এই ওয়েবসাইটে আর আপডেট হবে না। আমাদের নতুন সাইট Parstoday Bangla
সোমবার, 28 মার্চ 2016 16:05

চাষী ও বাদশাহ আব্বাস

চাষী ও বাদশাহ আব্বাস

এক দেশে ছিল এক চাষি। প্রতি বছর সে তার জমিতে তরমুজ, বাঙ্গী ও শশা ফলাতো এবং অন্যান্য খাদ্য-দ্রব্যের সাথে সেগুলো অদল-বদল করে সংসার চালাতো। তখনকার দিনে আজকের মতো এমন টাকা-পয়সা দিয়ে কেনাবেচার নিয়ম ছিল না। টাকার পরিবর্তে তখন মানুষ যার কাছে যা ছিল, তা অন্যদেরকে দিয়ে সেগুলোর বিনিময়ে তাদের কাছ থেকে নিজেদের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র সংগ্রহ করতো। চাষিও তার তরমুজ-বাঙ্গী-শশা অন্যদেরকে দিয়ে তার বিনিময়ে চাল-ডাল-তেল-আটা সংগ্রহ করতো। আর এভাবেই কেটে যেত তার দিন।

 

এক বছর হলো কি, চাষির ক্ষেতে প্রচুর ফসল উৎপন্ন হলো। চাষি তো বেজায় খুশি। বউকে ডেকে বলল: এ বছর ক্ষেতে তো ভালোই ফসল হয়েছে। ভাবছি, ভালো দেখে এ বস্তা তরমুজ গাধার পিঠে চাপিয়ে আমাদের বাদশাহ আব্বাসকে দিয়ে আসব। তোমার মত কি?

বউ বলল: খুবই ভালো চিন্তা করেছো। বাদশাহ আমাদের তরমুজ পেলে নিশ্চয়ই খুব খুশি হবেন।

বউয়ের সাথে পরামর্শ করে চাষি খুব ভালো দেশে কয়েকটা তরমুজ আর বাঙ্গী একটা বস্তায় ভরল। তারপর বোঝাটা তার গাধার পিঠে চাপিয়ে ইরানের তৎকালীন রাজধানী ইস্ফাহানে রওনা হল।

 

এদিকে হয়েছে কি, বাদশাহ আব্বাস ও তাঁর উজির আল্লাবর্দী খান দরবেশের ছদ্মবেশে প্রজাদের অবস্থা স্বচক্ষে দেখার জন্য শহরে বের হয়েছিলেন। পথিমধ্যে তাঁরা চাষি ও তার গাধার মুখোমুখি হলেন। ছদ্মবেশি বাদশাহ চাষিকে জিজ্ঞেস করলেন: তোমার বস্তায় কী আছে মিয়া?

চাষি জবাব দিল: কিছু তরমুজ আর বাঙ্গী আছে, দরবেশ সাহেব।

বাদশাহ আবার জিজ্ঞেস করলেন: তা এগুলো কোথায় নিয়ে যাচ্ছো?

চাষি বলল: দরবেশ সাহেব, এ বছর আমার ক্ষেতে ভালো ফসল হয়েছে। তাই ভাবলাম ভালো দেখে কিছু তরমুজ উপহারস্বরূপ আমাদের বাদশাহ আব্বাসকে দিয়ে আসি। তাই এগুলো তাঁর জন্য নিয়ে যাচ্ছি।

ছদ্মবেশি বাদশাহ খানিকটা অবাক হয়ে বললেন: মানুষ তার সাথে দেখা করতে গেলে সোনা-দানা, হীরা-জহরত নিয়ে যায় আ তুমি কি-না নিয়ে যাচ্ছ তরমুজ-বাঙ্গী! বাদশাহ এসব দিয়ে কি করবেন?

চাষি বিনয়ের সাথে বলল: দরবেশ সাহেব, যাদের সোনা-দানা, হীরা-জহরত দেয়ার ক্ষমতা আছে, তারাতো বাদশাহকে তা-ই দেয়। কিন্তু আমার তো তরমুজ-বাঙ্গী ছাড়া অন্য কিছু দেয়ার সামর্থ্য নেই। তাই এগুলোই নিয়ে যাচ্ছি।

দরবেশের ছদ্মবেশি বাদশাহ চাষিকে বললেন: শুধু শুধু কষ্ট করছ তুমি, বাদশাহ এগুলো গ্রহণই করবেন না।

 

