এই ওয়েবসাইটে আর আপডেট হবে না। আমাদের নতুন সাইট Parstoday Bangla
সোমবার, 11 এপ্রিল 2016 20:02

ইঁদুর ও লোভী বুড়ো

ইঁদুর ও লোভী বুড়ো

রংধনু আসরের কাছের ও দূরের শিশু-কিশোর বন্ধুরা, তোমরা নিশ্চয়ই জানো যে, লোভে পড়লে মানুষ দিশেহারা হয়ে যায়। কোন্‌টা করা উচিত আর কোন্‌টা উচিত নয়, ওই হিতাহিত জ্ঞান আর থাকে না। জলন্ত আগুনে যত লাকড়িই দেয়া হোক না কেন, তা যেমন আস্ত থাকবে না, সবই পুড়ে যাবে- তেমনি লোভী ব্যক্তি দুনিয়ার সব সম্পদ পেলেও কখনো সন্তুষ্ট হবে না। লোভী মানুষের পরিণতিও ভয়ংকর। এ কারণেই রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা লোভ থেকে বিরত থাকো, কারণ তোমাদের পূর্ববর্তীদের অনেকেই লোভের কারণে ধ্বংস হয়েছে।’ আমিরুল মুমেনিন হযরত আলী (আ) বলেছেন, ‘লোভ পরিহার কর। কেননা লোভী ব্যক্তি অপমানের হাতে বন্দী। তার এ বন্দীদশা কখনও শেষ হবে না।’

 

অন্যদিকে, ইমাম বাকের (আ.) লোভী ব্যক্তি সম্পর্কে বলেছেন, ‘দুনিয়ার লোভী লোকের উদাহরণ রেশম গুটির মতো। সে যতই তার চারিদিকে রেশম সুতা জড়াতে থাকে ততই নিজে বন্দি হয়ে পড়ে এবং এভাবেই তার মৃত্যু ঘটে।’

 

সুতরাং তোমরা কখনোই অতিরিক্ত লোভ করবে না কেমন! আর অসৎ পথেও কক্ষণো যাবে না এবং কাউকে হিংসাও করবে না। তবে হ্যাঁ! হিংসা যদি হয় ভালোর জন্যে, যেমন ক্লাসে ফার্স্ট হবার জন্যে কে কার চেয়ে বেশি পড়ালেখা করতে পারে কিংবা ইবাদাত বন্দেগিতে কে কার চেয়ে এগিয়ে যেতে পারে..এরকম চিন্তা করা যেতে পারে।

বন্ধুরা, এত কথা বলার উদ্দেশ্য হচ্ছে, এ সম্পর্কেই আমরা রংধনু আসরে একটি গল্প প্রচার করেছি। আর গল্প শেষে থাকছে একটি গান।

 

অনেক অনেকদিন আগের কথা। থুরথুরে এক বুড়ো আর বুড়ি একটা ভাঙ্গাচোরা কুঁড়েঘরে খুবই কষ্টে দিন কাটাচ্ছিল। তারা ছিল খুবই অভাবী। তিনবেলা ঠিকমতো খাবারও জুটতো না। তো একদিন বুড়ো লোকটা তাদের ভাঙ্গাচোরা ঘরটা ঝাড়ু দিচ্ছিল। ঝাড়ু দিতে দিতে বুড়ো লোকটি একটা ভুট্টার দানা খুঁজে পেল। দানাটি বেশ বড়সড়। দানাটি হাতে নিয়ে ভালো করে দেখল বুড়ো। কেমন সোনালী রঙের, ঝকঝকে, বুকটা সাদা। বুড়ো লোকটা ভুট্টাদানাটি হাতে নিয়ে ইঁদুরের গর্তের কাছে গেল। গিয়ে গর্তের মুখে ভুট্টাদানাটি রেখে বলল: ইঁদুর বন্ধু! কোথায় তুমি! উপরে এসো..ভুট্টাদানাটি নিয়ে গিয়ে খাও।

 

নিজের পেটে ক্ষুধা থাকায় আরেকজনের ক্ষুধার কষ্টটাও বুঝতে পারত বুড়ো। এরপর কয়েকদিন ধরে এরকম চলল। বুড়ো লোকটি ইঁদুরটাকে ডেকে ভুট্টাদানা দিত আর ইঁদুর ভুট্টাটি নিয়ে চলে যেত।

একদিন কী হলো...ইঁদুরের গর্ত থেকে ছোট্ট একটি ইঁদুর বেরিয়ে এসে বুড়ো লোকটাকে বলল: আমি এসেছি ইঁদুরদের পক্ষ থেকে তোমাকে ধন্যবাদ জানাতে...আর আমাদের ইঁদুরদের দেশে তোমাকে আমন্ত্রণ জানাতে।

