহী তাদেরকে ফিরিয়ে রাখার স্বার্থে ইসলামকে ‘সন্ত্রাসী’ ধর্ম প্রমাণ করার চেষ্টা করছে। কিন্তু আমরা যদি ইসলামের ইসলামে যুদ্ধের ইতিহাস পর্যালোচনা করি তাহলে দেখতে পাব-  কোনো যুদ্ধেই মুসলমানরা আগে যুদ্ধ শুরু করে নি, শত্রুপক্ষই যুদ্ধ শুরু করেছে। যুদ্ধবন্দিদের সঙ্গে ইসলাম অত্যন্ত মানবিক আচরণ করেছে।

 

মুশরিকদের সাথে যুদ্ধ শুরু হয়ে যাবার পরও শত্রুদের সাথে, শত্রু পক্ষের বন্দিদের সাথে, আহতদের সাথে এবং বেসামরিক লোকজনের সাথে যেন মানবীয় নীতি নৈতিকতাগুলো মেনে চলা হয় সেজন্যে নবীজী তাঁর অনুসারীদের লক্ষ্য করে আদেশ দিতেন। ইসলামের বিভিন্ন বর্ণনায় যুদ্ধে কী ধরনের শিষ্টাচার এবং নীতি নৈতিকতা মেনে চলা উচিত সে সম্পর্কে চমৎকার কিছু দিক উল্লেখ করা হয়েছে।

 

ইমাম সাদেক (আ) বলেন, ‘রাসূলে আকরাম (সা.) যখন মুসলমান সেনাদেরকে যুদ্ধের ময়দানে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিতেন, তাদেরকে ডেকে পাঠাতেন এবং তাদেরকে স্পষ্টভাবে বলতেন, যুদ্ধের ময়দানের দিকে অগ্রসর হও তবে কামনা বাসনা চরিতার্থ করার লক্ষ্যে নয় বরং আল্লাহকে স্মরণ করতে করতে এবং তাঁরই সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষ্যে ইসলামের নীতিমালা অনুযায়ী আমল করতে করতে আল্লাহর রাস্তায় পা বাড়াও।'

 

বন্ধুরা, তোমরা নিশ্চয়ই জানো যে, আমিরুল মুমেনিন হযরত আলী (আ.) আব্দুর রাহমান ইবনে মুলযেম নামে এক ব্যক্তির তরবারীর আঘাতে শহীদ হয়েছিলেন। উনিশে রমযানে তাঁকে আঘাত করা হয়েছিল, আর একুশে রমযানে তিনি শাহাদাত লাভ করেন। এই মধ্যবর্তী সময়টাতে তিনি ইচ্ছে করলেই এর প্রতিশোধ নিতে পারতেন। কিন্তু তিনি তা নেন নি। কারণ প্রতিশোধের ক্ষেত্রে তাড়াহুড়ো করা বা ব্যক্তিগত প্রতিহিংসা থেকে তিনি সবসময় দূরে থেকেছেন। তাই তিনি তরবারীর আঘাত খেয়েও অপেক্ষা করেছেন এবং মুলযেমের যথার্থ যত্ব নেয়া হচ্ছে কিনা বা তার খাবার-দাবারের কোনো সমস্যা হচ্ছে কিনা; প্রভৃতি বিষয়ে খোঁজ নিয়েছেন। শহীদ হবার আগে তিনি বলে গিয়েছিলেন-"আমি যদি মারা যাই, তাহলে মুলযেম আমাকে যেভাবে তরবারি দিয়ে একটিমাত্র আঘাত করেছে, ঠিক সেভাবে তাকেও একটিমাত্র আঘাত করবে, এর বেশি নয়।”

 

সিফফীনের যুদ্ধে শত্রু সেনাদেরকে নদীর পানি থেকে বঞ্চিত করার সুযোগ ইমাম আলীর ছিল, কিন্তু তিনি তা করেননি। যুদ্ধের মাঠে এক শত্রু যখন তাঁর মুখে থু থু নিক্ষেপ করেছিল, তখন তিনি ওই শত্রুকে তৎক্ষণাৎ আর মারেননি। শত্রু  যখন তাঁকে এ ব্যাপারে জিজ্ঞেস করেছিল, তখন তিনি বলেছিলেন, তোমার থু থু নিক্ষেপের ঘটনায় আমার মনে ব্যক্তিগত প্রতিশোধস্পৃহা জেগে থাকতেও পারত। আর আমি তো তোমাকে ব্যক্তিগত প্রতিহিংসাবশত মারতে পারি না।”

 

এই ছিল হযরত আলী ( আ. ) এর মহানুভবতা। যুদ্ধক্ষেত্রে কিংবা স্বাভাবিক জীবনে ইসলামের নীতি এটাই। এ বিষয়ে আমরা হযরত আলীর নিয়োগ করা গভর্নর ও বিখ্যাত সেনাপতি মালিক আশতার নাখ্‌ঈ’র জীবন থেকে এবার একটি ঐতিহাসিক ঘটনা শুনব।

 

