এই ওয়েবসাইটে আর আপডেট হবে না। আমাদের নতুন সাইট Parstoday Bangla
শুক্রবার, 01 জানুয়ারী 2016 12:11

দুই কবুতর

রংধনু আসরের শিশু-কিশোর বন্ধুরা, তোমরা নিশ্চয়ই লক্ষ্য করেছ,  আমাদের সমাজে কিছু অযোগ্য লোক আছে যারা নিজেদের সবজান্তা হিসেবে পরিচয় দিতে খুব মজা পায়। তারা নিজেদেরকে বুদ্ধিমান, চালাক ও শক্তিশালী হিসেবেও অন্যের কাছে তুলে ধরে। এসব বুদ্ধি, বিবেকহীন মানুষের অজ্ঞতা ও দুর্বলতা যখন প্রকাশ হয়ে পড়ে তারা লজ্জা ও বিপদে পড়ে যায়। কিন্তু তখন আর করার কিছু থাকে না। কেবল মানুষের মধ্যেই নয় পশু-পাখিদের মধ্যেও এ ধরনের বদগুণ দেখা যায়। এ সম্পর্কে মধ্যযুগের বিখ্যাত ইরানি ব্যক্তিত্ব মোল্লা আহমদ নারাকীর কাশানীর ত্বাক্বদিস গ্রন্থে একটি গল্প রয়েছে। দুই কবুতরকে নিয়ে রচিত গল্পটি রংধনুর এ পর্বে প্রচার করা হয়েছে।  আর গল্প শেষে রয়েছে বাংলাদেশের ময়মনসিংহ শহরের এক নতুন বন্ধর গানসহ সাক্ষাৎকার। প্রথমেই গল্পটি শোনা যাক:

 

 দুই কবুতর

দুটো কবুতর পাশাপাশি বাসায় বাস করত। একটির নাম বাহক আরেকটির নাম বখাটে। একদিন বখাটে এসে বাহককে বলল:

বখাটে: বন্ধু শুনলে! আমি আজ তোমার সাথেই বেড়াতে যাবো।

বাহক: না না! আমি বহু কাজে ব্যস্ত থাকব। বাড়ি বাড়ি গিয়ে চিঠি পৌঁছাতে হবে। তুমি আমার সাথে যেতে পারবে না। আমার ভয় হয় তুমি এমন ঘটনা ঘটিয়ে দেবে যে, তোমার যেমন বিপদ হবে তেমনি আমার হবে বদনাম।

বখাটে: তুমি এসব কী বলছো! একশো খেটে খাওয়া কবুতরও আমার শিষ্য হওয়ার উপযুক্ত নয়। তোমার মতো চল্লিশ/পঞ্চাশটাকে পড়াতে পারি। তোমার আগেই নানারকম মানুষের সাথে চলাফেরা ও উঠাবসা করে রেখেছি। এমন কিছু নেই যে আমি জানি না। আমি যখন বলেছি আজ তোমার সাথেই বেড়াতে যাব তার মানে হচ্ছে কোনো কিছুকেই পরোয়া করি না, ভয় বলতে কিছুই বুঝি না আমি।

বাহক: এই যে তুমি ভয় পাচ্ছো না- এটাই অনেক বড় দোষ। অবশ্য অতি ভয়ও ব্যর্থতার কারণ হয়। কিন্তু বেপরোয়া মনোভাব ও উচ্ছৃঙ্খল আচরণ বিপজ্জনক। যারাই বিপদাপদে ও দুর্দশনায় পতিত হয়ে থাকে তারা সবাই উচ্ছৃঙ্খল ও অপরিণামদর্শিতার পরিণতি ভোগ করে। 

বখাটে: আরে বাবার এতো চিন্তার কোনো প্রয়োজন নাই। তুমি নিশ্চিন্ত থাকো। আমার সব দিকেই খেয়াল আছে। কোথায়, কখন কী করতে হবে না হবে- সবই আমি জানি।

বাহক: ঠিক আছে তাহলে তৈরি হও। ঘরেই দানাপানি খেয়ে নিও। আমার সাথে যখন থাকবে তখন পথিমধ্যে কখনো কোনো অজানা অপরিচিতের সাথে ভাব জমাবে না।

বখাটে: ঠিক আছে আর বলতে হবে না। এবার চলো আমরা বের হই।

 

