এই ওয়েবসাইটে আর আপডেট হবে না। আমাদের নতুন সাইট Parstoday Bangla
সোমবার, 29 জুন 2009 15:54

ইরান : সৃজনশীলতার নবদিগন্তে ( ২১-৩০)

২১ তম পর্ব

গত সপ্তার আলোচনায় আমরা আমরা কৃষি ও শিল্প ক্ষেত্রে শান্তিপূর্ণ পরমাণু প্রযুক্তির ব্যবহার এবং এক্ষেত্রে ইরানের অগ্রগতির কিছু দিক সম্পর্কে আলোচনা করেছি। আজকের এ আসরে আমরা মহাকাশ বা মহাশুণ্য গবেষণায় ইরানের অগ্রগতি সম্পর্কে আলোচনা করবো।

মহাকাশ বা মহাশুণ্য গবেষণা এবং এ সংক্রান্ত শিল্প ও প্রযুক্তি বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথা জরুরী ও কল্যাণকর প্রযুক্তিগুলোর মধ্যে শীর্ষস্থানীয় হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। অত্যাধুনিক এ প্রযুক্তির অগ্রযাত্রা শুরু হয়েছিল প্রায় অর্ধ শত বছর আগে একটি কৃত্রিম উপগ্রহ উৎক্ষেপণের মাধ্যমে। স্পুটনিক নামের ঐ উপগ্রহ ছিল পৃথিবীর কক্ষপথে উৎক্ষিপ্ত ও স্থাপিত প্রথম কৃত্রিম উপগ্রহ। এরপর থেকে শত শত কৃত্রিম উপগ্রহ পৃথিবীর কক্ষপথে স্থাপিত হয়েছে। এসব কৃত্রিম উপগ্রহ মানুষের দৃষ্টির জগৎকে করেছে প্রশস্ত, তীক্ষ্ণ এবং বেগবান। একইসাথে রহস্যের অনেক অজানা জগৎ উন্মোচিত হয়েছে এসবের সুবাদে। এইসব কৃত্রিম উপগ্রহের কল্যাণে মানুষ আজ দেখতে পারছে ভূ-গর্ভের কোথায় কোন্ রত্ন বা সম্পদের খনি রয়েছে এবং আগামী কালের আবহাওয়া কেমন হবে। কৃত্রিম উপগ্রহ ও মহাকাশ প্রযুক্তির সহায়তায় পৃথিবীর আবহমন্ডলের সৌন্দয্য দেখা সম্ভব হয়েছে। চাঁদে পা রাখার পর মানুষ এখন অনুসন্ধানী রোবট পাঠাচ্ছে মঙ্গল , বৃহষ্পতি ও শুক্র গ্রহসহ বিভিন্ন গ্রহে এবং এমনকি সৌর জগতের বাইরেও পৌঁছে গেছে এ ধরনের রোবট। এ অবস্থায় এটা স্পষ্ট যে, যেসব দেশ উপগ্রহ ও মহাকাশ প্রযুক্তিতে পিছিয়ে থাকবে সেসব দেশ যথাযোগ্য অবস্থান তথা অগ্রগতি ও উন্নতি থেকেও পিছিয়ে থাকবে।

কৃত্রিম উপগ্রহগুলোর মধ্যে বিভিন্ন রকমফের আছে। বিভিন্ন ধরনের তৎপরতা বা কাজের উদ্দেশ্যে নির্মাণ করা হয় নানা ধরনের কৃত্রিম উপগ্রহ। যেমন, যোগাযোগ উপগ্রহ ব্যবহার করা হয় রেডিও-টেলিভিশন, ইন্টারনেট ও টেলিযোগাযোগ সংক্রান্ত কাজে। আবহাওয়া সংক্রান্ত গবেষণা ও তথ্য আদান-প্রদানের কাজে ব্যবহার করা হয় আবহাওয়া উপগ্রহ। এসব উপগ্রহ বলে দেয় বাতাসের গতি ও মেঘমালার তৎপরতা এবং এর ফলে সম্ভাব্য ঝড়-বৃষ্টিসহ আবহাওয়ার পূর্বাভাস দেয়া সহজ হয়। সম্ভাব্য ঘূর্ণিঝড়, শৈত্য ও উষ্ণ-প্রবাহ, বন্যা এবং অন্যান্য প্রাকৃতিক দূর্যোগের ব্যাপারে জনগণকে সতর্ক করা সম্ভব হয় এসব উপগ্রহের কল্যাণে।
নেভীগেশান স্যাটেলাইট হিসেবে পরিচিত কৃত্রিম উপগ্রহ ভৌগলিক অবস্থান নির্নয়ে এবং আকাশ ও সমুদ্র-পথে বিমান বা সামুদ্রিক জাহাজকে পরিচালনার কাজে ব্যবহৃত হয়।

গবেষণামূলক উপগ্রহ হিসেবে পরিচিত কৃত্রিম উপগ্রহগুলো চৌম্বক-ক্ষেত্র, মহাজাগতিক রশ্মি ও সূর্যের নানা তরঙ্গের মত বিষয় সম্পর্কে গবেষণা করে। এ ধরনের কয়েকটি বিখ্যাত উপগ্রহের নাম হাবল্, মীর ও স্কাইল্যাব।
সামরিক উপগ্রহ ব্যবহৃত হয় গোয়েন্দা, প্রতিরক্ষা ও আক্রমণ-তৎপরতায়। এ ধরনের উপগ্রহ শত্রুদের বিভিন্ন তথ্য শোনার পাশাপাশি সামরিক কেন্দ্রগুলো চিহ্নিত করা, অভিযানে জড়িত সেনাদের দিক-নির্দেশনা দেয়া এবং শত্রুদের টেলি-যোগাযোগ বা সাংকেতিক যোগাযোগে বিঘ্ন ঘটানোর মত কাজে ব্যবহৃত হয়। বর্তমানে বিভিন্ন উন্নত দেশ পৃথিবীর কক্ষপথে এ ধরনের উপগ্রহ পাঠিয়ে টার্গেটভুক্ত দেশগুলোর বিভিন্ন কথোপকথন ও পরিকল্পনা আগে-ভাগেই জেনে নেয়ার চেষ্টা করছে।

সম্প্রতি ওয়াল স্ট্রীট জার্নাল নামের একটি পত্রিকা লিখেছে, মার্কিন প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় বা পেন্টাগন নতুন প্রজন্মের গোয়েন্দা-উপগ্রহ তৈরি করছে। এই উপগ্রহগুলো আগের গোয়েন্দা-উপগ্রহগুলোর চেয়ে আকারে ছোট এবং সস্তা। আকারে ছোট হবার কারণে এসব উপগ্রহ জরুরী ভিত্তিতে ও পৃথিবীর খুব কাছাকাছি এবং অপেক্ষাকৃত বেশী নীচে অবস্থিত কক্ষ-পথে স্থাপন করা সম্ভব হবে। পেন্টাগন নতুন প্রজন্মের এসব গোয়েন্দা-উপগ্রহকে অপেক্ষাকৃত বেশী হাল্কা ও ভ্রাম্যমাণ ক্ষেপনাস্ত্রের মাধ্যমে মহাকাশে পাঠাতে পারবে।
এ ছাড়াও এমন কিছু উপগ্রহ আছে যেগুলো পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানের চিড় বা ফাটল, ভূগর্ভস্থ পানি, সাগরের জোয়ার-ভাটা, বনাঞ্চল ও আগ্নেয়গিরি সম্পর্কিত তথ্যসহ অন্য অনেক বিষয়ের তথ্য পাঠাতে সক্ষম।

বর্তমানে বিশ্বের গুটি কয়েক দেশ কৃত্রিম উপগ্রহ উৎপাদন করছে এবং এসব দেশের উপগ্রহ পৃথিবীর কক্ষ-পথে রয়েছে। কিন্তু বিশ্বের অধিকাংশ দেশের কাছে কৃত্রিম উপগ্রহ উৎপাদন ও তা মহাকাশে পাঠানোর জন্য প্রয়োজনীয় উন্নত প্রযুক্তি নেই। রকেট বা ক্ষেপনাস্ত্রযোগে এ ধরনের উপগ্রহ পাঠানোর জন্য ভূ-পৃষ্ঠে স্টেশন প্রতিষ্ঠা করতে হয়। কিন্তু এই জটিল প্রযুক্তিও অধিকাংশ দেশের কাছে নেই।

ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান মহাকাশ গবেষণা ও প্রযুক্তিতে বিস্ময়কর সাফল্য অর্জন করেছে। ১৯৫৯ সালেই ইরান এক্ষেত্রে কিছু প্রাথমিক কর্মসূচী নিয়েছিল। ইরান সে বছরই পৃথিবীর আবহমন্ডলের বাইরে মানুষের ব্যবহার শীর্ষক কর্মসূচী বা প্রকল্পের সদস্য হয়। এ ব্যাপারে দূর থেকে পরিমাপ, উপযুক্ত স্থান নির্বাচন এবং উপগ্রহ উৎক্ষেপণ ছিল এই কর্মসূচীর কিছু দিক। কিন্তু ইরানে সত্তুরের দশকের শেষের দিকে ইসলামী বিপ্লবের বিজয় ও এরপর সাদ্দামের যুদ্ধ চাপিয়ে দেয়ার কারণে এবং মার্কিন সরকারের নিষেধাজ্ঞার ফলে কিছুকাল ইরানের মহাকাশ গবেষণা স্থগিত হয়েছিল। কিন্তু অল্প কিছু কাল পরই ইরানের প্রকৌশলী ও বিজ্ঞানীরা মহাকাশ-গবেষণা এবং এ সংক্রান্ত কর্মসূচী পুনরায় শুরু করেন। পাশ্চাত্যের দেশগুলোর অবরোধ সত্ত্বেও বর্তমানে ইরান কৃত্রিম উপগ্রহ উৎপাদন ও তা উৎক্ষেপনের প্রযুক্তি আয়ত্ত্ব করেছে। পরিবেশ, আবহাওয়া, গবেষণা এবং যোগাযোগ সংক্রান্ত বিষয়ে ব্যবহারের জন্য ইরান বেশ কয়েকটি উপগ্রহ পৃথিবীর কক্ষপথে স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে। ইরান এরিমধ্যে এ ক্ষেত্রে বেশ অগ্রগতিও অর্জন করেছে। ইরান সিনা নামের একটি উপগ্রহ প্রথমবারের মত নির্মাণ করে রাশিয়ার সহযোগিতায়। ঐ কৃত্রিম উপগ্রহ উৎক্ষেপণ করা হয়েছিল ২০০৫ সালে এবং তা পৃথিবীর কক্ষপথে স্থাপিত হয়। দূর থেকে পরিমাপ এবং দূর থেকে তথ্য আদান-প্রদান ও সংরক্ষণ সিনা'র দুটি বড় মিশন। দূর থেকে পরিমাপের মিশনটি কৃষিকাজ, পৃথিবীর উদ্ভিদ বা গাছ-পালা-বহুল অঞ্চলগুলোকে সনাক্ত করা এবং ইলেকট্রনিক ডাক-সেবা প্রদানের সাথে সম্পর্কিত।

