এই ওয়েবসাইটে আর আপডেট হবে না। আমাদের নতুন সাইট Parstoday Bangla
বৃহস্পতিবার, 24 মার্চ 2016 17:16

নওরোজ ও তিনটি গল্প

নওরোজ ও তিনটি গল্প

ইরানের ঐতিহ্যবাহী উৎসব নওরোজ। নওরোজ মানে ‘নতুন দিন’। ‘নওরোজ’ একটি ইরানি উৎসব হলেও ভারত উপমহাদেশে বিশেষকরে মোগল আমলে জাঁকজমকের সাথে তা পালিত হতো। এখনও বিক্ষিপ্তভাবে পাকিস্তান, ভারত ও বাংলাদেশে তা কমবেশি পালিত হচ্ছে। এছাড়া, আফগানিস্তান, তাজিকিস্তান, তুর্কমেনিস্তান, উজবেকিস্তান, তুরস্ক, আযারবাইজান, কুর্দিস্তান এবং কোনো কোনো আরব ও ইউরোপীয় দেশেও নওরোজ উৎসব পালিত হয়ে থাকে।

 

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহিল উজমা খামেনেয়ী ‘নওরোজ’ সম্পর্কে বলেছেন, ‘নওরোজ বা নববর্ষ মহান প্রতিপালকের সামনে মানুষের দাসত্ব ও বিনম্রতা প্রকাশের মাধ্যম। নওরোজ হল নব-উদ্ভাবন বা সৃষ্টিশীলতা, সজীবতা, তারুণ্য ও প্রফুল্লতার প্রতীক। একইসঙ্গে এই উৎসব পরস্পরের প্রতি ভালোবাসা ও ভাইয়ে-ভাইয়ে হৃদ্যতা, আত্মীয়-স্বজনের পরস্পরের মধ্যে সম্প্রীতি, পরিচিতজন ও বন্ধুদের মধ্যে আন্তরিকতা বৃদ্ধি ও হিংসা-বিদ্বেষ দূর করার প্রতীক।’

 

ইরানের সর্বোচ্চ নেতার মতে, কোনো কোনো দেশে নওরোজ উৎসব কেবল একটি প্রাচীন উৎসব মাত্র। ইরানে ইসলাম-পূর্ব যুগেও এই উৎসবের ছিল বেশ কিছু সুন্দর প্রথা ও আনুষ্ঠানিকতা। অবশ্য এর পাশাপাশি কিছু কুসংস্কারও প্রচলিত ছিল। ইরানে ইসলাম আগমনের পর নওরোজের মধ্যে বেশ কিছু মূল্যবান আচার-অনুষ্ঠান যুক্ত হয় এবং এ উৎসব পরিণত হয় আল্লাহর ইবাদত-বন্দেগি ও সন্তুষ্টি অর্জনের এক মোক্ষম সুযোগে।

 

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা এ প্রসঙ্গে আরও বলেছেন, ‘বর্তমানে নওরোজ ইরানি জাতির জন্য আল্লাহকে স্মরণের মাধ্যম। নতুন বছর শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ইরানিরা আল্লাহকে স্মরণ করে বলেন: হে অবস্থাসমূহের পরিবর্তনকারী আমাদের অবস্থাকে সর্বোত্তম অবস্থায় রূপান্তরিত করুন।–এভাবে ইরানিরা নওরোজের সময় আল্লাহর স্মরণ বা আল্লাহর দিকে মনোযোগ জোরদার করেন। বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এ ছাড়াও ইরানিরা নওরোজ উপলক্ষে প্রিয়জন ও আত্মীয়-স্বজনদের দেখতে যান এবং এ সময় তারা গ্লানি, বিদ্বেষ ও মান-অভিমান দূর করেন ভালোবাসার মাধ্যমে। আর এভাবে নওরোজ হল ইসলামের ভ্রাতৃত্ব, সহমর্মিতা ও বিশেষ করে রক্তের সম্পর্কের আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে হৃদ্যতাপূর্ণ যোগাযোগ অব্যাহত রাখার নির্দেশ পালন করার অন্যতম মাধ্যম। এ ছাড়াও নববর্ষের উৎসবের সময় ইরানিরা পবিত্র স্থানগুলো বা ধর্মীয় সাধক ও আউলিয়ার মাজার জিয়ারত করেন। আর এসবই খুব ভালো প্রথা। এভাবে ইরানিরা নওরোজে প্রচলিত বহু কুপ্রথা দূর করে তাতে যুক্ত করেছে অনেক সঠিক ও ভালো প্রথা।’