আমন্ত্রণ পেয়ে বুড়ো লোকটা ভীষণ খুশি হল। সে ইঁদুরকে ধন্যবাদ কীভাবে যাবে তাদের দেশে যাবে তা জানিয়ে জানতে চাইল। ইঁদুর তখন

 

বুড়ো লোকটাকে বলল: তুমি যদি তোমার চোখদুটো বন্ধ করো, তাহলে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই ইঁদুরদের দেশে চলে যাবে।

বুড়ো চোখ বন্ধ করতে না করতেই ইঁদুরদের চেঁচামেচি শুনতে পেল। চোখ খুলতেই বুড়ো তো হতবাক হয়ে গেল! বুড়ো দেখতে পেল- ফুলে ফুলে ভরপুর চমৎকার একটি বাগান। অ্যাতো সুন্দর ও পরিচ্ছন্ন বাগান বুড়ো জীবনেও দেখেছি। তাই মুখ হা করে রইলো বুড়ো। কোনো কথা বেরুচ্ছিল না মুখ দিয়ে। বুড়ো শুধু ইঁদুরকে অনুসরণ করল। ইঁদুর যেদিকে গেল, বুড়োও সেদিকে যেতে লাগল। যেতে যেতে গিয়ে পৌঁছল আরো সুন্দর একটি প্রাসাদে। সেখানে ইঁদুরদের বাদশাহ বসে ছিল। বুড়ো তাদের বাদশাকে সম্মান জানাল, ইঁদুর-বাদশাও বুড়োকে স্বাগত জানাল। বুড়ো একজন গরীব মানুষ ইঁদুরদের প্রতি যে দয়া বুড়ো তাদের দেখিয়েছে, সেই দয়ার জন্যে ধন্যবাদ জানালো এবং বুড়োকে সারাটা দিন তাদের সাথে কাটানোর আমন্ত্রণ জানাল। বুড়ো মনের খুশিতে তাদের সেই আমন্ত্রণ গ্রহণ করল এবং তাদের সাথে কাটাল, তাদের সাথে কথাবার্তা বলল এবং খেলাধুলা করল।

 

এভাবে যখন রাত হয়ে গেল তখন ইঁদুরদের বাদশা বুড়োর হাতে একটা থলি দিয়ে বলল: বাসায় না পৌঁছানো পর্যন্ত থলিটির মুখ খুলবে না।

এরপর বুড়ো চোখ বন্ধ করল আর কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই কানে শুনতে পেল বুড়ির কথা। বুড়ো খুশিতে চোখ মেলে দেখল তার কুঁড়ে ঘরে এসে গেছে সে। আনন্দের সাথে সেদিনের পুরো ঘটনাটা বুড়িকে বলল এবং থলির মুখটা খুলল...

 

থলি খুলেই বুড়ো-বুড়ি অবাক হয়ে গেল। থলিতে ছিল চমৎকার দুটি মুক্তা। বুড়োবুড়ি কেউইই বুঝে উঠতে পারছিল না এগুলো দিয়ে কী করবে। তাই তারা তাদের পরিচিত দু’একজনের সাথে এ বিষয়ে পরামর্শ চাইল। এরপর এককান দু’কান হতে হতে জেনে গেল ওই বুড়োরই এক প্রতিবেশি। প্রতিবেশিও ছিল বুড়ো তবে বেশ সম্পদশালী। সম্পদশালী হলে কী হবে, ভীষণ লোভী ছিল সে। বুড়োবুড়ির বিপদের দিনে ধনী লোকটা তাদেরকে কোনো সাহায্য না করলেও মুক্তা পাবার কথা শুনে এক ব্যাগ ভুট্টা নিয়ে বুড়োবুড়ির কুঁড়েঘরে চলে এল সে। তার উদ্দেশ্য ছিল- ইঁদুরকে নিজ হাতে ভুট্টা দিয়ে সেও ইঁদুরদের দেশে যাবে এবং মুক্তা আনবে। বুড়ো-বুড়ি ধনী লোকটাকে বসতে দিল। এরপর ধনী লোকটা নিজ হাতে ইঁদুরদের ভুট্টা খেতে দিল। এরপর তাকেও তাদের দেশে যাবার আমন্ত্রণ জানাল।

 