ইরান জোহরেহ বা শুকতারা ও মেসবাহ নামের দুটি কৃত্রিম উপগ্রহ নির্মাণের প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে। এরিমধ্যে কৃত্রিম উপগ্রহ মেসবাহ তৈরির কাজ শেষ হয়েছে এবং এটি এখন উৎক্ষিপ্ত হবার জন্য প্রস্তুত। মেসবাহ-দুই নামের আরো একটি কৃত্রিম উপগ্রহ নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে ইরান। এই কৃত্রিম উপগ্রহগুলোকে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও গবেষণামূলক কাজে ব্যবহার করা হবে।

২২তম পর্ব

 গত আসরে আমরা মহাকাশ গবেষণা ও এ সংক্রান্ত প্রযুক্তি ক্ষেত্রে ইরানের অগ্রগতির কিছু দিক তুলে ধরেছি। আজকের আসরে আমরা এ ক্ষেত্রে ইরানের অগ্রগতির আরো কিছু দিক তুলে ধরবো।

মহাকাশ গবেষণা ও এ সংক্রান্ত প্রযুক্তি ক্ষেত্রে ইরানের অগ্রগতির সবচেয়ে বড় সাফল্যটি হ'ল "উমিদ" নামের কৃত্রিম উপগ্রহের উৎক্ষেপণ। উমিদ বা আশা নামের এই উপগ্রহ পুরোপুরি ইরানের নির্মিত প্রথম উপগ্রহ এবং এটি নির্মাণও করা হয়েছে ইরানের নির্মিত স্টেশন থেকে। ইরানের জাতীয় উপগ্রহ হিসেবে খ্যাত এই কৃত্রিম উপগ্রহ পৃথিবীর কক্ষপথে সফলভাবে স্থাপিত হয়েছে। ইরানের এই অবিস্মরনীয় সাফল্য প্রমাণ করেছে যে, কোনো জাতি যদি অগ্রগতি অর্জনের জন্য দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হয়, তাহলে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি অর্জন করা সম্ভব।

"উমিদ" নামের এই কৃত্রিম উপগ্রহ উৎক্ষেপণসহ এর যন্ত্রাংশ পরিকল্পিত ও নির্মিত হয়েছে ইরানী বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে। এটি ইরানের দ্বিতীয় উপগ্রহ যা পৃথিবীর কক্ষপথে স্থাপিত হয়েছে। সাফির দুই বা দূত-দুই নামের একটি ইরানী উপগ্রহের মাধ্যমে উমিদকে পৃথিবীর কক্ষপথে স্থাপন করা হয়। মূল উপগ্রহ "উমিদ" বা "আশা" ও এই উপগ্রহ বহনকারী রকেট বা উপগ্রহ ছাড়াও ভূ-পৃষ্ঠে স্থাপিত উপগ্রহ উৎক্ষেপণ কেন্দ্র এবং এই স্টেশন বা কেন্দ্রের সমস্ত যন্ত্রপাতিও ইরানে নির্মিত হয়েছে। "উমিদ" প্রতি ২৪ ঘন্টায় ১৫ বার পৃথিবীর কক্ষপথ প্রদক্ষিণ করে এবং ইরানে অবস্থিত তথ্য-গ্রাহক কেন্দ্রগুলোতে তথ্য পাঠায়। টেলিযোগাযোগ, অনুসন্ধান ও গবেষণা-উপগ্রহ উমিদের নির্মাণ কাজ শুরু হয় ২০০৫ সালের প্রথম দিকে। এরপর ২ বছরের মধ্যেই এই উপগ্রহ ব্যবহার করা সম্ভব হয়। মহাকাশে এই উপগ্রহ পাঠাতে সক্ষম হওয়ায় ইরান উপগ্রহ পাঠাতে সক্ষম গুটিকয়েক দেশের তালিকায় স্থান পেল। এর আগে বিশ্বের মাত্র ৮ টি দেশ এই প্রযুক্তি অর্জন করতে সক্ষম হয়।
ইরানের মহাকাশ বিষয়ক গবেষক ডক্টর ইব্রাহিমী উপগ্রহ বহনকারী রকেট বা উপগ্রহ "সাফিরে উমিদ-দুই" বা "আশার-দূত-দুই" নির্মাণ এবং তা পরীক্ষার প্রক্রিয়া সম্পর্কে বলেন,
প্রথমে কাওয়েশগার-ওয়ান বা অনুসন্ধানী -এক নামক রকেট উৎক্ষেপণ করা হয়। এর কাজ বা দায়িত্ব ছিল দূত বা সাফির নামক উপগ্রহের উড্ডয়ন-পথ সম্পর্কে তথ্য পাঠানো এবং উপগ্রহ ও উপগ্রহ পরিবাহকের কিছু সিস্টেম পরীক্ষা করা। ২০০৮ সালের গ্রীষ্মকালে "সাফিরে উমিদ-এক" বা "আশার-আলো-এক" নামের উপগ্রহের পরিকল্পনা ও নির্মাণ-কাজ শেষ হয় এবং তা উৎক্ষেপণ করা হয়। এর কিছুকাল পর উৎক্ষেপণ করা হয় "অনুসন্ধানী-দুই" বা "কাওয়েশগার-টু" নামক রকেট । উড্ডয়ন-পথ সম্পর্কে ডাটা বা তথ্য-ব্যাংক পূর্ণ করা ছিল এই রকেট উৎক্ষেপণের উদ্দেশ্য। এটিকে বহুমুখী প্যারাসুট-পদ্ধতির মাধ্যমে পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনা হয়। এই গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষার পর "সাফিরে উমিদ-দুই" বা "আশার-দূত-দুই" নামের উপগ্রহ বাহককে ব্যবহারের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত করা সম্ভব হয়েছে।
পাশ্চাত্যের গণমাধ্যমগুলো বিজ্ঞান ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে পাশ্চাত্যের অবরোধের শিকার ইরানের এসব সাফল্যকে খুবই গুরুত্বপূর্ণ বলে অভিহিত করেছে। ম্যাসাচুসেট কারিগরি সংস্থার বিশেষজ্ঞ জ্যাফরী ফোর্ডন দৈনিকি নিউইয়র্ক টাইমসকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে এ প্রসঙ্গে বলেছেন, " ইরান উপগ্রহ উৎক্ষেপণের জন্য নিজস্ব রকেট ব্যবহারের মাধ্যমে এই প্রযুক্তির অধিকারী বিশ্বের মাত্র ৮ টি দেশের ক্লাবে যুক্ত হল।"
ইরান বর্তমানে "মেসবাহ-দুই" নামের আরো একটি কৃত্রিম উপগ্রহকে উৎক্ষেপণের জন্য প্রস্তুত করেছে। এ ছাড়াও আগামী দুই বছরের মধ্যে ইরান আরো চারটি কৃত্রিম উপগ্রহ মহাকাশে পাঠানোর পরিকল্পনা নিয়েছে। রুশ সংসদের ডেপুটি স্পীকার ভ্লাদিমির ঝিরনোভস্কি মহাকাশ গবেষণা ও এ সংক্রান্ত প্রযুক্তিতে ইরানী বিজ্ঞানীদের সাফল্যের উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেছেন। তিনি বলেছেন, " ইরানের উপগ্রহ "উমিদ" সবার কাছে এটা প্রমাণ করেছে যে ইরান মধ্যপ্রাচ্যের ও বিশ্বের একটি আদর্শ দেশ। এই উপগ্রহ ইরানের ইসলামী বিপ্লবের শক্তি, সত্যতা বা পবিত্রতা ও শ্রেষ্ঠত্বের প্রকাশ।"
ইরানের উপগ্রহ "উমিদ" দুটি বেতার-তরঙ্গ এবং ৮ টি এন্টেনার মাধ্যমে ভূ-পৃষ্ঠে অবস্থিত মহাকাশ-স্টেশনে তথ্য পাঠিয়ে থাকে।
ইসলামী বিপ্লবের দেশ ইরান জ্ঞান-বিজ্ঞানে যেসব সাফল্য অর্জন করছে তা থেকে বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ)'র একটি বিখ্যাত হাদীস সবার কাছে আরো অর্থপূর্ণ হয়ে উঠছে। ঐ হাদীসে তিনি বলেছিলেন, "জ্ঞান যদি সুরাইয়া নক্ষত্রেও থাকে, সেখান থেকেও ইরানীরা জ্ঞান আহরণ করবে। " যাই হোক্, ইরান আগামী দশ বছরে মহাকাশে নভোচারী পাঠানোর পরিকল্পনাও নিয়েছে। ইরানের মহাকাশ সংস্থার সভাপতি বলেছেন, মহাকাশ প্রযুক্তিতে অগ্রগতি অর্জন করা ইরানের অন্যতম প্রধান কৌশলগত লক্ষ্য। মহাকাশ বিষয়ের ব্যাপকতার আলোকে ইরান এই লক্ষ্য অর্জন করতে চায় বলে তিনি জানান। ইরান বেশারত নামের একটি উপগ্রহ নির্মাণে মুসলিম দেশগুলাকে সহযোগিতা করবে বলে ঘোষণা করেছে। এই উপগ্রহ মুসলিম দেশগুলোর অভিন্ন উপগ্রহ হিসেবে ব্যবহৃত হবে। এ ছাড়াও এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোর একটি অভিন্ন উপগ্রহ নির্মাণে এবং এর পরিকল্পনায় অংশ নেবেন ইরানের বিজ্ঞানীরা। এই উপগ্রহটির নাম হবে "এস এম এম এস"। ইরানের বিশিষ্ট মহাকাশ-বিজ্ঞানী ডক্টর হোসাইন বাহরামীর মতে "অনুসন্ধানী-দুই" বা "কাওয়েশগার-টু" নামক রকেট উৎক্ষেপণের লক্ষ্য শান্তিপূর্ণ মহাকাশ প্রযুক্তিতে অগ্রগতি ঘটানো। এই রকেটটি পৃথিবীর আবহমন্ডলের ছবি, তাপমাত্রার পরিমাণ, চাপ ও অন্য অনেক বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করবে। এই রকেটে স্থাপিত ক্যামেরাগুলো আকাশ ও পৃথিবীর ছবি তুলতেও সক্ষম বলে তিনি জানান। ইরানের বিশিষ্ট মহাকাশ-বিজ্ঞানী ডক্টর হোসাইন বাহরামী মহাকাশ-গবেষণা সংক্রান্ত অনেকগুলো প্রকল্পের সাথে জড়িত। তিনি এক্ষেত্রে ইরানের শ্রেষ্ঠ গবেষক হিসেবে পুরস্কার পেয়েছেন। মহাকাশ-গবেষণা বিষয়ে তার লেখা ৮০টিরও বেশী প্রবন্ধ রয়েছে।
ইসলামী বিপ্লবের পর ইরান বিমান নির্মাণ শিল্পেও ব্যাপক অগ্রগতি অর্জন করেছে। ইউক্রেনের সহযোগিতায় ইরানের বিজ্ঞানীরা এখন বিমানের বিভিন্ন যন্ত্রাংশ নির্মাণ করছেন। তারা "ইরান-১৪০" ও "ইরান-১৩৮" নামের বিমানসহ বিভিন্ন যাত্রীবাহী বিমানও নির্মাণ করছেন। এসব বিমানের আসন সংখ্যা হবে ১০০। ইউক্রেনের সহযোগিতায় ইরান যেসব বেসামরিক বিমান নির্মাণ করছে সেগুলো ইরানের বেসামরিক বিমান পরিবহন ব্যবস্থায় ব্যাপক মাত্রায় ব্যবহৃত হচ্ছে। ইরানের বিজ্ঞানীরা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর নির্মাণেও সফল হয়েছেন। ইমাম খোমেনী(রঃ) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর নির্মাণ এর উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। আগামী ২০৩০ সাল নাগাদ এই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরকে নয় কোটি যাত্রীর জন্য ব্যবহার-উপযোগী করা হবে।  বর্তমানে ইরানের বেশ কয়েকটি বেসরকারী কোম্পানীও বিভিন্ন ধরনের বিমান নির্মাণ করছে। এ ধরনের কোম্পানীর সংখ্যা ৬১ টি। তারা বিমান নির্মাণ ছাড়াও বিমানের বিভিন্ন যন্ত্রাংশ নির্মাণ এবং মেরামতের কাজ করছে। বাইরের দেশগুলোও বিমানের যোগাযোগ সম্পর্কিত ও ইলেকট্রনিক যন্ত্রাংশসহ এ ধরনের যন্ত্রাংশ কিনছে। ইরানের বিশেষজ্ঞরা বিমানের ও সামুদ্রিক জাহাজের রাডার, পাইলটবিহীন বিমান, প্রি-ড্রাইভিং সিস্টেম ও মোটর জেটও তৈরি করছেন। এবারে একটি বিশেষ খবর।
একজন ইরানী মহিলা প্রথম ইরানী হিসেবে এরিমধ্যে নভোচারী হয়েছেন। এই মহিলার নাম আনুশে আনসারী।
২৩ তম পর্ব

