এই ওয়েবসাইটে আর আপডেট হবে না। আমাদের নতুন সাইট Parstoday Bangla
শুক্রবার, 06 নভেম্বর 2009 22:24

৪ নভেম্বর : আধিপত্যবাদ বিরোধী জাতীয় দিবস ও বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র দিবস

ফার্সি ১৩ অবন অর্থাৎ খ্রিষ্ট্রিয় ৪ নভেম্বর তেহরানে মার্কিন গুপ্তচরদের আখড়া ধ্বংস করার বার্ষিকী। এই দিনটিকে আধিপত্যবাদ বিরোধী জাতীয় দিবস ও বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র দিবস হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। এই নামকরণ থেকেই বোঝা যায় যে ইরানের সাথে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের শত্রুতা রয়েছে,কিন্তু এই শত্রুতার কারণ কী? এই প্রশ্নটি প্রতি বছর যখন আধিপত্যবাদ বিরোধী জাতীয় দিবস ঘনিয়ে আসে তখন বিশেষজ্ঞদের মনকে বিদ্ধ করে, আন্দোলিত করে। এই প্রশ্নের জবাব কেবল ইরানী জাতির ন্যায়কামিতা এবং বলদর্পী শক্তি বিরোধী মানসিকতার মাঝেই খুজেঁ পাওয়া যেতে পারে,যেই বিপ্লবী চেতনার ফলে ইরান মুক্তি পেয়েছিল মার্কিন আগ্রাসনের করালগ্রাস থেকে এবং বিজয় লাভ করেছিল ইসলামী বিপ্লব।

৪ নভেম্বর দিনটি ইরানের ঐতিহাসিক দিনপঞ্জিকায় বেশ ঘটনাবহুল। বিভিন্ন সময়ের ঠিক এই দিনটিতে ইরানে অন্তত তিনটি ঘটনা সংঘটিত হয়েছিল। ১৯৬৪ সালের ৪ নভেম্বরে বিদেশী উপনিবেশবাদ এবং আভ্যন্তরীণ স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করার কারণে শাহ সরকার ইসলামী বিপ্লবের রূপকার ইমাম খোমেনী (রহ)কে গ্রেফতার করে নির্বাসনে পাঠায়। প্রথমে পাঠায় তুরস্কে এবং তারপর ইরাকে।১৪ বছর পর অর্থাৎ ১৯৭৮ সালের ঠিক এই দিনেই তেহরানে ইরানের কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের বিক্ষোভ সমাবেশের ওপর স্বৈরাচারী শাহের বাহিনীর হামলায় রাজপথ রক্তাক্ত হয়। এই ন্যাক্কারজনক ঘটনার কারণেই ৪ঠা নভেম্বরকে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র দিবস বলে অভিহিত করা হয়েছে। ১৯৭৯ সালের ৪ নভেম্বরেও মার্কিন গুপ্তচরের আখড়া নামে খ্যাত তেহরানের মার্কিন দূতাবাস ইরানের মুসলিম জনগোষ্ঠি ও একদল বিপ্লবী ছাত্র ধ্বংস করে দিয়েছিল।

এই তিনটি ঘটনাই আসলে এক সূত্রে গাঁথা,তা হলো তিনটি ঘটনাই ইরানী জাতির ওপর অব্যাহত আধিপত্যবাদের নির্মম চিত্র। আর সেজন্যেই এগুলো হয়ে উঠেছিল ইসলামী বিপ্লব বিজয় ও ইরানের ইসলামী সরকার ব্যবস্থার মূল প্রেরণা। এই তিনটি ঘটনা প্রমাণ করে আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে ইরানী জাতির সংগ্রাম কেবল ইরানের রাজনৈতিক আন্দোলন কিংবা সংগ্রামের ইতিহাসের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়,বরং তাদের আন্দোলন-সংগ্রাম ক্রমশ সামনের দিকে অগ্রসরমান, যা ইরানে মার্কিন হস্তক্ষেপকামী নীতির বিরুদ্ধে ইরানী জনতার ন্যায়কামী আন্দোলনের চেতনা ও মানসিকতা সৃষ্টি করেছে। আমেরিকা এবং বৃটেন যৌথভাবে ইরানী জনগণের স্বাধীনতা আন্দোলন দমন করার জন্যে ১৯৫২ এবং ১৯৫৩ সালে বিশেষ করে ১৯৫৩ সালের ১৯ আগস্টে যে অভ্যুত্থান ঘটিয়েছিল,তা এই সত্যকেই প্রমাণ করে যে, মার্কিন কর্মকর্তারা ইরানে তাদের অবস্থান মজবুত করার জন্যে ইরানী জাতির নিজস্ব আশা-আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের পথে বাধার সৃষ্টি করেছিল এবং সেইসাথে ইরানের উন্নয়ন ও অগ্রগতির পথ রোধ করে দাঁড়িয়েছিল।


মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা জাতিসংঘের বার্ষিক সাধারণ অধিবেশনে দেওয়া বক্তৃতায় ১৯৫৩ সালে ইরানের বৈধ সরকারের পতনের ক্ষেত্রে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকার কথা স্বীকার করে বলেছেন,ঐ পদক্ষেপের ব্যাপারে ওয়াশিংটনের হাত ছিল। এই প্রথমবারের মতো কোনো মার্কিন কর্মকর্তা ইরানে ১৯৫৩ সালের অভ্যুত্থানে তাদের দেশের ভূমিকার কথা আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করলো। ঐ অভ্যুত্থানের ফলে সে সময় মোহাম্মাদ মোসাদ্দেকের বৈধ ও নির্বাচিত সরকারের পতন ঘটেছিল। আসলে ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বৈষম্যমূলক,শত্রুতামূলক ও হস্তক্ষেপকামী নীতির ইতিহাস চার দশকেরও বেশিদিনের,যার ক্ষতি এতোটা সহজে পূরণীয় নয়।

মার্কিনীরা ইরানে তাদের উপস্থিতি নিশ্চিত করার জন্যে এবং বিদেশী ও পুজিঁ বিনিয়োগকারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্যে ১৯৬৪ সালের অক্টোবরে ন্যাক্কারজনক ক্যাপিচ্যুলেশান আইন ইরানীদের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছিল। ঐ আইনের ভিত্তিতে মার্কিনী নাগরিকরা ইরানে আইনের উর্ধ্বে থাকার কথা ছিল। অর্থাৎ মার্কিন নাগরিকরা যেই শ্রেণী বা পর্যায়েরই হোক না কেন,তারা যদি ইরানে বসবাস করে,কিংবা ব্যবসা বাণিজ্য করে এককথায় আর্থ-সামরিক-রাজনৈতিক ক্ষেত্র নির্বিশেষে তাদেরকে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো যাবে না। ইমাম খোমেনী (রহ) ১৯৬৪ সালের ২৬ অক্টোবরে এই প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে জ্বালাময়ী এক বক্তৃতা দেন। ঐ বক্তৃতায় তিনি ইরানের আভ্যন্তরীণ ব্যাপারে মার্কিনীদের হস্তক্ষেপকামী নীতির বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্যে জনগণের প্রতি আহ্বান জানান। তাঁর আহ্বানে জনগণ স্বতস্ফূর্তভাবে সাড়া দেয়। এরই পরিপ্রেক্ষিতে স্বৈরাচারী শাহ সরকার ইমাম খোমেনী (রহ) কে গ্রেফতার ক'রে ১৯৬৪ সালের ৪ নভেম্বর তাঁকে তুরস্কে নির্বাসন দেয়। ইমামকে নির্বাসনে পাঠানোর পর আভ্যন্তরীণ স্বৈরাচার কিংবা বিদেশী উপনিবেশবাদের বিরুদ্ধে জনগণের আন্দোলন তো থামেই নি বরং বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। ইমাম ১৫ বছর নির্বাসনে ছিলেন। ১৫ টি বছর স্বদেশের মাটি-জনগণ ও আলো-বাতাস থেকে বঞ্চিত হয়েছিলেন ইমাম। এই ১৫ বছরে ইরানের বিপ্লবী জনতার আন্দোলন এতো তীব্র আকার ধারণ করে যে তারই ফলে ১৯৭৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইসলামী বিপ্লব বিজয়ের ক্ষেত্র প্রস্তুত হয়।