বুড়ো সাথে সাথে দাওয়াত কবুল করল। ইঁদুর বলার আগেই চোখ বন্ধ করল আর অমনি চলে গেল ইঁদুরদের রাজ্যে। ইঁদুরদের শব্দ শুনে চোখ মেলতেই চমৎকার সেই রাজ্যটি দেখতে পেল। কিন্তু বুড়োর সেদিকে কোনো খেয়ালই নেই। কেবল অপেক্ষায় ছিল কখন দিন শেষ হবে..রাত আসবে আর মূল্যবান উপহার-মুক্তাগুলো পাবে।

অধৈর্য হয়ে ইঁদুরদের বাদশাকে বলেই বসল: একটু তাড়াতাড়ি করুন প্লিজ, আমার একদম সময় নেই, যদি কোনো উপহার থাকে, দিয়ে দেন আমি চলে যাই।

 

একথা বলে বুড়ো লোকটা বাদশার দিকে তাকাল। সে দেখল তার পাশে বড় একটা পাত্রে মুক্তা ভর্তি করা। চোখ ধাঁধিয়ে গেল বুড়োর। একদৃষ্টিতে সেদিকে তাকিয়ে থাকল। হঠাৎ একটা দুষ্টু বুদ্ধি খাটালো বুড়ো। বেড়ালের মতো করে ডাক দিতে শুরু করে দিল সে।

 

বুড়ো ভেবেছিল, বেড়ালের ডাক শুনে ইঁদুরগুলো সব পালিয়ে যাবে আর বুড়ো ওই মুক্তাগুলো নিয়ে চম্পট মারবে। কিন্তু ঘটনাটা হয়ে গেল অন্যরকম...বেড়ালের শব্দ করার কারণে ইঁদুরগুলো ভয়ে পালিয়ে গেল ঠিকই, তবে ইঁদুরগুলো চলে যাবার সাথে সাথে ওই রাজ্যের সব আলো চলে গেল। পাখিদের ডাকাডাকিও বন্ধ হয়ে গেল। চারদিকে নেমে এল নিঃসীম অন্ধকার। বুড়ো লোকটা অন্ধকারের ভেতর হাতড়িয়ে হাতড়িয়ে সামনের দিকে গেল। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার হলো যেই পাত্রে অ্যাতো উজ্জ্বল মুক্তাগুলো ছিল, ওই পাত্র থেকে মুক্তাগুলোও উধাও হয়ে গেল। বেচারার আশা আর পূরণ হলো না, বুদ্ধিটাও বিফলে গেল। শেষ পর্যন্ত ভাবলো ঘরেই ফিরে যাবে।

 

কিন্তু তা আর হবে কীভাবে! ইঁদুরগুলো যেহেতু পালিয়ে গেছে তাই বুড়োকে আর পথ দেখিয়ে কে নিয়ে যাবে? কে চোখ বুঁজলেই জাদুর মতো বাড়িতে পৌঁছে দেবে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে?

 

বুড়ো এবার বুঝতে পারলো কাজটা সে ঠিক করেনি কিন্তু তাতে কোনো কাজ হলো না। কারণ, অন্ধকারের মাঝে কোনোভাবেই ফেরার পথ খুঁজে পেল না। এমনকি সাহায্য করার মতো একটি ইঁদুরকেও তো দেখতে পেল না। অবশেষে যা হবার তাই হলো। মুক্তার অতিরিক্ত লোভে জীবনটাকেই হারাতে হলো। অথচ ওই জীবনটা ছিল মুক্তার চেয়েও মূল্যবান।

 

বন্ধুরা, তোমরা নিশ্চয়ই বুঝতে পারছ যে, সততার কারণেই ইঁদুরের বাদশার পক্ষ থেকে বুড়ো-বুড়ি মহামূল্যবান উপহার পেয়েছিল। এটা আসলে ছিল সৎ কাজ ও লোভ না করার পুরস্কার। অথচ ধনী বুড়ো লোকটা সম্পদের লোভ করায় শেষ পর্যন্ত তার যা ছিল তাও হারাতে হলো। এ গল্প থেকে আমরা শিখতে পারি, অতিরিক্ত লোভ করা যেমন ভালো নয়, তেমনি অন্যের ধন-সম্পদ দেখে হিংসা করাও উচিত নয়। আমরা সবাই হিংসা-বিদ্বেষ ও লোভ-লালসা থেকে দূরে থাকব এ কামনা করে বিদায় নিতে চাই। তবে তার আগে রয়েছে হিংসা-বিদ্বেষ ত্যাগ করার আহ্বান জানিয়ে অনুপম শিল্পীগোষ্ঠীর শিশু-কিশোরদের একটি গান। পুরো অনুষ্ঠানটি শুনতে নিচের লিংকে ক্লিক কর।#(আশরাফুর রহমান)

 

 

 

 

 

মাধ্যম

মন্তব্য লিখুন


Security code
রিফ্রেস দিন