ইরান সৃজনশীলতার নব-দিগন্তে শীর্ষক ধারাবাহিক আলোচনার এ সপ্তার আসর থেকে আপনাদের জানাচ্ছি সালাম এবং একরাশ প্রীতি ও শুভেচ্ছা। আজকের আলোচনায় আমরা সামরিক শিল্পে ইরানের অগ্রগতি সম্পর্কে কথা বলবো।

সামরিক শিল্পের গবেষণা ও এ সংক্রান্ত উন্নত প্রযুক্তি অর্জনের ক্ষেত্রে ইরান ব্যাপক অগ্রগতি অর্জন করেছে। তরুণ গবেষকদের সৃষ্টিশীলতা ও প্রতিভাকে কাজে লাগিয়ে ইসলামী বিপ্লবের পর ইরান সামরিক শিল্পে যে অগ্রগতি অর্জন করেছে এক কথায় তা অবিশ্বাস্য হলেও বাস্তব। ইসলামী বিপ্লবের আগে ইরানের সামরিক শিল্প ছিল পাশ্চাত্যের এবং বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দয়ার ওপর নির্ভরশীল। ইরানের ভেতরে কৌশলগত বা গুরুত্বপূর্ণ কোনো অস্ত্র নির্মিত হত না। ফলে এ ধরনের অস্ত্র কেনা ও মেরামতের জন্য ইরানের বিপুল অংকের অর্থ হাতিয়ে নিত এইসব পশ্চিমা দেশ। বিপ্লবের আগে ইরানে মান্ধাতার আমলের কিছু মামুলি অস্ত্র নির্মিত হত । যেমন, জে-থ্রি বন্দুক, জে-থ্রি কার্তূজ ও পিস্তলের কার্তূজ। সেযুগে অস্ত্র বিষয়ে ইরানের প্রকৌশলী ও বিশেষজ্ঞদের জন্য গবেষণার সুযোগও রাখা হয় নি, এমনকি ইরানের সামরিক শিল্পের অবকাঠামোও ছিল মার্কিন উপনিবেশবাদীদের দখলে বা তাদের কর্তৃত্বাধীনে। কিন্তু ইসলামী বিপ্লবের পর ইরানের সামরিক শিল্পের পরিস্থিতি সম্পূর্ণ পাল্টে যায়। সকল ক্ষেত্রে স্বাধীনতা ও স্বনির্ভরতা অর্জন ছিল এই বিপ্লবের অন্যতম শ্লোগান। তাই ইসলামী ইরান সামরিক শিল্পে পরনির্ভরতা যথাসম্ভব কমিয়ে আনার চেষ্টা করে। সাদ্দামকে ব্যবহার করে পাশ্চাত্য যখন ইরানের ওপর যুদ্ধ চাপিয়ে দিল তখন ইরান তার সামরিক শিল্পকে সমৃদ্ধ করার উদ্যোগ জোরদার করে। একদিকে এই চাপিয়ে দেয়া যুদ্ধ এবং অন্যদিকে পাশ্চাত্যের অর্থনৈতিক অবরোধ প্রতিরক্ষা শিল্পে ইরানীদেরকে উদ্ভাবনী ও সৃষ্টিশীল হতে বাধ্য করে। এ সময় ইরান বিপরীত প্রকৌশল ব্যবহার করে বিভিন্ন ধরনের অস্ত্র উৎপাদন শুরু করে।

বর্তমানে ইরান ক্ষেপনাস্ত্র, স্থল-যুদ্ধের সাজ-সরঞ্জাম, ইলেকট্রনিক অস্ত্র এবং নৌ ও বিমান বাহিনীর প্রতিরক্ষা-সামগ্রী নির্মাণে ব্যাপক অগ্রগতি অর্জন করেছে। বিশেষ করে বর্তমান ইরান ক্ষেপনাস্ত্র ক্ষেত্রে তাক-লাগানো অগ্রগতি সাধন করেছে। আর এই বিস্ময়কর সাফল্য পুরোপুরি ইরানের নিজস্ব। ইরান অত্যন্ত কম খরচে এইসব অগ্রগতি অর্জন করেছে।

বর্তমানে ইরানের বিশেষজ্ঞরা কাঁধ থেকে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপনাস্ত্রসহ মধ্য-আকাশের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার ক্ষেপনাস্ত্র এবং ভূমি থেকে ভূমিতে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপনাস্ত্র, লেজার-নিয়ন্ত্রিত ক্ষেপনাস্ত্র ও উপগ্রহ-বাহক ক্ষেপনাস্ত্রও তৈরি করছেন।

ইরানের মাঝারি পাল্লার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেপনাস্ত্র হল ভূমি থেকে ভূমিতে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপনাস্ত্র শাহাব-তিন এবং ফাতহ-১১০। শাহাব শব্দের অর্থ উল্কা। এই ক্ষেপনাস্ত্রের লক্ষ্য ভেদ করার ক্ষমতা অত্যন্ত উচ্চ মানের এবং সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুকে ধ্বংস করার জন্য অত্যন্ত উপযোগী।

ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ইরানের ক্ষেপনাস্ত্রগুলো শত্রুর জঙ্গী বিমান ও হেলিকপ্টারকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে অনুসরণ করে এবং শব্দের চেয়ে দ্রুত গতিতে পশ্চাদধাবন করে শত্রুকে ঘায়েল করতে সক্ষম। অত্যাধুনিক প্রযুক্তি-সমৃদ্ধ এ ধরনের একটি ইরানী ক্ষেপনাস্ত্রের নাম শাহীন বা ঈগল। হাজারো যন্ত্রাংশের সমন্বয়ে গঠিত এই ক্ষেপনাস্ত্র ইরানের ওপর পাশ্চাত্যের নিষেধাজ্ঞাগুলোর অকার্যকারীতাকেই তুলে ধরেছে।
ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য আরেকটি ইরানী ক্ষেপনাস্ত্রের নাম হল শাহাবে সাক্বেব। এর অর্থ জ্বলন্ত বা উজ্জ্বল উল্কাপিন্ড। রাডারযুক্ত এবং স্বয়ংক্রিয় ও কমান্ডযুক্ত এই ক্ষেপনাস্ত্র লক্ষ্যভেদে অত্যন্ত নিঁখুত বা অন্যকথায় এতে ভুলের মাত্রা অত্যন্ত কম।

ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য আরো দুটি উল্লেখযোগ্য উন্নতমানের ইরানী ক্ষেপনাস্ত্রের নাম মিসাক্ব-ওয়ান ও টু। মিসাক্ব শব্দের অর্থ অঙ্গীকার বা চুক্তি। এই ক্ষেপনাস্ত্রগুলো সব দিক থেকেই নিক্ষেপ করা যায়।
ইরানের ক্ষেপনাস্ত্র ভান্ডারে রয়েছে ট্যাংক ও সাঁজোয়া যান-বিধ্বংসী ক্ষেপনাস্ত্র "তুফান"। এই "তুফান" ৩ হাজার ৮৫০ মিটার দূরের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম এবং ৭৬ সেন্টিমিটার পুরু ট্যাংক বা সাঁজোয়া যানের বডি ভেদ করতে পারে। তুফানে যুক্ত রয়েছে রাতের বেলায় লক্ষ্যবস্তু দেখার সরঞ্জাম এবং এটি হেলিকপ্টার থেকেও নিক্ষেপ করা যায়। অন্যদিকে কোনো কিছুই এই ক্ষেপনাস্ত্রকে লক্ষ্যভ্রষ্ট করতে বা ধ্বংস করতে পারে না।

