এই ওয়েবসাইটে আর আপডেট হবে না। আমাদের নতুন সাইট Parstoday Bangla
বৃহস্পতিবার, 17 ডিসেম্বর 2009 18:38

চলচ্চিত্রে ঔজ্জ্বল্যের শীর্ষে উঠে আসছে ইরান

ইরানী চলচ্চিত্রের বয়স প্রায় ৮০ হতে চলল। রাজনৈতিক ও সামাজিক নানা ঘটনার ঘাত প্রতিঘাত পেরিয়ে পরিপূর্ণতার শীর্ষের দিকে এগিয়ে চলছে ইরানের এই নান্দনিক শিল্প। ইরানে এই শিল্পের প্রথম চার দশকে সিনেমা বলতে বোঝাতো কেবল একঘেয়েমিতে ভরা গল্প দেখে অলস সময়-ক্ষেপণ। মারদাঙ্গা ও অশালীন দৃশ্যে ভরপুর পশ্চিমা ছায়াছবির অনুকরণের চেষ্টাও ছিল লক্ষ্যণীয়। সিনেমা হলগুলোতে ছিল বিদেশী ছায়াছবির কর্তৃত্ব। তবে সে সময়ও কোনো কোনো চিত্র-নির্মাতা অর্থবহ ও সুরুচিসম্পন্ন ছায়াছবি নির্মাণ করেছেন এবং এভাবে এগিয়ে নেয়ার চেষ্টা করেছেন ইরানের চলচ্চিত্র শিল্পকে।

কিন্তু ইরানী চলচ্চিত্রের প্রকৃত ও অর্থবহ জীবন শুরু হয় ইসলামী বিপ্লবের পর। এটা এখন জোর গলায় বলা যায় যে, গত ত্রিশ বছরে ইরানে গণযোগাযোগ ও বিনোদনের সবচেয়ে সেরা শিল্প-মাধ্যমে পরিণত হয়েছে চলচ্চিত্র। বুদ্ধিজীবী ও শিক্ষিত মহল থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের সাথেও সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছে এ শিল্প।
ইসলামী বিপ্লবের পর বৈচিত্রময় ইরানী চলচ্চিত্র ইরানের সব শ্রেণীর দর্শকের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়। শুধু তাই নয়, ইরানী চলচ্চিত্র বহির্বিশ্বেও ব্যাপক মাত্রায় সমাদৃত হচ্ছে। আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র অঙ্গনে ও বিশেষ করে এশিয়া মহাদেশে ইরানী চলচ্চিত্রকে এখন সেরা ও মান-সম্পন্ন ধারা হিসেবে ধরা হয়। বিশ্বের অধিকাংশ আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে ইরানী ছায়াছবি প্রদর্শিত হচ্ছে এবং এসব ছায়াছবি দর্শক-নন্দিত হওয়ায় দিনকে দিন ইরানী ছায়াছবির চাহিদা বৃদ্ধি পাচ্ছে। তাই ইরানের চলচ্চিত্রকে এখন কেবল ইরানের জন্যই নয়, একইসাথে গোটা এশিয়ার চলচ্চিত্রের জন্য অসাধারণ অগ্রগতি হিসেবে দেখা হয়।
সম্প্রতি ভারতের স্ক্রীন ডেইলী নামের ওয়েব সাইট এক রিপোর্টে লিখেছে, "পাশ্চাত্যে ঠিক যে পরিমাণে চলচ্চিত্র নির্মাণ হ্রাস পেয়েছে, ঠিক সেই হারে প্রাচ্যে চলচ্চিত্র নির্মাণ বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০০৮ সালে ইরানে নির্মিত হয়েছে ১০৫ টি ছায়াছবি। ফলে গেলো বছর ইরান বিশ্বে সবচেয়ে বেশী চলচ্চিত্র নির্মাণকারী শীর্ষস্থানীয় ১৪ টি দেশের তালিকায় স্থান করে নিয়েছে।" এই রিপোর্টে আরো বলা হয়েছে, "অর্থনৈতিক সংকটের কারণে পাশ্চাত্যে চলচ্চিত্র নির্মাণ শতকরা ২০ ভাগ হ্রাস পেয়েছে। অন্যদিকে এশিয়ায়, বিশেষ করে ভারত ও ইরানে চলচ্চিত্র নির্মাণ বৃদ্ধি পেয়েছে। ইরানী ছায়াছবির উন্নত মান বিশ্ব সমাজের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। সম্প্রতি কয়েকটি ইরানী ছায়াছবি ইন্দোনেশিয়ায় প্রদর্শিত হয়েছে এবং সেখানকার সাংস্কৃতিক ও শিল্প অঙ্গনের ব্যক্তিত্বরা এসব ছায়াছবির ভূয়সী প্রশংসা করেছেন।"