একথা শুনে চাষি রেগে-মেগে বলল: দরবেশ সাহেব, শুনে রাখুন- বাদশাহ এগুলো গ্রহণ করলেন তো করলেন; যদি না নেন তাহলে গাধাসুদ্ধ তরমুজ-বাঙ্গীর বোঝাটা তাঁর মাথায় চাপিয়ে দিয়ে আমার কাছে ফিরে আসব।

 

এ কথা শুনে উজির আল্লাবর্দী খান তো রেগে আগুন! তিনি হাত উঠিয়ে তেড়ে যেতে চাইলেন চাষিকে মারতে। বাদশাহ খপ্ করে ধরে ফেললেন তার হাত। এরপর তারা চাষির কাছ থেকে বিদায় নিয়ে সংক্ষিপ্ত পথে তাড়াতাড়ি রাজপ্রাসাদে পৌঁছলেন।

 

প্রাসাদের ফিরে বাদশাহ তার ছদ্মবেশ খুলে লাল টকটকে শাহী পোশাক পরলেন। মাথায় দিলেন মুকুট। এরপর তিনি প্রহরীদের নির্দেশ দিলেন, ‘তরমুজ ও বাঙ্গীর বোঝাভর্তি একটি গাধাসহ কোনো লোককে যদি দেখতে পাওয়া যায় তবে যেন তাকে অতিসত্বর রাজদরবারে পাঠিয়ে দেয়া হয়।‘

 

বাদশাহ যখন প্রহরীদের হুকুম দিলেন ঠিক তখনই চাষি রাজপ্রাসাদের কাছাকাছি পৌঁছল। প্রহরীরা তাকে সম্মানে বাদশাহ’র দরবারে হাজির করল। বাদশাহ তাকে জিজ্ঞেস করলেন: তোমার থলেতে কি আছে?

 

চাষি জবাবে বলল: আপনার জন্য আমার জান কোরবান হোক, জাহাঁপনা। থলেলে কিছু তরমুজ আর বাঙ্গী আছে। এ বছর আমার ক্ষেতে ভালো ফসল হয়েছে। সেখান থেকে এই সামান্য কয়কটি আপনার জন্য হাদিয়া হিসেবে নিয়ে এসেছি, জাহাঁপনা।

 

বাদশাহ আব্বাস বললেন, তুমি পাগল নাকি? তুমি কি ভেবেছো আমাকে? মানুষ আমার জন্য উপহার হিসেবে নিয়ে আসে সোনা-দানা, হীরা-জহরত আর তুমি কিনা এনেছো তরমুজ-বাঙ্গী?

 

চাষি মুখ কাচুমাচু করে বলল: জাহাঁপনা, তাদের সামর্থ্য আছে, তারা তো সোনা-দানা, হীরা-জহরত নিয়েই আপনার সাথে সাক্ষাৎ করতে আসে; কিন্তু আমি গরীব চাষি, আমার তো আর তরমুজ-বাঙ্গী ছাড়া অন্য কিছু নিয়ে আসার সামর্থ্য নেই।

 

বাদশাহ গম্ভীর কণ্ঠে বললেন: আমার তরমুজ-বাঙ্গীর প্রয়োজন নেই। এগুলো নিয়ে জলদি বের হও, নইলে এক্ষুনি তোমাকে ফাঁসিতে ঝোলানোর হুকুম দেব।

 

বাদশাহর কথা শুনে চাষি অভিমানের সুরে বলল: জাহাঁপনা, আপনি কেন রাগ করছেন? এগুলো গ্রহণ করেন তো করেন নইলে সে কাজই করবো যা রাস্তায় বলেছিলাম।

বাদশাহ অবাক হবার ভান করে বললেন: বলো দেখি তুমি রাস্তায় কী বলেছিলে?

চাষি ধরা পড়ে যাওয়ার ভয়ে বলল: কিছু না জাহাঁপনা, এই কিছু কথা মুখ ফসকে বের হয়ে গিয়েছিল আর কি!