সম্প্রতি ইরান ভূমি থেকে ভূমিতে আঘাত হানতে সক্ষম সিজ্জিল-টু নামের একটি অত্যাধুনিক ক্ষেপনাস্ত্র পরীক্ষা করেছে। সিজ্জিল কয়েকটি ধাপে কাজ করে এবং অত্যন্ত দ্রুতগতিসম্পন্ন এই ক্ষেপনাস্ত্র শক্ত জ্বালানীর মাধ্যমে পরিচালিত হয়। শক্ত জ্বালানীর মাধ্যমে পরিচালিত হওয়ায় এই ক্ষেপনাস্ত্রের গতিশীলতা অত্যন্ত বেশী। ইরানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী মোস্তফা মোঃ নাজ্জার এ প্রসঙ্গে বলেছেন, " ২৬ মিটার দৈর্ঘের আগের ক্ষেপনাস্ত্রগুলোর প্রায় ২৩ মিটারের মধ্যেই থাকতো জ্বালানী। সিজ্জিল-টু'র রয়েছে নতুন নেভিগেশন সিস্টেম এবং এর রয়েছে সেন্সর করার অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও নিখুঁত ব্যবস্থা, ফলে অতীতের ক্ষেপনাস্ত্রগুলোর চেয়ে এই ক্ষেপনাস্ত্র অনেক বেশী কার্যকরী।" বর্তমানে ইরানে ব্যাপক পরিমাণে এই ক্ষেপনাস্ত্রের উৎপাদন শুরু হয়েছে বলে তিনি জানান।

সিজ্জিল-টু ক্ষেপনাস্ত্রকে বিজ্ঞান, সামরিক-প্রযুক্তি ও ক্ষেপনাস্ত্র শিল্পে ইরানের অসাধারণ অগ্রগতির স্বাক্ষর বলে মনে করছেন বিশ্বের সামরিক বিশেষজ্ঞরা। লম্বায় সম্ভব নয়। এমনকি ইহুদিবাদী ইসরাইলের সেনা-কর্মকর্তারাও সিজ্জিল-টু ক্ষেপনাস্ত্রে শক্ত জ্বালানী ব্যবহারের ঘটনাকে ইরানের ক্ষেপনাস্ত্র শিল্পের নজিরবিহীন অগ্রগতি বলে অভিহিত করেছেন।
ইরানের প্রেসিডেন্ট ডক্টর মাহমুদ আহমাদিনেজাদ সিজ্জিল-টু ক্ষেপনাস্ত্রকে প্রতিরক্ষা ও শান্তির জন্য নিবেদিত বলে অভিহিত করেছেন। #
২৪ তম পর্ব

ইরান সৃজনশীলতার নব-দিগন্তে শীর্ষক ধারাবাহিক আলোচনার এ সপ্তার আসর থেকে আপনাদের জানাচ্ছি সালাম এবং একরাশ প্রীতি ও শুভেচ্ছা। গেলো সপ্তার আলোচনায় আমরা সামরিক শিল্পে ইরানের অগ্রগতির কিছু দিক তুলে ধরেছি এবং বিশেষ করে ক্ষেপনাস্ত্র ব্যবস্থায় ইরানের অসাধারণ সাফল্যের কিছু দৃষ্টান্ত তুলে ধরেছিলাম। আজকের আসরে আমরা নৌ, স্থল ও ইলেকট্রনিক ক্ষেত্রে ইরানের প্রতিরক্ষা শিল্পের অগ্রগতির কিছু চিত্র তুলে ধরবো।

যে কোনো দেশের প্রতিরক্ষা শক্তির অন্যতম স্তম্ভ হলো স্থলক্ষেত্রের প্রতিরক্ষা শক্তি। ইরান বর্তমানে এ ক্ষেত্রে এক অসাধারণ উন্নত অবস্থায় রয়েছে। এ প্রসঙ্গে ইরানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী জনাব মোস্তফা মোঃ নজ্জার বলেছেন, "ইরান তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন দিক থেকে হুমকির আলোকে সামরিক কৌশল প্রনয়ন করছে এবং অস্ত্র উৎপাদন করছে। ইরানের প্রতিরক্ষা সামগ্রীর শতকরা ৯৫ ভাগ ইরানেই উৎপাদন করা হচ্ছে এবং ইরানী বিশেষজ্ঞরা নিজস্ব প্রযুক্তি ব্যবহার করেই এসব প্রতিরক্ষা সামগ্রী উৎপাদন করছেন। "

ইরানের নতুন প্রজন্মের বিজ্ঞানীরা স্থল বাহিনীর জন্য বিভিন্ন ধরনের হাল্কা ও ভারী প্রতিরক্ষা সামগ্রী নির্মাণ করছে। বিভিন্ন ধরনের ট্যাংক ও সাঁজোয়া যান এসবের মধ্যে অন্যতম। উদাহরণ হিসেবে জুলফিক্বার-ওয়ান, জুলফিক্বার-টু ও জুলফিক্বার-থ্রি ট্যাংকের নাম উল্লেখ করা যায়। ইরানের নির্মিত "বুরাক্ব" নামের সাঁজোয়া যানটি জলে ও ডাঙ্গায় চলতে সক্ষম। এই "বুরাক্ব" ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপনাস্ত্র নিক্ষেপ ব্যবস্থা বা এস এ ম-ফাইভ বিমান বিধ্বংসী ক্ষেপনাস্ত্র-ব্যবস্থা সজ্জিত। ইরান স্বয়ংক্রিয় ও আধা-স্বয়ংক্রিয় কামানও তৈরি করছে। ইরান তাফতান নামের একটি মাইন ডিকেক্টর নির্মাণ করছে। এই যন্ত্র মাটির নীচে ৫ মিটারেরও বেশী গভীরে প্রোথিত মাইন সনাক্ত করতে পারে এবং বিভিন্ন ধরনের মাইন নিস্ক্রিয় করতে সক্ষম। এই যন্ত্র দূর-নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থার মাধ্যমে ব্যবহার করা যায়।

ইরানের স্থল বাহিনী বিভিন্ন ধরনের কৌশলগত সাঁজোয়া যান নির্মাণ করছে। এসব যান সামরিক কাজেও ব্যবহার করা যায়, আবার প্রয়োজনে বেসামরিক কাজেও ব্যবহার করা যায়। এই বাহিনী বিশেষ ধরনের উন্নত বা অত্যাধুনিক বন্দুক নির্মাণ করছে। এসব বন্দুকের গুলির আধার বা ম্যাগাজিন ট্রিগারের সামনের পরিবর্তে পেছনে থাকে। ফলে এ ধরনের বন্দুক প্রচলিত বন্দুকের চেয়ে অনেক হাল্কা এবং এর ব্যবহার অপেক্ষাকৃত সহজ।

ইরান ইলেকট্রনিক প্রতিরক্ষা শিল্পেও ব্যাপক অগ্রগতি অর্জন করেছে। তাই ইরানের অধিকাংশ অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম অত্যাধুনিক ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতিতে সজ্জিত। এইসব ইলেকট্রনিক ব্যবস্থার কারণে ইরানের প্রতিরক্ষা সামগ্রীর কার্যকারীতা বৃদ্ধি পেয়েছে। ইরান এখন বিভিন্ন ধরনের তারবিহীন যোগাযোগ-সামগ্রী বা ওয়ার‌ল্যাস ও অপটিকেল সামগ্রী নির্মাণ করছে এবং এক্ষেত্রে স্বনির্ভরতা অর্জন করেছে। পানির নীচের টেলিফোন ও পানির নীচের শব্দ শোনার যন্ত্রপাতি বা sonar equiepmentsও নির্মাণ করছেন ইরানের বিশেষজ্ঞরা। এসব যন্ত্রের মাধ্যমে পানির নীচে থাকা শত্রুর অস্ত্র চিহ্নিত করা যায়।
বর্তমানে ইরানী বিশেষজ্ঞরা প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রের বিভিন্ন ধরনের মাইক্রোইলেকট্রনিক ও অপটোইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতি নির্মাণ করছেন। এসব যন্ত্রপাতি বিমান শিল্পে ব্যবহৃত হয়। ইরান বিভিন্ন ধরনের রাডার ও বি এম ডি -থ্রি নির্মাণ করছে যেগুলো শত্রুর ক্ষেপনাস্ত্রগুলোকে সনাক্ত করতে সক্ষম।

নৌ-প্রতিরক্ষায়ও ইরান অসাধারণ অগ্রগতি অর্জন করেছে। বিভিন্ন ধরনের স্পীডবোট, ক্ষেপাস্ত্রবাহী রণতরী, রসদবাহী রণতরী ও সাবমেরিন নির্মিত হচ্ছে ইরানে। ইরান নৌ যুদ্ধে ব্যবহারের উপযোগী বিভিন্ন ধরনের ক্ষেপনাস্ত্র ও ইলেকট্রনিক সামগ্রী নির্মাণ করছে। ইরানের নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি একটি বিশেষ সাবমেরিনের নাম আসসাবাহাত। ইরানের নৌবাহিনীর প্রধান জনাব হাবিবুল্লাহ সাইয়ারী জানিয়েছেন, ইরানের নৌ-প্রতিরক্ষা সংস্থা গ্বাদির নামের বিশেষ ধরনের সাবমেরিন বা ডুবোজাহাজ নির্মাণ করেছে। এই ডুবোজাহাজের মডেলও ইরানের নিজস্ব। এ ছাড়াও ইরান বিভিন্ন ধরনের হাল্কা ডুবোজাহাজ নির্মাণের মাধ্যমে পানির নীচে ও গভীর সমুদ্রে ইরানের নৌবাহিনীর প্রতিরক্ষা ক্ষমতা ব্যাপক মাত্রায় বৃদ্ধি করেছে। ইরান ক্ষেপনাস্ত্রবাহী ছোট ছোট যুদ্ধ জাহাজ নির্মাণ করছে বলেও ইরানের নৌবাহিনীর প্রধান জানিয়েছেন। তিনি আরো জানান, ইরান বিভিন্ন ধরনের ৬০ টিরও বেশী যুদ্ধজাহাজ নির্মাণ করছে। এসবের মধ্যে রয়েছে ডেস্ট্রয়ার, ক্ষেপনাস্ত্রবাহী ছোট ছোট যুদ্ধ জাহাজ এবং পানির উপরে ও পানির গভীরে থাকা লক্ষ্যবস্তু ধ্বংস করতে সক্ষম হেলিকপ্টার।