এরপর তারা উভয়ের বসল গাছের ডালে এবং যতদূর চোখ যায় দেখতে লাগল। বখাটে কিছু দূরে বাহককে দেখিয়ে বলল:

 

বখাটে: ওই জায়গাটা দেখতে পাচ্ছো? সবুজ ঘার যার মাঝে খানাদানা ছড়িয়ে আছে। চলো গিয়ে খেয়ে আসি।

বাহক: হ্যাঁ, দেখতে পাচ্ছি সবুজ ঘাস ও শস্যদানা তবে ওখানে ফাঁদও রয়েছে।

বখাটে: তোমার এত ভয় কেন? কবে কারো কাছ থেকে গল্প শুনেছো যে, সবুজ ঘাসের উপর শস্যদানা ছড়িয়ে দেয়া হয় এবং এর ভেতরেই পেতে রাখা হয় ফাঁদ? এসব কথার বেশিরভাগই গালগল্প।

বাহক: কে বলল আমি ভয় পাচ্ছি? আমি মোটেই ভীতু নই, কিন্তু আমার আক্কেল বুদ্ধি রয়েছে। আমি বুঝি যে, এই শুষ্ক মরু বিয়াবনে যেখানে সব সময় লু হাওয়া বয় সেখানে সবুজ ঘাসের জন্ম হতে পারে না। তাই শস্যদানারও সম্ভাবনা থাকে না। তুমি যে শস্যদানা দেখতে পাচ্ছো তা নিশ্চয়ই কোনো শিকারী ছড়িয়ে রেখেছে যাতে লোভী পাখিরা এসে তার ফাঁদে পা দেয়। 

বখাটে: না, এতো খারাপ ধারণা করছো কেন? হয়ত আল্লাহ নিজের কুদরতের প্রমাণ রাখার জন্যে এই মরুভূমিতে সবুজ ঘাস সৃষ্টি করেছেন।

বাহক: তুমি তো শুধু ঘাস আর দানাই দেখতে পাচ্ছো। ভালো করে ওই টিলার দিকে তাকাও। ঘাস দিয়ে মাথা ঢেকে একটা লোক বসে আছে- তাকে দেখছে পাচ্ছো? তুমি কি কিছুই ধারণা করতে পারছো না যে, লোকটি ওখানে কী করছে?

বখাটে: লোকটি হয়ত সফর করছে। আমাদের মতোই ক্লান্ত হয়েছে ওখানে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিচ্ছে। কিন্তু তাতে আমাদের অসুবিধা কি?

বাহক: তুমি যা বলছো তা না হয় মেনে নিলাম। কিন্তু তার হাতে ধরা ওই সুতাটি দেখতে পাচ্ছো? ওটা কি ফাঁদের সুতা নয়?

বখাটে: ওটা যে সুতা সে বিষয়ে সন্দেহ নেই। কিন্তু বাতাস হয়ত ওটাকে উড়িয়ে এনেছে এবং তা সবুজ ঘাসে আটকে গিয়ে ওখান পর্যন্ত ছড়িয়ে আছে।

বাহক: ঠিক আছে, তোমার সব কথাই না হয় ঠিক। কিন্তু কিছুতেই কি ভাবতে পারছো না যে, এই অনাবাদী মরুভূমিতে কোথা থেকে শস্যদানা এসে পড়ল?

বখাটে: এসব দানা হয়তো গতবছর এসব সবুজ ঘাস থেকেই উৎপন্ন হয়ে পড়ে আছে। কিংবা কোনো বোঝাবাহী উটের কাফেলা এদিক দিয়ে যাওয়ার পর কিছু শস্যদানা বোঝার ছিদ্র দিয়ে পড়ে গেছে। তুমি কেন আমার মতো ভাবতে পারছো না। সবকিছুতেই তোমার সন্দেহ আর কুধারণা। মনে রেখো- পাখি যদি এতে ভীতু হয় তাহলে কখনো তার কপালে দানা জুটবে না।

বাহক: আমার মনে হয় শয়তান তোমাকে কুমন্ত্রণা দিচ্ছে যাতে দানার লোভে পড়ে সেখানে যাও এবং শিকারির ফাঁদে আটকা পড়ো। প্রিয় বন্ধু আমার, সাবধানী কবুতর হিসেবে তোমাকে অন্তত এটুকু বুঝতে হবে যে, এতো সবকিছু বেহুদা এই মরুভূমিতে একসাথে জমা হতে পারে না। ঘাসে মাথা ঢাকা লোকটি, ধু ধু বালিতে হঠাৎ গজিয়ে উঠা সবুজ ঘাস, জালের মতো পেঁচানো সুতা এবং এক মুঠো দানা সবই এ কথাই প্রমাণ দিচ্ছে যে, পাখি শিকারের জন্য এটা একটা ফাঁদ। তুমি এতো বোকা কেন? পেটের জন্যের প্রাণটাতো দিবে দেখছি!

