এই ওয়েবসাইটে আর আপডেট হবে না। আমাদের নতুন সাইট Parstoday Bangla
মঙ্গলবার, 15 ডিসেম্বর 2015 08:50

বিশ্বনবীর (সা) ওফাত ও ইমাম হাসানের শাহাদাত বার্ষিকী

রংধনু আসরের শিশু-কিশোর বন্ধুরা, তোমরা হয়ত জানো যে, হিজরী সনের আটাশে সফর ইসলামের ইতিহাসে এক শোকাবহ দিন। কোনো কোনো বর্ণনায় এসেছে, এই দিন বিশ্বমানবতার মুক্তির দিশারী হযরত মুহাম্মাদ ( সা. ) এর ওফাত দিবস। অবশ্য ১২ই রবিউল আউয়াল তারিখে মহানবীর ইন্তেকাল হয়েছে বলেও প্রসিদ্ধি রয়েছে। তবে মতানৈক্যের উর্ধ্বে উঠে যে বিষয়টি আমাদের বিবেচনা করতে হবে তা হলো, মহানবী (সা.) এই পৃথিবীতে আমাদের জন্যে যে বার্তা নিয়ে এসেছিলেন, যে আদর্শ  বিশ্ববাসীকে দিয়ে গেছেন, তা আমরা কতোটা অনুসরণ করছি। মনে রাখতে হবে রাসূলের প্রতি সম্মান ও শ্রদ্ধা প্রদর্শনের একমাত্র উপায় হলো তাঁর প্রদর্শিত পথে চলা। জীবন সমস্যার সমাধানে তাঁর নির্দেশনাকে কাজে লাগানো। তাঁর চারিত্র্যিক ও নৈতিক আদর্শে আমাদের জীবনকে রাঙিয়ে তোলাই হবে তাঁর প্রতি ভালোবাসা নিবেদনের অন্যতম উপায়।

 

বন্ধুরা, আগেই বলেছি যে, ১১ হিজরীর ২৮ সফর বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) সবাইকে কাঁদিয়ে মহান আল্লাহর কাছে চিরদিনের জন্য চলে গেছেন। বিস্ময়ের ব্যাপার হচ্ছে- একই মাসের একই দিন অর্থাৎ ২৮ সফর রাসূলেখোদার প্রাণপ্রিয় নাতি ইমাম হাসান (আ.)ও শাহাদাত বরণ করেন। তবে তিনি শহীদ হন নবীজির ওফাতের ৩৯ বছর পর অর্থাৎ ৫০ হিজরীতে।

 

রাসূল (সা.) তার নাতি ইমাম হাসান ও হুসাইনকে খুব ভালো বাসতেন। তিনি  বলতেন, যারা হাসান ও হুসাইনকে ভালোবাসবে তারা আমাকেই ভালোবাসল, আর যারা এ দুজনের সাথে শত্রুতা করবে তারা আমাকেই তাদের শত্রু হিসেবে গণ্য করল।'  

রাসূলেখোদা আরও বলেছেন: হাসান ও হুসাইন আমার সন্তান। আমিরুল মু’মিনীন হযরত আলী ইবনে আবি তালিবও রাসূলের কথাকে স্মরণ করে নিজের অন্য সন্তানদেরকে বলতেন: তোমরা আমার সন্তান এবং হাসান ও হুসাইন আল্লাহর রাসূল (স.) এর সন্তান।

ইমাম হাসান (আ.) ৩য় হিজরী’র ১৫ই রমজানের রাতে মদিনায় জন্মগ্রহণ করেন। তিনি আমিরুল মু’মিনীন হযরত আলী (আ.) ও নারীকূলের শিরোমনি হযরত ফাতেমা যাহরা (সা. আ.)-এর প্রথম সন্তান।

 

হযরত মহানবী (সা.) তাঁর জন্মের পর তাঁকে কোলে তুলে নিয়ে তাঁর বাম কানে ইকামত দেন। অতঃপর একটি দুম্বা কুরবানী করেন এবং তার মাথার চুল কামিয়ে সে চুলের ওজনে রূপা দরিদ্র ও অভাবীদের মাঝে বিতরণ করে তাঁর মাথায় আতর লাগাতে বলেন। আর তখন হতেই মাথার চুলের ওজনে সাদকা দেয়া ও আকিকা করা একটি সুন্নতে পরিণত হয়।

 

মহানবী (সা.) তার বড় নাতি ইমাম হাসানকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিতেন। তাঁর ওপর যখনই কোনো ওহী অবতীর্ণ হতো তখন তিনি তাঁর সাহাবীদের কাছে প্রকাশ করার পাশাপাশি ইমাম হাসানকেও জানাতেন। ইমাম হাসান তখনই তার মা হযরত ফাতিমা (সা. আ.)’কে তেলাওয়াত করে শুনিয়ে তাঁকে হতবাক করে দিতেন। এ ব্যাপারে হযরত ফাতিমাকে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি জানান যে, ইমাম হাসানের মাধ্যমে ওই ওহী সম্পর্কে অবহিত হয়েছেন।