সম্প্রতি ইরানী বিশেষজ্ঞরা রাডারকে এড়িয়ে যেতে বা ফাঁকি দিতে সক্ষম স্মার্ট সাবমেরিন নির্মাণ করেছেন। আরোহীবিহীন ও ছোট আকারের এই সাবমেরিন রোবটের মত কাজ করে এবং এটি পানির ওপরে ভাসমান ও নীচে থাকা বিভিন্ন ধরনের জাহাজের ভিডিও-চিত্র ও স্থিরচিত্র তুলে তা অন-লাইন সার্ভিসের মত কমান্ড কেন্দ্রে পাঠাতে পারে। এই সাবমেরিনের কাছে কোনো ডুবুরি চলে আসলে সে তা বুঝতে পারে এবং তখন এটি পানিতে বায়েক্যামিকেল দ্রব্য ছাড়তে থাকে। আর এইসব বায়েক্যামিকেল দ্রব্য খেতে মাছের সমারোহ ঘটলে শত্রুপক্ষ আর এই সাবমেরিনকে চিনতে সক্ষম হবে না।

ইরানের কয়েকজন তরুণ বিজ্ঞানী যুদ্ধ করতে সক্ষম এমন কয়েকটি রোবেট তৈরি করেছেন। রোবাটিক বাহু, অগ্নিনির্বাপক রোবট, রোবট-সেনা, গাড়ী-চালক রোবট তৈরি করে এই ৫ ইরানী তরুণ সবাইকে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন। অগ্নিনির্বাপক রোবট জঙ্গলে বা বনে ও নদীতে যেতে এবং দূর্গম পথ পাড়ি দিতে সক্ষম। রোবাটিক বাহু নতুন সিস্টেমে কম খরচে তৈরি করা হলেও এর রয়েছে অনেক কার্যকারীতা। রোবট-সেনা যুদ্ধ ও সংঘাতে অংশ নিতে সক্ষম। এ ছাড়াও ত্রাণ-সহায়ক রোবট ভূমিকম্প বা ঘর-বাড়ী বিধ্বস্ত হবার মত ঘটনায় পেশাদার ত্রাণকর্মীর মত বিভিন্ন বাধা বা দূর্গম পথ অতিক্রম করে আহতদের সহায়তা করতে সক্ষম। #
২৫ তম পর্ব

ইরান, সৃজনশীলতার নব-দিগন্তে শীর্ষক ধারাবাহিক আলোচনার এ সপ্তার আসর থেকে আপনাদের জানাচ্ছি সালাম এবং একরাশ প্রীতি ও শুভেচ্ছা। গেলো সপ্তার আলোচনায় আমরা সামরিক শিল্পে ইরানের অগ্রগতির চিত্র তুলে ধরতে গিয়ে নৌ, স্থল ও ইলেকট্রনিক ক্ষেত্রে দেশটির প্রতিরক্ষা শিল্পের অগ্রগতির কিছু দিক তুলে ধরেছি। আজকের আসরে আমরা নৌ-প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে ইরানের অগ্রগতির আরো কিছু চিত্র তুলে ধরবো।

ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় এলাকায় রয়েছে পারস্য উপসাগর ও ওমান সাগর। তাই ইরানের জন্য নৌ-প্রতিরক্ষা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। উপকূলীয় এই অঞ্চলে ইরানের নৌ-সেনারা অত্যন্ত শক্তিশালী অবস্থান গড়ে তুলেছে। ইরানের বীর সেনাদের এই শক্তিশালী অবস্থান গড়ে তোলার পেছনে রয়েছে ইরানী প্রকৌশলী ও বিশেষজ্ঞদের বিভিন্ন আবিস্কার বা উদ্ভাবন। যুগের চাহিদা অনুযায়ী ইরানের নৌবাহিনীকে বিভিন্ন নতুন বা অত্যাধুনিক অস্ত্র ও সাজ-সরঞ্জামে সজ্জিত করা হয়েছে। ইরানের নির্মিত বিভিন্ন ধরনের রণতরী এইসব প্রতিরক্ষা সামগ্রীর মধ্যে উল্লেখযোগ্য।

ইসলামী ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হযরত আয়াতুল্লাহিল উজমা খামেনেয়ী ইরানের নৌবাহিনীর আধ্যাত্মিক ও মানবীয় গুণাবলীর প্রশংসার পাশাপাশি তাদের কৌশলগত দক্ষতা, অস্ত্র-শক্তি এবং যুদ্ধ-ক্ষমতারও প্রশংসা করেছেন। তিনি এ প্রসঙ্গে বলেছেন, বর্তমানে আমাদের শক্তিশালী সেনারা ও যুবকরা পাশ্চাত্যের নানা অবরোধ সত্ত্বেও নৌবাহিনীর অত্যাধুনিক সাজ-সরঞ্জাম বা প্রতিরক্ষা সামগ্রী নির্মাণ করছে এবং প্রয়োজনে সেগুলো মেরামতও করছে।

ইরানের নৌবাহিনীর নিজস্ব কারখানায় তৈরি হচ্ছে অত্যাধুনিক নৌ-সামগ্রী। মাত্র এক বছরের মধ্যে গ্বাদির নামের দুটি সাবমেরিনও এই কারখানাতেই নির্মাণ করা হয়েছে। ইরানের নৌবাহিনীর নিজস্ব কারখানায় তৈরি হচ্ছে হ্যাঙ্গার, যন্ত্রপাতি সংযোজনকারী যন্ত্র প্রভৃতি। এ কারখানার চমক লাগানো আরেকটি প্রতিরক্ষা-সরঞ্জাম হ'ল, অত্যন্ত দ্রুত গতি-সম্পন্ন রণতরী। "ববার" বা "বিশ্বাস" নামের রণতরী প্রতি ঘন্টায় ১৪০ কিলোমিটার বেগে চলতে সক্ষম। এটি হাল্কা অথচ শক্ত পাতের তৈরি হওয়ায় অগভীর পানিতেও তার দ্রুত গতি অব্যাহত রাখতে সক্ষম। "বিশ্বাস" নামের ছোট যুদ্ধ-জাহাজ বিভিন্ন ধরনের শক্তিশালী ক্ষেপনাস্ত্রে সজ্জিত। এইসব ক্ষেপনাস্ত্র আকাশের এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতায় থাকা লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে পারে। অত্যন্ত দ্রুত গতি-সম্পন্ন এই রণতরী চলন্ত অবস্থাতেও শত্রুর লক্ষ্যবস্তু সনাক্ত করে সেখানে ক্ষেপনাস্ত্র নিক্ষেপ করতে সক্ষম। রাডার-সজ্জিত এই জাহাজ মাইন-অপসারক এবং আবহাওয়ার অবস্থা বুঝতে সক্ষম যন্ত্রপাতিতেও সজ্জিত।

ইরানের নৌবাহিনীর যুদ্ধ-জাহাজগুলো অত্যন্ত উন্নত প্রযুক্তি-সমৃদ্ধ। যেমন, পেইকান নামের জাহাজটি ইরানী বিশেষজ্ঞদের ১৮ মাসের পরিশ্রমের ফসল। এটিসহ ইরানী বিশেষজ্ঞদের নির্মিত জুশান নামের অন্য একটি জাহাজ নির্মাণে ১৫ টি বিভিন্ন বিভাগের প্রকৌশলীরা অংশ নিয়েছেন এবং ২০ টিরও বেশী প্রাইভেট কোম্পানী এসব জাহাজ নির্মাণে সহযোগিতা করেছে। এই যুদ্ধ জাহাজগুলো প্রতিরক্ষার কাজ ছাড়াও কর্মসংস্থানের মত বেসামরিক কাজেও ব্যবহৃত হয়। ফরাসী যুদ্ধ জাহাজের যে মডেলের ভিত্তিতে জুশান নামের জাহাজটি নির্মাণ করা হয়েছে, তার কার্যকারীতা ঐ ফরাসী জাহাজের চেয়ে অনেক বেশী। এই যুদ্ধ জাহাজে ১০০ কিলোমিটারের চেয়েও বেশী পাল্লার ক্ষেপনাস্ত্র মোতায়েন রয়েছে। এ ছাড়াও জুশান নামের এই যুদ্ধ জাহাজে রয়েছে নৌবাহিনীতে ব্যবহৃত বিশ্বের সর্বাধুনিক কামান। ইরানী বিশেষজ্ঞরা কয়েক বছরের প্রচেষ্টার পর এখন ব্যাপক পরিমাণে এই কামান নির্মাণ করছেন। ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান জনাব সালেহী জানিয়েছেন, ইরান নিকট ভবিষ্যতে এ অঞ্চলের সর্ববৃহৎ ও আধুনিকতম ডেস্ট্রয়ার এবং সাবমেরিন নির্মাণ করবে বলে তিনি জানিয়েছেন।

ফজর-২৭ নামের ইরানী নৌবাহিনীর কামান সমুদ্র-পৃষ্ঠের সমান উচ্চতায় ও আকাশের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম। ইরানের বিশেষজ্ঞরা ৬ বছর ধরে গবেষণা চালানোর পর এই কামান তৈরি করতে সক্ষম হন। এই কামান সমুদ্র-পৃষ্ঠের সমান উচ্চতা ও আকাশের দিক থেকে আসা শত্রুপক্ষের যে কোনো লক্ষ্যবস্তুর মোকাবেলা করতে সক্ষম। স্বয়ংক্রিয় এই কামানের গোলা নিক্ষেপের ক্ষমতা অত্যন্ত ব্যাপক এবং এটি ছোটখাট জাহাজেও স্থাপন করা সম্ভব। এর আগে শুধু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইতালী এ ধরনের অত্যাধুনিক কামানের প্রযুক্তির অধিকারী ছিল। ইরান এক্ষেত্রে পশ্চিমা দেশগুলোর একচেটিয়া কর্তৃত্ব ভেঙ্গে দিয়েছে। ইরানে এই কামান উৎপাদনের খরচ কম হওয়ায় ভবিষ্যতে তেহরান এ ধরনের কামান বিদেশেও রপ্তানীর উদ্যোগ নিবে।

