এই ওয়েবসাইটে আর আপডেট হবে না। আমাদের নতুন সাইট Parstoday Bangla
বৃহস্পতিবার, 20 আগস্ট 2009 15:44

ইরানের নির্বাচিত মোসাদ্দেক সরকারের বিরুদ্ধে মার্কিন সামরিক অভ্যুত্থানের বার্ষিকী

ইতিহাসের পথ পরিক্রমায় কখনো কখনো এমন কিছু ঘটনা ঘটে,যা জনগণকে সর্বদা পীড়া দেয়। ফার্সি ১৩৩২ সালের ২৮ শে মোরদদ মোতাবেক ১৯৫৩ খ্রীষ্টাব্দের ১৯ শে আগস্ট ইরানের ইতিহাসে এমনি এক পীড়াদায়ক ঘটনা সংঘটিত হয়। সেদিন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বৃটেনকে সাথে নিয়ে ইরানের আভ্যন্তরীণ ব্যাপারে সরাসরি হস্তক্ষেপ করে। যুক্তরাষ্ট্র ইরানের অভ্যন্তরে এক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে দেশটির নির্বাচিত ও জনপ্রিয় মোসাদ্দেক সরকারকে উৎখাত করে। ইরানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ডঃ মোহাম্মদ মোসাদ্দেক ও তার সরকার ইরানের তেল শিল্পকে জাতীয়করণের উদ্যোগ নেয়ার পরই এই সামরিক অভ্যুত্থান ঘটানো হয়। সে সময় উপনিবেশবাদী বৃটিশ সরকার দীর্ঘ অর্ধ শতাব্দি ধরে ইরানের তেল সম্পদের উপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে রেখেছিল। ইরানের তেল খাত থেকে অর্জিত অর্থের প্রায় পুরোটাই বৃটেনের পকেটে চলে যাচ্ছিল। এ কারণে ইরানের তেল সম্পদকে জাতীয়করণ করা ছিল তৎকালীন সময়ের একটি প্রধান জনপ্রত্যাশা।  ১৯৪০-র দশকের শেষ দিকে ইরানের তেল সম্পদকে জাতীয়করণের পরিবেশ সৃষ্টি হয় এবং অবশেষে ইরানের জাতীয় সংসদ ১৯৫১ সালের মার্চ মাসে এই জনপ্রত্যাশা বাস্তবায়ন করে। এর ফলে সাম্রাজ্যবাদী বৃটিশ সরকারের স্বার্থে আঘাত লাগে এবং যুক্তরাষ্ট্রসহ পাশ্চাত্যের দেশগুলোর মাধ্যমে ইরানের উপর চাপ বৃদ্ধি করে। বৃটিশরা সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের তৎকালীন সরকারকে পর্যন্ত এ ব্যাপারে চাপ প্রয়োগের জন্য রাজি করাতে সক্ষম হয়েছিল। এ সময় ইরানের অভ্যন্তরেও তেল সম্পদ জাতীয়করণ ইস্যুতে রাজনৈতিক ও ধর্মীয় নেতৃবৃন্দের মধ্যে কিছুটা মতপার্থক্য ছিল। এই সুযোগে যুক্তরাষ্ট্র বৃটেনের সহযোগিতায় ইরানে সামরিক অভ্যুত্থান ঘটানোর পরিকল্পনা করে। মার্কিন ও বৃটিশ গোয়েন্দা সংস্থাগুলো ইরানের অভ্যন্তরে অবস্থিত দালাল চক্রকে সাথে নিয়ে ১৯৫৩ সালের ১৯ শে আগস্ট সামরিক অভ্যুত্থান ঘটায়। এর মধ্য দিয়ে ডঃ মোহাম্মদ মোসাদ্দেকের নেতৃত্বাধীন সরকারের পতন ঘটে এবং বিদেশে পালিয়ে থাকা শাহ দেশে ফিরে আসে। আর এরপরই যুক্তরাষ্ট্র শাহের মাধ্যমে তেল শিল্পসহ গোটা দেশের উপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে। শুরু হয় মার্কিন নেতৃত্বে ইরানের সম্পদ লুটপাটের মহোৎসব। ২৫ বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে এই প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা গত জুনে কায়রো বিশ্ববিদ্যালয়ে দেয়া এক ভাষণে ১৯৫৩ সালে ইরানের তৎকালীন সরকারকে উৎখাতের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি হাত থাকার কথা উল্লেখ করে ওয়াশিংটনের ঐ পদক্ষেপকে ইরানের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে হস্তক্ষেপ হিসাবে অভিহিত করেছেন। ওবামাই যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম প্রেসিডেন্ট যিনি ১৯৫৩ সালে অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ইরানের জনপ্রিয় ও নির্বাচিত মোসাদ্দেক সরকারের পতনে যুক্তরাষ্ট্রের হাত থাকার কথা স্বীকার করলেন। তিনি বলেছেন, গত প্রায় ৪০ বছরেরও বেশী সময় ধরে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে যেভাবে হস্তক্ষেপ করেছে এবং দেশটির বিরুদ্ধে শত্রুতায় লিপ্ত থেকেছে যে তা পুষিয়ে নেয়া এত সহজ হবে না। কিন্তু প্রশ্ন হলো, যুক্তরাষ্ট্র কি তার এই হস্তক্ষেপকামী নীতি থেকে সরে আসতে পেরেছে ? না, পারেনি।