বাদশাহ রাগত স্বরে বললেন: চাষি! রাস্তায় যা বলেছিলে, কোনো কিছু গোপন না করে যদি তা সত্যি-সত্যি বলো, তবে আমার নামের কসম- তোমার কোনো ক্ষতিই করবো না। কিন্তু যদি সত্য না বলো, তবে যা বলেছিলাম, তোমার অবস্থা তা-ই করে ছাড়ব।

 

চাষি এতক্ষণে বুঝতে পারল যে, আর কেউ নয়, স্বয়ং বাদশাহ আব্বাস-ই ছিলেন পথের ওই দরবেশ। তাই সে নির্ভয়ে বলল: জাহাঁপনা, আপনি আমাকে যে প্রশ্নগুলো করলেন, রাস্তায় এক দরবেশও আমাকে সেগুলো জিজ্ঞেস করেছিল। যখন সে আমাকে বলল যে, বাদশাহ তরমুজ-বাঙ্গী গ্রহণ করবেন না তখন আমি তাকে বলেছিলাম, আমি গরীব চাষি। আমার তো বাদশাহকে এর চেয়ে বেশি কিছু দেয়ার সামর্থ্য নেই। তাই, তিনি যদি আমার উপহার গ্রহণ না করেন তাহলে তরমুজ-বাঙ্গীর বোঝাসহ বাদশাহ’র মাথায় চাপিয়ে দিয়ে আমি আমার পথে চলে আসব।

 

বাদশাহ চাষির সত্যবাদিতায় মুগ্ধ হলেন এবং অর্থমন্ত্রীকে ডেকে বললেন, এই লোকের তরমুজ-বাঙ্গীর বস্তাটা নিয়ে যাও এবং বস্তা খালি করে সেটা স্বর্ণ দ্বারা ভর্তি করে দাও।

 

অর্থমন্ত্রী চাষিকে বাদশাহর কোষাগারে নিয়ে গেল এবং বস্তা থেকে তরমুজ-বাঙ্গী রেখে দিয়ে সেটি স্বর্ণ দিয়ে পরিপূর্ণ করে তাকে দিয়ে দিল। চাষি তো খুশিতে আটখানা হয়ে বাদশাহকে একটা লম্বা সালাম দিয়ে স্বর্ণভর্তি বস্তাটা নিয়ে চলে গেল। কিন্তু বাদশাহ’র এ কাজগুলো উজির আল্লাবর্দী খানের ভালো লাগল না। সে বাদশাহকে বলল: জাহাঁপনা! আপনার এ কাজগুলো সত্যিই আমার ভালো লাগেনি। এক গেঁয়ো লোক বাজে কথা বলে আপনাকে বকে গেল আর আপনি কি-না তার বস্তা ভর্তি করে স্বর্ণ মূদ্রা দিয়ে দিলেন!!

 

বাদশাহ আব্বাস তাকে বললেন, উজির! ওই লোকটির তো কেবল তরমুজ-বাঙ্গী দেয়ার ক্ষমতাই আছে; আর তা-ই সে আমার জন্য উপহার হিসেবে নিয়ে এসেছে। এখন আমি যদি ও গরীব চাষির কাছে সোনা-দানা, হীরা-জহরত চাই, তা-ও তো তার প্রতি হবে আমার অন্যায় ও বাজে কথা বলার শামিল।

উজির বলল: আমি এক্ষুণি গিয়ে তার কাছ থেকে স্বর্ণগুলো ফিরিয়ে নিয়ে আসছি।

বাদশাহ মৃদু হেসে বললেন, আল্লাবর্দী খান! তোমার চেয়ে তার বুদ্ধি অনেক বেশি। তুমি নিজেকে লাঞ্ছিত করো না। আমার ধারণা, তুমি তার কাছ থেকে কিছুই আনতে পারবে না।

উজির বলল: আপনি কেবল তাকিয়ে মজাটাই দেখুন, আমি কেমন করে তার কাছ থেকে সমস্ত স্বর্ণ ফিরিয়ে আনছি।

বাদশাহ হেসে বললেন: বেশ তো যাও! দেখি কী করে তুমি তার কাছ থেকে সেগুলো ফিরিয়ে আনো।

উজির আল্লাবর্দী খান তক্ষুণি তার টগবগে ঘোড়াটায় চড়ল। চাবুক হাঁকিয়ে ঘোড়া ছুটিয়ে অন্য একটা পথ ধরে দ্রুত চাষির সামনে গিয়ে পথ আগলে দাঁড়াল। এরপর চাষিকে বলল: তোমাকে কয়েকটা প্রশ্ন করব। যদি ঠিকঠাক জবাব দিতে পার, তোমার জীবন নিরাপদ, আর যদি সঠিক জবাব দিতে না পার, তবে আমি তোমার স্বর্ণগুলো নিয়ে যাব।

চাষি বলল: উজির সাহেব! বলুন কী জানতে চান।

উজির বলল: বলো তো, আকাশে কতগুলো তারা আছে?