ফজর-২৭ নামের ইরানী নৌবাহিনীর কামানের গোলা দুই ধরনের উদ্দেশ্যে ব্যবহারের উপযোগী। এটাই বিশ্বের একমাত্র কামানের গোলা যা দুই ধরনের কাজে ব্যবহার করা যায়। প্রথমতঃ এই গোলা শত্রুর যুদ্ধ-জাহাজে আঘাত হানে। দ্বিতীয়তঃ সমুদ্র-পৃষ্ঠের সমান উচ্চতা থেকে আসা ক্ষেপনাস্ত্রসহ জাহাজ-বিধ্বংসী ক্ষেপনাস্ত্র ও হেলিকপ্টারকেও ঘায়েল করতে সক্ষম এই কামানের গোলা। এই গোলা ২৩ হাজার ফুট পর্যন্ত উচ্চতায় থাকা লক্ষ্য বস্তুতে আঘাত হানতে পারে। দূর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায়ও স্বয়ংক্রিয় এই কামান কার্যক্ষম এবং এই অস্ত্রকে ব্যবহার উপযোগী করার জন্য মাত্র ৪ সেকেন্ড সময় লাগে।

এবারে ইরানের একটি সাবমেরিন বা ডুবো জাহাজ সম্পর্কে কিছু তথ্য তুলে ধরছি। নাহাঙ্গ বা তিমি নামের এই সাবমেরিন ইরানের নির্মিত প্রথম সাবমেরিন। ইরানের উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চলের পানির পরিবেশের উপযোগি করে এই সাবমেরিন নির্মাণ করা হয়েছে। এতে রয়েছে শব্দ ধারণ করার যন্ত্র বা সোনার সিস্টেম। এ সিস্টেমের মাধ্যমে শত্রু-পক্ষের সাবমেরিন, জাহাজ, নৌকা ও অনান্য অস্ত্র সনাক্ত করা যায়। এ ছাড়াও পানিতে ভাসমান জাহাজ ও অন্যান্য লক্ষ্যগুলোকে মোকাবেলা করে এই সাবমেরিন। খুব দ্রুত অভিযান চালাতে সক্ষম তিমি নামের এই ইরানী সাবমেরিন পানির ভেতরে শত্রুর লক্ষ্যবস্তুতে গোলা বা টর্পেডো নিক্ষেপ করতে পারে। এতে টর্পেডো নিক্ষেপকারী ৪ টি ইউনিট রয়েছে। এ ছাড়াও এ ডুবোজাহাজ প্রয়োজনে ক্ষেপনাস্ত্র নিক্ষেপ করতে ও মাইন বসাতে সক্ষম। ইরানের এই সাবমেরিন বা ডুবোজাহাজ রাডারকে ফাঁকি দিতে পারে। নৌ-প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে ইরান যে কতটা অগ্রগতি অর্জন করেছে এই অত্যাধুনিক ডুবোজাহাজ তারই অন্যতম দৃষ্টান্ত।

২৬তম পর্ব

ইরান, সৃজনশীলতার নব-দিগন্তে শীর্ষক ধারাবাহিক আলোচনার এ সপ্তার আসর থেকে আপনাদের জানাচ্ছি সালাম এবং একরাশ প্রীতি ও শুভেচ্ছা। গত আসরে আমরা নৌ-প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে ইরানের অগ্রগতির কিছু দিক তুলে ধরেছি। আজকের আসরে আমরা বিমান প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে ইরানের অগ্রগতি সম্পর্কে আলোচনা করবো।

প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে ইরানের অগ্রগতি সম্পর্কে দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রী মোস্তফা মোহাম্মাদ নাজ্জারের একটি বক্তব্য উদ্ধৃত করে শুরু করছি আজকের মূল আলোচনা। তিনি বলেছেন, " ইসলামী বিপ্লবের তিন দশক পর প্রতিরক্ষা শিল্পের সব ক্ষেত্রে ইরান এখন অত্যন্ত ভালো ও বিকাশমান পর্যায়ে রয়েছে। ইরান এখন প্রতিরক্ষা সামগ্রীর ক্ষেত্রে স্বনির্ভর।"
ইসলামী বিপ্লবের পরে বিমান প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রেও ইরানের অগ্রগতি অবিশ্বাস্য বা অসাধারণ পর্যায়ে উন্নীত হয়েছে এবং দিনকে দিন এক্ষেত্রে এগিয়ে চলছে ঝড়ের গতিতে। এ বিষয়টি যে বাস্তব তা বিমান প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রের কোনো কোনো পশ্চিমা বিশেষজ্ঞও স্বীকার করেছেন। যেমন, এ প্রসঙ্গে অস্ট্রিয়ার খ্যাতনামা বিশেষজ্ঞ টম কুপার বলেছেন, পশ্চিমা সামরিক বিশেষজ্ঞরা ইরানের বিমান বাহিনীর ক্ষমতা সম্পর্কে যতটা ধারণা করেন, বাস্তবে ইরানের বিমান বাহিনী তার চেয়েও অনেক বেশী শক্তিশালী। পাশ্চাত্যের অধিকাংশ বিশেষজ্ঞ ইরানের প্রতিরক্ষা ক্ষমতা সম্পর্কে গবেষণা করছেন ২০ বছর আগের তথ্যের ভিত্তিতে। তাই এ সম্পর্কে তাদের মতামতগুলো অলীক ও অবাস্তব। কিন্তু বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। এটা অবশ্যই স্বীকার করতে হবে যে, ইরানের বিমান বাহিনীর সদস্যরা অনেক উঁচু মানের দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার অধিকারী।

ইরানের বিমান বাহিনী এখন অত্যাধুনিক জঙ্গী বিমান , বিমান বিধ্বংসী ব্যবস্থা, টার্গেট বা লক্ষ্য খুঁজে নিতে সক্ষম ক্ষেপনাস্ত্র, বিভিন্ন ধরনের হেলিকপ্টার এবং বিভিন্ন ধরনের গাইডেড বোমাসহ অন্য অনেক সামরিক সাজ-সরঞ্জাম নির্মাণ করছে। ইরানের বিমান বাহিনীর প্রধান জনাব আহমদ মিকানী ইরানে স্টিলথ, মিরাজ ও অ্যাওয়াক্সসহ বিভিন্ন ধরনের অত্যাধুনিক জঙ্গী বিমান থাকার কথা উল্লেখ করে বলেছেন, ইসলামী বিপ্লবের সুবাদে ইরানের বিমান বাহিনী খুব সাধারণ একটি সেনা ইউনিট থেকে একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ বা স্বনির্ভর বাহিনীতে পরিণত হয়েছে। এই বাহিনী তার চাহিদাগুলোর পূরণের জন্য এখন আর বিদেশ-নির্ভর নয়। ইরানের বিমান বাহিনী এখন বিভিন্ন ধরনের ক্ষেপনাস্ত্র নির্মাণ করছে এবং দিনকে দিন এসব ক্ষেপনাস্ত্রের মান উন্নততর করছে। ইরানের বিশেষজ্ঞরা নির্মাণ করছেন এক হাজার কিলোমিটার পাল্লার রাডার । এ ছাড়াও ইরানের বিমান বাহিনী এখন সিগন্যাল-ডাটা সংগ্রহের যন্ত্র, দূরপাল্লার ক্ষেপনাস্ত্র ও গাইডেড ক্ষেপনাস্ত্রও তৈরি করছে।

বর্তমানে ইরানে বিভিন্ন ধরনের জঙ্গী ও বোমারু বিমান নির্মিত হচ্ছে। শাফাক্ব বা সন্ধ্যার লালিমা নামের জঙ্গী বিমান সামরিক বিমান নির্মাণ শিল্পে ইরানের অগ্রগতির এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। বিশ্বের খ্যাতনামা বিমান-বিশেষজ্ঞ এবং বিমান সংক্রান্ত ওয়েবসাইট ও ম্যাগাজিন এই জঙ্গী বিমানের ভূয়সী প্রশংসা করেছে।

রুইন ডিফেন্স নামের ওয়েব সাইট জানিয়েছে, ইরানের শাফাক্ব বা সন্ধ্যার লালিমা নামের জঙ্গী বিমানের মহড়া সবাইকে বিস্মিত করেছে। এই সামরিক বিমানে রয়েছে আর. ডি-৩৩ সিস্টেম। এর বডি এবং মটরে বাতাস প্রবেশের স্থানগুলো এমনভাবে নির্মাণ করা হয়েছে যে রাডার বা অন্য কোনো যন্ত্র দিয়ে এটিকে সনাক্ত করা সম্ভব হয় না। শাফাক্ব নামের এই জঙ্গী বিমান গাইডেড লেসার বোমাসহ নানা ধরনের বোমা এবং আকাশ থেকে আকাশে ও আকাশ থেকে ভূমিতে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপনাস্ত্র বহন করতে সক্ষম।

সয়েক্বে বা বজ্র নামের জঙ্গী বিমান নির্মাণ ইরানের বিমান বাহিনীর অগ্রগতির আরো এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। ইরান গত বছর এই অত্যাধুনিক জঙ্গী বিমানটির নির্মাণ শুরু করে। চলতি বছরেও ইরান এই বিমানটির নতুন প্রজন্ম বা আধুনিকতর সংস্করণ নির্মাণ করেছে। এতে রয়েছে আরো বেশী ক্ষমতা ও বিভিন্ন নতুন সিস্টেম। ইরান শিগগিরই ব্যাপক মাত্রায় সয়েক্বে বা বজ্র নামের এই জঙ্গী বিমানের নতুন প্রজন্মের উৎপাদন শুরু করবে।


ইরানী বিশেষজ্ঞরা ৩৫ মিলিমিটারের কামান, রাডার-সিস্টেম, চাপ দেয়া ছাড়াই আগুন নিয়ন্ত্রণে আনার সিস্টেম এবং বিমান, স্থল ও জলপথে ব্যবহার-উপযোগী ইলেকট্রনিক রাডার-সজ্জিত কামান নির্মাণ করছেন। কম উচ্চতায় ব্যবহারের উপযোগী বিমান-বিধ্বংসী কামান নির্মাণও ইরানের বিমান সেনাদের অব্যাহত অগ্রযাত্রার অন্যতম দৃষ্টান্ত। গত (২০০৯) ফেব্রুয়ারী মাসে ইরান ১০০ মিলিমিটারের বিমান-বিধ্বংসী স্মার্ট বা চৌকস কামান উৎপাদনের কাজ শুরু করে। এই কামানের সাথে রয়েছে অত্যন্ত উন্নত মানের রাডার। এই কামান স্বয়ংক্রিয়ভাবে শত্রুর লক্ষ্যবস্তুতের আঘাত হানতে সক্ষম। এই কামানের মধ্যে এমন ব্যবস্থা রয়েছে যে এর গোলাগুলো সরাসরি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে না পারলেও লক্ষ্যবস্তুর আশ-পাশে বোমার বিভিন্ন অংশ স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিস্ফোরিত হয় বলে লক্ষ্যবস্তু ধ্বংস হয়ে যায়। ইরানের ১০০ মিলিমিটারের বিমান-বিধ্বংসী চৌকস কামান ক্রুজ ক্ষেপনাস্ত্রও ধ্বংস করতে সক্ষম।