 

ইরানে নতুন বছর শুরু হয় বসন্ত ঋতুর প্রথম দিনে। ইরানি জনগণ, বিশেষ করে কবি-সাহিত্যিকদের দৃষ্টিতে বসন্ত ঋতু হচ্ছে ন্যায়-ইনসাফ ও ভারসাম্যের মওসুম। ইরানে বসন্ত নাতিশীতোষ্ণ। শীতের প্রকোপ যেমন থাকে না, তেমনি থাকে না গ্রীষ্মের দাবদাহ। মহাকবি ফেরদৌসী নওরোজের বর্ণনা দিয়েছেন এভাবে-

 

‘বসন্তের মেঘমালা থেকে নেমে আসে বৃষ্টির ফোঁটা

মাটির বুক থেকে ধুয়ে ফেলে যতসব দুশ্চিন্তা

পৃথিবী পূর্ণ হয় সবুজের সমারোহে এবং পানিতে নদী

দুঃখীর জীবনে এখন থাকে না কোন উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা।

ধরাতল সজ্জিত হয় যেন এক বেহেশত রূপে

ইনসাফ ও দানের মহিমায় পৃথিবী পূর্ণ হয়

আর কল্যাণ ও নিরাপত্তায়, আর

দুষ্ট ও দুরাচারের হাত হয় অবরুদ্ধ।‘

 

পুরনো দিনের সব মলিনতা, জড়তা, গ্লানি ও হতাশা আমাদের জীবন থেকে ধুয়ে মুছে সাফ হয়ে যাক এবং নতুনত্বের প্রাণ-প্রবাহে গড়ে উঠুক উন্নত, সফল ও সার্থক মানব-জীবন- এ প্রত্যাশায় শুরু করছি রংধনুর আজকের আসর। আজ আমরা তিনটি শিক্ষণীয় গল্প শোনাব।

 

ব্যবসায়ী ও গাধা

বসন্তকালে এক সুন্দর সকাল। এক ব্যবসায়ী তার গাধার পিঠে কয়েক বস্তা লবণ নিয়ে বাজারের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলো। বাজারে নিয়ে সে এগুলো বিক্রি করবে। ব্যবসায়ী এবং গাধা এক সাথে হাঁটছে। কিছু দূর গিয়ে পথে একটি নদী পড়ে। দুর্ভাগ্যবশত গাধাটি পা পিছলে নদীতে পড়ে গেল। তখন গাধা বুঝতে পারল যে, তার পিঠের বোঝা হালকা লাগছে। মূলত বস্তায় পানি লেগে লবন গলে যাওয়ার কারণে বোঝা হালকা হয়ে গেছে। ব্যবসায়ী আর কোনো উপায় না দেখে বাড়ি ফিরে এলো এবং গাধার পিঠে আরো কয়েক বস্তা লবন নিয়ে পুনরায় বাজারের পথে রওয়ানা হলো। তারা যখন নদীর পিচ্ছিল তীরে পৌঁছে তখন গাধাটি ইচ্ছে করে নদীতে পড়ে গেল। ফলে লবণগুলো আবার নষ্ট হয়ে গেল।

 