চাষি জবাব দিল: আমার গাধার গায়ে যতগুলো পশম আছে, ঠিক ততগুলো।

উজির মাথা নেড়ে বলল: তুমি ভুল বলেছো।

চাষি বলল: সন্দেহ বলে আমার গাধার গায়ের পশম গুণুন আর আকাশের তারাগুলোও গুণুন। যদি সমান না হয় তাহলে নাহয় আমার গর্দান নেবেন।

উজির আল্লাবর্দী খান ভাবল, প্রশ্ন করে দেখি আরেক বিপদে পড়লাম! এখন না পারব চাষির গাধার পশমগুলো গুণতে আর না পারব আকাশের তারা গুণে শেষ করতে। নিরুপায় হয়ে সে বলল: বেশ, মেনে নিলাম তোমার কথাই ঠিক। এখন আমার পরের প্রশ্নটির জবাব দাও। বল, আল্লাহ এখন কোথায় আছেন?

চাষি বলল: এ প্রশ্নটার জবাব তো খুবই সোজা। কিন্তু গাধার ওপর বসে তো এর জবাব আমি দিতে পারব না। আমি দয়া করে ঘোড়া থেকে নামুন; আমি ঘোড়ায় চড়ে এ প্রশ্নটার জবাব দিতে চাই। কারণ হলো, গাধার ওপর বসে আল্লাহর কথা বলা বেয়াদবির শামিল।

উজির এ কথা শুনে তখনি ঘোড়া থেকে লাফিয়ে মাটিতে নামল। এরপর চাষিকে বলল: ওঠো ঘোড়ায়।

 

চাষি গাধা থেকে নামল। লাফিয়ে ঘোড়ায় চড়ে একটু নিচু হয়ে খুব দ্রুত গাধার পিঠ থেকে স্বর্ণ বোঝাই থলেটা তুলে নিল। এরপর চাবুক মেরে ঘোড়াটাকে ছুটিয়ে দিতে দিতে উজিরকে বলল: উজির সাহেব! আল্লাহকে সেই জায়গাতেই দেখতে পাবেন, যেখানে আওয়াজ বা শব্দ চোখে দেখা যায়।

 

উজির যতই ডাকল, চিৎকার-চেঁচামেচি করল, হুমকি-ধমকি দিল, চাষি থামল না। ঘোড়া ছুটিয়ে মুহূর্তের মধ্যে সে চোখের আড়ালে চলে গেল। বোকা বনে যাওয়া উজির হতভম্ব হয়ে চাষির গাধাটার কাছে দাঁড়িয়ে রইল।

 

ওদিকে বাদশাহ আব্বাস রাজপ্রাসাদের ছাদের গম্ভুজ থেকে চাষি আর উজিরে র কথপোকথনের দৃশ্য উপভোগ করছিলেন। তিনি চাষির কাণ্ড দেখে এতটাই মজা পাচ্ছিলেন যে, হাসতে হাসতে তাঁর পেটে যেন খিল ধরে যাচ্ছিল। কোনো মতে নিজেকে সামলে নিয়ে কয়েকজন প্রহরীকে ডেকে বললেন: তোমরা উজির আল্লাবর্দী খানকে গিয়ে বলো যে, তিনি যেন লজ্জিত না হন এবং এক্ষুনি আমার সাথে দেখা করেন।

 

প্রহরীরা উজিরের কাছে গিয়ে বাদশার আদেশের কথা তাঁকে জানালো। উজির তাদের সঙ্গে খুব লজ্জা ও সংকোচের সাথে বাদশাহর সামনে হাজির হল। বাদশাহ আব্বাস খানিকটা হেসে বললেন: দেখলে তো আল্লাবর্দী খান! তুমি চাষির কাছ থেকে কিছুই রেখে দিতে পারলে না। তবে তুমি লজ্জা পেয়ো না। আসলে আমি চাষির প্রতি অবিচারই করেছিলাম। কারণ, আমার জন্য উপহারস্বরূপ আনা তরমুজ-বাঙ্গীর বদলে তাকে স্বর্ণ দিয়েছিলাম ঠিকই, কিন্তু বাদশাহ হিসেবে তার গাধাটার বদলে তাকে একটা ঘোড়া দেয়াও আমার উচিত ছিল। ধন্যবাদ তোমাকে যে, তুমি আমার সে দায়িত্বটাও পালন করে এসেছো।#

 

 

 

 

মাধ্যম

মন্তব্য লিখুন


Security code
রিফ্রেস দিন