এবারে আমরা স্মরণ করবো ইরানের একজন খ্যাতনামা পাইলটকে। ইরানের এই বিশিষ্ট পাইলট হলেন শহীদ সাত্তারী। তিনি নির্মাণ করেছিলেন পারাস্তু নামের প্রশিক্ষণ বিমান। অযারখেশ নামের জঙ্গী বিমান নির্মাণও ছিল তার অন্যতম অবদান। শহীদ সাত্তারী প্রতিষ্ঠা করেছিলেন পাইলট প্রশিক্ষণ কেন্দ্র এবং মহাকাশ গবেষণা সংক্রান্ত বিশ্ববিদ্যালয়। কিন্তু এই বিশিষ্ট পাইলট ১৯৯৪ সালে এক বিমান দূর্ঘটনায় শাহাদত বরণ করেন। শহীদ হলেও তার স্মৃতি এখনও অম্লান এবং তার নাম চিরকাল বেঁচে থাকবে অনেক অমর অবদান ও কীর্তির মাঝে ।

২৭ তম পর্ব

ইরান, সৃজনশীলতার নব-দিগন্তে শীর্ষক ধারাবাহিক আলোচনার এ সপ্তার আসর থেকে আপনাদের জানাচ্ছি সালাম এবং একরাশ প্রীতি ও শুভেচ্ছা। গত আসরে আমরা বিমান প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে ইরানের অগ্রগতির অগ্রগতির কিছু দিক তুলে ধরেছি। আজকের আসরে আমরা এ ক্ষেত্রে ইরানের অগ্রগতির আরো কিছু দিক তুলে ধরবো।

বিশ্বের অনেকেই হয়তো জানে না যে, ইসলামী ইরান বিপুল মাত্রায় জঙ্গী বিমান ও হেলিকপ্টারসহ অত্যাধুনিক বিভিন্ন সমরাস্ত্র উৎপাদন করছে এবং এসব অস্ত্র উৎপাদনের দিক থেকে ইরান এ অঞ্চলে সবার শীর্ষে রয়েছে। সামরিক বিশেষজ্ঞদের মতে, অত্যাধুনিক অস্ত্র নির্মাণে ইরানের অগ্রগতির কারণে দেশটি এখন বিশ্বের ৫০ টি দেশে অস্ত্র রপ্তানী করছে।

ইরানের বিমান শিল্পের বিশেষজ্ঞরা বিভিন্ন ধরনের বাণিজ্যিক ও সামরিক বিমানের মডেল ও পরিকল্পনার বিষয়ে গবেষণা করছেন। এই বিশেষজ্ঞরা ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর বিমান ও হেলিকপ্টাগুলো মেরামতও করছেন। ইরানের ফাজর নামের হ্যাঙ্গার মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে বড় হ্যাঙ্গারে যেখানে ধাতব যন্ত্রপাতি সংযোজন ও মেরামত করা যায়। এই হ্যাঙ্গারে একই সময়ে বিশাল আকৃতির ৮ থেকে ১২ টি বিমানের স্থান সংকুলান করা সম্ভব।

ইরান পাইলটবিহীন বিভিন্ন ধরনের বিমান নির্মাণ করছে। এ ধরনের কয়েকটি বিমানের নাম হল আবাবিল, মোহাজের এক, মোহাজের-দুই, মোহাজের-তিন ও চার এবং হুদহুদ। এ বিমানগুলো অত্যাধুনিক প্রযুক্তি-সমৃদ্ধ। মোহাজের এক, দুই, তিন ও চার নামের বিমানগুলো প্রহরা, চিহ্নিতকরণ, লক্ষ্য নির্ধারণ, মাদক চোরাকারবার দমনের জন্য সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ, শহরের ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ এবং ভৌগলিক ম্যাপ তৈরির জন্য ছবি তোলার মত বিচিত্রময় কাজে ব্যবহার করা হয়। পাইলটবিহীন এই বিমানগুলো ছোট-খাট অস্ত্র বহন ও নিক্ষেপ করতেও সক্ষম। আবাবিল নামের ইরানের পাইলটবিহীন এই বিমান কোনো নির্দিষ্ট কেন্দ্র থেকে চারদিকে ৭০০ কিলোমিটার পর্যন্ত এলাকায় অভিযান চালাতে সক্ষম। এ ধরনের বিমান হাল্কা হওয়ায় যেসব স্থানে কোনো বাধা নেই সেসব স্থানে গতিবেগ অপরিবর্তিত রেখেই উপরের দিকে উঠতে সক্ষম। এমনকি এর মটর বন্ধ থাকলেও তা এক স্থান থেকে অন্য স্থানে উড়ে যেতে পারে এবং ঐ অবস্থায় ওপর ও নীচের দিকে যেতে পারে বা উঠ-নামা করতে পারে।

ইরান বিভিন্ন ধরনের হেলিকপ্টার নির্মাণেও ব্যাপক অগ্রগতি অর্জন করেছে। হেলিকপ্টার নির্মাণের ক্ষেত্রে যন্ত্রাংশ নির্মাণ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ইরানে ইসলামী বিপ্লবের আগে এ ব্যাপারে কোনো পদক্ষেপ নেয়া হয় নি। ইরানের পাহনা নামের একটি প্রকৌশল কোম্পানী বিভিন্ন ধরনের হেলিকপ্টারের যন্ত্রাংশ নির্মাণ করছে এবং শাবাভিজ বা বাদুড় নামের হেলিকপ্টার, টু-জিরো-নাইন-ওয়ান ও শাহেদ নামের হেলিকপ্টার নির্মাণ করছে।

ইরান শাহেদ নামের হেলিকপ্টার নির্মাণ করছে দশ বছর ধরে। টু- সেভেন-এইট মডেলের শাহেদ নামের হেলিকপ্টার কয়েক ধরনের উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা যায়। শাহেদ টু এইট ফাইভ নামের হেলিকপ্টার পানিতে ও আকাশে ব্যবহার উপযোগী। পুরোপুরি এয়ারোডাইনামিক এই হেলিকপ্টার অসাধারণ ক্ষমতা-সম্পন্ন। এটি সাঁজোয়া যান ও যুদ্ধ-জাহাজ বিধ্বংসী রকেটসহ বিভিন্ন ধরনের কামান বা ক্ষেপনাস্ত্র বহন করতে পারে।

ইরানের বিজ্ঞানীরা ২০৬ নামের একটি কৃত্রিম হেলিকপ্টার নির্মাণ করছেন যা দিয়ে হেলিকপ্টারের সমস্ত কাজ করা ও প্রশিক্ষণ নেয়া সম্ভব। আগামী কয়েক মাসের মধ্যেই এই কৃত্রিম হেলিকপ্টার বাজারে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।
ইরানের বিজ্ঞানীরা পাইলটবিহীন হেলিকপ্টার ও ছোট ছোট কৃত্রিম বার্ডও নির্মাণ করছেন। শাহীন নামের পাইলটবিহীন হেলিকপ্টার ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ, পরিবেশ সংরক্ষণ ও দূর্গম এলাকায় সাজ-সরঞ্জাম বা মালামাল পৌঁছানোর মত কাজ করে। ইরানে নির্মিত এ ধরনের পাইলটবিহীন হেলিকপ্টারের মধ্যে শাহীন নামের পাইলটবিহীন হেলিকপ্টার অত্যন্ত ছোট আকৃতির এবং এর গতি ঘন্টায় প্রায় ১১০ কিলোমিটার। এই হেলিকপ্টার পাইলটদের প্রশিক্ষণ দেয়ার কাজেও ব্যবহার করার জন্য খুব উপযোগী।

ইরানের বিজ্ঞানীরা পলিমার জাতীয় পদার্থ ব্যবহার করে হেলিকপ্টারের জানালার কাঁচ নির্মাণ করতে সক্ষম হয়েছেন। ইস্ফাহানের বিমান শিল্প-স্থাপনায় শিনুক টু জিরো সিক্স, জেট রেঞ্জার ২১৪, ইস্ফাহান হেলিকপ্টার এবং ২০৫ মডেলের হেলিকপ্টারের জানালার কাঁচ নির্মাণ করা হচ্ছে। তাই এক্ষেত্রে ইরান এখন স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছে এবং ইরান এখন অভ্যন্তরীণ চাহিদা মিটিয়ে বিদেশেও এসব কাঁচ রপ্তানী করতে সক্ষম। এসব কাঁচ সর্বসাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক স্ট্যান্ডার্ড অনুযায়ী তৈরি করা হচ্ছে। ইস্ফাহানের বিমান শিল্প-স্থাপনায় এ পর্যন্ত বিভিন্ন হেলিকপ্টারের জানালার ১২০০ পিস কাঁচ নির্মাণ করা হয়েছে। এ ছাড়াও এখানে বিভিন্ন হেলিকপ্টারের চাকার শত শত যন্ত্রাংশ এবং হেলিকপ্টার মেরামতের জন্য জরুরী হাজার হাজার ধাতব যন্ত্রাংশ উৎপাদিত হচ্ছে।

ইরানের বিজ্ঞানীরা এখন ইস্ফাহানের বিমান শিল্প-স্থাপনায় হেলিকপ্টারের টেস্টারও নির্মাণ করছেন। এই টেস্টার বা সতর্ককারী যন্ত্র হেলিকপ্টারের প্রপেলার ও মটরের অবস্থা তুলে ধরে এবং হেলিকপ্টারের দুই মটর ও প্রপেলারে কোনো সমস্যা দেখা দিলে এই টেস্টার পাইলটকে সতর্ক সংকেত দেয়। ইরান অতীতে এই যন্ত্র বা সিস্টেম বিদেশ থেকে আমদানী করতো। কিন্তু ইরানের বিজ্ঞানীরা এখন দেশীয় প্রযুক্তি ব্যবহার করে ২০৫, ২১৪, কোবরা ও শিনুক জাতীয় হেলিকপ্টারের টেস্টার নির্মাণ করছেন।