ব্যবসায়ী কিন্তু গাধার কৌশল বুঝে ফেলেছে। তাই এবার বাড়ি ফিরে সে স্পঞ্জ ভর্তি বস্তা দিয়ে গাধার পিঠ বোঝাই করল। বোকা গাধা পথ চলতে চলতে নদীর কিনারে এসে পুনরায় নদীতে পড়ে গেল। কিন্তু হায়, তার পিঠের বোঝা হালকা না হয়ে এবার ভারী হয়ে উঠেছে। ব্যবসায়ী তখন গাধার দিকে তাকিয়ে হাসতে হাসতে বলে, ‘হে বোকা গাধা! তোমার কৌশল আমি বুঝে নিয়েছি। কিন্তু তোমার জেনে রাখা উচিত, অতি চালাকের গলায় দড়ি।’

 

লোভী ইঁদুর

অনেক দিন আগের কথা। একটি ছোট গ্রামে বাস করত এক বৃদ্ধ চাষী। তার ছিল কিছু কৃষি জমি। এ জমিতে সে গমের চাষ করত এবং গম থেকে তৈরি রুটি খেয়ে জীবনধারণ করত। প্রতিবছর তার জমিতে প্রচুর গম হতো। কৃষক তার উৎপাদিত গম বড় বড় বস্তায় ভরে ঘরের এক কোনায় রেখে দিত।

 

একদিন দুটি ইঁদুর এই গম দেখতে পেল এবং সঙ্গে সঙ্গেই তারা একটা পরিকল্পনা আঁটলো। তারা ঘরের দেয়ালে একটি গর্ত করল। কৃষক বাইরে চলে গেলেই ইঁদুর দুটি গর্ত থেকে বেরিয়ে আসত এবং বস্তা ছিদ্র করে গম বের করে নিজেদের গর্তে নিয়ে যেত। এভাবে দিন যেতে থাকল এবং একসময় অনেক গম তাদের গর্তে জমা হলো।

একদিন এক ইঁদুর অপর ইঁদুরকে বলল: ‘শোন বন্ধু! আমরা অনেক গম জমা করেছি। কৃষক জানার আগেই আমাদের গম নেয়া বন্ধ করা উচিত। আর তা না হলে আমরা বিপদে পড়ে যেতে পারি।’

দ্বিতীয় ইঁদুরটি বলল: ‘তুমি এসব কি বলছ? আমরা কখনো এমন সুযোগ আর পাব না। কৃষক জানার আগেই চলো আমরা আরো গম মজুদ করি। ভয় পাওয়ার কিছু নেই।’

প্রথম ইঁদুরটি বলল: ‘আমি আর তোমার সঙ্গে আসতে চাই না। কারণ, আমি আমার জীবনকে বিপদের মুখে ঠেলে দিতে চাই না।’

জবাবে দ্বিতীয় ইঁদুর বলল: ‘তুমি আস্ত একটা ভীতু। আগামীকাল থেকে আমি একাই এখানে আসব এবং গম নিয়ে গর্ত ভর্তি করব। তোমার মতো একজন ভীতু বন্ধুর আমার প্রয়োজন নেই।’

পরের দিন থেকে লোভী ইঁদুরটি তার নিজের জন্য আরো গম সংগ্রহ শুরু করল।

 

একদিন কৃষক মনে মনে সিদ্ধান্ত নিল যে, তার গমের বস্তাগুলো পরীক্ষা করে দেখবে। গমের বস্তার কাছে গিয়ে কৃষক দেখতে পেল সবগুলো বস্তাতেই শুধু ছিদ্র আর ছিদ্র। এতে তার খুব রাগ হলো। সে ইঁদুর ধরার জন্য একটি ফাঁদ বস্তার কাছে পেতে রাখল। লোভী ইঁদুরটি যখন গম নিতে বস্তার কাছে এল অমনি সেই ফাঁদে আটকা পড়ে গেল।

 

এ গল্প থেকে আমরা শিখতে পারলাম যে, পৃথিবীর ধন-সম্পদের প্রতি লোভীর দৃষ্টান্ত হচ্ছে গুটি পোকার ন্যায়। সে যতই তার চারিদিকে রেশম সুতা জড়াতে থাকে ততই সে নিজে বন্দি হয়ে পড়ে এবং এভাবেই তার মৃত্যু ঘটে।