বখাটে: আমি তোমার এতোসব ওয়াজ-নছিহত বুঝি না। আমার এখন অনেক ক্ষুধা। আমি ওসব দানা খাবোই। বিপদ যে হবেই তার কোনো গ্যারান্টি নেই। তবে কাছে গিয়ে দেখব বিপদ আছে কিনা। বিপদ থাকলে ফিরে আসব। তুমি এখানেই বসে থাকো। আমি এক্ষুণি ফিরে আসছি।

বাহক: আমি তোমার এ লালসায় ভয় পাচ্ছি। তুমি নিজেকে বিপদে ফেলতে যাচ্ছো। এসব লালসা ত্যাগ করো। বিপদ কখনো পরীক্ষা করে দেখার জিনিস নয়।

বখাটে: তোমার কী? তুমি কি আমার জিম্মাদার? আমার জন্য কোনো উকিল মোক্তার প্রয়োজন নেই। আমি যাচ্ছি। যদি ফিরে আসি তাহলে একসাথে সফর করব। আর যদি আটকা পড়ি তাহলে তুমি তোমার কাজে চলে যেও। আমি জানি কী করে নিজেকে মুক্ত করতে হবে।

বাহক: আমি খুবই দুঃখিত যে, তুমি আমার উপদেশ শুনলে না।

বখাটে: তুমি অনর্থক দুঃখ পাচ্ছ। নিজের চরকায় তেল দাও। সারাজীবন শুধু মানুষের চিঠিপত্র বয়েই বেড়ালে। আল্লাহর এই দুনিয়ায় এতো দানা পড়ে আছে অথচ ওসবের স্বাদটাও চেখে দেখলে না। তোমার জন্য আফসোস।

 

বখাটে এসব কথা বলে উড়ে গেল দানার কাছে। সেখানে পৌঁছেই দেখল কিছু সুতা, লোহার শলাকা ও কিছু গমের দানা ছড়িয়ে আছে। সুতা ও লোহার শলাকা নিয়ে চিন্তাভাবনা না করে সে গম খাওয়া শুরু করল। কিন্তু প্রথম কয়েকটি দানা তার গলা দিয়ে পেটে পৌঁছার আগেই ছড়ানো ফাঁদ তাকে আটকে ফেলল। তাকে ফাঁদে আটকা পড়তে দেখেই শিকারী ছুটে এলো। বখাটে বলল: হে শিকারী! আমি বুঝতে পারিনি এবং আমার বন্ধুর কথা শুনিনি। দানার লোভে পড়ে আটকে গেলাম। এখন তুমি আল্লাহর ওয়াস্তে আমার প্রতি দয়া করো। আমাকে ছেড়ে দাও।

 

বখাটে কবুতরের কথা শুনে শিকারী বলল: ওসব কথা সবাই বলে থাকে। কোন্‌ পাখিটি জেনেশুনে ফাঁদে পড়ে? আমার পেশাই হচ্ছে শিকার করা ও পাখি ধরা। তুই যদি মুক্ত-স্বাধীন থাকলে পছন্দ করতিস তাহলে প্রথমেই নিজের প্রতি দয়া করতি। যখন সবুজ ঘাস ও শস্যদানা দেখছি তখনই এর পরিণতি চিন্তা করতে পারতিস। তোর ওই বন্ধুকে চেয়ে দ্যাখ গাছের ডালে স্বাধীনভাবে বসে আছে। সেও তোর মতো দানা দেখেছিল। কিন্তু তোর মতো বোকা ও বখাটে সে নয়।

 

এদিকে বাহক যখন দেখল বখাটে ফাঁদে আটকা পড়েছে এবং তার আর ফিরে আসার কোনো নাম নেই তখন সে নিরাশ হয়ে গাছ থেকে উড়াল দিল এবং চিঠি পৌঁছে দেয়ার কাজে নেমে পড়ল।#  

 

রেডিও তেহরান/এআর/১

 

মাধ্যম

মন্তব্য লিখুন


Security code
রিফ্রেস দিন