২৮তম পর্ব

'ইরান, সৃজনশীলতার নব-দিগন্তে' শীর্ষক ধারাবাহিক আলোচনার এ সপ্তার আসর থেকে আপনাদের জানাচ্ছি সালাম এবং একরাশ প্রীতি ও শুভেচ্ছা। গত আসরগুলোতে আমরা বিভিন্ন ক্ষেত্রে ইরানের অগ্রগতির কিছু দিক তুলে ধরেছি। এই ধারাবাহিকের শেষ আসরে আমরা ইরানের অগ্রগতির প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে সক্ষম হয়েছেন এমন কয়েকজন উদ্ভাবকের পরিচয় তুলে ধরবো।

ডক্টর নাদেরে গুলশান ইব্রাহীমী ইরানের একজন বিখ্যাত বিজ্ঞানী। জাপানের কিয়েটো বিশ্ববিদ্যালয়ে পলিমার বিষয়ক গবেষণায় ডক্টরেট ডিগ্রী লাভ করার পর তিনি দেশ-সেবার অদম্য বাসনা নিয়ে ইরানে ফিরে আসেন। আবিস্কার বা উদ্ভাবনার মাধ্যমে দেশের উন্নতি ও অগ্রগতি সাধন ছিল তার দীর্ঘ দিনের স্বপ্ন। দেশে ফিরে এসে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতার সময় তিনি গবেষণার ক্ষেত্রে বাধাগুলো দূর করার এবং ছাত্রদের সাফল্যের জন্য একটি সেতু-বন্ধন গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নেন। বর্তমানে তিনি একটি ছোট গবেষণাগারে অনেক বড় বড় ও গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা-প্রকল্প পরিচালনা করছেন।

ডক্টর নাদেরে গুলশান ইব্রাহীমী পলিমার জাতীয় পদার্থ দিয়ে অস্ত্রপচারের সূতা তৈরি করতে সফল হয়েছেন। এ ধরনের সূতা অস্ত্রপচারের পর খুব দ্রুত শরীরে মিশে যায়। পলি ভিনাইল ক্লোরাইড বা পি ভি সি জাতীয় পদার্থ ব্যবহার করে রক্ত রাখার বিকল্প ব্যাগ তৈরি ইরানের এই মহিলা বিজ্ঞানীর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্ভাবন। যেসব রোগীকে প্রায়ই রক্ত নেয়ার জন্য রক্ত রাখার ব্যাগ ব্যবহার করতে হয়, তারা যাতে ক্যান্সার রোগে আক্রান্ত না হন সে জন্য রক্ত রাখার বিকল্প এই ব্যাগ ব্যবহার করা হয়। এই ব্যাগে ব্যবহৃত পি ভি সি ক্যান্সার প্রতিরোধ করে। পলিমারের অপটিক্যাল ফাইবার ও প্রলেপযুক্ত স্ট্যান্ট তৈরি ডক্টর নাদেরে গুলশানের অন্য দুটি বড় আবিস্কার। প্রলেপযুক্ত স্ট্যান্ট হার্টের রোগীর এনজিওপ্লাস্টের সময় রগকে উন্মুক্ত রাখে। এ প্রসঙ্গে ডক্টর গুলশান বলেছেন, "স্ট্যান্ট হচ্ছে একটি ধাতব মাধ্যম যা রানের কুচকীতে থাকা রক্তবাহী ধমনী থেকে হার্টের বদ্ধ রগে পরিচালিত করা হয়। রগের চর্বি দূর করে রক্ত সঞ্চালনের পথ উন্মুক্ত করার লক্ষ্যে এই মাধ্যমটি রগের ভেতর প্রসারিত হয় এবং তা রগের মধ্যে রগের বৃত্তাকার চামড়া বা দেয়ালের মধ্যে মিশে যায়। কিন্তু এ ধরনের ধাতব স্ট্যান্ট বিভিন্ন সমস্যা সৃষ্টি করে। যেমন, এই ধাতব স্ট্যান্ট রগের মধ্যে রক্তের প্রবাহ বন্ধ করে দেয়, কিংবা শরীরে প্রদাহ বা জ্বালা সৃষ্টি করে এবং কখনও কখনও তা শরীরের অন্যত্র চলে যায়। তাই আমরা এই ধাতব পদার্থের বিকল্প হিসেবে বিশেষ ধরনের পলিমার ব্যবহারের পরিকল্পনা নেই, যে পলিমার সংরক্ষক হিসেবে ব্যবহৃত হবে। একই পদ্ধতিতে এই নতুন স্ট্যান্ট ব্যবহারের পর দেখা গেল, তা শরীরের তাপমাত্রার সাথে মানানসই এবং তা নিজেই প্রকৃত রগে পরিণত হয় ও রগের ভেতরের অংশ উন্মুক্ত থাকে। এভাবে এই স্ট্যান্ট রগকে পুনরায় অকেজো হওয়া থেকে রক্ষা করে।"

ইরানের আরেকজন বিশিষ্ট বিজ্ঞানী ও গবেষক জনাব নাজাফী। প্রকৌশলী নাজাফী দুটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্ভাবনের স্রষ্টা। তিনি যথাক্রমে ২০০৫ ও ২০০৯ সালে এ দুটি আবিস্কার তার নামে নথিভূক্ত করেন। জনাব নাজাফীর প্রথম আবিস্কারটি হল মটরগাড়ীর স্বয়ংক্রিয় গাইড। তার দ্বিতীয় আবিস্কারটি হল গাড়ীর ওজন নির্দেশক স্বয়ংক্রিয় যন্ত্র। গাড়ীতে অতিরিক্ত মালামাল ও অবৈধ মালামাল রাখা হলে এই যন্ত্র সতর্ক সংকেত দেয়। জনাব নাজাফী ইলেকট্রনিক, ম্যাকানিক ও কম্পিউটার, মটরগাড়ী ও সামরিক শিল্পের বিভিন্ন প্রকল্প নিয়ে কাজ করছেন।

ইরানের আরেকজন বিশিষ্ট বিজ্ঞানী ও গবেষকের নাম বেহনাম সিদ্দিক নিয়া। ইঞ্জিনিয়ার সিদ্দিক নিয়া প্রাইড ও রিয়োসহ আরো কয়েকটি মটরগাড়ীর ম্যাগনেট টেস্টিং যন্ত্র নির্মাণ করেছেন। এই যন্ত্র স্বয়ংক্রিয়ভাবে গাড়ীর বিভিন্ন দোষ-ত্রুটি তুলে ধরে। ইঞ্জিনিয়ার সিদ্দিক নিয়া এ পর্যন্ত ১২ টি উদ্ভাবন নিজের নামে নথিবদ্ধ করতে সক্ষম হয়েছেন। তার আবিস্কৃত একটি যন্ত্রের নাম ড্রিল স্পুটার। এ যন্ত্রের মাধ্যমে ড্রিলের রডের অগ্রভাগ দেয়ালের অন্য প্রান্তে কোন বিন্দু দিয়ে বের হবে এবং দেয়াল ছিদ্র করার সময় এর মধ্যে কোনো বাধা আছে কিনা তা আগেই চিহ্নিত করে।

জনাব মূর্তাজা বমদাদ ইরানের আরেকজন বিশিষ্ট উদ্ভাবক ও গবেষক। তিনি মটরগাড়ীর মটরের সুপাপবিহীন এমন তিনটি বিশেষ সিলিন্ডারের নির্মাতা যেসব সিলিন্ডার গাড়ীর জ্বালানীর ব্যবহার কমায় এবং মটরের গতি ও কার্যকারীতা বৃদ্ধি করে। বর্হিদহনকক্ষ ও অভ্যন্তরীণ-দহন-কক্ষযুক্ত সব মটরেই এইসব বিশেষ সিলেন্ডার ব্যবহার করা যায়। এ ধরনের আবিস্কার বিশ্বে নজিরবিহীন। জনাব মূর্তাজা বমদাদ বর্তমানে আরো কয়েকটি গবেষণা-প্রকল্প নিয়ে কাজ করছেন।

বর্তমান বিশ্বে রোবটের ব্যবহার দিনকে দিন বাড়ছে। এ সংক্রান্ত গবেষণায় ক্রমবর্ধমান উন্নতির ফলে আগামী দুই দশকের মধ্যে বিশ্বের বিভিন্ন তৎপরতায় মানুষের পাশাপাশি রোবটের স্থান অপরিহার্য হয়ে উঠবে বলে মনে করা হচ্ছে। আজকাল রোবটদের দিয়ে ফুটবলসহ বিভিন্ন খেলাধুলার আন্তর্জাতিক প্রতিযোগীতাও অনুষ্ঠিত হচ্ছে। ইরানও রোবট সংক্রান্ত গবেষণায় বেশ অগ্রগতি অর্জন করেছে। চীনে অনুষ্ঠিত দ্বাদশ আন্তর্জাতিক রোবোকাপ প্রতিযোগিতায় ইরানের ছাত্ররা তিনটি স্বর্ন ও ৩ টি রৌপ্য-পদক এবং তিনটি ব্রোঞ্জ পদক পেয়ে চতুর্থ স্থান অধিকার করেছে। বিশ্ব রোবোকাপ ফেডারেশনের আওতায় এই আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা প্রতি বছর অনুষ্ঠিত হয়। এই ফেডারেশনের আওতার বাইরে এ ধরনের প্রতিযোগিতা ইরানে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে, জাপানে ও জার্মানীর মত দেশগুলোতেও অনুষ্ঠিত হচ্ছে এবং এসব প্রতিযোগিতায় ইরানী ছাত্ররা বেশ ভাল ফলাফল অর্জন করছে। খেলাধুলা ছাড়াও ত্রাণকর্মী-রোবট ও অন্যান্য কাজের রোবটদের দিয়ে প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। ওয়াহিদ হাশেমী নাজাফাবাদী নামের ইরানের একজন বিজ্ঞানী মানুষের বিভিন্ন কাজ করতে সক্ষম এমন রোবট আবিস্কার করেছেন। এই রোবটের প্রযুক্তিগুলো পুরোপুরি ইরানী। #

 

 

 

 


মন্তব্য লিখুন


Security code
রিফ্রেস দিন