ইন্দোনেশিয়ার বিশিষ্ট অভিনেতা জেন্নি রাচমন ইরানের চলচ্চিত্র সম্পর্কে বলেছেন, ইরানী ছায়াছবি পাশ্চাত্যের মারদাঙ্গা ও অশালীন দৃশ্যযুক্ত ছবির চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রকৃতির। ধর্ম, মানবতা, নৈতিক মূল্যবোধ ও দেশপ্রেমের মত উন্নত ভাবধারা বা বিষয় নিয়ে নির্মিত ইরানী ছায়াছবিগুলো অত্যন্ত মানসম্পন্ন।

ভারতের প্রখ্যাত চলচ্চিত্র সমালোচক ও তৃতীয় চোখ নামের এশীয় চলচ্চিত্র উৎসবের সচিব সুধীর নন্দ গনকার মনে করেন এশিয়ার চলচ্চিত্রের বাজার এশীয় ছায়াছবিগুলোর কর্তৃত্বেই থাকা উচিত, আর এ জন্য আরো ব্যাপক প্রচেষ্টা চালানো জরুরী। তার মতে, ইরানী ছায়াছবির সাফল্যের কারণ হ'ল, সহজ-সরল অথচ আকর্ষণীয় ভঙ্গীতে সাদামাটা ঘটনা বা গল্পের বর্ণনা। যুব প্রজন্মের সৃষ্টিশীলতা ও প্রতিভা ছাড়া এ ধরনের ছায়াছবি নির্মাণ সম্ভব হত না।

তুরস্কের বিশিষ্ট চিত্র নির্মাতা আব্বাস অরনাত মনে করেন, ইরান এশীয় চলচ্চিত্রে নেতৃত্ব দেয়ার যোগ্যতা রাখে। এর কারণ সম্পর্কে তিনি বলেন, ইরানীদের মধ্যে রয়েছে আন্তরিকতা, সাহিত্যের প্রাচীন ঐতিহ্য এবং গভীর ও মানবীয় দর্শনের বন্ধন।
সম্প্রতি অস্ট্রেলিয়ার কুইন্সল্যান্ডে ৭১ টি দেশের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত হয়েছে "স্ক্রীন এশিয়া প্যাসিফিক" শীর্ষক তৃতীয় চলচ্চিত্র উৎসব। এ উৎসবে ইরানী চিত্র নির্মাতা আসগর ফরহাদের ছায়াছবি এবাউট এলি বা এলি সম্পর্কে শ্রেষ্ঠ চিত্রনাট্যের পুরস্কার লাভ করে। এ ছাড়াও এই ছায়াছবি সেখানে দুটি বিশেষ পুরস্কার পেয়েছে। এশিয়া ও প্যাসিফিক অঞ্চলের সাংস্কৃতিক বৈচিত্রসহ এ অঞ্চলে ছায়াছবি নির্মাণের বিভিন্ন পন্থা বা ধারাকে সম্মাননা দেয়ার উদ্দেশ্যেই প্রতি বছর এই উৎসবের আয়োজন করা হয়। ইরানের ছায়াছবি ছাড়াও অস্ট্রেলিয়া, ফিলিস্তিন, চীন ও দক্ষিণ কোরিয়ায় ছায়াছবি এই উৎসবে সেরা ছায়াছবির পুরস্কার লাভ করে। এ উৎসবকে এশিয়ার অস্কার বলা যেতে পারে। কারণ এতে এক বছর ধরে এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগর অঞ্চলে নির্মিত ছায়াছবিগুলোর মধ্যে সেরা ছায়াছবি বাছাই করা হয়।

