এই ওয়েবসাইটে আর আপডেট হবে না। আমাদের নতুন সাইট Parstoday Bangla
বৃহস্পতিবার, 07 জানুয়ারী 2010 22:36

ইরানের সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহে বিদেশী হস্তক্ষেপের কারণসমূহ

ইরান মধ্যপ্রাচ্য ও পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের একটি বৃহৎ ও প্রভাবশালী দেশ। স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠা ও সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী শ্লোগানের ওপর ভিত্তি করে ইরানে ইসলামী শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর মধ্যপ্রাচ্যে পশ্চিমা দেশগুলোর স্বার্থ ক্ষুন্ন হয়। এ কারণে এসব দেশ ইরানের প্রতি বিদ্বেষী নীতি গ্রহণ করে এবং যে কোন উপায়ে ইরান সরকারের জন্য সমস্যা সৃষ্টির পরিকল্পনা করে। এরই ধারাবাহিকতায় গত বছর জুনের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের পর ইরানে যে সহিংতা সৃষ্টি হয় সেটিকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহারের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় কিছু দেশ। শতকরা ৮০ ভাগেরও বেশী ভোটার ঐ নির্বাচনে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন যা গণতান্ত্রিক দেশগুলোর ইতিহাসে নজীরবিহীন ঘটনা। ঐ নির্বাচনের পর কোন কোন প্রার্থী দাবি করতে থাকেন ঐ নির্বাচনে কারচুপি হয়েছিলো। তখন থেকেই পশ্চিমা সরকার ও গণমাধ্যমগুলো ইরানের রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে জটিল করার জন্য মাঠে নেমে যায়। আজকের দিগন্তে আমরা এ সম্পর্কে সংক্ষেপে আলোচনা করবো।

পশ্চিমারা বিভিন্ন কৌশল অবলম্বনের মাধ্যমে ইরানের সাম্প্রতিক পরিস্থিতিকে নিজেদের স্বার্থের অনুকূলে নেয়ার চেষ্টা করেছে। যুক্তরাষ্ট্র, বৃটেন ও ফ্রান্স সরকার মানবাধিকার ও গণতন্ত্র রক্ষার অজুহাতে ইরানের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপমূলক কথাবার্তা প্রচার করছে। ঐসব কথাবার্তায় প্ররোচিত হয়ে ইরানের কিছু উদাসিন জনগোষ্ঠি সরকার বিরোধী বিক্ষোভ অব্যাহত রেখেছে। এদের মধ্যে কিছু লোক নির্বাচনের ফলাফলকে অজুহাত হিসেবে দাঁড় করিয়ে ইরানের ইসলামী শাসনব্যবস্থার অবমাননা করেছে এবং নাশকতামূলক তৎপরতা চালিয়েছে। গত ২৭শে ডিসেম্বর পবিত্র আশুরার দিন কথিত সরকার বিরোধীরা আশুরার পবিত্রতা ক্ষুন্ন ও সরকারী সম্পদ ধ্বংস করার কারণে দেশের আপামর জনসাধারণ ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছে

মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ইরানে আশুরার দিনের ঘটনার ব্যাপারে গোলযোগ সৃষ্টিকারীদের সমর্থন করে তাদের নিয়ন্ত্রণে সরকারের গৃহিত পদক্ষেপের নিন্দা জানিয়েছেন। বৃটেন ও ফ্রান্সসহ আরো কিছু ইউরোপীয় দেশ ওয়াশিংটনের কণ্ঠে সুর মিলিয়েছে। কিন্তু এর কয়েক দিনের মধ্যে তেহরানসহ সারা ইরানের কোটি কোটি জনতা রাস্তায় নেমে ইসলামী শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে শ্লোগান দেয়ার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। তবে পশ্চিমা গণমাধ্যমগুলো ইরানের মুষ্টিমেয় মানুষের বিক্ষোভকে বড় করে তুলে ধরলেও কোটি জনতার বিক্ষোভকে অত্যন্ত গুরুত্বহীন হিসেবে প্রচার করে। পশ্চিমা সরকার ও গণমাধ্যমগুলো এমন সময় ইরানের মানবাধিকার পরিস্থিতি ও গণতন্ত্রকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে, যখন মধ্যপ্রাচ্যের অধিকাংশ দেশে হয় গণতন্ত্র নেই, অথবা থাকলেও তা অত্যন্ত সীমিত পর্যায়ে রয়েছে। কিন্তু ইরান ছাড়া বাকি দেশগুলো পশ্চিমাদের অনুগত বলে সেসব দেশের ব্যাপারে সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলোকে কখনো কিছু বলতে শোনা যায় নি।

মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিন্টন সম্প্রতি সিএনএনকে দেয়া সাক্ষাৎকারে ইরানের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপের কথা সরাসরি স্বীকার করেছেন। তিনি বলেছেন : "আমরা ব্যাপক প্রচেষ্টা চালিয়েছি। ইরানের সরকার বিরোধীদের সাথে সরাসরি বিক্ষোভে অংশ নেই নি ঠিকই, কিন্তু তাদের প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানিয়েছি।" গোলযোগ সৃষ্টিকারীদের প্রতি মার্কিন সরকার সমর্থন অব্যাহত রাখবে বলে তিনি ঘোষণা করেন। আসলে ইরানের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের পর পশ্চিমা দেশগুলো ইরানের বিরুদ্ধে মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ শুরু করেছে এবং এই যুদ্ধের প্রধান অস্ত্র হচ্ছে গণমাধ্যম। পাশ্চাত্য রেডিও, টিভি, নিউজ চ্যানেল ও ইন্টারনেটের মাধ্যমে নির্বাচনের ফলাফলে ক্ষুব্ধ ব্যক্তিদের সহিংস আচরণ করতে উস্কে দিচ্ছে। সিএনএন, ফক্স নিউজ, ইউরো নিউজ, বিবিসি ও ভয়েস অব আমেরিকার নাম এক্ষেত্রে বিশেষভাবে উল্লেখ করা যায়। এছাড়া আল আরাবিয়া ও আল-জাযিরার মতো আরব নিউজ চ্যানেলগুলিও পশ্চিমা গণমাধ্যমগুলোর দ্বারা প্রভাবিত হয়ে ইরান বিরোধী প্রচারে নেমেছে।

ইরানের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের মাত্র কয়েকমাস আগে বিবিসি'র ফার্সি টিভি বিভাগ চালু হয়। এছাড়া বিবিসি ফার্সি রেডিও'র অনুষ্ঠানের সময়ও বৃদ্ধি করা হয়। ফলে বৃটিশ সরকার বিবিসি রেডিও ও টিভির পাশাপাশি বিবিসির ওয়েব সাইটের মাধ্যমে ইরানের নির্বাচন পরবর্তী ঘটনাবলীতে প্রকাশ্য হস্তক্ষেপ করে। বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে একই ধরনের যেসব বিক্ষোভ বৃটিশ সরকারের স্বার্থ রক্ষা করে নি, বিবিসি সেসব খবর প্রচার করে নি। অথচ ইরানের সহিংস ঘটনাকে প্রতি মুহুর্তে সরাসরি সম্প্রচার করেছে এবং এসব ঘটনাকে বড় করে তুলে ধরার চেষ্টা করেছে। ইরানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মোস্তফা মোহাম্মাদ নাজ্জার বলেছেন, বিবিসি ফার্সি গোলযোগ সৃষ্টিকারীদের দিক নির্দেশনা দিচ্ছে। ঐ নিউজ চ্যানেল সহিংস বিক্ষোভকে শান্তিপূর্ণ আখ্যায়িত করে দাবি করেছে, বিক্ষোভে প্রতি মুহুর্তে লোকজনের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিবিসির এই খবর প্রচারের উদ্দেশ্য ছিলো, গোলযোগ সৃষ্টিকারীদের এই বার্তা দেয়া যে, রাস্তায় কোন বিপদ নেই, এই মুহুর্তে তোমরা রাস্তায় নেমে এসো।