যুক্তরাষ্ট্র ইরান ছাড়াও বিশ্বের বহু স্বাধীন দেশের আভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করেছে এবং এখনও করছে। এ পর্যন্ত বিশ্বের বহু দেশের নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করে নিজের অশুভ স্বার্থ হাসিল করেছে ওয়াশিংটন। খোদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এমন এক ভূখন্ডে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যা আদিবাসী রেড ইন্ডিয়ানদের। ইউরোপীয় অভিবাসীরা হাজার হাজার আদিবাসী রেড ইন্ডিয়ানকে হত্যা করে সেখানে বর্তমান আমেরিকা নামক রাষ্ট্র গড়ে তুলেছে। দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের আগ পর্যন্ত ইউরোপীয় দেশগুলোর শক্তি অটুট থাকায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হস্তক্ষেপের গন্ডি ল্যাটিন আমেরিকাতেই সীমাবদ্ধ ছিল। এ পর্যন্ত মধ্য আমেরিকা ও দক্ষিণ আমেরিকায় বহু বার সামরিক আগ্রাসন চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। মেক্সিকো, কিউবা, নিকারাগুয়া ও হন্ডুরাস মার্কিন হামলার শিকার হয়েছে। কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ বিশ্বের নানা প্রান্তে মার্কিন হস্তক্ষেপের ক্ষেত্র তৈরী করে। ধ্বংসাত্বক এই যুদ্ধের ফলে ইউরোপের সাম্রাজ্যবাদীদের শক্তি অনেকটা হ্রাস পায় এবং যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্য প্রতিষ্ঠার পথ উন্মুক্ত হয়। মার্কিন সরকার দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ মুহুর্তে এসে জাপানের হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে পরমাণু বোমা বর্ষণ করে এবং এর ফলে লাখ লাখ মানুষ হতাহত হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পরাশক্তি হিসেবে আবির্ভুত যুক্তরাষ্ট্র বিভিন্ন দেশের আভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ জোরদার করে। বিংশ শতাব্দির দ্বিতীয়ার্ধে যুক্তরাষ্ট্র বিভিন্ন দেশে সামরিক অভ্যুত্থান ঘটায় এবং কোন কোন দেশে সরাসরি সামরিক হামলা চালিয়ে সেগুলো দখল করে নেয়।