একদল বিপ্লবী ছাত্রের মাধ্যমে তেহরানে মার্কিন গুপ্তচরদের আখড়া ধ্বংসের ঘটনা ইসলামী বিপ্লব বিজয়ের পথকে আরো সুগম করেছিল। এই ঘটনার মধ্যে মার্কিন কর্মকর্তাদের জন্যে একটি দৃষ্টান্তমূলক ও শিক্ষণীয় বার্তা ছিল। ইসলামী বিপ্লব বিজয়ের ৩০ বছর পর এখন মনে হচ্ছে,মার্কিন কর্মকর্তারা বোধ হয় আজো সেই দৃষ্টান্তমূলক শিক্ষাটি সঠিকভাবে উপলব্ধি করতে পারে নি। ১৯৫৩ সালে ইরানের সাংবিধানিক সরকারের বিরুদ্ধে অভ্যুত্থানে মার্কিন গোয়েন্দা বাহিনীর হস্তক্ষেপ মার্কিন কর্মকর্তাদের হস্তক্ষেপকামী নীতির প্রতি ইরানী জনগণের ঘৃণা ও অবিশ্বাসের অনেকগুলো কারণের একটি । ইরানের শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক তৎপরতার ব্যাপারে আমেরিকার বিরোধিতা, ইরাক এবং আফগানিস্তানে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির পেছনে ইরানের হাত রয়েছে বলে ইরানের বিরুদ্ধে আমেরিকার অন্যায় অভিযোগ আরোপ করা,ইরানের বিরুদ্ধে অপরাধী তৎপরতা চালানোর জন্যে সন্ত্রাসী গোষ্ঠিগুলোকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান করা ইত্যাদি ঘটনা ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিনীদের শত্রুতামূলক পদক্ষেপের কিছু নমুনা। এসবের পাশাপাশি ইরাক এবং আফগানিস্তানে সামরিক হস্তক্ষেপ ও সহিংস পদক্ষেপ নিয়ে এবং ইহুদিবাদী ইসরাইলকে পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে মার্কিন কর্মকর্তারা মধ্যপ্রাচ্যসহ সমগ্র বিশ্ববাসীর ঘৃণা কুড়িয়েছে।

মার্কিন কর্মকর্তারা এখন যতোই নিজেদের অতীত ভুলের কথা স্বীকার করুক না কেন,তারা কিন্তু সেই অতীতের ভুল পথেই পা বাড়াচ্ছে। তারা ইরানের বিরুদ্ধে অবরোধ আরো কঠোরভাবে আরোপ করার জন্যে বিশ্বব্যাপী তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে। মার্কিন কর্মকর্তারা অবরোধ আরোপ চেষ্টার পাশাপাশি ইরানের সম্পদ জব্দ করার জন্যে গত চার বছর ধরে ইরানের শান্তিপূর্ণ পরমাণু প্রযুক্তি অর্জন সম্পর্কে বিচিত্র মিথ্যা ও ভিত্তিহীন দাবী করে আসছে। এইসব মিথ্যা ও বানোয়াট দাবী তুলে তারা ইরানের বিরুদ্ধে অন্যায় অবরোধ আরোপের লক্ষ্যে ইশতেহার পাশ করার অজুহাত সৃষ্টির চেষ্টা চালিয়েছে। সাক্ষ্য-প্রমাণ থেকে ভালোভাবেই বোঝা যাচ্ছে যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আসলে তাদের সেই পুরোণো হস্তক্ষেপকামী লক্ষ্য বাস্তবায়ন করার জন্যেই পরিকল্পিতভাবে অগ্রসর হচ্ছে, এখন তারা কেবল সুযোগের অপেক্ষায় রয়েছে ।

ইরানের ব্যাপারে পশ্চিমাদের অব্যাহতভাবে এই নাক গলানোর ঘটনা থেকে প্রমাণিত হয় গত ত্রিশ বছর ধরে তাদের বিচ্ছিন্নতাকামী ও ষড়যন্ত্রমূলক বিচিত্র পদক্ষেপের বিরুদ্ধে ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান রুখে দাঁড়ানোর পরও এখনো তাদের হুশ হয় নি। যদিও ইরানের সবোর্চ্চ নেতা বহুবার বলেছেন-ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন ষড়যন্ত্র ব্যর্থ হয়েছে। অন্তত অর্ধ শতাব্দীকাল ধরে আমেরিকা ইরানের বিরুদ্ধে ষঢ়যন্ত্র চালিয়ে যাচ্ছে। ইসলামী বিপ্লব বিজয়ের পরও তারা ভিন্ন আঙ্গিকে ইরানের উন্নতি ও অগ্রগতির পথে বাধার সৃষ্টি করে আসছে। কিন্তু অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে সুস্পষ্টভাবেই বলা যায় মার্কিনীদের এইসব ষড়যন্ত্র ভবিষ্যতেও নিশ্চিতভাবেই ব্যর্থতায় পর্যবসিত হবে। বিশ্ববাসী তা প্রত্যক্ষ করবে।


মন্তব্য লিখুন


Security code
রিফ্রেস দিন