 

উপদেশ না মানার পরিণতি

একদা একটি ছোট্ট জলাশয়ে তিনটি মাছ সাঁতার কাটছিল। এর মধ্যে একটি ছিল কমলা মাছ, আরেকটি ছিল সোনালি মাছ এবং তৃতীয়টি রুপালি মাছ। তারা ছিল খুবই সুখী এবং প্রত্যেক দিন তারা মনের আনন্দে খেলা করত।

 

একদিন দুই ব্যক্তি ওই জলাশয়ের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় মাছ তিনটিকে দেখতে পেল। তাদের মধ্যে একজন বলে উঠল, ‘ওই দেখ কী চমৎকার সুন্দর মাছ! চল, রান্না করে খাওয়ার জন্য এগুলো ধরি।’ অন্যজন বলল, ‘চমৎকার চিন্তা! কিন্তু আমাদের তো জাল দরকার।’

এসব কথাবার্তার পর তারা জাল যোগাড় করার উদ্দেশ্যে নিকটবর্তী গ্রামে গেল।

 

কমলা মাছটি ছিল অপর মাছ দু’টির তুলনায় চালাক। ওই দুই ব্যক্তি যখন কথাবার্তা বলছিল তখন সোনালি ও রুপালি মাছ ছিল খেলায় মত্ত। কিন্তু কমলা মাছ তাদের কথাবার্তা কান পেতে শুনল। সে তাদেরকে বলল, ‘আমার কথা শোন, আমরা কিন্তু এখন বিপদের সম্মুখীন। ওই দুটি লোক খুব শিগগিরই একটি জাল নিয়ে আসবে আমাদের ধরার জন্য। আমাদের খুব দ্রুত একটা কিছু করতে হবে।’

সোনালি মাছ বলল, ‘এত ঘাবড়াবার কিছু নেই। একটা পরিকল্পনা করার মতো সময় আমাদের আছে। আগে আমাদের খেলাটা শেষ করি।’

রুপালি মাছ এতে রাজী হলো, কিন্তু কমলা মাছ তাদেরকে বলল, ‘এখানে নিকটে একটি গোপন নালা আছে। আমরা সেই নালায় গিয়ে আশ্রয় নিয়েও আত্মগোপন করতে পারি। এতে আমরা নিরাপদ হব।’

 

কিন্তু কমলা মাছের একথায় কান দিল না অন্য মাছ দুটি। তাই বাধ্য হয়ে সে একাই গিয়ে সেখানে আশ্রয় নিল। লোক দুটি একটি জাল নিয়ে ফিরে এল মাছ ধরার জন্য। একজন বলল, ‘কি অদ্ভুত ব্যাপার! এখানে না তিনটি মাছ ছিল!’ অপরজন বলল, ‘তাড়াতাড়ি করো এবং এই দু’টিকেই ধর।’

 

এই কথা শুনে সোনালি মাছ খুবই ভীত হয়ে পড়ল এবং ধরা পড়ার আগেই প্রাণপণে ছুটে গিয়ে কোনোমতে গোপন নালায় আশ্রয় নিল। কিন্তু রুপালি মাছ এত চালাক ছিল না। সে জালে ধরা পড়ে গেল।

 

বন্ধুরা, বলতো এই গল্প থেকে আমরা কি শিক্ষা পাই? এখান থেকে আমরা যে শিক্ষাটি পাই সেটা হলো, কোনো ভালো পরামর্শ বা উপদেশ যখন আমরা পাই তখন আমাদের উচিত হবে কোনো বিলম্ব না করে সেই মতো কাজ করা।#

 

রেডিও তেহরান/আশরাফুর রহমান/২৪

মাধ্যম

মন্তব্য লিখুন


Security code
রিফ্রেস দিন