এবাউট এলি বা এলি সম্পর্কে শীর্ষক ছায়াছবি আসগর ফরহাদের নির্মিত চতুর্থ ছায়াছবি। জনাব ফরহাদ পড়াশুনা করেছেন অভিনয় বিষয়ে। ছায়াছবি নির্মাণ ছাড়াও তিনি বেশ কয়েকটি চিত্র নাট্য লিখেছেন এবং কয়েকটি টিভি সিরিয়ালও নির্মাণ করেছেন। ছাত্রজীবনে অভিনেতা হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। চাহার শানবেহ সুরী বা ফার্সী বছরের শেষ বুধবারের উৎসব শীর্ষক তার ছায়াছবিটি দর্শকদের ব্যাপক প্রশংসা কুড়িয়েছে।
এবাউট এলি ছায়াছবিতে দেখা যায় চার দম্পতি উত্তর ইরানে সমুদ্র সৈকতে বেড়াতে যাবার পর তাদের কোনো এক দম্পতির এক পুত্র সন্তান সাগরে ডুবে গেলে লোকজন তাকে উদ্ধার করে। এরপর উদ্ধারের জন্য ছুটে আসা লোকদের মধ্যে হঠাৎ এলি নামের এক যুবতী নিখোঁজ হবার খবর শুনতে পায় অন্যরা। এই যুবতী নিজেকে নার্সারী স্কুলের শিক্ষিকা বলে তার সফরসঙ্গীদের কাছে উল্লেখ করেছিলেন। কিন্তু পরে অনুসন্ধানে জানা যায় সে মিথ্যে কথা বলেছিল। এ ধরনের মিথ্যাচারের রহস্য অনুসন্ধান ও এর মনোস্তাত্তিক তাৎপর্য উদঘাটনের মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছে এই ছায়াছবি। এভাবে এ ছায়াছবিতে মানসিক ও নৈতিক বা চারিত্রিক মূল্যবোধ সংক্রান্ত সমস্যা এবং সেসবের কারণ তুলে ধরা হয়েছে।

এ ছায়াছবি আমাদের এটা শিক্ষা দেয় যে মানুষের জীবনে অনেক সময় এমন কিছু মুহূর্ত আসে যখন হয় নিজের স্বার্থের বিষয়কে প্রাধান্য দেয়া অথবা সত্য বিষয় বা বাস্তবতা তুলে ধরার মধ্যে যে কোনো একটিকে বেছে নেয়া খুব কষ্টকর হয়ে পড়ে। কিন্তু এ অবস্থায় নিজের ক্ষতি হলেও সত্য কথাটি বলা ও মিথ্যা পরিহার করাই যে মঙ্গলজনক এবাউট এলি-তে সে বাস্তবতা তুলে ধরা হয়েছে।

এশীয় চলচ্চিত্রের বিশেষজ্ঞ ও সমালোচক ডেভিড ব্রডওয়েল এবাউট এলি শীর্ষক ছায়াছবির উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেছেন। তার মতে এ ছবির ভাষা বা ভাবার্থ আন্তর্জাতিক। ফলে এই ছায়াছবি খুব সহজেই বিশ্বের যে কোনো প্রান্তের মানুষের সাথে সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম। কারণ, বিভিন্ন ঘটনার ব্যাপারে মানুষের মানসিক বা মনোস্তাত্তিক সাড়াগুলো বিশেষ কোনো স্থানের মধ্যে সিমীত নয়। এ ছায়াছবিতে গল্পের ফর্ম ও বিষয়বস্তুর মধ্যে সঙ্গতি চমৎকার। বিশেষ করে এ ছায়াছবিতে তথাকথিত অপরিহার্য মিথ্যা বক্তব্য প্রদানের পটভূমি বা কারণ খুব ভালোভাবে তুলে ধরা হয়েছে।

এবাউট এলি ইরানের সাতাশতম ফজর ফিল্ম চলচ্চিত্র উৎসবে শ্রেষ্ঠ চিত্র পরিচালনার পুরস্কার পেয়েছে। এ ছাড়াও এ ছায়াছবি বার্লিনের সিলভার বিয়ার চলচ্চিত্র উৎসবে, নিউইয়র্কের ট্র্যাবিকা চলচ্চিত্র উৎসবে পুরস্কার পেয়েছে। নিউইয়র্কের এই উৎসবে ছায়াছবিটি শ্রেষ্ঠ গল্প হবার গৌরব অর্জন করে। ইতালীর ইশিয়াতিকা চলচ্চিত্র উৎসবে এই ছায়াছবি বিচারক ও দর্শকদের ভোটে শ্রেষ্ঠ ছায়াছবি হবার পুরস্কার পায়। আগামী বছর অর্থাৎ ২০১০ সালে এই ছায়াছবিটি অস্কার চলচ্চিত্র উৎসবেও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে বলে কথা রয়েছে। #


মন্তব্য লিখুন


Security code
রিফ্রেস দিন