১৯৫০ সালে কোরিয়ো যুদ্ধ শুরু হয় এবং এই যুদ্ধে তিন বছরেই লাখ লাখ মানুষ প্রাণ হারায়। এর মধ্যে বেসামরিক মানুষের প্রাণহানির সংখ্যাই ছিল চার লক্ষ। দক্ষিণ কোরিয়ার জনগণের প্রতিবাদ সত্ত্বেও দেশটিতে এখনও মার্কিন বাহিনী মোতায়েন রাখা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র এর আগে কমিউনিজমের প্রভাব ও বিস্তার ঠেকানোর অজুহাত দেখিয়ে সে সময় কোরিয়াসহ বিভিন্ন স্থানে হামলা চালাতো। যুক্তরাষ্ট্র এই অজুহাতে কিউবার ফিদেল কাস্ত্রোর বিরোধীদেরকে অস্ত্র ও যুদ্ধ সরঞ্জাম দিয়েছিল। কিন্তু কাস্ত্রোর বিরোধীরা শেষ পর্যন্ত হামলা চালিয়েও সফল হতে পারেনি। বিশ্বের যে দেশই মার্কিন আধিপত্যের বিরোধিতা করেছে,যুক্তরাষ্ট্র সে দেশের বিরুদ্ধেই ষড়যন্ত্র করেছে এবং সরকার বিরোধীদের উস্কে দিয়েছে। ইরান ও নিকারাগুয়ার বিপ্লব বিরোধীদের প্রতি মার্কিন সমর্থনও এ ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য।

ভিয়েতনামে মার্কিন আগ্রাসন ছিল সবচেয়ে ভয়াবহ ও দীর্ঘমেয়াদী। মার্কিন বাহিনী ১৯৬৪ থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত সময়ে ভিয়েতনামের লাখ লাখ মানুষকে হত্যা করেছে। মার্কিনীরা সেখানে নিষিদ্ধ নাপাম বোমা ও রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহার করেছে। কিন্তু এত কিছুর পরও ভিয়েতনামের জনগণের প্রতিরোধের মুখে মার্কিন বাহিনী সেখানে পরাজয় বরণ করে। ইরানে ইসলামী বিপ্লব সফল হবার দেড় বছরের মাথায় হোয়াইট হাউজ ইরাকের সাদ্দাম হোসেনকে দিয়ে ইরানে হামলা চালায়। ১৯৮০ সালের ঐ হামলায় উভয় দেশের জানমালের ব্যাপক ক্ষতি হয়। এ সময় যুক্তরাষ্ট্র সাদ্দামকে সর্বাত্মক সহযোগিতা দেয়। সাদ্দাম হোসেনও ইরানি জনগণের বিরুদ্ধে রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহার করে। কিন্তু ২০০৩ সালে যুক্তরাষ্ট্র কিছু ভিত্তিহীন অভিযোগে সেই সাদ্দাম হোসেনের বিরুদ্ধেই হামলা চালায় এবং ইরাক দখল করে নেয়। এর দুই বছর আগে যুক্তরাষ্ট্র ২০০১ সালে আফগানিস্তান দখল করে। এই দুটি মুসলিম দেশ এখনও যুক্তরাষ্ট্রের দখলে রয়েছে।

২০০২ সালে ভেনিজুয়েলার নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট হুগো চ্যাভেজের বিরুদ্ধে সামরিক হস্তক্ষেপ চালিয়ে ব্যর্থ হয় যুক্তরাষ্ট্র। ১৯৭৩ সালেও একবার চিলিতে নগ্ন হস্তক্ষেপের মাধ্যমে ল্যাটিন আমেরিকায় জন-নিন্দিত হয়েছিল দেশটি। স্যালভেদর আলেন্দের নেতৃত্বাধীন চিলির নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করে স্বৈরশাসক অগাস্টো পিনোশেকে ক্ষমতায় আনার ঘটনা আজও বিশ্বের ইতিহাসে গণতন্ত্রের জন্য এক কলংকজনক অধ্যায় হয়ে আছে। অবশেষে চিলির মার্কিন সমর্থিত স্বৈরশাসকের পতন ঘটেছে। যুক্তরাষ্ট্র অতীত কাল থেকেই স্বৈরশাসকদের প্রতি সমর্থন দিয়ে আসলেও নিজেকে গণতন্ত্রের ধারক-বাহক বলে দাবি করছে এবং গণতন্ত্র না থাকার অজুহাতে বিভিন্ন দেশের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করছে। এছাড়া, ইন্দোনেশিয়া,তুরস্ক ও পাকিস্তানের বিভিন্ন সামরিক অভ্যুত্থানে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি জড়িত ছিলো। এর ফলে বিশ্বের জনগণের কাছে আজ যুক্তরাষ্ট্র এক ধিকৃত নাম।