একবার মালিক আশতার কুফা'র বাজারের ভেতর দিয়ে যাচ্ছিলেন। সাদাসিধে পোশাকে থাকায় অনেকেই তাকে চিনতে পারলেন না। এক দোকানি তখন দোকানে বলেছিল। বন্ধুদের হাসানোর জন্য সে এক মুঠো ময়লা মালিক আশতারের ওপর নিক্ষেপ করল। দোকানদারের এ অভদ্র আচরণে মালিক আশতার কোনো প্রকার রাগ বা ক্রোধ প্রকাশ না করে বরং অত্যন্ত শান্ত ও নিশ্চিত মনে নিজের পথে চলে যেতে লাগলেন যেন কিছুই হয়নি। তিনি কিছুদূর যাওয়ার পর দোকানির এক বন্ধু তাকে বলল: তুমি যে লোকের ওপর ময়লা নিক্ষেপ করেছো, তুমি কি তাকে চেনো?

 

দোকানি: “না,  আমি তাকে মোটেই চিনি না। আমি তো মনে করেছি সহস্র পথিকের মতো সে-ও একজন। তোমার যদি জানা থাকে তাহলে বলো- এ লোকটি কে?

বন্ধু:  আসলেই তুমি তাকে চেনো না? খুবই আশ্চর্যের বিষয়! আরে, তুমি যার শরীরে ময়লা ছুড়েছো, তিনি আর কেউ নন; তিনি হলেন মুসলিম সেনাবাহিনীর প্রখ্যাত সেনাপতি জনাব মালিক আশতার নাখঈ।

 

দোকানি: কি বললে- তিনিই সেই বিখ্যাত সেনাপতি মালিক আশতার; যার ভয়ে বাঘের কলিজাও পানি হয়ে যায়! যার নাম শুনলে শত্রুর আত্মা কেঁপে ওঠে!!

বন্ধু: হ্যাঁ, হ্যাঁ, তিনি সেই মালিক আশতার।

দোকানি: হায়! হায়! তুমি একি শোনালে!! আমি তো অনেক বড় অন্যায় করে ফেলেছি। এক্ষুণই তিনি হয়ত আমার অপরাধের কঠিন শাস্তি দেয়ার হুকুম দেবেন। আমি তার কাছে গিয়ে আমার অপরাধের জন্য এক্ষুণি ক্ষমা চাইব।

 

এই বলে দোকানদার মালিক আশতারের পেছনে পেছনে দৌঁড়াতে লাগল। কিছুদূর যাওয়ার পর সে দেখতে পেল যে, মালিক আশতার একটা মসজিদের দিকে যাচ্ছেন। দোকানিও তাঁর পেছনে পেছনে মসজিদে প্রবেশ করল। সে দেখল, মালিক আশতার নামায পড়ছেন। কিছুক্ষণ পর্যন্ত দোকানি সেখানে অপেক্ষা করল। নামায শেষ হবার সাথে সাথেই দোকানদার মালিক আশতারের সামনে এসে অত্যন্ত লজ্জিত ও বিনম্রভাবে নিজের পরিচয় দিয়ে বলল:

 

দোকানি: আমি সেই লোক, যে নিজের অজ্ঞতা ও বোকামির কারণে আপনার সাথে অন্যায় করেছি।

মালিক আশতার বললেন: “আল্লাহর কসম করে বলছি, এ মুহূর্তে মসজিদে আসার কোনো ইচ্ছা আমার আদৌ ছিল না। আমি তো কেবল তোমার জন্যই এখানে এসেছি। কেননা আমি বুঝতে পারলাম যে, তুমি একজন অজ্ঞ ও পথভ্রস্ট লোক, এ কারণে লোকদেরকে অন্যায়ভাবে কষ্ট দিয়ে থাকো। তোমার এ অজ্ঞতা দেখে আমার মনে ব্যথা পেলাম। তাই আল্লাহর নিকট তোমার সঠিক পথেকে হেদায়াত লাভের জন্য দোয়া করতে মসজিদে এসেছি। তুমি যে ভয় পাচ্ছ তার কোনো কারণ নেই।”

 

বন্ধুরা, দেখলে তো, একজন মুসলিম সেনাপতি কেমন উন্নত চরিত্রের অধিকারি হতে পারেন? অথচ যারা ইরাক, সিরিয়া, ইয়েমেনে, বাহরাইনসহ বিভিন্ন দেশে হামলা চালাচ্ছে তারা নামে মুসলমান হলেও তারা ইসলামের শত্রুদেরকেও হার মানিয়েছে। তারা মহররমসহ ইসলামের নিষিদ্ধ মাসগুলোতেও মানুষ হত্যা করছে। ইসলামকে বিতর্কিত করার জন্য তারা যে বর্বরতা চালাচ্ছে সে সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করতে হবে। সেইসঙ্গে শান্তির ধর্ম ইসলামের বাণী সর্বত্র ছড়িয়ে দিতে হবে। তাহলেই পথহারা মানুষজন ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে আশ্রয় দেবে।#

 

রেডিও তেহরান/এআর/৫

 

 

 

মাধ্যম

মন্তব্য লিখুন


Security code
রিফ্রেস দিন