বন্ধুরা, ঐতিহাসিক ২৮ সফর উপলক্ষে আমরা একটি বিশেষ অনুষ্ঠান প্রচার করেছি। অনুষ্ঠানটি সাজানো ছিল রাসূল (সা.) এর শিশুপ্রীতি সম্পর্কে কয়েকটি ঘটনা দিয়ে।

প্রথমেই আমরা রাসূলের শিশুপ্রীতি সম্পর্কে তাঁর সাহাবী আবু নায়ীম শৈশবের মধুমাখা স্মৃতির কিছু কথা শুনব- যে স্মৃতিতে অম্লান হয়ে জড়িয়ে আছেন বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) নিজে।

 

মক্কা থেকে মদীনায় বিশ্বনবীর হিজরতের প্রাথমিক বছরগুলোতে প্রিয় নবীজির সঙ্গে কাটানো সেই মিষ্টি মধুর দিনগুলোর কথা প্রায়ই ভেসে ওঠে আবু নায়ীমের মনে। আবু নায়ীম মাঝে মধ্যে তাঁর ছেলের কাছে সে দিনগুলোর কথা বলতে গিয়ে আবার যেন ফিরে পেতে চান সোনালী সেই দিনগুলো। বিশেষ করে, যে দিন প্রিয় নবী আদর করে তাঁর পিঠ চাপড়িয়ে দিয়েছিলেন সেই সুন্দর দিনটি তিনি কখনোই ভুলেন না। সে দিনটি মদীনার অলি গলি শিশুদের প্রাণচাঞ্চল্য ও কোলাহলে মুখরিত ছিল। রাস্তার এক পাশ থেকে অন্য পাশে তারা ছুটোছুটি করছিল।

কচি কাঁচা শিশুদের হাসির কলোরোল যেন গোটা মদীনা শহরেই ধ্বনিত প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল। শিশু কিশোরদের কোলাহলের মধ্যেই শোনা গেলো উটের ঘণ্টার শব্দ। এ ঘণ্টার শব্দে বোঝা যাচ্ছিল, দূর থেকে শহরের দিকে এগিয়ে আসছে একটি কাফেলা। হ্যাঁ, কোনো এক সফর থেকে মদীনায় ফিরছিলেন বিশ্বনবী (সা.) ও তাঁর সাহাবীদের একটি দল। এ সম্পর্কে আবু নায়ীম বললেন,

 

“মহানবী (সা.) ও তাঁর কাফেলা শহরের দিকে আসছে এটা দেখতে পেয়ে আমরা আমাদের খেলাধুলা বন্ধ করলাম এবং আল্লাহর প্রিয় নবী (সা.)'র আগমনের জন্যে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতে লাগলাম। বিস্ময়ের ব্যাপার হলো, কোনো কিছুই আমাদেরকে খেলাধুলা থেকে বিরত রাখতে পারতো না। কিন্তু সব সময় মুখে হাসি লেগে থাকা প্রিয় নবীজীকে দেখলেই আমরা খেলা ভুলে যেতাম। রাসূলের কাফেলা যখন শহরে ঢুকে পড়লো তখন আমরা শিশুরা আনন্দে উচছ্বসিত অবস্থায় তাঁর দিকে ছুটে গেলাম। ভ্রমণের কারণে শ্রান্ত ও ক্লান্ত হওয়া সত্ত্বেও তিনি আমাদের জন্যে থামলেন এবং আমাদেরকে তাঁর দিকে আসার জন্যে সাহাবীদেরকে পথ ছেড়ে দিতে বললেন।

আবু নায়ীম বললেন, আমার ছোট্র বন্ধুদের অনেকেই রাসূল (সা.)কে জড়িয়ে ধরলেন এবং কেউ কেউ খুশীতে মত্ত হয়ে তাঁর চারদিকে পাখীর মতো ঘুরতে লাগল। রাসূলের সাহাবীরা আমাদের বাধা দিতে চাইলেন, কিন্তু রাসূল তাঁদেরকে তা করতে দিলেন না, বরং তিনি অত্যন্ত মমতা দিয়ে আমার বন্ধুদের সাথে আলিঙ্গন করলেন। আমিও প্রিয় রাসূল (সা.)'র কাছে আসার জন্যে অপেক্ষার প্রহর গুণছিলাম, কিন্তু লাজুক হওয়ায় আমি এক কোণে সরে দাঁড়িয়েছিলাম এবং আনন্দের এ দৃশ্যগুলো দেখছিলাম।

এমন সময় রাসূল মিষ্টি হাসি হেসে আমার দিকে তাকালেন। তিনি আমার দিকে এগিয়ে এলেন এবং এগিয়ে আসতে আসতে তিনি আমার দিকে তাঁর দু'হাত বাড়িয়ে দিলেন। আর আমিও অপ্রতিরোধ্য ইচ্ছা নিয়ে রাসূল (সা.)কে আলিঙ্গন করতে এগিয়ে গেলাম। রাসূলেখোদা আমার সাথে আলিঙ্গন করলেন এবং আমার কপালে চুমু দিলেন এবং আমার পিঠ চাপড়িয়ে দিলেন। এটা ছিল আমার জন্যে অবর্ণনীয় মুহূর্ত যা আমি কখনো ভুলব না। মহানবীর সান্নিধ্যের সেই স্মৃতি কতো মধুর! ইস! সেই দিনগুলো যদি আর একবার ফিরে আসত!”