যুক্তরাষ্ট্র ভিন্ন দেশের আভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপের ক্ষেত্রে ১৯৯০-এর দশক থেকে নয়া পদ্ধতি অনুসরণ করছে। এই পদ্ধতিতে মার্কিন বিরোধী দেশেগুলোর জনগণের একটা অংশকে সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তুলে তাদেরকে দিয়ে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি সৃষ্টি করা হয় এবং তাদের প্রতি সমর্থন ও সহযোগিতা দিয়ে সরকার উৎখাত করা হয়। নয়া পদ্ধতিতে মার্কিন হস্তক্ষেপের বিষয়টি সাধারণ মানুষের চোখে খুব সহজে ধরা পড়েনা। নয়া পদ্ধতিটি মূলত গণমাধ্যম নির্ভর। যুক্তরাষ্ট্রসহ পাশ্চাত্যের দেশগুলোর কাছে শক্তিশালী ও প্রভাববিস্তারকারী গণমাধ্যম থাকায় এই পদ্ধতি অনেকটাই সফল হচ্ছে। টিভি-রেডিওসহ অন্যান্য গণমাধ্যমের পাশাপাশি ইন্টারনেটকেও এ কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে। ফেসবুক, টুইটার ও ইউটিউবের মতো ইন্টারনেট ভিত্তিক নেটওয়ার্ককে কাজে লাগিয়ে তারা তাদের উদ্দেশ্য হাসিলের চেষ্টা করছে। গুজব সৃষ্টির মতো কাজে এসব মাধ্যমকে ব্যবহার করা হচ্ছে। এই পদ্ধতিতে এনজিও গুলোর ভূমিকাও সর্বাধিক। এসব এনজিও দেশের অভ্যন্তরে সামাজিক কর্মকান্ডে জড়িত থাকলেও কখনো সচেতন ভাবে আবার কখনো নিজেদের অজান্তে মার্কিন স্বার্থ রক্ষা করে চলেছে। এছাড়া ফোর্ড ও আলবার্ট আইনস্টাইনের মতো কিছু কিছু মার্কিন প্রতিষ্ঠান মার্কিন বিরোধী সরকারগুলোকে উৎখাতের জন্য ব্যাপক ভূমিকা পালন করে থাকে।

ইউক্রেন,জর্জিয়া ও কিরগিজস্তানে মার্কিন নয়া পদ্ধতি সফল হয়েছে। এসব দেশে যুক্তরাষ্ট্র কথিত বিপ্লব ঘটিয়ে নিজের পছন্দসই ব্যক্তি ও দলকে ক্ষমতায় বসিয়েছে। তবে মার্কিনপন্থী এসব সরকারের কোন কোনটির অবস্থা এখন টালমাটাল। কারণ ঐসব দেশের জনগণ মার্কিন ষড়যন্ত্র উপলব্ধি করতে সক্ষম হয়েছে। ইরানের ইসলামী সরকার ব্যবস্থাকে ধ্বংসের লক্ষ্যেও যুক্তরাষ্ট্র এখন একই পদ্ধতি অনুসরণের চেষ্টা করছে। যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সাম্প্রতিক প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের পর ফলাফলের ব্যাপারে অসন্তুষ্ট রাজনীতিবিদসহ কিছু জনতাকে দিয়ে কথিত বিপ্লব ঘটানোর চেষ্টা করে। কিন্তু জনগণ ও নেতৃবৃন্দের সচেতনতার কারণে এই ষড়যন্ত্র ভেস্তে গেছে। তবে আধিপত্যকামী যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপকামী নীতি ও ষড়যন্ত্র সহসাই বন্ধ হবে বলে মনে হয়না। কাজেই প্রতিটি দেশের নাগরিক ও সরকারকে আরও সজাগ হতে এবং নিজেদের শক্তি ও ক্ষমতা বৃদ্ধি করতে হবে। বিশেষকরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান টার্গেট হচ্ছে মুসলিম দেশগুলো। ফলে মুসলমানদেরকে অবশ্যই সদা সতর্ক থাকতে হবে। #


মন্তব্য লিখুন


Security code
রিফ্রেস দিন