এদিকে বিশ্বের ইন্টারনেট ব্যবস্থা রয়েছে মূলত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে। মার্কিন সরকার ফেইসবুক, টুইটার ও ইউটিউবের মতো ওয়েবসাইট খুলে দিয়ে ইরান সম্পর্কে ভিত্তিহীন খবর ছড়িয়ে দিয়ে সরকার বিরোধীদের মধ্যে সম্পর্ক ও সমন্বয় সৃষ্টির কাজ করছে। এসব সাইট এ পর্যন্ত বহু অসত্য খবর প্রচার করেছে। এমনকি ইরানের ঘটনাবলীকে বড় করে তুলে ধরার জন্য অনেক বিকৃত ছবিও তৈরি করেছে। এসব ছবির মাধ্যমে গোলযোগ সৃষ্টিকারীদের নিয়ন্ত্রণের জন্য নিরাপত্তা বাহিনীর গৃহিত পদক্ষেপকে অত্যন্ত রুঢ় ও দমনপীড়নমূলক বলে দেখানোর চেষ্টা করা হয়েছে।

এখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে, পশ্চিমা সরকারগুলো ইরানের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করে কী কী লক্ষ্য অর্জন করতে চায়? ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান বর্তমান বিশ্বে ধর্মভিত্তিক জনগণের শাসনের উজ্জ্বলতম দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। বিশ্বের আপামর মুসলিম জনগোষ্ঠির কাছে ইরানের ইসলামী শাসনব্যবস্থা জনপ্রিয় হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। এ কারণে কথিত উদারনৈতিক গনতন্ত্রের ধ্বজাধারী পাশ্চাত্য এই জনপ্রিয়তায় শঙ্কিত হয়ে ইরানের ইসলামী শাসনব্যবস্থার ভাবমুর্তি ক্ষুন্ন করার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। ইরানের অনেক বিক্ষোভকারী যখন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ফলাফল মেনে নিয়েছেন, তখন পশ্চিমা গণমাধ্যমগুলো এখনো গোলযোগকে উস্কে দেয়ার চেষ্টা করছে। পশ্চিমা দেশগুলো ইরানের ইসলামী শাসনব্যবস্থাকে দুর্বল- এমনকি সম্ভব হলে এর পতন ঘটানোর চেষ্টা করছে। ঐসব শক্তি এ পর্যন্ত অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, অভ্যূত্থান, যুদ্ধ চাপিয়ে দেয়াসহ অন্যান্যা পন্থায় তাদের ঐসব অশুভ লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হয়ে এখন ইরানে দাঙ্গা উস্কে দিতে চাচ্ছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, ইরানের হাতে গোনা কিছু লোক আইন অমান্য ও সরকারী সম্পদ ধ্বংসের মাধ্যমে তাদের লক্ষ্য অর্জনের চেষ্টা করলেও দেশের অধিকাংশ জনগণ শান্তি ও নিরাপত্তা চায় এবং তারা ইসলামী শাসনব্যবস্থার আওতায় সব সমস্যার সমাধানে বিশ্বাসী। তাদের মতে, পশ্চিমারা ইরানের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করলে গত বছরের জুনে অনুষ্ঠিত নির্বাচন পরবর্তী সমস্যা অনেক দ্রুত মিটে যেতো এবং অনেক সহিংস ঘটনা ঘটতো না। ইরানের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আহমাদিনেজাদ গত ৬ মাসে ইরানের জনগণ ও ইসলামী বিপ্লবকে দুর্বল করার পশ্চিমা ষড়যন্ত্রের কথা উল্লেখ করে বলেছেন : "ওরা যে ষড়যন্ত্র ও চক্রান্ত করেছিলো তার ব্যাপ্তি ছিলো অনেক বিস্তৃত ও জটিল। কিন্তু ইরানী জনগণের কাছে তাদের নেতার অবস্থান অনেক উর্দ্ধে বলে তারা শত্রুদের ষড়যন্ত্র যত জটিলই হোক না কেন তা নস্যাত করে দেবে।"


মন্তব্য লিখুন


Security code
রিফ্রেস দিন