 

 

বন্ধুরা, রাসূলের শিশুপ্রীতি সম্পর্কে আরেকটি ঘটনা শোনা যাক। একদিন প্রিনবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) খেতে বসেছিলেন। কিন্তু খানা তখনও শুরু করেননি। উম্মে কায়েস বিনতে মুহসিন (রাঃ) তার শিশুপুত্রটিকে কোলে করে রাসূলের সাথে দেখা করতে আসলেন। শিশুটিকে দেখে রাসূল (সা.) তার দিকে এগিয়ে এলেন। পরম আদরে কোলে তুলে নিয়ে খাবারের জায়গায় গিয়ে বসলেন। শিশুটি নবীজীর আদর পেয়ে তাঁর কোলেই পেশাব করে ভিজিয়ে দিলো। রাসূল (সা.) স্মিত হাসলেন। চেহারায় বিরক্তি প্রকাশ পেলো না। তিনি পানি আনার জন্য একজনকে বললেন। পানি আনা হলে যে যে জায়গায় পেশাব পড়েছিল সেখানে পানি ঢেলে দিলেন। রাসূলেখোদা মনে করতেন, বাগানের ফুল যেমন পবিত্র, মায়ের কোল থেকে নেয়া শিশুও তেমনি পবিত্র।

 

রাসূলে খোদা বলেছেন, "তোমরা শিশুদেরকে স্নেহ কর এবং তাদের প্রতি দয়ালু হও।" শিশুদের প্রতি মহানবী (সা.)'র স্নেহ ও পিতৃসূলভ আচরণের কথা ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা আছে। রাসূল (সা.) শিশুদের সাথে খেলতেন এবং এমনকি তাদের খেলনা ও পোষা প্রাণীরও খবর নিতেন। তিনি তাঁদের সাথে শিশুসুলভ ভঙ্গিতে ও নীচু কণ্ঠে কথা বলতেন। বিশেষ করে নাতি ইমাম হাসান ও হোসাইনের প্রতি রাসূলের ভালোবাসা ও স্নেহের কথা কমবেশী সবাই জানে। মহানবী (সা.) তাঁর এ নাতিদের সাথে খেলাধুলা করতেন এবং অন্যদের সামনে তাদের চুমু দিতেন। তিনি প্রতিদিন তাঁদের কাছে দিতেন। আর এভাবে তিনি মুসলমানদের বাস্তবে শিখিয়ে গেছেন যে, কিভাবে শিশুদের সাথে ব্যবহার করতে হয়।

 

শিশুদের সাথে কিভাবে কথা বলতে হয়, তাদের সাথে আমাদের আচরণ কেমন হওয়া উচিত তা রাসূলেখোদার জীবনী থেকে জানলাম। কিন্তু অনেক অভিভাবক আছেন যারা শিশুদের সাথে কোমল আচরণ করেন না, তাদের কথাও মনোযোগ দিয়ে শোনেন না। কেবল হু, হ্যাঁ করে যান। এমন আচরণ করলে শিশুরা কষ্ট পায়। আর এটা ইসলামী আদর্শেরও পরিপন্থী। মনে রাখতে হবে, ঘর সাজাতে হলে শিশু প্রয়োজন। যত মূল্যবান আসবাবপত্র দ্বারাই গৃহ পূর্ণ করা হোক না কেন, একটি শিশু ঘরটিতে যত জীবন্ত, আনন্দময় এবং সুন্দর করে তোলে, অতি মূল্যবান আসবাবপত্রও তার তুলনায় মূল্যহীন। তাই আমাদের সবাইকে শিশুদের প্রতি আন্তরিক ও স্নেহশীল হতে হবে।

 

আর শিশুদের কর্তব্য হচ্ছে, পিতা-মাতা ও অভিভাবকদের কথামতো চলা। তারা কষ্ট পান এমন কোনো আচরণ করা কখনই উচিত হবে না। তো, আমরা সবাই রাসূল (সা.) এর নির্দেশিত আদর্শ পরিবার গঠনে ভূমিকা রাখবে এই কামনা করে বিদায় নিচ্ছি রংধনুর আজকের আসর থেকে।#

 

 রেডিও তেহরান/এআর/১৫

 

 

 

মাধ্যম

মন্তব্য লিখুন


Security code
রিফ্রেস দিন